kalerkantho


আমি দৌড়ের ওপর ছিলাম এখনো দৌড়ের ওপরই আছি

১৮ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



আমি দৌড়ের ওপর ছিলাম এখনো দৌড়ের ওপরই আছি

ছবি : মীর ফরিদ

যাঁকে মনে করেন বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ক্রীড়াবিদ, সেই ‘হাবিলদার মোস্তাক’কেই হারিয়েছিলেন তিনি। আর এখানেই থেমে না থেকে ১০ হাজার মিটার দৌড়ে তাঁর একের পর এক সাফল্য আজও অম্লান।

কাকতালীয়ভাবে নামেও মিল আছে দুজনের, তিনি মহিউদ্দিন আহমেদ মোশতাক। আর সেনাবাহিনীর ‘হাবিলদার মোস্তাক’-এর সঙ্গে তিনি হয়ে গেলেন দর্শকদের কারো কারো কাছে, ‘সিভিল মোশতাক। ’ সেই মানুষটির ট্র্যাকের দৌড় আর জীবনের দৌড়ের গল্প শুনতে গিয়েছিলেন মাসুদ পারভেজ। গিয়ে জানলেন, তাঁর কাছে জীবনের প্রতিশব্দই হচ্ছে দৌড়

প্রশ্ন : সাক্ষাৎকারটি বাংলাদেশের ফুটবল কিংবদন্তি শেখ মোহাম্মদ আসলামকে দিয়েই শুরু করি। শুনেছি উনি আপনাকে ‘ওস্তাদ’ বলে ডাকেন। তা দুই ভুবনের এই দুই বাসিন্দার মধ্যে নিবিড় যোগাযোগটা তৈরি হয়েছিল কিভাবে?

মহিউদ্দিন আহমেদ মোশতাক : সেটিও অ্যাথলেট হিসেবে আমার নামডাক হওয়ার সুবাদেই। ওই সময়ে ফুটবলারদের মতো অতটা না হলেও তারকাখ্যাতি অ্যাথলেটদেরও ছিল কিছুটা। আমার কথাই ধরুন না। ভক্তদের অটোগ্রাফ পর্যন্ত বিলিয়েছি আমি।

ফুটবলাররা তো চিনতই আমাকে। এই বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামেই ওদের পাশাপাশি অনুশীলন করত অ্যাথলেটরাও। অনুশীলন করতে করতেই আসলাম সাহেবের সঙ্গে আমার পরিচয়। উনি একদিন এসে ধরলেন, ‘স্কিল-টিল সবই আছে আমার, খালি দম আর স্ট্রেন্থের অভাব। আপনি যেহেতু অ্যাথলেট, আপনার সঙ্গে একটু অনুশীলন করব। ঠিক আছে?’ ওই শুরু। আবাহনী ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হওয়াও তাঁর মাধ্যমেই।

প্রশ্ন : আবাহনী ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণ?

মোশতাক : একই কারণ। ফুটবলারদের ফিটনেস বাড়ানোর জন্য। আবাহনী টানা তিন বছর ফুটবল লিগ জেতে না। ১৯৮৯ সালের ফুটবল মৌসুম শুরুর আগে তাই ক্লাব থেকে একজন ট্রেনার চেয়ে অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনে চিঠি দেওয়া হয়। ফেডারেশন আমাদের কোচ অরুন কুমার চাকমাকে পাঠায়। বয়স হয়ে যাওয়াতে উনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ড্রিল দেখাতেন বলে সম্ভবত ভালো লাগেনি ক্লাব কর্তৃপক্ষের। না হলে আসলাম সাহেব একদিন এসে কেন বলবেন, ‘কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে আমার। আপনিই আমাদের ট্রেনার হয়ে যান। ’ ওই হলাম। ওই বছরই এক যুগোস্লাভ কোচকে নিয়ে আসে আবাহনী। ভাবতে ভালো লাগে যে তিন বছর পর আবাহনীর শিরোপা পুনরুদ্ধারে আমারও কিছুটা অবদান ছিল। ওই বছর কোনো ইনজুরির সমস্যাই ছিল না। এই সুযোগে বলে রাখি আসলাম সাহেবের সঙ্গে কিন্তু আরেকটি সম্পর্কের বন্ধনও আছে আমার।

প্রশ্ন : কী সেটা?

মোশতাক : (হাসি...) লজ্জার কথাই, তবু বলি। প্রচলিত বাংলায় যাকে বলে আমি আমার স্ত্রীকে ভাগিয়ে এনে বিয়ে করেছিলাম! তা আসলাম সাহেব আর ওনার স্ত্রী মিলেই মগবাজারে কাজি অফিসে আমাদের বিয়ে পড়ান। বিয়ের পর যাত্রাবাড়ীতে আমাদের দুজনের বাড়ির কাছাকাছিই একটি জায়গায় থাকার ব্যবস্থাও করেন। সেই হিসাবে বলতে পারেন উনি আমার উকিল শ্বশুরও!

