kalerkantho


ওরা স্লেজিং করতেও ভুলে গিয়েছিল!

সে সময় র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষ দল তো বটেই, ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা দল মনে করা হয় রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়াকে। আর ফতুল্লায় সে দলটির প্রতিপক্ষই কিনা বাংলাদেশ, যাদের টেস্ট মর্যাদা নিয়ে তখন কটাক্ষ হতো হরহামেশাই। অথচ সে ম্যাচেই অবিশ্বাস্য সম্ভাবনার বাতি জ্বালিয়েছিল বাংলাদেশ। পরিণতি হৃদয়বিদারক হলেও ফতুল্লা টেস্ট বাংলাদেশ ক্রিকেটের লোকগাথায় ঠাঁই নিয়ে আছে। আজকের পর্বে তখনকার অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের স্মৃতিতে সে ম্যাচকে ফিরিয়ে এনেছেন সাইদুজ্জামান

২২ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



ওরা স্লেজিং করতেও ভুলে গিয়েছিল!

বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে যখন কোনো কূল-কিনারা ছিল না, তখন ছিলেন একজন হাবিবুল বাশার। ৫০ ম্যাচের টেস্ট জীবনে তাঁর ২৪ ফিফটি এখনো বাংলাদেশের রেকর্ড। সে যুগের ক্রিকেট পরিকাঠামো ও দলের অবস্থা বিবেচনায় তাই এখনো মাশরাফি বিন মর্তুজার কাছে তাঁর পূর্বসূরিই দেশের সেরা টেস্ট ব্যাটসম্যান। ফতুল্লার স্মরণীয় টেস্টের সেঞ্চুরিয়ান শাহরিয়ার নাফীস আহমেদের বিশ্বাস, ‘(হাবিবুল বাশার) সুমন ভাই ক্রিজে থাকলে সব ব্যাটসম্যানেরই আত্মবিশ্বাস বেড়ে যেত। ’ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সে ম্যাচেও শাহরিয়ারকে আত্মবিশ্বাসের অক্সিজেন জুগিয়েছিলেন বাশার, সে সময়কার অধিনায়কও। গতকাল সকালেও প্রসঙ্গ তুলতেই যিনি ফিরে যান ২০০৬ সালের এপ্রিলে।

‘বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, ওই টেস্টের কথা মাঝেমধ্যেই মনে পড়ে। প্রথম টেস্টজয়ী দলে ছিলাম (অধিনায়ক হিসেবে), জিম্বাবুয়েতে ওয়ানডে জয়, কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো কিংবা মুলতানে কষ্টের হার—এমন অনেক স্মৃতিই আছে। কিন্তু ফতুল্লা টেস্টটা স্পেশাল। মনে হলে এখনো মনটা খারাপ হয়ে যায়’, বলছিলেন হাবিবুল বাশার। এখনো ব্যাট হাতে যিনি সফলতম, সফল অধিনায়কদের কাতারে উজ্জ্বল তিনি কিনা একটা হারের কষ্টকেই মনে রেখেছেন বেশি! কারণ, ‘সে সময়ের অস্ট্রেলিয়া দলটার কথা ভাবেন।

টপ পারফরমারে ভরা একটা দল। সত্যি বলতে কী, জেতার বিশ্বাসটাই তখন আমাদের ছিল না। বলতে দ্বিধা নেই, মনে হচ্ছিল কেউ না কেউ ঠিকই ম্যাচ নিয়ে যাবে। নিলও। কিন্তু মনে করে দেখেন, ওরা খুব স্ট্রাগল করছিল। তবু হারলাম। বিশ্বাসের এ ঘাটতিটাই সম্ভবত আমাদের জিততে দেয়নি। ইস্, পন্টিংয়ের ওই ক্যাচটা যদি না পড়ত! এখনো চোখের সামনে ভাসে...পন্টিং পুল করল। মাশরাফি সম্ভবত মিসজাজ করেছিল ক্যাচটা। হলো না, বিশ্বসেরা দলটাকে খুব কাছে গিয়েও হারাতে পারিনি। ’

