kalerkantho


তবু স্বপ্ন দেখে যাওয়া

বাতাস থেকে অক্সিজেন নেওয়ার ক্ষমতা, খাদ্যাভ্যাস আর শরীরে থাকা জিনের প্রভাব নির্ণয় করে উন্নত বিশ্বে ছয় বছর বা তারও আগে থেকে শুরু হয় বিজ্ঞানভিত্তিক খেলোয়াড় গড়ার কাজ। আমাদের দেশে শুরুই হয় ১৫-১৬-র পর। সাফল্য আসবে কিভাবে? বিজ্ঞান মেনে অ্যাথলেট বা খেলোয়াড় তৈরির গুরুত্ব, পদ্ধতি, সম্ভাবনা নিয়েই এ আয়োজন। লিখেছেন রাহেনুর ইসলাম

২০ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



তবু স্বপ্ন দেখে যাওয়া

১২তম সামার অ্যাথলেটিকসে বিপাকেই পড়েছিলেন ঢাকার বাইরে থেকে আসা এক কোচ। খেলোয়াড়দের যাতায়াত ভাতা না পেয়ে সেটা চাইতে গেলে তিনি লাঞ্ছিত হন ফেডারেশনে।

পরে জেলা ক্রীড়া সংস্থা থেকে ‘বিকাশে’ টাকা পাঠিয়ে ব্যবস্থা করা হয় খেলোয়াড়দের ফেরার। ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে সেই কোচ বলছিলেন, ‘আর কখনো দল নিয়ে ঢাকায় আসব না। ’ কর্মকর্তাদের এমন খামখেয়ালি বাংলাদেশের অ্যাথলেটিকস বা ক্রীড়াঙ্গন পিছিয়ে পড়ার আরেক কারণ। যেখানে এমন সংকীর্ণতা, সেখানে গ্রাম থেকে তুলে এনে নতুন কাউকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে গড়ে তোলার আশা করা বাতুলতা। কিন্তু সাফল্য পেতে হলে এর বিকল্প নেই। কাজটা করতে পারেন দক্ষ কোনো কোচ। বিজ্ঞান মেনে সেই কাজ করার গুরুত্ব তুলে ধরা যাক।

চিকিৎসাশাস্ত্র বলছে, সুস্থ পুরুষ গড়ে প্রতি মিনিটে বাতাস থেকে অক্সিজেন টেনে নিতে পারেন তিন হাজার ৬০০ সিসি। পুরুষ ম্যারাথনাররা নিতে পারেন পাঁচ হাজার ১০০ সিসি।

বাড়তি অক্সিজেন টেনে নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে কঠোর অনুশীলন আর বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। পারফরম্যান্স ভালো হয় সেটা বাড়লেই। অনুশীলনের সময়ের হিসাবে বাতাস থেকে খেলোয়াড়দের অক্সিজেন টানার হারকে বলে ‘ভিও-টু ম্যাক্স’। উন্নত বিশ্বে স্প্রিন্টার, ম্যারাথনার, জিমন্যাস্ট, ভারোত্তোলকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এর ওপর ভিত্তি করেই। বাংলাদেশে কি এটা সম্ভব? বিকেএসপির অ্যাথলেটিকস কোচ আবদুল্লাহ হেল কাফি বলছেন কেন নয়, ‘দেখুন, কোচের দক্ষতায় আমরা পিছিয়ে নেই। ১০.৩৩ সেকেন্ডে ১০০ মিটার শেষ করা মালদ্বীপের হাসান সাঈদের কোচ আন্তর্জাতিক পরীক্ষায় বসেছিল বাংলাদেশের কয়েকজনের সঙ্গে। সেখানে আমরা কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করি আর সাঈদের কোচ করেছিল ফেল। মালদ্বীপ খুব উন্নত দেশ নয়। কিন্তু ওরা বছরজুড়েই অনুশীলন করায় খেলোয়াড়দের। অ্যাথলেটদের দেওয়া হয় বিজ্ঞান মেনে খাবার। আমরা এসব করি না বলেই পারি না। ’

বিজ্ঞান মেনে খাবারও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অ্যাথলেটিকসে। শরীরে পুষ্টির মাত্রা যা থাকা উচিত, বেশির ভাগেরই তা থাকে না। জানতে হবে কোন খেলায় কত ক্যালরি খরচ করা দরকার। অ্যাথলেটদের শরীর সেই পরিমাণ ক্যালরি পায় কি না। ঘাটতি থাকলে কার বেলায় কত, আর কিভাবে সেটা পূরণ করা যায়। এসব জেনে অনুশীলন করানো গেলে তবেই সম্ভব কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছানো। পাশাপাশি দরকার আধুনিক সব সরঞ্জামও। কিছু জিমন্যাস্টিকস রয়েছে, যার অনুশীলনের জন্য সর্বাধুনিক অ্যাপারেটাস যা লাগে, বাংলাদেশে তা নেই। এ জন্য মার্গারিটা মামুনের মতো রিদমিক জিমন্যাস্ট হারিয়েছি আমরা। রাশিয়া থেকে মার্গারিটাকে তাঁর বাবা এনেছিলেন বাংলাদেশের হয়ে খেলানোর জন্য। কিন্তু রিদমিক জিমন্যাস্টিকসের সর্বাধুনিক অ্যাপারেটাস ও অনুশীলনের ব্যবস্থা না থাকায় মার্গারিটাকে রাখা যায়নি। এরপর রাশিয়ায় ফিরে সেই দেশের হয়ে গত অলিম্পিকে সোনা জিতেছেন ‘বাংলার বাঘিনী’।

