kalerkantho


ওই ক্যাচটা নিতে পারলে ম্যাচটা জিততাম

সে সময় র্যাংকিংয়ের শীর্ষ দল তো বটেই, ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা দল মনে করা হয় রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়াকে। আর ফতুল্লায় সে দলটির প্রতিপক্ষই কিনা বাংলাদেশ, যাদের টেস্ট মর্যাদা নিয়ে তখন কটাক্ষ হতো হরহামেশাই। অথচ সে ম্যাচেই অবিশ্বাস্য সম্ভাবনার বাতি জ্বালিয়েছিল বাংলাদেশ। পরিণতি হৃদয়বিদারক হলেও ফতুল্লা টেস্ট বাংলাদেশ ক্রিকেটের লোকগাথায় ঠাঁই নিয়ে আছে। আজকের পর্বে মাশরাফি বিন মর্তুজার স্মৃতিতে সে ম্যাচকে ফিরিয়ে এনেছেন সাইদুজ্জামান

২১ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



ওই ক্যাচটা নিতে পারলে ম্যাচটা জিততাম

ওভারহলিং করানো ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ তখন তিনি নন। গতি ছিল বলেই ‘এক্সপ্রেস’খ্যাত মাশরাফি বিন মর্তুজা  ব্যাটের কানার বদলে গন্তব্য ঠিক করতেন মিডল স্টাম্প, ব্যাটসম্যানের হেলমেটে তাক করার ‘উগ্রতা’য় বুনো আনন্দও পেতেন। তবে বোলিং নয়, ফতুল্লা টেস্ট গভীর এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেঁচে আছে ফিল্ডার মাশরাফির মনে, ‘সবচেয়ে বেশি মনে আছে ওই ক্যাচটার কথা। ওটা নিতে পারলে আমরা ম্যাচটা জিততাম, হান্ড্রেড পারসেন্ট!’

শাহাদাত হোসেনের বলে ক্যাচ তুলেছিলেন সে ম্যাচের মহানায়ক রিকি পন্টিং। বলের জন্য দৌড়াতে একটু কি দেরি করেছিলেন ডিপ ফাইন লেগের ফিল্ডার মাশরাফি? হ্যাঁ, করেছিলেন বৈকি। ‘সত্যি বলতে কি, বলটা স্কয়ার লেগ ফিল্ডারের ছিল। ওখানে তখন (মোহাম্মদ) রফিক ভাই ছিলেন। উনি বলের কাছে যাবেন ভাবতে গিয়েই একটু দেরি করে ফেলি। তার পরও কনফিডেন্ট ছিলাম যে বলটা পাব। অনেকটা দৌড়ে ডাইভ দিয়ে আঙুলও লাগিয়েছিলাম। কিন্তু হাতে পড়েনি।

পড়লে ক্যাচটা মিস হতো না’, এতগুলো বছর পরও ফতুল্লা টেস্টের ফ্ল্যাশব্যাকে হতাশার স্পষ্ট ছাপ মাশরাফির অভিব্যক্তিতে। সান্ত্বনা খোঁজার চেষ্টা করেন পরমূহূর্তেই, ‘স্কয়ার লেগে যদি কুইক মুভার কোনো ফিল্ডার থাকত, তাহলে...। পন্টিং আউট হয়ে গেলে বাকি থাকত (স্টুয়ার্ট) ম্যাকগিল আর (স্টুয়ার্ট) ক্লার্ক। রফিক ভাই যে বোলিং করছিলেন, তাতে ওরা দাঁড়াতেই পারত না। ’ তবু হতাশার ছায়া আর সরে না ২০০৯ সালের পর টেস্ট ক্রিকেট থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখা বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়কের।

ফতুল্লা টেস্ট নিয়ে অন্যদের মতো তাঁর কণ্ঠেও আনন্দের চেয়ে আক্ষেপই বেশি। এর কারণও আছে। ‘অস্ট্রেলিয়ার ওই দলটা আমার দেখা সর্বকালের সেরা। সত্তর আর আশির দশকের ওয়েস্ট ইন্ডিজকে এখানে টানছি না। আমি টেস্ট ক্রিকেট দেখি ১৯৯২-৯৩ সাল থেকে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার ওই দলটাই বিশ্বসেরা। এমন একটা দলের বিপক্ষে সুযোগ তৈরি করেও জিততে পারিনি...’, কল্পনাকে মুঠোয় পেয়েও হাতছাড়া করার বেদনা আজও ভোলেননি মাশরাফি।

একদিনে ৩৫৫ রান, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ১৫৮ রানের অগ্রগামিতা—৯ এপ্রিল সকালে টেস্ট শুরুর আগমুহূর্তেও এসবকে দিবাস্বপ্নই মনে হচ্ছিল মাশরাফির, ‘সত্যি বলতে কি, এমন কিছু হতে পারে, তা আমরা কল্পনাও করিনি। জিতব এমনকি জেতার সম্ভাবনা তৈরির কথাও ভাবিনি। আমাদের তখনকার অধিনায়কদের নিয়ম রক্ষার জন্যই বলতে হতো যে আমরা ভালো খেলার চেষ্টা করব। এর বেশি কিছু না। কিন্তু আমরা প্রায় জিতেই গিয়েছিলাম। আমি কেন, দলের কেউই এতটা ভাবেনি। ’