ম্যাচের আগের কথা চিন্তা করে অবশ্য খানিকটা সান্ত্বনা পান হাবিবুল বাশার, ‘ওই সময়ের অস্ট্রেলিয়াকে বাংলাদেশ কেন, বিশ্বের সব দলই সমীহ করত। কিন্তু খেলা শুরু হওয়ার পর সব কিছু কেমন ভোজবাজির মতো বদলে গেল। এটা ঠিক যে কিছুদিন আগে আমরা প্রথম টেস্ট জিতেছিলাম। তাতে কিছুটা আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। তার পরও ওরকম ব্যাটিং আমরা নিজেও কল্পনা করিনি। শাহরিয়ার নাফীস আর জাভেদ শুরু করার পর আমি নামলাম। বিশেষ করে আমি আর শাহরিয়ার নাফীস যখন ব্যাটিং করছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল ওটাই পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ। ব্যাটিংয়ের সময় নিজেদের কাছেও একটু অবাক লাগছিল। কী সব বোলার...ওয়ার্ন, ব্রেট লি, গিলেস্পি! ওই ম্যাচের আগে ওয়ার্নকে খেলি নাই। কিন্তু আমাদের দাপটের সামনে ওকে মনে হচ্ছিল পথ হারিয়ে ফেলেছে। তবে আমার কাছে মনে হচ্ছিল আমাদের চেয়ে বেশি অবাক হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। ওরা বরাবরই আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলে। অথচ ওরাই একজন ডিফেন্সিভ ক্রিকেট খেলতে বাধ্য হয়েছিল। ওটা আমাদের জন্য অনেক বড় মোর‌্যাল ভিক্টরি ছিল। ’

অবয়বে, শরীরী ভাষায় আক্রমণের ঝাঁজ নেই। কিন্তু ব্যাটিংয়ে বরাবরই আক্রমণাত্মক। এ নিয়ে খেলোয়াড়ি জীবনে প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনাও শুনতে হয়েছে হাবিবুল বাশারকে। শাহরিয়ার নাফীসের সঙ্গে দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে রেকর্ড গড়ার পথে তাঁর ৭৬ রানের ইনিংসটাও ছিল আক্রমণাত্মক। অবশ্য আক্রমণটা বাশারের পূর্ব পরিকল্পনারই অংশ ছিল, ‘আমার কাছে মনে হয়েছিল ওদের বিপক্ষে রক্ষণাত্মক ক্রিকেট খেলে লাভ নাই। আমরা যে অ্যাটাকিং ক্রিকেট খেলব, এটা ওরা দুঃস্বপ্নেও ভাবে নাই। সবাই জানেন যে, স্লেজিংয়ে অস্ট্রেলিয়ানরা দুর্ধর্ষ। কিন্তু একটা সময়ে ওরা স্লেজিংও ভুলে গিয়েছিল। ওরা একদম ভ্যাবাচেকা খেয়ে গিয়েছিল। ’

২৪ ফিফটির পাশে সেঞ্চুরি মাত্র তিনটি। কনভার্সন রেট কম হওয়া নিয়ে বিস্তর গঞ্জনা সইতে হয়েছে বাশারকে। যুগের বিবেচনায় কোথায় তাঁর নাম হওয়ার কথা ‘মি. কনসিসট্যান্ট’, তা না, হয়ে গেল ‘মি. ফিফটি’! তবে একজন ব্যাটসম্যানের মনে তো সে বিসর্জন কাঁটা হয়ে বিঁধবেই। বাশারের মনে কাঁটা হয়ে আছে ফতুল্লার প্রথম ইনিংসও, ‘সেঞ্চুরি মিস করে কিছুটা কষ্ট তো পেয়েছিলামই। তবে বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম দ্বিতীয় ইনিংসে রান আউট হয়ে। দ্বিতীয় ইনিংসে ভালো শুরু করেছিলাম। আমি একটা বড় রান করলে গল্পের শেষটা অন্য রকম হতে পারত। একটা পার্টনারশিপ দরকার ছিল। ’ রান আউটের পেছনের কারণটাও মনে আছে বাশারের, ‘তার একটু আগেই ব্রেট লির একটা বাউন্সার মাথায় লেগেছিল। ব্যথা পাইনি, তবে একটু আনস্টেবল হয়ে গিয়েছিলাম। রান আউটটাও ফ্রিকিশ ছিল। সিঙ্গেল স্টাম্পে ক্লার্ক হিট করবে, ভাবিনি। সম্ভবত ওই বাউন্সারের প্রভাবেই কিনা, আমি ভাবতেই পারিনি ও থ্রো করবে, লাগবেও। ’