হাই জাম্পে বাংলাদেশের হয়ে রেকর্ড ২.১১ মিটার লাফানোর রেকর্ডটা এখনো সজীব হোসেনের। ২০১০ সালে রেকর্ড গড়লেও এ বছর তিনি সোনা জিতেছেন ১.৯৫ মিটার লাফিয়ে! এ জন্যই লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিয়মিত অনুশীলন করার পক্ষে তিনি, ‘আমরা দেরি করে শুরু করায় পিছিয়ে আছি অনেক। সেপ্টেম্বরে জাতীয় যুব চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হবে। সেখান থেকে বাছাই করে যদি ১০ জনকে বিজ্ঞানসম্মত অনুশীলন করানো যায় তাহলে ভবিষ্যতে সফলতা পাওয়া যেতেই পারে। ’

সমস্যাটা হচ্ছে বিজ্ঞানভিত্তিক অনুশীলনের জন্য দেশের কোথাও অবকাঠামো নেই। ১৯৯৬ সালে বিকেএসপিতে চালু হয়েছে ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগ। এখানকার স্পোর্টস সাইকোলজি বিভাগ মানসম্পন্ন। তবে স্পোর্টস বায়োমেকানিক বিভাগ পিছিয়ে। ভিও-টু ম্যাক্স পদ্ধতিতে খেলোয়াড়দের শরীরে অক্সিজেন নেওয়ার মাত্রা মাপার ব্যবস্থা আছে। খেলোয়াড়দের শরীরের জিনের অবস্থান, ফাইবার চিহ্নিত করা, লেকটিক এসিডের পরিমাণ নির্ণয়ের ব্যবস্থা নেই। ক্রীড়াবিজ্ঞানের উপপরিচালক নুসরাত শারমিন অবশ্য আশাবাদী, ‘আমাদের মেশিনগুলো জার্মানির বিখ্যাত কম্পানি থেকে কেনা। তবে কেনার ১৭ বছর পেরিয়ে গেছে। এগুলো মেরামত, নতুন কিছু যন্ত্র কেনা আর দেখাশোনার বিশেষজ্ঞ দরকার। চীনের সঙ্গে আমাদের একটা সমঝোতা চুক্তি হয়েছে। এটা কার্যকর হলে আশা করছি উপকৃত হব আমরা। ’

বিশ্ব অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন বা আইএএএফ গবেষণা করে দেখেছে ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, বাস্কেটবলের মতো দলীয় খেলার সঙ্গে টিকে থাকতে হলে অ্যাথলেটিকসে ‘টিম গেম’ দরকার। এ জন্য বিশ্বব্যাপী স্কুলগুলোতে তারা চালু করেছে ‘কিডস অ্যাথলেটিকস’, যেখানে কয়েকটি দল গড়ে আলাদা রঙের জার্সিতে খেলা হয় একে অন্যের বিপক্ষে। জেতার পর ছেলে-মেয়েরা যেভাবে উল্লাসে মাতে তাতে প্রেরণা পায় আরো ভালো করার। বাংলাদেশি কোচদেরও নিজেদের খরচে কয়েকবার বিদেশে নিয়ে আইএএএফ দিয়েছে এমন প্রশিক্ষণ। বিখ্যাত কোচ কিতাব আলী নিজেই স্বীকার করলেন, ‘বিদেশে নিয়ে কেবল আমার পেছনেই ৬০ লাখের বেশি টাকা খরচ করেছে আইএএএফ। যা শিখে এসেছি সেটা কাজে লাগাতে পারছি না দেশে। ফেডারেশন এখনো চালু করতে পারল না কিডস অ্যাথলটিকস। ’ স্কুলে কিডস অ্যাথলেটিকস চালুর খরচও দিতে চেয়েছে আইএএএফ। তার পরও চালু করতে পারেনি অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন। তবে স্বপ্ন দেখা ছাড়ছেন না আথলেটিকস ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক ফরিদ খান চৌধুরী (সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক বিশ্ব অ্যাথলেটিকসে যোগ দিতে লন্ডনে থাকায় ফেডারেশনের দায়িত্বে এখন তিনি), ‘আমরা কিডস অ্যাথলেটিকস চালু করতে যাচ্ছি। বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে খেলোয়াড় তৈরির বিকল্প নেই। যন্ত্রপাতিগুলো অবশ্যই দামি, তবে আমাদের কেনার অসাধ্য নয়। এসব পরিচালনার জন্য দক্ষ বিশেষজ্ঞ দরকার। খাবারের ব্যাপারটাও গুরুত্বপূর্ণ। অনুশীলন শেষে দেখা যায় স্প্রিন্টার, ম্যারাথনার সবাইকে দেওয়া হচ্ছে দুটি করে ডিম! কিন্তু একেকজনের শরীরে দরকার একেক রকম খাবার। আশার কথা, গত ২৬ মে উদ্বোধন হয়েছে শেখ কামাল অ্যাথলেটিকস একাডেমি। বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে খেলোয়াড় গড়ে তুলতে এখানে ভালো কিছু করার স্বপ্ন আছে আমাদের। ’ এই স্বপ্নটাই আপাতত ভরসা।


মন্তব্য