kalerkantho


বোলিংয়েও মেঘের ঘনঘটা

১৭ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



বোলিংয়েও মেঘের ঘনঘটা

খেলবেন তামিম : চোটের কারণে দ্বিতীয় টেস্ট থেকেই মাঠের বাইরে তামিম ইকবাল। তবে আগামীকাল পার্লে অনুষ্ঠেয় সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতেই ফিরছেন বাঁহাতি এ ওপেনার। ছবি : ফাইল ফটো

পচেফস্ট্রুমের কনকনে ঠাণ্ডা থেকে ব্লুমফন্টেইনের বৃষ্টি। এরপর কিম্বার্লিতে রোদের দাপটে কিছুটা বাংলাদেশের মতো আবহাওয়া; সঙ্গে থাকলই বা প্রবল হাওয়া।

শহর থেকে শহরে ছুটে বেড়ানোর এই দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে বাংলাদেশ দল কাল এসে পৌঁছে কেপটাউনে। এই বদলে ভাগ্য কি বদলাবে এবার?

প্রকৃতির কিন্তু রং বদলায়নি খুব একটা। কাল দ্বিতীয় ওয়ানডে যে কেপটাউনসংলগ্ন পার্লে, সেখানকার প্রকৃতি বরং যেন আগের দিন শহরের সমন্বিত রূপ নিয়ে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত বাংলাদেশ দলকে। এখানকার আকাশে কাল সকাল থেকেই মেঘ-রোদ্দুরের লুকোচুরি। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে আটকে থাকে মেঘমালা; যখন খুশি বৃষ্টি হয়ে ঝরছে তা। আবার মেঘভাঙা রোদ হেসে উঠতেও সময় নিচ্ছে না। কাল বিকেলে কেপটাউনে যখন এসে পৌঁছে মাশরাফি বিন মর্তুজার দল, তখন অবশ্য বৃষ্টি-রোদ দুটোই অনুপস্থিত। টেবিল মাউন্টেন থেকে উড়ে আসা তীব্র শীতল বাতাস কেবল ঘুরে বেড়ায় উদ্ভ্রান্তের মতো।

ঠিক যেমন উদ্ভ্রান্ত দশা বাংলাদেশের!

দক্ষিণ আফ্রিকায় এসে যে হাতি-ঘোড়া কিছু করে ফেলবে বাংলাদেশ, অমন আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা ছিল না তেমন কারো।

কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতাটুকু তো করবে অন্তত! চোখে চোখ রেখে লড়াইয়ের সামর্থ্য যে হয়েছে এত দিনে, এর প্রতিফলন তো থাকবে পারফরম্যান্সে! কিসের কী? বাংলাদেশের খেলায় বরং সেই প্রস্তর যুগের ছাপ। ২০০২ ও ২০০৮ সালের সফরের রোগ। আর এত দিন তো ছিল রোগের লক্ষণ, এখন সময় যত গড়াচ্ছে তা রূপান্তরিত হচ্ছে বিকারে। ক্রমশ!

টেস্ট সিরিজের দুই ম্যাচেই নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। আশা ছিল, ওয়ানডেতে নিশ্চয়ধই ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ। কিন্তু সেই আশার আগুনে পানি ঢেলে দিতে একদমই সময় নেননি ক্রিকেটাররা। বিশেষত বোলাররা। ২৭৮ করেও যদি ১০ উইকেটে হারতে হয়, তাহলে তাঁদের কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে উপায় কী! ম্যাচ শেষে তাই অধিনায়ক মাশরাফির কণ্ঠে ছিল হাহাকার, ‘আজ যে বোলিং করেছি, তা পুরোপুরি হতাশাজনক। আমরা ভালো বোলিং করলেও ওরা হয়তো এই রান তাড়া করে জিতত। কিন্তু যদি ৫-৬ উইকেট নিতে পারতাম, তাহলে ব্যাপারটা অন্য রকম হতো। যদি ম্যাচের মাঝামাঝি পর্যায়ে ওই ৫-৬ উইকেট নিতাম, তাহলে ফল আমাদের পক্ষেও থাকতে পারত। ’ বলতে বলতে হাঁপান মাশরাফি। তাঁর বুকের ভেতর তখন ছোটাছুটি করছে একগাদা ক্লান্ত নিঃশ্বাসের ভার।

কালকের পার্লের মতোই!

টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমও বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছেন বোলারদের সামর্থ্য আর দায়বদ্ধতা। ওয়ানডে অধিনায়ক অত দূর যাননি। কিন্তু হতাশাটা চেপেও রাখতে পারেননি তিনি, ‘ওয়ানডেতে পার্টনারশিপ বোলিংটা বেশি করতে হয়। এক পাশ থেকে রান বের হয়ে গেলে অন্য দিকে যে ভালো বোলিং করছে, তাকে আর ব্যাটসম্যানের মেরে খেলতে হয় না। এই ধরনের উইকেটে আজ আমরা অমন বোলিং করতে পারিনি। যদি কিছুটা সময়ের জন্য এভাবে বোলিং করতে পারতাম, তাহলে হয়তো ব্রেক থ্রু পেতে পারতাম। সেটা আমরা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পারিনি। ’ ভুল আর কী বলেছেন মাশরাফি! প্রথম ওয়ানডেতে নতুন বল হাতে রুবেল হোসেন তিন ওভারে দিয়ে দেন ১৭ রান। বদলি হিসেবে এসে তাসকিন আহমেদ ২৩ রান দেন দুই ওভারে। অন্য প্রান্তের পাঁচ ওভারে অধিনায়ক মাত্র ২০ রান দিলেই বা কী!

বোলারদের এমন এলেবেলে বোলিং যে পরশুই ব্যতিক্রম—তা তো না। এ বছর চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩০৫ রানে হৃষ্টপুষ্ট সংগ্রহ গড়ে বাংলাদেশ। কী হেলাফেলাতেই না ১৬ বল ও ৮ উইকেট হাতে রেখে তা পেরিয়ে যায় স্বাগতিকরা! ১৮৩ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া ১৬ ওভারেই

তুলে ফেলে ৮৩। এরপর বৃষ্টিতে না হয় রক্ষা! কিন্তু নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠার পর ভারতের বিপক্ষে আর শেষরক্ষা হয়নি। ২৬৪ রানের পুঁজিতেও ন্যূনতম প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে পারে না বাংলাদেশ। ৯.৫ ওভার বাকি থাকতে ৯ উইকেটে জিতে যায় ভারত।

পরশুর ম্যাচের সঙ্গে পার্থক্য বলতে, দক্ষিণ আফ্রিকার একটি উইকেটও তুলে নিতে পারেনি মাশরাফির দল।

হ্যাঁ, ইনজুরির কারণে মুস্তাফিজুর রহমান খেলতে না পারাটা ছিল বড় এক ধাক্কা। এই বাঁহাতি পেসারই তো এ বছর ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সফলতম বোলার। ১১ ম্যাচে ১৪ শিকারে; ৩২.৫৭ গড় এবং ৫.৪৮ ইকোনমিতে। দ্বিতীয় সফলতম মাশরাফি ১১ ম্যাচে ৩৭.৯২ গড়, ৫.৩১ ইকোনমিতে ১৩ উইকেট নিয়ে। তাঁদের বাইরে তাসকিন সাত ওয়ানডেতে নেন ৮ উইকেট; ৩৬.৩৭ গড় এবং ৫.৯৫ ইকোনমিত আর রুবেলের ৯ ম্যাচে ৫ শিকার ৭৫.৬০ গড় এবং ৫.৯০ ইকোনমিতে। শেষ দুজনের পারফরম্যান্স বলা মতো না। তবে সবচেয়ে আতঙ্ক জাগানিয়া বোলিং সাকিব আল হাসানের। এ বছর খেলা ১২ ওয়ানডেতে মাত্র ৪ উইকেট নিয়েছেন তিনি। ওভারপ্রতি ৫.৪৩ রান দেওয়া তা-ও না হয় মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু যখন জানবেন প্রতিটি উইকেটের জন্য সাকিবকে করতে হয়েছে ১৩২টি বল এবং খরচ করতে হয়েছে ১১৯.৫০ রান—তখন শঙ্কা তাড়ানো কঠিন বৈকি!

যেমনটা কঠিন মনে হচ্ছিল কালকের পার্লের আকাশ থেকে মেঘ তাড়ানোটাও! একটু-আধটু রোদ্দুরের সাধ্যি আর কতটুকুন!


মন্তব্য