প্রশ্ন : তা ট্রেনিং করাতে গিয়ে উকিল শ্বশুরকেও রগড়ানোর গল্প নিশ্চয়ই আছে?

মোশতাক : অবশ্যই আছে (হাসি...)। খেপ খেলতে যাওয়ায় একদিন অনুশীলনে অনুপস্থিত থাকেন তিনি। পরদিন এমন ডলা দিই যে দেখি তিনি নিজেই নিজেকে বলতে শুরু করে দিয়েছেন, ‘কিরে আসলাম, আর খেপ খেলতে যাবি!’ হা হা হা...।

প্রশ্ন : দূর পাল্লার দৌড়বিদ হিসেবে আপনার নিজের ট্রেনিংও ভীষণ কষ্টকর ছিল বলেই শুনেছি।

মোশতাক : ভুল শোনেননি। সফল হতে গেলে কষ্ট তো করতেই হবে। দেখে খারাপ লাগে এখনকার অ্যাথলেটরা কবে ক্যাম্প হবে, সেই আশায় বসে থাকে। নিজে থেকে অনুশীলন চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপার ওদের মধ্যে খুব একটা নেই। নেই বলেই এখন জাতীয় অ্যাথলেটিকসের সময় পকেটে আমি ১০ হাজার টাকা নিয়ে ঘুরলেও কাউকে দেওয়া হয় না আর! ১০ হাজার মিটারে আমার টাইমিং কেউ টপকাতে পারলে ওই টাকা পুরস্কার দেব বলে ঠিক করে রেখেছি। কিন্তু সবশেষ আসরেও যে জিতেছে, ওর টাইমিং ৩৫ মিনিট। আমার চেয়ে ৩ মিনিট বেশি! আমারটাই পারে না, সেনাবাহিনীর ইলিয়াসের ৩১ মিনিটের কিছু সময় বেশি নিয়ে গড়া রেকর্ড ভাঙবে কী করে!

প্রশ্ন : তা আপনার নিজে থেকে চালিয়ে যাওয়া অনুশীলন সূচিটাও একটু শুনতে চাই।

মোশতাক : আমি ঢাকার ছেলে। ঢাকা শহরে এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে আমার পায়ের ছাপ পড়েনি। কয়েকটি উদাহরণ দিই। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম থেকে দৌড় শুরু করে সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, পোস্তগোলা এবং নারায়ণগঞ্জ হয়ে আবার এখানে ফিরতাম। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পুরোটা চক্কর মারলে ২.৫ কিলোমিটার হতো। আমি দিতাম ১০ চক্কর। আবার মিরপুরের ক্রীড়াপল্লীতে ক্যাম্পে থাকার সময়ও নিজে থেকে কম দৌড়াইনি। ছুটির দিন ফজরের আজানের সময়ে পিঠে ব্যাগ বেঁধে যাত্রাবাড়ীর বাসার পথে দৌড় শুরু করতাম। কখনো কখনো একটু সময় বেশি লেগে যেত। তবে গড়ে ৫৫ মিনিটে আমি মিরপুর থেকে যাত্রাবাড়ীর বাসায় পৌঁছে যেতাম। ১৯৮৫-র সাফ গেমসের আগে আর্মি স্টেডিয়ামের ক্যাম্প থেকে দৌড়ে সেই টঙ্গী চলে যেতাম। আরো শুনবেন?

প্রশ্ন : শোনা যাক।

মোশতাক : ১৯৮১ সালে বিটিএমসিতে পাওয়া চাকরির সীমিত পয়সা নিয়েই চলে যাই চট্টগ্রাম। স্রেফ অনুশীলনের জন্য সেখানে বাসা ভাড়া নিয়ে টাইগার পাসের জিলাপি পাহাড়ে দৌড়াতাম। আমি বালিতে দৌড়াতাম। ময়মনসিংহে গিয়ে এক বন্ধুর বাসায় ‘পেয়িং গেস্ট’ হিসেবে থেকে দৌড়াতাম নদীর চরে। দৌড়েছি গ্রামের পর গ্রাম। বৃষ্টি হলে ময়মনসিংহের সার্কিট হাউস মাঠের জমে যাওয়া পানিতে একসময়ের দ্রুততম মানবী ফিরোজা, লংজাম্পের চ্যাম্পিয়ন জেসমিনসহ ওই শহরের অ্যাথলেটদের নিয়ে ফিটনেস ট্রেনিংও করতাম।

