kalerkantho


আরেক ‘কলসিন্দুর’ রাঙ্গাটুঙ্গি

রাহেনুর ইসলাম   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



আরেক ‘কলসিন্দুর’ রাঙ্গাটুঙ্গি

৫০ বিঘার বিশাল মাঠ। স্বাধীনতার আগে থেকে শিশু-কিশোররা ফুটবল খেলে এখানে।

মনের আনন্দে। খেলছে এখনো। কিশোরদের সঙ্গে ঠাকুরগাঁও জেলার রানীশংকৈল উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম রাঙ্গাটুঙ্গির এই মাঠে খেলছে এখন কিশোরীরাও। আকাশি-নীল জার্সিতে তাদের অনুশীলনও আগ্রহ নিয়ে দেখেন অনেকে। অথচ শুরুতে উড়ে আসত শুধুই টিটকিরি। সুযোগ-সুবিধায় পিছিয়ে থাকা গ্রামের মেয়েদের হাফপ্যান্ট পরে খেলাতেও এসেছে আপত্তি। তবে দিনে তিন বেলা খেতে না পারা মেয়েরা ফুটবল ঘিরে দেখেছিল বাঁচার স্বপ্ন। স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়ে তাদের জীবনে আসেন অধ্যক্ষ তাজুল ইসলাম। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এই গ্রামের মেয়েদের সুনাম ছড়িয়ে পড়ছে দেশজুড়ে।

জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৪ দলে এরই মধ্যে সুযোগ পেয়েছে রাঙ্গাটুঙ্গি গ্রামের দুই কিশোরী—মুন্নী আক্তার আদুরি ও সোহাগী কিসকু। মুন্নীর বাবা নুরুল ইসলামের বাড়ি করার নিজের জমি নেই। কোনো রকমে অন্যের জমিতে ঘর তুলে কাটাচ্ছেন জীবন। একসময় ভেবেছিলেন মুন্নীকে দ্রুত বিয়ে দিয়ে কিছুটা ভারমুক্ত হতে। সেই তিনিই মুন্নীর ফুটবলে আঁকছেন জীবন বদলে দেওয়ার ছবি, ‘আমার মেয়ে জাতীয় দলে সুযোগ পাবে, স্বপ্নেও ভাবিনি কখনো। ও নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখাচ্ছে আমাদের। ’

রাঙ্গাটুঙ্গি ইউনাইটেড ফুটবল একাডেমি নামে তাজুল স্যারের পাঠশালায় এখন রয়েছে ২৩ জন কিশোরী। শুরুতে তাচ্ছিল্য করা গ্রামের লোকই দলবেঁধে খেলা দেখতে আসে প্রতিভাবান মেয়েদের। কলসিন্দুরের মেয়েদের মতো এই গ্রামের মেয়েদের নিয়ে ফুটবল-বিপ্লবের স্বপ্নই দেখছেন একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা তাজুল ইসলাম, ‘বাংলাদেশে মেয়েদের ফুটবল বদলে দিয়েছে কলসিন্দুরের মেয়েরা। রাঙ্গাটুঙ্গির মেয়েদেরও আছে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। জাতীয় নারী দলের কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন সব সময় খোঁজ নেন আমাদের। আশা করছি, আগামী কয়েক বছরে জাতীয় দলে ফুটবলার উপহার দিতে পারব আরো কয়েকজন। ’

রাঙ্গাটুঙ্গি গ্রামের মেয়েদের শুরুটা ২০১৪ সালে। নিজেদের পারিবারিক কবরস্থানের পাশে গড়ে ওঠা ৫০ বিঘা মাঠের পাশে কিশোরীদের পায়ে বল মারতে দেখছিলেন রানীশংকৈল ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তাজুল ইসলাম। পায়ে জোর দেখে তাদের ফুটবলার তৈরি করা যায় কি না, এই চিন্তা চেপে বসে তাঁর মাথায়। অথচ তিনি পেশাদার কোচ নন। অভিজ্ঞতা বলতে যৌবনের উত্তাল দিনগুলোতে ফুটবল খেলা। তাতেই ভরসা রেখে এই মেয়েদের অভিভাবকদের প্রস্তাব দেন ফুটবল মাঠে পাঠানোর। কথাটা শুনে আকাশ থেকে পড়ার দশা প্রথমে। তবে বর্গাজমি চাষ করে কোনো রকমে জীবন চালানো কৃষকরা মুখের ওপর না করতে পারেননি। ভরসাও ছিল প্রিয় শিক্ষকের ওপর। কারণ ফুটবল দিয়ে অনাহার, অর্ধাহারে থাকা মেয়েদের জীবন বদলানোর স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি।