তিনি রান করেননি, বড় কোনো পার্টনারশিপও হয়নি। তাই প্রথম ইনিংসে ৪২৭ রান করা বাংলাদেশ দ্বিতীয় দফায় গুটিয়ে যায় মাত্র ১৪৮ রানে। তবে দ্বিতীয় ইনিংসের ঘাটতিও অধিনায়ক বাশার পুষিয়ে নিতে পারতেন, যদি, ‘রফিক তো খুবই ভালো করেছিল। সে সময় এনামও (এনামুল হক) দারুণ বল করছিল। প্রথম ইনিংসে দারুণ এক ডেলিভারিতে মাইকেল ক্লার্ককে বোল্ড করেছিল এনাম। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে ওকে পেলামই না। অঙুলে চোট লাগাতে পরের ইনিংসে ও বল করতে পারেনি। এনাম দ্বিতীয় ইনিংসে বেশি ভালো বল করত, তখন উইকেট ভেঙে যাওয়ায় বেশি টার্ন পেত। আমার মনে হয় আমরা ওখানেই পিছিয়ে গিয়েছিলাম। ’ তবু বিস্তর প্রশংসা আর সম্মান পেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ড্রেসিংরুমে তখন ভগ্নহৃদয় বাশার, ‘মুলতানের মতো কাঁদিনি, কিন্তু খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। হ্যাঁ, প্রশংসা পেয়েছিলাম অনেক। অস্ট্রেলিয়ার মতো দলকে হার্ডটাইম দেওয়ার আনন্দও আছে। কিন্তু কষ্টটা বেশি, এত বড় সুযোগ মিস হয়ে গেল যে! মনে আছে, ফতুল্লা থেকে ফেরার পর আমাদের বাসে একটা ছেলে ঢিল মেরেছিল। ওকে ধরাও হয়েছিল। এ নিয়ে অনেক হৈচৈ শুনছিলাম। কিন্তু আমার সেদিকে কোনো আগ্রহ ছিল না, স্তব্ধ হয়ে বসে ভাবছিলাম...কী হলো এটা!’

সেই হাবিবুল বাশার এখন নির্বাচক। বাজি ধরে বলে দিচ্ছেন, ‘ওই রকম সুযোগ এলে আমাদের এখনকার দল মিস করবে না। আমাদের ওই দলেরও অনেকের সামর্থ্য ছিল, কিন্তু বিশ্বাসটা ছিল না। এখনকার ছেলেরা জিতে অভ্যস্ত। কখনোই ভাববে না যে, প্রতিপক্ষে কেউ না কেউ ম্যাচ বের করে নিয়ে যাবে। আমরা যে অবস্থায় থেকে হেরেছি, সেরকম আর ঘটবে বলে মনে হয় না। ’ শুধু নিজের দলের উন্নতি হয়েছে বলেই নয়, এবারের প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়াও বিবেচনায় আছে বাশারের, ‘কাউকে খাটো করে বলছি না...এটা তো যে কেউই বলবে যে পন্টিংয়ের ওই দলটার মতো শক্তিশালী না এখনকার দল। আমরা তখন জেতার সম্ভাবনা নিয়ে কোনো আলোচনা করিনি। এখন আমরা সিরিজের পরিকল্পনাই করছি জয়ের সম্ভাবনাকে ঘিরে। ’

তাতে যদি কষ্ট সামান্য ঘোচে হাবিবুল বাশারের! ‘সিরিজ জিতলে খুব খুশি হব অবশ্যই। তবে ফতুল্লার কষ্ট কমবে না’, দীর্ঘশ্বাস হাবিবুল বাশারের।


মন্তব্য