প্রশ্ন : শুনেছি কষ্টকর দৌড় এখনো অব্যাহত আছে আপনার।

মোশতাক : ঠিকই শুনেছেন। খেলা ছাড়লেও দৌড় ছাড়িনি আমি। ফিটনেস ঠিক রাখার জন্য এখনো খেলোয়াড়ি জীবনের মতোই নিয়ম করে দৌড়াই। যে ১০ বছর নিউ ইয়র্কে ছিলাম, দৌড়েছি তখনো। বাড়ির মালিক ছিলেন হন্ডুরাসের। কাজ শেষে ফিরে তাঁকে নিয়ে কত মাইলের পর মাইল যে দৌড়েছি!

প্রশ্ন : আপনার পুরো জীবনটা দেখছি আক্ষরিক অর্থেই দৌড়ের ওপর ছিল!

মোশতাক : (হাসি...) ঠিকই বলেছেন। আমি দৌড়ের ওপর ছিলাম, এখনো দৌড়ের ওপরই আছি। খেলোয়াড়ি জীবনেই যত মাইল দৌড়েছি, পুরোটা একসঙ্গে করলে মনে হয় এত দিনে আমি হজ করে চলে আসতে পারতাম। দূর পাল্লার দৌড়ের জন্য যে অফুরন্ত দমের দরকার হয়, আমার সেটি ছিলও।

প্রশ্ন : অফুরান প্রাণশক্তির জন্য একটি নিকনেমও পেয়েছিলেন আপনি?

মোশতাক : হ্যাঁ, আমাকে এই খেলার ভুবনে নিয়ে আসা কোচ খালেক ভাই নাম দিয়েছিলেন ‘অক্সিজেন বক্স’। তিনি পরে বিকেএসপির ডিরেক্টর ট্রেনিংও হয়েছিলেন। পরে তাঁর দেওয়া ওই নামেই সবাই আমাকে ডাকতে শুরু করল।

প্রশ্ন : আপনার আরেকটি নামের কথাও শুনেছি। যাঁকে হারিয়ে অ্যাথলেটিকসে আপনার নামডাকের শুরু, সম্ভবত সেই মোস্তাক আহমেদকে হারানোর পরই অন্য নামটি দেওয়া হয়েছিল আপনার।

মোশতাক : হ্যাঁ, আমার শ্রদ্ধেয় কিংবদন্তি ‘হাবিলদার মোস্তাক’কে হারিয়েই আমার যাত্রা শুরু। ১৯৮৪-র সেই ১২তম ন্যাশনাল অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপের আগে ১০ হাজার মিটারে তিনি টানা ১০ বারের চ্যাম্পিয়ন। ৮০০, ১৫০০, ৫০০০ ও ১০০০০ মিটার—এই চারটিতে প্রতিবছর তাঁর শিরোপা বাঁধা-ধরা ছিল। ওইবারও অন্যগুলোতে জিতেছিলেন। কিন্তু ১০ হাজার মিটারে আমার কাছে হেরে যান। তা আমাদের দুজনের নামই তো এক। তাই দর্শকরা দুজনকে আলাদাভাবে চেনার জন্য আমার নতুন নামকরণ করেন। মোস্তাক ভাইকে পেছনে ফেলে যখন জিতছি, তখনই গ্যালারি থেকে হাজার পনেরো দর্শকের রব শুনতে পেলাম, ‘সিভিল মোশতাক, সিভিল মোশতাক’। ওই আমার আরেকটি নাম হয়ে গেল। আর ওই আমলে অ্যাথলেটিকসও যে দর্শকপ্রিয় ছিল, সেটি নিশ্চয়ই উপস্থিতির সংখ্যা থেকে অনুমান করতে পারছেন?

প্রশ্ন : পারছি। ‘হাবিলদার মোস্তাক’ আর আপনার ঐতিহাসিক সেই লড়াইয়েও আরেক পাক ঘুরতে যাব। এর আগে জেনে নিতে চাই অ্যাথলেটিকসে আপনার হাতেখড়ি কিভাবে?

মোশতাক : সেটি বলতে গেলে আগে স্কুলজীবনের কথাও একটু বলে নিতে হবে। দোলাইরপাড় হাই স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সব ইভেন্টেই দৌড়াই আর জিতি। দিনের শেষে পুরস্কার প্রদানের সময় একের পর এক নাম ঘোষিত হয় আমার। এলাকার সোলেমান ভাইয়ের বিষয়টি মনে ধরে যায়। তাঁর মাধ্যমেই আসলে আমার অ্যাথলেটিকসে আসার পথ খুলে যায়।

প্রশ্ন : কিভাবে?