দীর্ঘ ১৬ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে কম তো ম্যাচ খেলেননি, অভিজ্ঞার ভাণ্ডারও দলের আর সবার চেয়ে বেশি। সেই মানদণ্ডে ফেলে ওই ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান শাহরিয়ার নাফীস আহমেদকে অনন্য একটি স্বীকৃতিও দিয়েছেন মাশরাফি, ‘বাংলাদেশের যতগুলো গ্রেট টেস্ট ইনিংস আছে, তার মধ্যে শাহরিয়ারেরটা অন্যতম সেরা। আমি তো বলব, সবার সেরা। অস্ট্রেলিয়ার ওই আক্রমণের কথা ভাবুন—ব্রেট লি, জেসন গিলেস্পি, শেন ওয়ার্ন আর স্টুয়ার্ট ম্যাকগিল। এঁদের যেকোনো দুজনই ব্যাটসম্যানকে বিপদে ফেলার জন্য যথেষ্ট। সেখানে শাহরিয়ার ওদের চারজনকেই মেরে এক দিনে সেঞ্চুরি করেছিল...অবিশ্বাস্য ইনিংস। ’

হাবিবুল বাশারের ব্যাটিং তত দিনে চোখে সয়ে গেছে মাশরাফির, ‘আর সুমন ভাইয়ের কথা কী বলব? আমি উনাকে বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা টেস্ট ব্যাটসম্যান মনে করি। এত ধারাবাহিক আর কেউ না। সে সময় আর কেউ নিয়মিত রান করত না। অথচ সুমন ভাই ঠিকই ৫০, ৬০ কিংবা ৭৩ রানের ইনিংস খেলত, মানে ফিফটি করত। উনার জন্য আমার দুঃখ লাগে এটা ভেবে যে, উনি যদি এখনকার খেলোয়াড় হতেন, তাহলে অনেক ভালো সাপোর্ট পেতেন। উনার সময় আর কেউ তো দাঁড়াতেই পারত না। যাক, সেদিন শাহরিয়ার আর সুমন ভাইয়ের ব্যাটিং দারুণ উপভোগ করেছিলাম, রেকর্ড পার্টনারশিপ হয়েছিল। ’

কল্পনাতীত আশার ডানা মেলা শুরু ওই জুটিতে। মাশরাফির স্মৃতিতে আশার সমাধিও খোঁড়া হয়ে যায় তখনই, ‘শাহরিয়ার আর সুমন ভাইয়ের ব্যাটিংয়ে বড় ইনিংস হলো আমাদের। এরপর ওদের আড়াই শ রানের আশপাশে অল আউট করে দেওয়ার পরই মনে হলো ম্যাচটা জিততে পারি। এই আশাই কাল হলো কি না, কে জানে। দ্বিতীয় ইনিংসে আমরা খুব বাজে ব্যাটিং করেছিলাম। ক্যাচ মিসের কথা বলছিলাম, তবে আমার মনে হয় দ্বিতীয় ইনিংসে আরেকটু ভালো ব্যাটিং করলে রিকি পন্টিংও বাঁচাতে পারত না। তবে এটা ভুললে চলবে না যে, ম্যাচের শুরুতে জেতার সম্ভাবনা তৈরি করে হারার কথাও আমরা কেউ ভাবিনি। ’

তার পরও একাডেমির নির্জন জিমনেসিয়ামে স্মৃতি ডুব দেওয়া মাশরাফির মনে বেদনার বেহালা বাজে, ‘মুলতানে পাকিস্তানের (২০০৩) কাছে হারটা ড্রেসিংরুমে বসে দেখেছি, সেদিন খুব কেঁদেছিলাম। কাউকে ছোট না করেই বলছি, এখনো মনে হয় আমি খেললে ওই ম্যাচটা হয়তো জিততাম। আমাকে কেউ ইচ্ছা করে বাদ দেয়নি, বিশ্রাম দেওয়ার পরিকল্পনা আগেরই ছিল। তবে সেই দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছে ফতুল্লার হার। এটা বেশি কষ্টের কারণ, প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়ার শক্তি। পাকিস্তানের চেয়ে অস্ট্রেলিয়ার ওই দলটা বহুগুণ শক্তিধর ছিল। এমন একটা দলকে হারানোর সুযোগ পেয়েও পারিনি, কষ্টটা বেশি এ কারণেই। ’ বিষাদ সংক্রমিত হয়েছিল পুরো ড্রেসিংরুমেই। মাশরাফির ধারণা, এর প্রভাব পড়েছিল চট্টগ্রামে টেস্টে। সে ম্যাচে ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলেন গিলেস্পি!

অস্ট্রেলিয়া আবার বাংলাদেশে। তবে পন্টিং আর স্টিভেন স্মিথের দলটার সামর্থ্যে যোজন পার্থক্য রয়েছে মাশরাফির কাছে, ‘অস্ট্রেলিয়ার এই দলটা ফতুল্লার ওই ম্যাচের চাপ নিতেই পারত না। পন্টিংয়ের দলের যে কেউই বিপর্যয় থেকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারত। এখনকার দলের সে সামর্থ্য নেই। ’ গত এক দশকেরও কিছু বেশি সময়ে বদলেছে বাংলাদেশ দলও, ‘কোয়ালিটি প্লেয়ার তখনো ছিল। তবে এখনকার দল এগিয়ে মানসিকতায়। ইংল্যান্ড তো ভালো অবস্থানেই ছিল। তবু একটা উইকেট পড়তেই কেমন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছিল। এখনকার দলে বোলিং বৈচিত্র্যও বেশি। ফতুল্লার দলে অফ স্পিনার ছিল না। এখন মিরাজের সঙ্গে নাসিরও আছে। সাকিব, তাইজুল, মুস্তাফিজ—বৈচিত্র্যের অভাব নেই। সঙ্গে মানসিকতা আর প্রতিপক্ষের শক্তি বিবেচনা করলে আবার ফতুল্লা দেখার ভয় নেই!’

ওই প্রথম হাসিতে উদ্ভাসিত মাশরাফি।


মন্তব্য