kalerkantho


তাহলে ৫০ বছরে পিছিয়ে বাংলাদেশ!

১৯ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



তাহলে ৫০ বছরে পিছিয়ে বাংলাদেশ!

১৯৯৯ সালে ১০.৫৪ সেকেন্ডে দৌড়ে জাতীয় রেকর্ড গড়ে গেছেন মাহবুব আলম, তাও ইলেকট্রনিক টাইমিংয়ে। যা এখনো ভাঙতে পারেনি কেউ। হাতঘড়িতে ১৯৯১ সালে ১০.৪০-এও দৌড়েছেন গোলাম আম্বিয়া।

বাতাস থেকে অক্সিজেন নেওয়ার ক্ষমতা, খাদ্যাভ্যাস আর শরীরে থাকা জিনের প্রভাব নির্ণয় করে উন্নত বিশ্বে ছয় বছর বা এরও আগে থেকে প্রতিভাবানদের খুঁজে শুরু হয় বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে খেলোয়াড় গড়ার কাজ। আমাদের দেশে খেলোয়াড় হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৫-১৬ বছর বয়স থেকে! সাফল্য আসবে কিভাবে? বিজ্ঞান মেনে অ্যাথলেট বা খেলোয়াড় তৈরির গুরুত্ব, পদ্ধতি, সম্ভাবনা নিয়েই এই আয়োজন। লিখেছেন রাহেনুর ইসলাম

 

অলিম্পিকে আট আর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ১১ সোনা জিতে অবসর নিলেন উসাইন বোল্ট। কিন্তু জানেন কি, ১০০ ও ২০০ মিটারের রেকর্ড অবিশ্বাস্য সময়ে নামিয়ে আনা এই কিংবদন্তির অ্যাথলেটই হওয়ার কথা ছিল না। ক্রিকেট অন্তপ্রাণ বোল্ট চাইতেন ওয়াকার ইউনুসের মতো পেসার হতে। স্কুলের ক্রীড়া বিভাগের প্রধান লর্না থর্প লম্বা পা জোড়া দেখে বলেছিলেন, ‘তোমার লম্বা পায়ের ভেতর সোনার খনি লুকানো। ’ এর পরই তাঁর অ্যাথলেটিকসে আসা।

এ ধরনের লর্না থর্প কোথায় আমাদের ক্রীড়াঙ্গনে? যাঁদের জহুরির চোখে বেরিয়ে আসবে প্রতিভা। আর অনুশীলন করাবেন আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধাসহ ক্রীড়াবিজ্ঞান মেনে। এর আগে বুঝতে হবে ভালো প্রতিভা মানে ইচ্ছামতো স্প্রিন্টার, সাঁতারু বা ম্যারাথনার বানানোর নিশ্চয়তা নয়। কাকে দিয়ে কী হবে সেটা জানা আসল ব্যাপার।

তাই জানতে হবে কোন নির্দিষ্ট খেলার জন্য শারীরিক কোন বৈশিষ্ট্য দরকার। এ ধরনের কোনো কিছুর ব্যবস্থা নেই বিকেএসপিতেও। তাহলে এখানে অ্যাথলেট বাছাই করা হয় কিভাবে? বিকেএসপির অ্যাথলেটিকস কোচ আবদুল্লাহ হেল কাফি জানালেন, ‘সবাই আগে থেকে ঠিক করে আসে ক্রিকেটার হবে। ক্রিকেটের ২৫ আসনের বিপরীতে পরীক্ষা দেয় ১০ হাজার! অথচ অ্যাথলেটিকসে ১০ জনের কোটায় পাওয়া যায় সাতজন। সাধারণত তাদের মুভমেন্ট দেখে কাউকে বলি স্প্রিন্টার হতে তো কাউকে পাঠাই লং জাম্প বা হাই জাম্পে। শতভাগ বিজ্ঞানভিত্তিক নয় বলে সেই ধারণা ভুল হতেই পারে। ’

শাহ আলম, বিমল তরফদার, মাহবুব আলমদের মতো স্প্রিন্টার উঠে এসেছেন একসময়। দক্ষিণ এশিয়ারও সেরা হয়েছেন তাঁরা। ১৯৯৯ সালে ১০.৫৪ সেকেন্ডে দৌড়ে জাতীয় রেকর্ড গড়ে গেছেন মাহবুব আলম, তাও ইলেকট্রনিক টাইমিংয়ে। যা এখনো ভাঙতে পারেনি কেউ। হাতঘড়িতে ১৯৯১ সালে ১০.৪০-এও দৌড়েছেন গোলাম আম্বিয়া। গত ছয় বছর ধরে যিনি দেশ মাতাচ্ছেন, সেই মেজবাহ আহমেদ সেসব রেকর্ডের ধারেকাছেও নেই। তাঁর সেরা সময় ১০.৭০ সেকেন্ড। লেভেল ফাইভ করা বিকেএসপির সাবেক কোচ ও আইএএএফের সাবেক লেকচারার নজরুল ইসলাম রুমি জানালেন পিছিয়ে থাকার কারণটা, ‘আমরা উন্নত দেশগুলোর চেয়ে অন্তত ৫০ বছর পিছিয়ে আছি। যেভাবে ক্রীড়াঙ্গন চলছে তাতে আগামী ৫০ বছরেও অলিম্পিকে পদক পাওয়ার আশা না করাই ভালো। অথচ অ্যাথলেটিকসে আমাদের ভালো সম্ভাবনা ছিল। পরিকল্পনা করে না এগোনোয় নষ্ট করেছি সেটা। ’