মোশতাক : একসময় যাত্রাবাড়ীতে টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরা জায়গায় কাবাডি টুর্নামেন্ট হতো। টিকিট কিনে সেই খেলা দেখার ব্যবস্থাও ছিল। তা ওই টুর্নামেন্টে যাত্রাবাড়ী ক্রীড়া চক্র নামে একটি দল নেন সোলেমান ভাই। তাঁর দলেই খেলানোর জন্য নিয়ে আসেন ১১০ মিটার হার্ডলসে তখনকার চ্যাম্পিয়ন খালেক ভাইকে। যাঁর কথা একটু আগেই বলছিলাম। তাঁকে সোলেমান ভাই আমার জন্য কিছু করার কথা বলেন। উনি একদিন তাঁর কাছে আমাকে নিয়েও যেতে বলেন। সোলেমান ভাইয়ের মোটরসাইকেলে চেপেই যাই।

প্রশ্ন : যেতে না যেতেই কি দুয়ার খুলে গেল?

মোশতাক : না, অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। সেটি ১৯৭৯ সালের কথা। আউটার স্টেডিয়ামে বিটিএমসির আন্ত প্রজেক্ট অ্যাথলেটিকসে যেতে বলা হলো আমাকে। ওই প্রতিযোগিতায় প্রতিটি ইভেন্টের সেরা দুজন জাতীয় অ্যাথলেটিকসে খেলতে যায়। আমি সেটিতে অংশ নিতে গেলামও। কিন্তু পারব না মনে করে খালেক ভাই সেবার আমাকে সুযোগ দিলেন না। পরের বছর অবশ্য ৫ ও ১০ হাজার মিটারে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় খালেক ভাইকে আফসোস করে বলতে শুনলাম, ‘আমি ভুল করেছি রে, তোকে আগেরবারই নামানো দরকার ছিল। তোর ভেতরে ট্যালেন্ট আছে। ’

প্রশ্ন : প্রতিভা বিকশিত হওয়ার সেই শুরু?

মোশতাক : হ্যাঁ, পরের বছর জাতীয় অ্যাথলেটিকসের ১০ হাজার মিটারে তৃতীয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই খালেক ভাই আমাকে বিটিএমসিতে চাকরি দিয়ে দিলেন। ১৯৮১ সালে আমি তখন মাত্র ম্যাট্রিক পাস করেছি। ওই সময়ে ৪৮০ টাকা বেতনের চাকরিও বিশাল ব্যাপার। তবে আমার জীবনের প্রথম আয় বিটিএমসির চির প্রতিদ্বন্দ্বীর হয়ে খেলে। তাও আবার কাছাকাছি সময়ের মধ্যেই।

প্রশ্ন : সেটি কী করে সম্ভব?

মোশতাক : বিটিএমসি-বিজেএমসি তখন প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী। আবাহনী-মোহামেডানের মতো। তখন ৪০০ মিটারের গোল্ড মেডেলিস্ট রাজিয়া সুলতানা অনু আপা আমাকে খেপ খেলতে নিয়ে গেলেন বিজেএমসির জোনাল টুর্নামেন্টে। ওটা ১৯৮০ সালের কথা। তত দিনে আমি কিন্তু বিটিএমসির হয়ে পরের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে দৌড়ানোর যোগ্যতা অর্জন করে ফেলেছি। ওই সময় নিয়মের বিধিনিষেধ অত ছিল না বলে বিজেএমসির ঢাকা জোনের হয়ে খেলতে চলে যাই এবং তৃতীয় হই। অনু আপা খেলা শেষে আমাকে একটা খাম ধরিয়ে দিলেন। খুলে দেখি ৫০০ টাকার নোট। ওটাই আমার প্রথম আয়। চকচকে নোটটি দেখে কী যে আনন্দ হয়েছিল!

প্রশ্ন : ‘হাবিলদার মোস্তাক’কে হারিয়ে ১০ হাজার মিটারে আপনার প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হওয়া তো বিজেএমসির হয়েই, নাকি?

