kalerkantho


এবার সুযোগ হাতছাড়া হবে না

সে সময় র্যাংকিংয়ের শীর্ষ দল তো বটেই, ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা দল মনে করা হয় রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়াকে। আর ফতুল্লায় সে দলটির প্রতিপক্ষই কিনা বাংলাদেশ, যাদের টেস্ট মর্যাদা নিয়ে তখন কটাক্ষ হতো হরহামেশাই। অথচ সে ম্যাচেই অবিশ্বাস্য সম্ভাবনার বাতি জ্বালিয়েছিল বাংলাদেশ। পরিণতি হৃদয়বিদারক হলেও ফতুল্লা টেস্ট বাংলাদেশ ক্রিকেটের লোকগাথায় ঠাঁই নিয়ে আছে। আজকের পর্বে শাহরিয়ার নাফীস আহমেদের স্মৃতিতে সে ম্যাচকে ফিরিয়ে এনেছেন সাইদুজ্জামান

২০ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



এবার সুযোগ হাতছাড়া হবে না

৮ ইনিংসে মাত্র একটি ফিফটি—সেকালে একজন মোহাম্মদ আশরাফুল ছাড়া আর কারো পক্ষে এমন পারফরম্যান্স নিয়ে আরেকটি সুযোগ পাওয়া দুঃসাধ্যই ছিল। তবু সুযোগ পেয়েছিলেন ওয়ানডেতে ধারাবাহিক রান করার সুবাদে।

কে জানত, ওয়ানডের ‘গ্রেস নম্বর’ নিয়ে পাওয়া ওই সুযোগটাতেই আলোড়ন তুলবেন শাহরিয়ার নাফীস আহমেদ?

তিনি নিজেও তো অত দূর ভাবেননি, ‘সেঞ্চুরি! কী যে প্রচণ্ড চাপে ছিলাম। ভালো করেই বুঝতে পারছিলাম ওই টেস্টে ভালো কিছু করতে না পারলে বাদ পড়তে হবে, ফেরার লড়াই করতে হবে। তা ছাড়া আগের চার টেস্টে ব্যাটিং করেছিলাম মিডল অর্ডারে (প্রথম দুটিতে ওপেন করলেও পরের দুটিতে খেলেছিলেন মিডল অর্ডারে)। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে আমাকে ওপেন করতে বলা হলো। সেসময়কার অস্ট্রেলিয়ার ফর্ম তো জানেনই। ’ না জানার কিছু নেই। রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়া সদ্যই দক্ষিণ আফ্রিকাকে তাদের মাটিতে ৪-০তে দুরমুশ করে এসেছে। গ্লেন ম্যাকগ্রা আসেননি তো কী; ব্রেট লি, জেসন গিলেস্পি, স্টুয়ার্ট ক্লার্ক আর স্টুয়ার্ট ম্যাকগিলের নেতৃত্বে শেন ওয়ার্ন— ২০০৬ সালের বাংলাদেশ কেন, সারা বিশ্বের ব্যাটসম্যানদেরই সংশয়ে ফেলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট এ লাইন আপ।

আর সদ্য কুড়ির শাহরিয়ার তো চাপে জেরবার।

নিজের টেস্ট ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তা, মহাশক্তিধর প্রতিপক্ষের সামনে আচমকা ওপেন করতে নামার আগের মুহূর্তটা মনে করে এখনো হাসেন শাহরিয়ার, “এতটাই নার্ভাস ছিলাম যে ম্যাচের ঠিক আগে নক করার সময় নিজের ব্যাটটাকেই ভীষণ ভারী মনে হচ্ছিল, অথচ এই ব্যাট দিয়েই আগের ছয় মাসে ওয়ানডে সেঞ্চুরিও করেছি। পাশে পাইলট ভাই (খালেদ মাসুদ) ছিলেন। উনাকে বললাম, ‘ভাই, আপনার কাছে কি হালকা ব্যাট আছে?’ পরে উনার একটা ব্যাট নিয়ে নেমেছিলাম ফতুল্লায়। ” এরপর? এরপর মঞ্চস্থ হয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের সর্বকালীন হাইলাইটস হয়ে থাকা একটি ইনিংস, তার সূত্র ধরে ম্যাচও—টেস্ট নম্বর ১৭৯৭। বাংলাদেশ বনাম অস্ট্রেলিয়া। ৯-১৩ এপ্রিল, ২০০৬। ফতুল্লা।

