kalerkantho


পদত্যাগই করে ফেলেছিলেন হাতুরাসিংহে

মাসুদ পারভেজ   

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



পদত্যাগই করে ফেলেছিলেন হাতুরাসিংহে

মাত্রই আবার বাংলাদেশে ফিরেছেন তিনি। ফিরেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) কার্যালয়ের করিডরে হুট করে এক কর্তাব্যক্তির প্রশ্নে চমকেও উঠেছিলেন চাম্পাকা রামানায়েকে। চমকে ওঠারই কথা। তাঁদের দুজনের বাক্যালাপ যে ছিল অনেকটা এ রকমই—

‘থাকছেন না যাচ্ছেন?’

—কে?

‘চন্দিকা হাতুরাসিংহে’।

বাংলাদেশ দলের হেড কোচের চলে যাওয়া বা থেকে যাওয়া নিয়ে বিসিবির অন্দরমহলে ছড়িয়ে পড়া দ্বিধার অবসানে ওই একজনই নন, চাম্পাকার শরণাপন্ন হয়েছিলেন আরো অনেকেই। শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের (এসএলসি) চাকরি ছেড়ে হাই পারফরম্যান্সের (এইচপি) বোলিং কোচ হিসেবে বাংলাদেশে ফেরা এই সাবেক পেসার নিজের জানা-শোনা থেকে যথাসাধ্য তথ্য দেওয়ার চেষ্টাও করেছেন। গ্রাহাম ফোর্ড চলে যাওয়ার পর ক্রমেই খারাপ হতে থাকা শ্রীলঙ্কা দলের পারফরম্যান্স নিয়ে উদ্বিগ্ন এসএলসি যে এখন হাতুরাসিংহেকে পেতে আরো মরিয়া, অন্যান্য সূত্রের পাশাপাশি চাম্পাকার কাছ থেকেও বিসিবি সেই বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে বলে খবর।

চাম্পাকা নাকি এ-ও নিশ্চিত করেছেন যে এসএলসির প্রস্তাব পাওয়া হাতুরাসিংহে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। তাই বলে অদূর ভবিষ্যতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবেন না, সে নিশ্চয়তাও নেই। তবে বিসিবি পরিচালক ইসমাইল হায়দার মল্লিকের কণ্ঠে নিশ্চয়তার সুর, ‘লিখে দিন, হাতুরাসিংহে কোথাও যাচ্ছেন না। উনি আমাদের এখানেই থাকছেন।

’ যদিও অন্য কিছু নয়, ২০১৯ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত বিসিবি-হাতুরাসিংহের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির ওপরই শুধু আস্থা মল্লিকের, ‘আমরা জানি যে শ্রীলঙ্কা দলের কোচ হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে ওনাকে। কিন্তু আমরা আশা করি তাঁর সঙ্গে আগামী ওয়ানডে বিশ্বকাপ পর্যন্ত হওয়া চুক্তির প্রতি সম্মান দেখিয়ে তিনি মেয়াদ পুরো করবেন। ’ জানিয়ে রাখা দরকার, দুই পক্ষেরই তিন মাসের নোটিশ দিয়ে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে।

যে সুযোগ আগেও একবার নিয়েছিলেন হাতুরাসিংহে এবং করেছিলেন পদত্যাগও। আরো এক বছর আগেই পদত্যাগ করা এই শ্রীলঙ্কানকে শেষ পর্যন্ত বুঝিয়ে-শুনিয়ে এখানে রেখে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন বিসিবি কর্মকর্তারা। গত বছরের ৮ আগস্ট বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরী বরাবর পাঠানো পদত্যাগপত্রে হাতুরাসিংহে ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করেছেন বলে উল্লেখ করেছিলেন। সরে যেতে চাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানানোর আগে বিসিবি সভাপতিকে বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে হাতুরাসিংহে পদত্যাগপত্রে এ-ও লিখেছিলেন, ‘হেড কোচ হিসেবে আমার দায়িত্ব পালনকালে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের জন্য বিশেষ ধন্যবাদ বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসানকে। যা ভূমিকা রেখেছিল আমার নিজের সেরাটা দেওয়ার ক্ষেত্রে। একই সঙ্গে যা খেলোয়াড়দের জন্য নিজেদের ছাড়িয়ে যাওয়া পারফরম্যান্সের পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছিল। ’

এরপরই বাংলাদেশের কোচ হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যেতে অপারগতা প্রকাশ করে লিখেছিলেন, ‘ব্যক্তিগত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে নিজ সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা দিয়ে দায়িত্ব পালন করতে আমি অপারগ। অনেক চিন্তাভাবনার পর তাই বিসিবির প্রধান কোচের পদ থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যা কার্যকর হবে ৮ নভেম্বর ২০১৬ থেকে। ’ অর্থাৎ নিজ সিদ্ধান্তে অটল থাকলে গত বছরের অক্টোবরে দেশের মাটিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মুশফিকুর রহিমদের ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের পরপরই এই শ্রীলঙ্কান কোচের বাংলাদেশ অধ্যায় শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে বিসিবি হাতুরাসিংহেকে রেখে দেওয়ার জোর চেষ্টা চালিয়ে সফলও হয়। গত বছরের ২৫ আগস্ট এক চিঠির মাধ্যমে বিসিবির প্রধান নির্বাহী তাঁকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়ে লেখেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে ২০১৯ সালের আইসিসি বিশ্বকাপ পর্যন্ত জাতীয় দলসংক্রান্ত কর্মসূচি চালিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা আপনার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি। এ অবস্থায় আপনার অনুপস্থিতি কিংবা দায়িত্ব পালনে অপারগতা আমাদের ব্যাপকভাবে লক্ষ্যচ্যুত করবে এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও খেলোয়াড়দের উন্নয়নকেও ব্যাহত করবে। এসব বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্বার্থেই বোর্ড আপনার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করতে পারছে না। ’

চিঠিতে এ-ও জানিয়ে দেওয়া হয় যে এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব বিসিবি দিয়েছে এর সহসভাপতি মাহবুব আনামকে। তত দিনে বাংলাদেশের হেড কোচ হিসেবে দুই বছর পার করে দেওয়া হাতুরাসিংহেকে ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ পর্যন্ত নতুন চুক্তির প্রস্তাবও দেওয়া হয়ে গেছে। জানা গেছে, প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো পছন্দ না হওয়াতেই পদত্যাগ করেছিলেন তিনি। পরে মাসে প্রায় ২৮ হাজার ইউএস ডলার বেতন ধার্য করে নতুন চুক্তিতে রাজি করানো হয় তাঁকে। শ্রীলঙ্কার দায়িত্ব ছাড়া গ্রাহাম ফোর্ডের বেতনও এর কাছাকাছিই ছিল বলে জানা গেছে। কে জানে, বাংলাদেশে কোচ হিসেবে দারুণ সফল হাতুরাসিংহেকে পেতে এর চেয়েও আকর্ষণীয় কোনো অঙ্কের প্রস্তাব দিয়ে বসে নেই এসএলসি! পেশাদারদের দুনিয়ায় সেই প্রস্তাব লুফে নেওয়াতেও দোষের কিছু নেই। আর বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী তিন মাসের নোটিশ দিয়ে চলে যাওয়ার সুযোগ তো আছেই।

যে সুযোগ নিয়ে এক বছর আগেই পদত্যাগ করেছিলেন হাতুরাসিংহে!


মন্তব্য