মোশতাক : এর আগে অবশ্য বেশ কয়েকবার দলবদলের ঘটনাও আছে। ১৯৮২ এবং ১৯৮৩-তে বিটিএমসির হয়েই ৫ ও ১০ হাজার মিটারে পর পর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় হই। এরপর চিন্তা করি সোনা পেতেই হবে। ওই সময়েই বিজেএমসির খুলনা শাখা আমাকে ওদের হয়ে খেলার প্রস্তাব নিয়ে আসে। প্রস্তাবটা দেয় জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে তখনকার জ্যাভেলিন থ্রোর চ্যাম্পিয়ন আরিফ। এই তো মাত্র দুই বছর আগে ওর রেকর্ড ভাঙল। ও বলল বেতন বিটিএমসিতে যা পাই, তার দ্বিগুণ করে দেওয়া হবে। ৯০০ টাকা বেতনে যোগ দিই বিজেএমসির খুলনা শাখার প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলে। পদ ছোট, আপার ডিভিশন ক্লার্কের। তবে মর্যাদা বেশ। আন্ত মিল প্রতিযোগিতায় আমার প্রতিষ্ঠানকে চ্যাম্পিয়নও করাই ৩, ৫ ও ১০ হাজার মিটারে জিতে। শ্রমিকরা আমাকে কাঁধে তুলে নিয়ে মিছিলও করে।

প্রশ্ন : কিন্তু সেখানেও বোধ হয় আপনার মন টেকেনি?

মোশতাক : আসলে চাহিদা থাকায় সুযোগটা নিয়েছি। এতে দোষের কিছু ছিল বলে আমি মনে করি না। এখন অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের সহসভাপতি শাহ আলম ভাই বিজেএমসির আদমজী অঞ্চলে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আসতেই বলি দুই হাজার টাকা বেতন দিতে হবে। কিন্তু অ্যাসিস্ট্যান্ট কো-অর্ডিনেশন অফিসারের বেতন ১৬০০ টাকার বেশি হয় না। অথচ তাঁরা আমাকে অনেকগুলো ইনক্রিমেন্ট দিয়ে ঠিকই ২২০০ টাকা বেতনের বন্দোবস্ত করে দেন। ঝামেলাটা বাধল জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের প্রতিযোগী বাছাইয়ের জন্য বিজেএমসির আন্ত অঞ্চল টুর্নামেন্টের আগে। ম্যানেজার্স মিটিংয়ে খুলনা অঞ্চল আমাকে ছাড়পত্র না দেওয়ায় আমার সেবার জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ খেলাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তবে পারফরম্যান্স ভালো থাকায় কর্তৃপক্ষ একটা ব্যবস্থা ঠিক করে দেয়। বলা হয় খুলনা বা আদমজী নয়, আমি খেলব হেড অফিসের হয়ে। ওদের হয়েও আমি ৩, ৫ ও ১০ হাজার মিটারে চ্যাম্পিয়ন হলাম। এরপর আরেকবার দলবদলের সুযোগ নিয়েও শেষ পর্যন্ত ফিরে আসতে হয় বিজেএমসিতে।

প্রশ্ন : কেন?

মোশতাক : বিজেএমসি মামলা-মোকদ্দমার ভয় দেখানোতেই আসলে আমাকে ফিরে আসতে হয়। লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মুস্তাফিজুর রহমানের প্রস্তাব পেয়ে চলে যাই নৌবাহিনীতে। একা নই, উনি বিজেএমসি থেকে বিশাল একটি দল ভাগিয়ে নৌবাহিনীতে নিয়ে যান। আমাকে করা হয় চিফ পেটি অফিসার। তখন নৌবাহিনীর প্রধান ছিলেন এম এইচ খান। পুরনো বিমানবন্দরে একটি বিমান দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে যিনি হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান। সেবারই ঢোকার পরে আমাদের সবার চুল একদম ছেঁটে ফেলা হয়। অথচ এর আগে আমার ঝাঁকড়া চুল। নৌবাহিনীতে এক মাস ট্রেনিং করার পর আবার সেই ঝামেলা। অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের তখনকার সভাপতি সালাউদ্দিন আহমেদের কাছে বিজেএমসি অভিযোগ করল। বিজেএমসির সাইফউদ্দিন আহমেদ এমনকি নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকিও দিলেন। তবু নৌবাহিনী আমাদের রাখতে চাইল। তবে সে জন্য ওই বছরটি বাদ দিয়ে পরের বছর খেলতে হতো। আমিসহ অনেকেই তাতে রাজি না হয়ে বিজেএমসিতেই ফিরে এলাম।