এরপর শাহরিয়ার নাফীসের ক্যারিয়ারে অনেক উত্থান-পতন হয়েছে। ভবিষ্যতের অধিনায়ক বিবেচনায় হাবিবুল বাশারের ডেপুটি হয়েছিলেন, সে পদে থাকতে থাকতেই ২০০৭ বিশ্বকাপ থেকে দলে অনিয়মিতও হয়েছেন। সে ধাক্কায় আইসিএল খেলে নির্বাসনে, পরে ফিরলেও বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমটাকে আর নিজের ঘর বানাতে পারেননি শাহরিয়ার। তবে এখনো নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন জাতীয় দলে ফেরার। নির্বাচকদের পরিকল্পনার বাইরে থেকেও গত মৌসুমে সব মিলিয়ে প্রায় ১৮০০ রান করেছেন, নিয়মিত ফিটনেস ট্রেনিংয়ের বাইরে স্ত্রীর তত্ত্বাবধানে যোগ ব্যায়াম আর ‘টাবাটা’ও (বিশেষ ফ্রিহ্যান্ড ফিটনেস ট্রেনিং, যা অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটাররা করেন) চলছে। ১১ বছর তিন মাস পরের জীবনে দৈনন্দিন ব্যস্ততার মাঝেও ফতুল্লা টেস্টের প্রতিটি মুহূর্ত ভোলেননি শাহরিয়ার, ‘ভুলি কী করে? দলের এবং আমার নিজের জন্যও অবিস্মরণীয় টেস্ট হয়ে আছে ওটা। ’

অস্ট্রেলিয়া ৩ উইকেটে জিতেছিল ম্যাচটি। কিন্তু সেদিনের অস্ট্রেলিয়ানরাও স্বীকার করে, বাঘের থাবা থেকে বাঁচতে কী মরণপণ লড়াই-না করতে হয়েছিল। একজন রিকি পন্টিং একার কাঁধে একটি জাতির জাত্যভিমান বয়ে বেড়িয়েছিলেন দ্বিতীয় ইনিংসে। নিজের ১৩৮ রানের ইনিংসটির মতো অস্ট্রেলীয় অধিনায়কের (অপরাজিত ১১৮) ইনিসের আদ্যপান্তও মনে আছে শাহরিয়ারের, ‘আমাদের কাছে তখন অ্যাটাকিং ব্যাটিং মানেই খালি মারো আর ডিফেন্সিভ মানেই ঠেকাও। কিন্তু পন্টিংকে দেখে বুঝেছিলাম ডিভেন্সিভ থেকেও কিভাবে অ্যাটাকিং ব্যাটিং করতে হয়। প্রথম ইনিংসেও দলের বিপর্যয়ে দারুণ সেঞ্চুরি করেছিলেন (অ্যাডাম) গিলক্রিস্ট। সত্যি বলতে কী, জেতার আশা ঠিকই করেছিলাম, কিন্তু মন বলছিল ঠিকই ওদের কেউ না কেউ ম্যাচটি জিতিয়ে নিয়ে যাবে। তাই মাশরাফি (বিন মর্তুজা) পন্টিংয়ের ক্যাচটি ফেলার পর মাঠে তেমন কিছু মনে হয়নি। হ্যাঁ, পরে ড্রেসিংরুমে ফিরে মনে হয়েছিল, যদি ক্যাচটি হতো...। তবে ক্যাচ পড়তেই পারে। ওটা নিয়ে মাশরাফিকে কেউ দোষারোপ করেনি, করার কারণও নেই। ’

