kalerkantho


নাবিলের চোখে বাংলাদেশের জার্সির স্বপ্ন

সনৎ বাবলা   

১৯ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



নাবিলের চোখে বাংলাদেশের জার্সির স্বপ্ন

হঠাৎ ফুটবলে ছেয়ে গেল আনোয়ার রহিমের মন। ছেলের পায়ে ফুটবল প্রতিভার উন্মেষ দেখে তিনি হয়ে গেলেন ‘হোর্হে মেসি’।

লিওনেল মেসির জন্য যেমন তাঁর বাবাকে আর্জেন্টিনা ছেড়ে বার্সেলোনায় যেতে হয়েছিল, তেমনি নাবিল রহিমের ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন সফল করতে তিনি ইংল্যান্ড ছেড়ে সপরিবারে ছুটে যাচ্ছেন থাইল্যান্ডে। ফুকেটের ক্রুজেইরো এফসির একাডেমি যে নাবিলের নতুন ফুটবল শিক্ষালয়।

নাবিলের জন্ম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ পরিবারে। গ্রীষ্মের ছুুটিতে কয়েক দিন আগে থাইল্যান্ড থেকে বাবার সঙ্গে এসেছে বাংলাদেশে। তাদের আদি বাড়ি চট্টগ্রামে, দুই প্রজন্ম আগে নাবিলের দাদা সপরিবারে চলে গিয়েছিলেন ইংল্যান্ডে। সেখানে জন্ম নেওয়া আনোয়ার রহিমও অত ক্রীড়ামনস্ক ছিলেন না, কিন্তু হঠাৎ ছেলের স্বপ্নে তাড়িত হয়ে তিনিও মজে গেছেন ফুটবলে, ‘৮-১০ বছর বয়স পর্যন্ত নাবিলের ঝোঁক ছিল অ্যাথলেটিকসে। ২০১২ সালের দিকে তার ইনডিপেনডেন্ট স্কুলের ফুটবল দল গঠনের সময় খেলোয়াড় ঘাটতি দেখে তারা নাবিলকে দলে নেয়। একটি টুর্নামেন্টে সে চার গোল করে, তখনই তার ফুটবল প্রতিভা সবার নজরে পড়ে। কিন্তু ফুটবলের মৌলিক শিক্ষাগুলো তার নেই।

’ স্কুলে খেলতে খেলতে নাবিল অজান্তে নিজেকে সঁপে দিয়েছে ফুটবলে, একরকম ভুলেই গিয়েছিল অ্যাথলেটিকসের অতীতকে। সমস্যা হলো, পায়ে ফুটবল থাকলেও ফুটবলের মৌলিক ব্যাপারগুলো তার অজানা। ফুটবলকে আরো ভালোভাবে জানার সুযোগ হয় তার ২০১৪ সালে লিভারপুল একাডেমিতে যাওয়ার পর, ‘তখন আমার ১২ বছর বয়স, একাডেমিতে যাওয়ার পর নিয়মতান্ত্রিকভাবে ফুটবল শিক্ষা শুরু হয়। আমি খুব উপভোগ করেছি ওই একটা বছর। পরের বছর স্কলারশিপ পেয়ে উইগান অ্যাথলেটিক ক্লাবের একাডেমিতে কাটিয়েছি। এখন শুরু হবে ক্রুজেইরো এফসির একাডেমিতে নতুন জীবন। আমার স্বপ্ন পেশাদার ফুটবলার হওয়া। ’

স্বপ্নের সারথি হিসেবে আনোয়ার রহিমের মতো বাবা থাকলে তো কথাই নেই। লিভারপুল এবং উইগান একাডেমি থেকে ছেলের সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শোনার পর আরো নিশ্চিত হতে তিনি গিয়েছিলেন একটা অ্যাসেসমেন্ট গ্রুপের কাছে, ‘ইংল্যান্ডে সাবেক ফুটবলার এবং কোচের সম্মিলনে অ্যাসেসমেন্ট গ্রুপ আছে। যেকোনো বাচ্চাকে কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করে তারা বলে দেবে, তার ফুটবল হওয়ার সামর্থ্য আছে কি না। সেই গ্রুপের কাছ থেকেও ইতিবাচক তথ্য পেয়ে আমি বিভিন্ন একাডেমির সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করি। বিভিন্ন দেশের কয়েকটি একাডেমি ট্রায়ালে ডাকলেও প্রথম পছন্দ ব্রাজিলের ক্রুজেইরো এফসির একাডেমি। ’ তাদেরই শাখা ফুকেটের একাডেমিতে গত জুনে গিয়ে প্রথম দিনের ট্রায়াল শেষেই মেলে সুখবর। নাবিলকে দিয়েছে পুরো স্কলারশিপ—অর্থাৎ ফুটবল ট্রেনিং, বোর্ডিং এবং পড়াশোনা সবই হবে তাদের খরচে। একাডেমিতে ফুটবল শেখার পাশাপাশি পড়াশোনা করবে ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে। ১৪ বছর বয়সী এই কিশোর ভীষণ খুশি, ‘আসলে পুরো স্কলারশিপ পাব ভাবিনি। একাডেমিতে পুরোদমে ট্রেনিং শুরুর আগেই আমি ক্রুজেইরো ক্লাবের হয়ে এইবার কাপ খেলে এসেছি পর্তুগালে। পাঁচ ম্যাচে চার গোল করেছি। এই একাডেমিতে কয়েক বছর থাকলে আমি ভালো ফুটবলার হয়ে বের হতে পারব। ’ 

১৪ বছর বয়সী বাঁ পায়ের এই ফুটবলার বাংলাদেশে বেড়াতে এলেও প্র্যাকটিস থেমে নেই। মুক্তিযোদ্ধার কোচ কায়সার পারভেজের কাছে কয়েক দিন ট্রেনিং করেছে। তার সম্পর্কে এই দেশি কোচের মূল্যায়ন হলো, ‘এই বয়সে সে অনেক ভালো ফুটবল খেলে। অনায়াসে বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক দলে খেলতে পারে। ’ তার বাবারও ইচ্ছা ছেলের গায়ে একটা জাতীয় দলের জার্সি দেখা, ‘ছেলে খেলতে চাইলে আমার কোনো সমস্যা নেই। তবে এখানকার ফুটবল ফ্যাসিলিটিজ বোধ হয় অত ভালো নয়। ’ নাবিলের মাথায় অবশ্য অত ভাবনা নেই, ‘আমি খেলব বাংলাদেশের হয়ে। বয়সভিত্তিক দলে খেলে দেখি। জাতীয় দলের খেলা থাকলে একাডেমি ছুটি দেবে। ’ জাতীয় দলের জার্সিই নতুন স্বপ্নের রং লাগিয়ে দিয়েছে এই প্রবাসী কিশোরের চোখে।


মন্তব্য