অভিভাবকরা রাজি হলেও গ্রাম কিংবা রানীশংকৈলের পরিচিত মানুষদের কাছ থেকে বাধা আসে প্রথমে। সবাই ভাবছিলেন মাথাটা গেছে তাজুল স্যারের! সব বাধা উপেক্ষা করে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে তাজুল ইসলাম চালিয়ে যান অনুশীলন। সঙ্গী ছিলেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের তালিকাভুক্ত রেফারি সেতাউর রহমান। অনভিজ্ঞ মেয়েদের ফুটবল শেখাতে দিন-রাত ভুলে প্রশিক্ষণ দিয়ে গেছেন সেতাউর। দলটা দাঁড়িয়ে যায় ২০১৬ সালে। গত বছর জেএফএ অনূর্ধ্ব-১৪ টুর্নামেন্টে ঠাকুরগাঁও জেলা দল গড়া হয় রাঙ্গাটুঙ্গির এই মেয়েদের নিয়ে। তারা প্রতিদানটা দেয় রূপকথার সাফল্যে নিজেদের অঞ্চল থেকে মূলপর্বে সুযোগ করে নিয়ে। সেখানেই থেমে না থেকে মূলপর্বেও সেমিফাইনালে উঠে যায় রাঙ্গাটুঙ্গির মেয়েরা। দুর্ভাগ্য, কমলাপুর স্টেডিয়ামে ভালো খেলেও টাইব্রেকারে সেমিফাইনালে হারতে হয় রংপুরের কাছে। তবে টুর্নামেন্টে তৃতীয় হয়ে রাঙ্গাটুঙ্গির মেয়েদের নিয়ে গড়া ঠাকুরগাঁও জেতে ফেয়ার প্লে ট্রফি। নিজহাতে গড়া মেয়েদের এমন সাফল্যে আবেগাপ্লুত  সেতাউর রহমান বলছিলেন, ‘এই মেয়েরা গ্রাম থেকে রানীশংকৈল উপজেলাতেই এসেছে কম। সেখানে ঢাকা তাদের কাছে হলিউডের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। ভয় আর লজ্জায় কুঁকড়েও ছিল অনেকে। নইলে টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়নও হতে পারতাম আমরা। ’

ঢাকায় খেলতে এসে ধানমণ্ডি মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে থাকার জায়গা হয়েছিল রাঙ্গাটুঙ্গির মেয়েদের। রানীশংকৈল থেকে তাদের যাতায়াতের ২৫ হাজার টাকা দেয় জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। কিন্তু খাওয়া আর আনুষঙ্গিক অন্য কাজের পেছনে তাজুল ইসলামকে নিজের পকেট থেকে খরচ করতে হয় প্রায় ৭৫ হাজার টাকা। গ্রামে তাদের পড়ালেখা আর খেলার খরচও চালাতে হচ্ছে তাজুল ইসলামকে। এতটা এগিয়ে গিয়ে পিছিয়ে আসার লোক নন বলেই বাফুফের তালিকাভুক্ত আরেক রেফারি গোপাল মুর্মু সুগা ও স্থানীয় সাবেক ফুটবলার জয়নুল আবেদীনকে কোচ নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। তাতে এ বছর জেএফএ কাপের শুরুটা আরো দুর্দান্ত হয়েছে ঠাকুরগাঁও জেলা দলের মোড়কে খেলা রাঙ্গাটুঙ্গির মেয়েদের। নিজেদের অঞ্চলে গতবার রানার্স-আপ হলেও এবার চ্যাম্পিয়ন হয়েই জায়গা করে নিয়েছে মূলপর্বে। গাইবান্ধায় হওয়া প্রথম দুই ম্যাচে লালমনিরহাটকে ১৬-০ আর দিনাজপুর জেলা দলকে হারায় ৮-০ গোলে। ফাইনালে গাইবান্ধা জেলা দলকে ৪-১ গোলে হারিয়ে ঢাকায় আসার টিকিট নিশ্চিত করে ফেলেছে তারা।

জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৪ দলে সুযোগ পাওয়া এই দলের আদিবাসী খেলোয়াড় সোহাগী কিসকু এখন মানে খুঁজে পাচ্ছে জীবনের, ‘আমরা আদিবাসী। ১৪-১৫ বছর বয়সে স্বামীর ঘরে যাওয়াই নিয়ম। কিন্তু ফুটবল বদলে দিয়েছে আমাদের। ফুটবলই বাল্যবিবাহ ঠেকিয়েছে এই গ্রামে। আমার ছোট বোন কোহাতি কিসকু অনেক ভালো খেলছে। রাঙ্গাটুঙ্গির আদিবাসীদের সঙ্গে এখন খেলছে হিন্দু আর মুসলমান মেয়েরাও। আমি নিশ্চিত ফুটবল বদলে দেবে এই মেয়েদের পরিবারগুলোর জীবন। ’

রাঙ্গাটুঙ্গির এই ফুটবল-বিপ্লবের পুরোধা তাজুল ইসলামের সামান্য চাওয়া, ‘ এলাকার দুই সংসদ সদস্য সেলিনা জাহান লিটা ও ইয়াসিন আলী সাহায্য করছেন আমাদের তবে সেটা অপ্রতুল। তাঁরা একটু এগিয়ে এলে আরেক কলসিন্দুর হয়ে উঠতে বেশি সময় লাগবে না রাঙ্গাটুঙ্গির। ’ তাতে লাভটা হবে কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবলেরই।


মন্তব্য