প্রশ্ন : ফিরে সেই বিজেএমসির হয়েই স্বপ্নপূরণও হলো আপনার।

মোশতাক : ঠিক তাই। ৩০ জন ১০ হাজার মিটারে দৌড়াতে নামল। তখন তো সিনথেটিক ট্র্যাক ছিল না। দৌড়াতাম আমরা ঘাসের মাঠেই। ৪০০ মিটারের একেকটি চক্কর। সব মিলিয়ে দিতে হবে ২৫ চক্কর। আমি তো জানি যে কী করলে জিততে পারব। সেভাবেই তৈরি হয়ে নামি। ৪ চক্কর পরে আনাড়ি খেলোয়াড়রা পেছনে পড়ে গেল। আরো কয়েক চক্কর পরে ‘হাবিলদার মোস্তাক’সহ নায়েক মালেক, বিডিআর এবং পুলিশও আমার সামনে। আমি তখন ৬ নম্বরে। ১০ চক্কর শেষে আমার সামনে চারজন। ২০ চক্কর পরে আমার সামনে সেনাবাহিনীর তিনজন। মোস্তাক, মালেক এবং আরেকজন। আরো পাঁচ চক্কর বাকি। চার চক্কর বাকি থাকতে সেনাবাহিনীর একজনকে পেছনে ফেললাম। পরের চক্করে আরেকজনকে। বাইরে থাকা সেনাবাহিনীর অন্য অ্যাথলেটরা তখন চিত্কার করে বলে হাবিলদারকে বলছে, ‘ওস্তাদ সিভিল কাটি দিল। জোরে বাড়ান। ’ শেষ চক্করের ঘণ্টা যখন বাজল, তখনো কেউ গতি বাড়াচ্ছি না।

প্রশ্ন : কারণ কী ছিল?

মোশতাক : তখন আমরা কেবল টেকনিক খাটাচ্ছি। ২৪ চক্করের পর কার পায়ের কী অবস্থা এবং দম কেমন, তা তো কেউ কারোটাই বুঝতে পারছিলাম না। সে জন্যই প্রায় শেষ পর্যন্ত একটু বুঝে নেওয়ার চেষ্টা। মশাল গেটের কাছে গিয়ে যখন মাত্র ১০০ মিটার বাকি, তখন আমি ওনার একটু পেছনে থেকে টেকনিক খাটালাম। আমি জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকলাম। যাতে উনি বোঝেন যে আমার আর দম অবশিষ্ট নেই। টেকনিকটা খুব কাজেও দিল। ওনাকে বোকা বানানো গেল। ওনার দুই হাত পেছনে থাকতে মশাল গেটের কাছে গিয়ে আমি হঠাৎ স্প্রিন্ট দেই। ৫ মিটারের একটি গ্যাপ হয়ে যায়। তাতেই আমি বেরিয়ে যাই। জীবনে প্রথমবারের মতো ১০ হাজার মিটারে আমি চ্যাম্পিয়ন হই।

প্রশ্ন : ‘হাবিলদার মোস্তাক’ আপনাকে অভিনন্দন জানাননি?

মোশতাক : উনি এসে আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বলে আমার তো মনে পড়ে না। এমনকি আমার জানামতে উনি সেদিন পুরস্কারও নিতে যাননি। হয়তো ওনার কল্পনাতেই ছিল না যে উনি হারতে পারেন। পরে তো মোস্তাক সাহেব আর ১০ হাজার মিটারই দৌড়াননি। উনি পাক্ষিক ক্রীড়াজগতকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন ওনার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ১০ হাজার মিটারে দ্বিতীয় হওয়া। কারণ উনি এর আগে কখনোই দ্বিতীয় হননি। জেতার পর নৌবাহিনী থেকে পাঠানো একটি চিরকুটের ভাষা এখনো মনে গেঁথে আছে আমার।

প্রশ্ন : কে লিখে পাঠিয়েছিলেন তা?

মোশতাক : ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তাই। লেখা ছিল, ‘এটা আমাদেরই গোল্ড হতে পারত। তার পরও তোমাকে ধন্যবাদ। ’

প্রশ্ন : ‘হাবিলদার মোস্তাক’-এর সঙ্গে কি পরে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছিল?

মোশতাক : অস্বাভাবিক তো ছিল না কখনো। পরবর্তীতে ওনার সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর হয় আমাদের। হয়তো ওই সময়ে ১০ হাজারে মাত্রই তাঁর রাজত্ব শেষ হওয়ার ব্যাপারটি মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু আমি তো ৫ হাজার মিটারে তাঁকে হারাতে পারিনি কখনোই। ওই আসরেই তাঁর কাছে হেরেছি। হেরেছি আগে-পরেও। আমি বলব বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদ তিনি। ৬৯টি সোনার পদক কে পেয়েছে কবে? আরেকটি ব্যাপারেও তিনি অনন্য। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বাংলাদেশের একমাত্র ক্রীড়াবিদ, যিনি কিনা স্বাধীনতা পুরস্কারও পেয়েছেন।

প্রশ্ন : ১৯৮৪-র জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে তাঁকে হারিয়ে আপনি নেপাল সাফ গেমসের ক্যাম্পেও তো ডাক পেয়েছিলেন?