কিন্তু সে আমলে ওরকম চাপ নিয়েও কী করে কালজয়ী ইনিংসটা খেললেন শাহরিয়ার? ‘জাভেদ (ওমর) ভাইয়ের সঙ্গে দড়িটা ক্রস করার পর আর কোনো চাপ অনুভব করিনি। ব্রেট লি’র চারটা বল খেলার পর মনে হয়েছিল, আজ আমাকে কেউ আউট করতে পারবে না। একটা ফ্লো চলে এসেছিল। কী দুর্দান্ত উইকেট বানানো হয়েছিল ফতুল্লায়, বল ব্যাটে আসছিল। তা ছাড়া অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের একটা কারণে আমার খুব পছন্দ। ওরা কপিবুক বোলিং করে। ওদের রান আপ থেকে শুরু করে ফলো থ্রু, কোথাও বিসদৃশ কিছু নেই। ওরা বিশ্বসেরা, তবু ওদের বোলিং খেলতে সব সময়ই বেশি এনজয় করেছি। ’ তাই বলে শেন ওয়ার্নকে উপমহাদেশে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। সর্বকালের সেরা লেগ স্পিনার প্রথম ইনিংসে উইকেটহীন থেকেছেন ৫.৬০ ওভারপিছু রান দিয়ে। তাঁর এক ওভারে ১৪ রান নিয়ে নব্বইয়ের ঘরে গেছেন শাহরিয়ার। ওয়ার্নের ওভারেই টানা দুই বাউন্ডারিতে পেরিয়েছেন ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট তো বটেই, প্রথম প্রথম শ্রেণির সেঞ্চুরিও, ঘড়িতে তখন বেলা ২টা ১২ মিনিট।

কি করে? টাইম মেশিনে করে শৈশবে ফিরে যান শাহরিয়ার, ‘১৯৯৪ সালের অ্যাশেজ সিরিজটা টিভিতে দেখেছিলাম। ওই সিরিজেই মহাতারকা হলেন ওয়ার্ন, করেছিলেন বল অব সেঞ্চুরি। তখন আমরা ফারুক (আহমেদ) ভাইদের বাসার নিচতলায় ভাড়া থাকি। রাতে ফারুক ভাইদের সঙ্গে বসে খেলা দেখতাম আর বলতাম, ওর (ওয়ার্ন) বোলিংয়ে এমন কী আছে? শুনে ফারুক ভাই খুব হাসতেন। তো, ফতুল্লায় ব্যাটিংয়ের সময় আমার ওই কথাগুলোই মনে পড়ছিল বারবার। শুধু ওয়ার্ন কেন, এমন একটা ফ্লো’র মধ্যে ছিলাম যে অস্ট্রেলিয়ার কোনো বোলারকেই কঠিন মনে হয়নি। এমনকি (স্টুয়ার্ট) ম্যাকগিলকে সুইপ করে বোল্ড হওয়ার সময়ও মনে হয়নি যে আমি আউট হতে পারি। ’

কিন্তু শাহরিয়ার আউট হয়েছিলেন, ৩০৬ রানের লিড নিয়েও হেরেছিল বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে ৪২৭ রান তোলা বাংলাদেশ দ্বিতীয়বারে মাত্র ১৪৮ রানে গুটিয়ে না গেলে মহাকাব্য রচিত হতো সেদিনই। হয়নি, ‘আপনার নিশ্চয় মনে আছে, তখন দুই ইনিংসে ভালো করতে পারতাম না। আমাদের লক্ষ্য ছিল যত কষ্ট হোক, আড়াই শ রান করব। তাহলেই চার শ রানের লিড হয়ে যায়। কিন্তু আমরা ইনটেনসিটি ধরে রাখতে পারিনি। ’

সেই বাংলাদেশ এই বাংলাদেশ আর সেই অস্ট্রেলিয়া এই অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় গিয়ে অবশ্য দারুণ আশাবাদী শাহরিয়ার, ‘সেরকম সুযোগ এলে আর হাতছাড়া হবে না, এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি। আর দুটি সিরিজের তুলনা করতে বসলে সবারই মনে হবে এবার জেতার সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের সময়ে সবার প্রত্যাশা ছিল ম্যাচ যদি পঞ্চম দিনে টেনে নিয়ে যাওয়া যায়। ফতুল্লার সেই দলের কয়েকজন বর্তমান দলেও জায়গা পেতে পারে। তবে দল হিসেবে বলব, সেই বাংলাদেশের চেয়ে এই বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে। তবে সেই অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে এই অস্ট্রেলিয়া পিছিয়ে, মানবেন নিশ্চয়ই?’

প্রত্যাশার অঙ্কটা যেন মিলিয়েও দিলেন ক্রিকেট রোমান্টিসিজমে ভরপুর ইনিংসটি খেলা শাহরিয়ার নাফীস আহমেদ!


মন্তব্য