জার্মানির লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া বিভাগ বিশ্বসেরাদের অন্যতম। সেখানে খেলোয়াড়দের শরীরে জমা লেকটিক এসিড পরীক্ষা করা হয় নিয়মিত। শরীরে বেশি লেকটিক এসিড যোগ হলে আলসেমি তৈরি হয় আর বাতাস থেকে অক্সিজেন নেওয়ার ক্ষমতা কমে। সেটা দূর করে খেলোয়াড়দের চনমনে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সেখানকার প্রভাষক ও ডাক্তাররা। পাশাপাশি হয় হোয়াইট বা রেড ফাইবার টেস্ট। কাতারের এসপায়ার একাডেমির কথাও বলা যায়। বাংলাদেশের একজন লং জাম্পারকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেখানে। তাঁর অ্যাপ্রোচ রান অনুযায়ী লাফানোর কথা ৬.৮০ মিটার। কিন্তু লাফাচ্ছিলেন ৬.৪০ মিটার। কোথায় সমস্যা হচ্ছে, কী করলে সেগুলো কাটবে বাতলে দেওয়া হয় সেই একাডেমির পক্ষ থেকে। আমাদের দেশে এসব ভাবাই যায় না।

আফ্রিকান অনেক দেশ আমাদের চেয়ে অর্থনীতিতে পিছিয়ে। সেই তারাও অলিম্পিক আর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে পদক জিতছে নিয়মিত। গরিব আফ্রিকানরা পারলে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি কেন? নজরুল ইসলাম রুমির পর্যবেক্ষণ, ‘আফ্রিকানদের অ্যাথলেটিকসে একটা সংস্কৃতি আছে। আমাদের সেটা নেই। বাংলাদেশে সবাই ক্রিকেট অন্তপ্রাণ। দ্বিতীয় জনপ্রিয় খেলা ফুটবল। একটু চেষ্টা করলে আর ছয় থেকে দশ বছর বয়সীদের নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত অনুশীলন করালে অ্যাথলেটিকসে সাফল্য অসম্ভব নয়। কাজে লাগানো যেতে পারে পাহাড়িদেরও। বংশগতভাবে ওদের শরীরে যে জিন থাকে বা ওরা যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে সেটা অ্যাথলেট বা ভালো খেলোয়াড় হওয়ার জন্য আদর্শ। পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ওপরও কিন্তু জিনের প্রভাব নিয়ন্ত্রিত হয় কিছুটা। ’

১৮৯৬ অলিম্পিকের ম্যারাথনে সোনা জেতা স্পিরিদন লুইস উদাহরণ হয়ে থাকতে পারে পাহাড়িদের জন্য। গ্রিক এই অ্যাথলেটের বাবা সংসার চালাতেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে পানি বিক্রি করে। গ্রিসে তখন পানির ভীষণ অভাব। ২৫ থেকে ৩৫ মাইল দূর থেকে বড় বড় বালতিতে পানি এনে মানুষের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কাজটা বাবার সঙ্গে করতেন লুইস। তিনি ম্যারাথনার হয়ে জন্মাননি কিন্তু দূর থেকে পানি আনার এই অভ্যাস তাঁকে দূরপাল্লার দৌড়ে সাফল্য এনে দিয়েছে। এর অর্থ পরিবেশ ও জীবনযাপন পদ্ধতি বদলে দিতে পারে অনেক কিছু। লুইসের মতো এতটা কষ্টের না হলেও পাহাড়িদের কঠোর জীবনযাপনের জন্য বেশ সম্ভাবনা আছে অ্যাথলেটিকসে। এ নিয়ে খাগড়াছড়ি জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক জুয়েল চাকমা জানালেন, ‘অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন যদি চায় পাহাড়িদের কাজে লাগাতে, আমরা অবশ্যই প্রতিভা খোঁজায় সাহায্য করব। ’

বাংলাদেশে ক্রীড়াবিজ্ঞানের একমাত্র ভরসা বিকেএসপি। এখানকার ক্রীড়াবিজ্ঞানের উপপরিচালক নুসরাত শারমিন প্রতিভা খোঁজার পাশাপাশি জোর দিচ্ছেন ক্রীড়া-সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপরও, ‘উন্নত দেশগুলোর স্কুল-কলেজগুলোয় জিমনেসিয়াম আর সুইমিং পুল থাকা বাধ্যতামূলক। ভালো খেলোয়াড় গড়তে হবে—এই শর্তে এসব রাখা নয়, এগুলো দরকার শরীরের বিকাশের জন্য। একটা সময় আমাদের স্কুলগুলোতে পিটি করানো হতো। শারীরিক ও মানসিক গঠনে কার্যকরী এটা। এখন তো মার্কেটের ওপর স্কুল হচ্ছে, পিটি হবে কিভাবে?’ মানে এই ধারা থেকে বের হতে না পারলে ৫০ বছরই পিছিয়ে থাকতে হবে আমাদের।


মন্তব্য