kalerkantho


পদ্মাপারের ক্রিকেট পাঠশালা

সামীউর রহমান, রাজশাহী থেকে ফিরে   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



পদ্মাপারের ক্রিকেট পাঠশালা

প্রথম বিভাগের চ্যাম্পিয়ন শাইনপুকুর, দ্বিতীয় বিভাগের চ্যাম্পিয়ন এক্সিওম ক্রিকেটার্স ও তৃতীয় বিভাগের রানার্স-আপ মোহাম্মদপুর ক্রিকেট একাডেমির বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই রাজশাহীর এই বাংলাট্র্যাক ক্রিকেট একাডেমির।

পিদ্মাপারের রাজশাহীতে নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব নেই! বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যাডেট কলেজ, পুলিশ ট্রেনিং কলেজ...কী নেই! বলা যায়, ছাত্র-ছাত্রীরাই এ শহরের প্রাণ! গ্রীষ্মের বন্ধে, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যখন ছুটি শুরু হয়, তখন শহরের মুঠোফোনের ব্যবহারকারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসে! গল্প আড্ডায় মুঠোফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের এক কর্মী জানিয়েছিলেন এমনটাই। প্রমাণটা মিলেছে হাতেনাতেই।

ঘড়ির কাঁটা রাত ৯টা পেরোতেই শহরের কেন্দ্রস্থল সাহেববাজার নীরব হলেও মধ্যরাতেও জমজমাট রাবিপ্রবি আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকের উল্টোপাশের খাবারের দোকানগুলো! এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খ্যাতি তো দেশজোড়া। তবে রাজধানীমুখী মহাসড়ক ধরে, বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকা ছাড়িয়ে আরো কতটা পথ পাড়ি দিলে চোখে পড়বে আরেকটি ‘শিক্ষা’ প্রতিষ্ঠানের, যেখানে ‘খাতাকলম’ হচ্ছে ব্যাট আর বল। স্কুলব্যাগ নয়, বরং কাঁধে কিটব্যাগ, তাতে বইপত্রের বদলে ব্যাট, প্যাড আর গ্লাভস গোঁজা। বাংলাট্র্যাক ক্রিকেট একাডেমিতে সপ্তাহে পাঁচ দিন ক্রিকেট প্রশিক্ষণ নেন ছয় শর মতো উঠতি ক্রিকেটার।

ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই ক্রিকেট একাডেমিটা আয়তনে বিশাল না হলেও একেবারে ছোট নয়। খোলা মাঠ, ইনডোর, ছাত্রাবাস, অতিথিশালা, ব্যয়ামাগার—সবই আছে একাডেমিতে। আছে লাগোয়া ছোট একটি মসজিদও। একপাশে পুকুর, ধার ঘেঁষে পেয়ারাবাগান আর নারকেলগাছের সারি। তবে একাডেমি তো আর রিসোর্ট নয় যে নিসর্গের সন্ধান করতে যাওয়া, তবে নান্দনিকতায় খুঁজে পাওয়া যায় উদ্যোক্তাদের সুরুচির ছাপ।

অনুশীলন সুবিধাও বেশ ভালো। ইনডোর নেট আছে তিনটি, আছে বোলিং মেশিনও। বেশ আধুনিক যন্ত্রপাতিতে সাজানো ব্যায়ামাগার, ফিজিওথেরাপি রুমও আছে। আপাতত জনাত্রিশেকের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা, তবে সেটা বাড়িয়ে তিন শ জন করার পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে। অবশ্য এসব তো পয়সাকড়ি খরচ করলেই সারা যায়, যেকোনো ক্রিকেট একাডেমির প্রাণ হচ্ছে কোচ ও ছাত্ররা। বাংলাট্র্যাকের একাডেমিতে নিবেদিতপ্রাণ কোচ ও ছাত্র দুই-ই আছে।

ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রতিভাবান ক্রিকেটার খুঁজে বের করার একটা জহুরির চোখ আছে খালেদ মাহমুদের। বিসিবি পরিচালক, ঢাকা ডায়নামাইটস বিপিএল দলের কোচ, প্রিমিয়ার লিগে আবাহনীর কোচ...এমন অনেক দায়িত্বই তাঁর ওপর। এত কিছুর মাঝেও ঠিকই নিয়ম করে সপ্তাহে তিন দিনের জন্য রাজশাহীর এই ক্রিকেট একাডেমিতে উঠতি ক্রিকেটারদের প্রশিক্ষণ দেন খালেদ মাহমুদ। সঙ্গে আছেন জাতীয় দলের হয়ে একটি ওয়ানডে খেলা সাবেক পেসার আমিনুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন স্থানীয় কোচ। তাঁরা প্রত্যেকেই লেভেল টু পর্যায়ের কোচিং কোর্স করেছেন। বিসিবিতে কাজ করা উঁচু মানের ফিজিও আছেন, মাঠকর্মী ও অন্যান্য কার্যক্রম চালানোসহ সব মিলিয়ে ২২ জনের একটি কর্মী বাহিনী বাংলাট্র্যাক ক্রিকেট একাডেমির। তাদের তত্ত্বাবধানেই দিনে চারটি ব্যাচে সপ্তাহে পাঁচ দিন চলে ক্রিকেট প্রশিক্ষণ। কোচিং কার্যক্রম নিয়ে খালেদ মাহমুদ জানান, ‘যারা ভালো করছে বা সম্ভাবনাময়, তাদের নিয়ে চলে সকাল থেকে মধ্যাহ্ন বিরতি পর্যন্ত সেশনটা। আর বিকেলে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তুলনামূলক নতুন ও কমবয়সী উঠতি ক্রিকেটারদের। ’ এখন পর্যন্ত বাংলাট্র্যাক ক্রিকেট একাডেমির (বিটিসিএ) প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে উজ্জ্বলতম ক্রিকেটার তাইজুল ইসলাম। বাংলাদেশের টেস্ট দলের অপরিহার্য সদস্য তাইজুল কিশোর বয়সে এসেছিলেন এই একাডেমিতে। এখান থেকেই নানা ধাপ পেরিয়ে তাইজুল এখন বাংলাদেশ দলের অন্যতম বোলিং ভরসা। দেশের মাটিতে হয়ে যাওয়া যুব বিশ্বকাপে খেলা নিহাদুজ্জামানও খুব ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের তালিম নিয়েছেন এই পাঠশালায়। বাঁহাতি স্পিনার নাঈম ইসলাম জুনিয়রকে এবার ১২ লাখ টাকায় দলে নিয়েছে রাজশাহী কিংস। প্রিমিয়ার লিগেও মোহামেডান, গাজী গ্রুপ ক্রিকেটার্সের মতো নামি দলে খেলা নাঈমকেও ক্রিকেটার হওয়ার দিশাটা দেখিয়েছিলেন এই একাডেমির কোচরাই।   এ ছাড়া হৃদয়, সুজন, রাহিম, অয়নসহ অনেক খুদে প্রতিভাবান ক্রিকেটারেরই আঁতুড়ঘর বিটিসিএ। হৃদয় খেলেছে বিসিএল, এনসিএল ও ঢাকা প্রথম বিভাগ লিগে। সুজনের নেতৃত্বে প্রথম বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাব। রাজশাহীর এই একাডেমিতে স্থানীয় এবং আশপাশের জেলা যেমন নাটোর, বগুড়া এসব অঞ্চলের ক্রিকেটারই বেশি। তবে মজার বিষয়, এ বছরে ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের শীর্ষস্তরটি বাদে পরের তিনটি পর্যায়েরই সেরা দলগুলোতে বিটিসিএর ক্রিকেটাররাই বেশি। প্রথম বিভাগের চ্যাম্পিয়ন শাইনপুকুর, দ্বিতীয় বিভাগের চ্যাম্পিয়ন এক্সিওম ক্রিকেটার্স ও তৃতীয় বিভাগের রানার্স-আপ মোহাম্মদপুর ক্রিকেট একাডেমির বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই বিটিসিএর। এ ছাড়া জেলা ও বিভাগীয় বয়সভিত্তিক দল, স্কুল ক্রিকেট, প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচিগুলোতেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য আছে এখানকার ক্রিকেটারদের।

মাসিক বেতন এক হাজার টাকা হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এই বেতন দেওয়ার সামর্থ্য নেই অনেকেরই। তখন বেতন কমিয়ে, এমনকি বিনা বেতনেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ক্রিকেটারদের। চোট আঘাতে প্রয়োজনে বিদেশেও উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। তাই সংস্থার আয়ের চেয়ে ব্যয় অনেক বেশি, তবু ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বিটিসিএকে রাখতে চান অলাভজনক সংস্থা হিসেবেই।

ব্যস্ত মহাসড়কটা ধরে সাইকেল চালিয়ে কিংবা ভ্যানে চেপে, কাঁধে ব্যাগ নিয়ে সকালে বা বিকেলে আসতে দেখা যায় নীল জার্সি পরা একদল কিশোর-তরুণদের। ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকেও আসছে কমবয়সী এই ছেলেগুলো। অনেক সময় পরিবারের আর্থিক অবস্থা বাধা হয়ে দাঁড়ায় সেই স্বপ্নে। সেখানেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে বাংলাট্র্যাক, একটি ট্রাস্ট ফাউন্ডেশন থেকে বৃত্তি দিচ্ছেন প্রতিভাবানদের। এভাবেই দেশের ক্রিকেটারদের পাইপলাইনে জোগান দিয়ে চলেছে বাংলাট্র্যাক ক্রিকেট একাডেমি।

একটা সময় জাতীয় দলে প্রাধান্য ছিল চট্টগ্রামের ক্রিকেটারদের। তবে এখন সেখানে দক্ষিণাঞ্চলের জয়জয়কার। মাশরাফি, সাকিব, মুস্তাফিজ, সৌম্য, মিরাজ সবাই তো খুলনা বিভাগের! কে জানে, বাংলাট্র্যাকের ক্রিকেট একাডেমির হাত ধরে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো জাতীয় দলে রাজশাহীরও একঝাঁক ক্রিকেটারেরও দেখা মিলবে।


মন্তব্য