মোশতাক : ডাকই পাইনি শুধু, আমার নেপালে যাওয়ারও কথা ছিল। কিন্তু অদৃশ্য হাতের কারসাজিতে আমি সেবার যেতে পারিনি। এই তো দুঃখের কথাটা মনে করিয়ে দিলেন (এরপর অনেকক্ষণের নীরবতা। মহিউদ্দিন আহমেদ মোশতাক দুই হাতে চোখ ঢেকে কাঁদলেন এবং কেঁদে স্বাভাবিক হতেও সময় নিলেন)। ঘটনাটা কী বলতেই হবে?

প্রশ্ন : প্রসঙ্গ যখন উঠেছেই, শুনি।

মোশতাক : এনএসসিতে ক্যাম্প হলো। প্রতিটি ট্রায়ালেই আমি প্রথম হতাম। ট্রায়ালেও ১০ হাজার মিটারে ‘হাবিলদার মোস্তাক’ আমার সঙ্গে পারেননি। প্রাক-বাছাই ও চূড়ান্ত বাছাইয়ের পর ২৫ জন থেকে দল হয়ে গেল ১২ জনের। ১০ হাজার মিটারে আমি একা টিকলাম। ১২ জনের তালিকায় আমার সিরিয়াল ১০ নম্বর। প্রথমে বলা হলো ১২ জনই যাবে। তবে সাফে অন্যান্য ডিসিপ্লিনেরও তো দল থাকে। অন্য দল বড় করতে গিয়েই কিনা অ্যাথলেটিকসের দলটা ১০ জনের হবে বলে জানিয়ে দেওয়া হলো। তখন অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওয়াদুদ ভাই এবং সহসভাপতি ফারুক ভাই একরকম নিশ্চয়তাই দিলেন যে আমি যাচ্ছিই। পাসপোর্টও দিলাম। কিন্তু যাওয়ার এক দিন আগে ফারুক ভাই ডেকে বলে দিলেন, ‘দুঃখিত, তুমি যাচ্ছো না। ’ পাসপোর্টও ফিরিয়ে দেওয়া হলো। মনে আছে, কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরেছিলাম আমি। আমার জীবনের সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা।

প্রশ্ন : অদৃশ্য হাত চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন?

মোশতাক : পেরেছিলাম। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্যালের হেড ছিলেন আব্দুল হাই স্যার। এনএসসির তখনকার সচিব সম্ভবত তাঁর বন্ধু ছিলেন। ওনার আরেক বন্ধুর ছেলে ছিলেন সিরিয়ালের ১২ নম্বরে। ৪০০ মিটার দৌড়াত ছেলেটা। নাম মনে করতে পারছি না। আমার নামটি কেটে ওর নাম বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।  

প্রশ্ন : পরের বছর ঢাকা সাফ গেমসে (১৯৮৫) পদক জিততে পারেননি বলে কোনো দুঃখ নেই?

মোশতাক : অবশ্যই আছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের কোচ স্কোয়াড্রন লিডার মোশাররফ ভাই ভুল তথ্য না দিলে আমি পদক জিততামই। জানেন তো বাংলাদেশে আজও দূর পাল্লার দৌড় কেউ রানিং শু পরে দৌড়ায় না। পায়ে টেপিং করে সবাই দৌড়ায়। আমরাও সেভাবেই দৌড়ানোর প্রস্তুতি নিয়ে নামি। কিন্তু দুই দিন আগে মোশাররফ ভাই জানান যে আমাকে নাকি রানিং শু পরে দৌড়াতে হবে। এটাই নাকি নিয়ম। কিন্তু আমার তো রানিং শু নেই। বাংলাদেশের প্রথম অলিম্পিয়ান সাইদুর রহমান ডন আর আমার পায়ের সাইজ তখন এক। ওর রানিং শু নিয়ে দুই দিন অনুশীলন করার পর আসল সময়ে গিয়ে দেখি কিসের কী! ভারতীয় অ্যাথলেট খালি পায়ে নেমেছে! ওদিকে রানিং শু পরে ১৫ চক্কর দেওয়ার পর আমার পা দুটো এমন ভারী হয়ে গেল যে আর দৌড়ানোর মতো অবস্থা ছিল না। তবু দৌড়ে চতুর্থ হলাম। মোশাররফ ভাই ওই ভুল না করলে আমি অবশ্যই দেশকে একটি পদক এনে দিতাম। এরপর তো সাফ গেমসে দূর পাল্লার অ্যাথলেটদের আর নেওয়াই হতো না। তাই আর দেশকে পদক এনে দেওয়ার সুযোগও হয়নি।

