kalerkantho


সাকিব খেললেন সাকিবের মতোই

১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



সাকিব খেললেন সাকিবের মতোই

শন পোলক : সাকিবকে টেস্টে দেখতে চেয়েছিলাম। ও ভালো ক্রিকেটার, এখানে ভালো করার সামর্থ্য আছে।

সে অন্যদের দেখাতে পারত যে, এমন উইকেটে কিভাবে খেলতে হয়।

অ্যালান ডোনাল্ড : মাঠের খেলা দেখে মনে হয়েছে, সাকিবের না থাকার প্রভাব পড়েছে প্রবলভাবে। ও দলের সেরা খেলোয়াড়, পারফরম্যান্সের কারণে মাঠের নেতা। এমন একজন যখন দক্ষিণ আফ্রিকার মতো কঠিন এক সফরে দলের সঙ্গে থাকে না, তখন এর প্রভাব পড়াই স্বাভাবিক।

জ্যাক ক্যালিস : সাকিব দারুণ খেলোয়াড়। বিশেষত ধীরগতির নিচু বাউন্সের উপমহাদেশীয় উইকেটে ও ভীষণ কার্যকর বোলার। খুব চতুরও। আর ব্যাটিংয়ে সাকিব আক্রমণাত্মক ধাঁচের। বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় খেলোয়াড় ও।

তিনজনই দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি ক্রিকেটার। সর্বকালের সেরাদের মধ্যেও জায়গা করে নেন অনায়াসে। গত এক সপ্তাহে এই ত্রয়ীর সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় প্রসঙ্গক্রমে তাঁদের মুখে সাকিব আল হাসানের নাম চলে আসে অবধারিতভাবে। কেন? তা যেন কালকের প্রস্তুতি ম্যাচে আরো একবার বুঝিয়ে দেন সাকিব। ভিনি, ভিডি, ভিসির মতো সাকিব আল হাসান এলেন, খেললেন, জয় করলেন। ব্যাটিংয়ে ৬৭ বলে ৬৮ রানের ঝকঝকে ইনিংসে। টেস্ট সিরিজে বিশ্রাম নেওয়ার কারণে সাকিবকে ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা কম হয়নি। তাঁকে ছাড়া বাংলাদেশের ভরাডুবিতে আরেক দফা।

কিন্তু ওসবে তাঁর থোড়াই কেয়ার! এই যে দক্ষিণ আফ্রিকায় আসার পর থেকে ক্রিকেটারদের মুখে মুখস্থ বুলির মতো শোনা যাচ্ছে কন্ডিশনের দোহাই, সেটিকেও কী তাচ্ছিল্যই না করেন! সাকিবের কালকের ব্যাটিং দেখে যেন মনে হয়, গত মাসের ১৭ তারিখ বাংলাদেশ দল দক্ষিণ আফ্রিকায় আসার আগে থেকেই এই দেশে বসতি তাঁর!

ওয়ানডে স্কোয়াডে যোগ হওয়া মাশরাফি বিন মর্তুজা, নাসির হোসেন ও মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিনের সঙ্গে সাকিব দক্ষিণ আফ্রিকায় আসেন ৭ অক্টোবর। জোহানেসবার্গ থেকে পরদিন ব্লুমফন্টেইন। ৯ অক্টোবর ঐচ্ছিক অনুশীলন করেন, পরদিন জিম, পুরোমাত্রায় অনুশীলন কেবল এক দিন—পরশু। ব্যস, তাতেই পুরোপুরি প্রস্তুত এই অলরাউন্ডার। রংধনুর দেশে প্রথম ম্যাচেই কাল তাঁর রং ছড়ানো পারফরম্যান্স।

উইকেটে যান ৬১ রানে ৩ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর। এত দিন পর ক্রিজে আবার, একটু জড়তা থাকা স্বাভাবিক। আর সাকিবের বেলায় জড়তা কাটানোর বরাবরের বটিকা তো আক্রমণাত্মক-ঝুঁকিপূর্ণ কিছু শট খেলা। অথচ কালকের সাকিব কত আলাদা! তাঁর ব্যাটিংয়ে আক্রমণের ঝাঁজ পুরোমাত্রায়, তবে ঝুঁকি ততটা নয়। পর পর দুই বলে পেসার মালুসি সিবোতোকে চোখজুড়ানো কাভার ড্রাইভে তাই চার মারেন। জেপি দুমিনিকেও এক ওভারে বাউন্ডারিছাড়া করেন দুইবার। সতীর্থ মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদ উল্লাহ ফিরে যান; দল আরো বিপদে—কিন্তু সাকিব থাকেন অবিচল। ফিফটিতে পৌঁছে যান দেখতে দেখতেই। বিউরান হেনড্রিকসকে পুল করে ফাইন লেগে পাঠিয়ে দুই রান নিয়ে যখন ওই মাইলফলকে, ততক্ষণে খেলেন মোটে ৫৪ বল।

অন্যদের জন্য অনুকরণীয় নিঃসন্দেহে।

সাকিবের কালকের ইনিংসে খুঁত একটাই—অত ভালো খেলেও সেটিকে বড় করতে পারেননি। ৯ বাউন্ডারির মধ্যে শেষ তিনটি ফিফটি পেরোনোর পর। শেষটি বাঁহাতি স্পিনার অ্যারন ফাঙ্গিসোকে কাভারের ওপর দিয়ে তুলে মেরে। কিন্তু পরের বলেই ডাউন দ্য উইকেটে এসে চালাতে গিয়ে লেগে যায় ব্যাটের কানায়। মিড অনে ক্যাচ দিয়ে আউট তিনি ৬৮ রানে। আন্তর্জাতিক ম্যাচ নয় এটি। তবে ওয়ানডে সিরিজের জন্য নিজের প্রস্তুতির ঘোষণা কাল ভালোভাবেই দেন সাকিব।

অবশ্য জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তনে এমন ঝলমলে পারফরম্যান্স তাঁর জন্য নতুন নয়। ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নিষেধাজ্ঞা পেরিয়ে ফেরেন সেই সিরিজে। ঢাকার প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসেই তাঁর ৬ উইকেট। খুলনার দ্বিতীয় টেস্টে তো ক্রিকেটের এক অত্যাশ্চর্য রেকর্ডে অংশীদার হন ইয়ান বোথাম ও ইমরান খানের। ওই দুই কিংবদন্তির পর ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে এক টেস্টে সেঞ্চুরি ও ১০ উইকেট শিকারের যুগলবন্দি অর্জনে। চট্টগ্রামের তৃতীয় টেস্টে তাঁর আরেক ফিফটি। ম্যান অব দ্য সিরিজ পুরস্কারে তাই দ্বিতীয় কারো নাম ভাবার সুযোগই দেননি সাকিব।

কালকের অনুশীলন ম্যাচের ব্যাটিং দেখে প্রোটিয়াদের বিপক্ষে সিরিজ নিয়ে এখনই অত বড় উচ্চারণ হয়তো করা যাবে না। তবে ওই তিন প্রোটিয়া কিংবদন্তির কথার মান তো রাখতে পেরেছেন সাকিব। পোলকের কথাকে যেমন যথার্থ মনে হয়—সাকিব অন্যদের কাল দেখান এই উইকেটে কিভাবে খেলতে হয়। ডোনাল্ডের কথাও ভুল না—সাকিব দলের সেরা খেলোয়াড়, পারফরম্যান্সের কারণে মাঠের নেতা। আর ক্যালিসের উচ্চারণও কত সত্য—বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় খেলোয়াড় সাকিব!


মন্তব্য