প্রশ্ন : কিন্তু এর পরও তো ১০ হাজার মিটারে আপনার জয়যাত্রা অব্যাহত ছিল।

মোশতাক : হ্যাঁ। ইনজুরি ও নানা কারণে ১৯৮৭ সালে কেবল জিততে পারিনি। না হলে ১৯৮৪-১৯৯১ পর্যন্ত আটবারের মধ্যে সাতবারই আমি চ্যাম্পিয়ন। পরে ফর্ম পড়তে থাকে। ১৯৯৬ সালে ফেডারেশনের সদস্য হওয়ার পর খেলাই ছেড়ে দিই।

প্রশ্ন : ফেডারেশনের সদস্য হওয়ার পর আপনার একটি বদনামও হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে আপনাকে ‘পলাতক অ্যাথলেট’ বলা হয়েছে।

মোশতাক : প্রসঙ্গ যখন উঠলই, আপনার মাধ্যমে এর একটি ব্যাখ্যা দিতে চাই। ২০০১ সালে কানাডার এডমুন্টনে ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিকসে যাওয়ার আমন্ত্রণপত্র আসে ফেডারেশনে। বলা হয় তিনজনের যাওয়া-আসার বিমান টিকিটের খরচ দেবে আইএএফ। ঠিক হয় প্রয়াত মাহবুব অ্যাথলেট হিসেবে যাবে। আর পর্যবেক্ষক হিসেবে আমি এবং ইকবাল ভাই। ভিসাও পেলাম আমরা। কিন্তু এরপর টিকিট আর আসে না। তখন ফেডারেশন সভাপতি কামাল মজুমদার সাহেব বললেন, ‘টিকিট আসেনি, টিমও যাবে না। ফেডারেশনের এত টাকা নেই যে তিনজনের জন্য ১০ লাখ টাকা খরচ করব। ’ পরে আইএএফ থেকে বলা হলো গিয়ে টিকিট দেখালে টাকা দিয়ে দেবে। তবে কামাল সাহেব সেই ঝুঁকিও নেবেন না। কিছুদিন পর আমিই ইকবাল ভাইকে প্রস্তাব করলাম, ‘ভিসা যেহেতু আছে, চলেন না ঘুরে আসি। ’ তখনো ওয়ান-ইলেভেন হয়নি পৃথিবীতে। ওই সময় কানাডায় থাকতেই শুনলাম সিনিয়র বুশ অভিবাসী আইন কিছুটা শিথিল করছেন। ওই সুযোগে আমি কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিয়ে ওখানে চলে যাই। বৈধভাবে সেখানকার ওয়ার্ক পারমিটও পাই। স্থায়ী কাগজপত্রের জন্য অপেক্ষা করতে করতে জীবনের ১০টি বছর নিউ ইয়র্কে পেরিয়ে যায়। ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিকস তো যুক্তরাষ্ট্রে হয়নি। তাহলে কেন আমাকে ‘পলাতক অ্যাথলেট’ বলা হবে?

প্রশ্ন : লম্বা সময় পরিবারও আপনাকে মিস করেছে?

মোশতাক : তা তো অবশ্যই। মেয়েকে রেখে গিয়েছিলাম ক্লাস ওয়ানে। ও ম্যাট্রিক দেওয়ার আগে বলল, ‘কাগজ লাগবে না, ফিরে আসো। ’ এই ফিরে এলাম। আমার আরেকটি মেয়েও আছে। বড় মেয়ে ইডেন কলেজে গণিতের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। ফেরার পর একটি ছেলে হয়েছে। ওর বয়স এখন আড়াই বছর। সুখী সংসারই আমার। বিয়েটা পালিয়ে করলেও দুই পরিবারই পরে আমাদের সাদরে গ্রহণ করেছে। পেশা বলতে পুরনো জিনিসপত্র কেনা-বেচার ব্যবসা করি। এই তো। আর সাবেক অ্যাথলেটদের মাস্টার্স টুর্নামেন্টে নিজ খরচে গিয়ে খেলে আসি। কিছুদিন আগে কলকাতায় গিয়ে কিছু পুরস্কারও জিতেছি।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। ক্যারিয়ার নিয়ে কোনো অতৃপ্তি?

মোশতাক : অতৃপ্তি নেই তবে দুঃখ আছে। একটাই দুঃখ। ১৯৮৪-র সাফ গেমসে যেতে না পারার। এ ছাড়া আমি তৃপ্ত। কারণ আমার উৎসাহ ছিল যে নিজেকে টপকাতে হবে। ভালো টাইমিং করতে হবে। আর কেউ নয়, আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আমার স্টপওয়াচ। স্টপওয়াচকে হারাতে হবে। এটা কয়জন করে আজকাল?


মন্তব্য