kalerkantho


গলদ আছে শুরুতেই

বাতাস থেকে অক্সিজেন নেওয়ার ক্ষমতা, খাদ্যাভ্যাস আর শরীরে থাকা জিনের প্রভাব নির্ণয় করে উন্নত বিশ্বে ছয় বছর বা এরও আগে থেকে প্রতিভাবানদের খুঁজে শুরু হয় বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে খেলোয়াড় গড়ার কাজ। আমাদের দেশে খেলোয়াড় হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৫-১৬ বছর বয়স থেকে! সাফল্য আসবে কিভাবে? বিজ্ঞান মেনে অ্যাথলেট বা খেলোয়াড় তৈরির গুরুত্ব, পদ্ধতি, সম্ভাবনা নিয়েই এই আয়োজন। লিখেছেন রাহেনুর ইসলাম

১৭ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



গলদ আছে শুরুতেই

কে বলে সময় পেছনে ছোটে না? বাংলাদেশের অ্যাথলেটিকসই তো প্রতিদিন পেছাচ্ছে একটু একটু করে। এবারের জাতীয় অ্যাথলেটিকসেই বাঁশি বাজিয়ে কিংবা দুখণ্ড কাঠের শব্দে শুরু হয়েছে ইভেন্টগুলো! কারণ স্টার্টার পিস্তল নষ্ট।

নেই ইলেকট্রনিক টাইমিংয়ের ব্যবস্থা। এটা নেই, সেটা নেই, তাই উন্নতিও নেই। ৩৫ বছরের জাস্টিন গ্যাটলিন এবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ১০০ মিটার স্প্রিন্ট জিতেছেন ৯.৯২ সেকেন্ডে। একই আসরে প্রাথমিক বাছাই পর্ব থেকে বাংলাদেশের মেজবাহ আহমেদ ছিটকে গেছেন ১১.০৮ সেকেন্ড সময় নিয়ে। বড় মঞ্চে যখন সবাই চায় নিজেকে মেলে ধরতে, সেখানেই ব্যর্থ মেজবাহ। অথচ তিনি টানা ছয়বারের জাতীয় চ্যাম্পিয়ন।

একই চিত্র ক্রিকেট ছাড়া পুরো ক্রীড়াঙ্গনে, যে কারণে অলিম্পিক বা বিশ্ব অ্যাথলেটিকস থেকে শূন্য হাতে ফেরাই নিয়তি আমাদের। দেশের ১৬ কোটি মানুষ থেকে বের হচ্ছে না দক্ষ অ্যাথলেট। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর এই ছবিটা বেদনার।

সাফল্য পেতে এখন দরকার একেবারে শুরু থেকে শুরু করা। অবশ্যই সেটা বিজ্ঞান মেনে। ১৯৯৯ সাফে ৪ গুণিতক ১০০ মিটার রিলেতে ব্রোঞ্জজয়ী সাবেক অ্যাথলেট ও বিকেএসপির অ্যাথলেটিকস কোচ আবদুল্লাহ হেল কাফি জানালেন, ‘আমাদের সমস্যাটা জেনেটিক্যাল। বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে এর সমাধান করতে হবে। ফেডারেশনের উচিত জিন বিশেষজ্ঞ, ক্রীড়াবিজ্ঞানী আর চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়া। কেননা আমাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজ পরিচালিত হয় মস্তিষ্কে থাকা এক বিশেষ ধরনের নিউরনের নিয়ন্ত্রণে। জিন বিশেষজ্ঞরা এর নাম দিয়েছেন মোটর নিউরন। ’

মোটর নিউরন কাজ করে কিভাবে? চিকিৎসাশাস্ত্র ঘেঁটে জানা যায়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মোটর নিউরনগুলোর দুটি জিনিস কমানো-বাড়ানো যায়। একটি ‘অ্যাবিলিটি’ (সক্ষমতা) আরেকটি ‘কোয়ালিটি’ (গুণ)। মোটর নিউরন অ্যাবিলিটির পাঁচটি অংশ— সহনশীলতা, শক্তি, চলনশীলতা, ক্ষমতা ও গতি। আর মোটর নিউরন কোয়ালিটির দুটি অংশ দক্ষতা ও কৌশল। খেলোয়াড় খুঁজতে হবে এসব মেনে ও জেনে। এগুলো কখন গড়ে ওঠে আর কিভাবেই বা কাজ করে? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোমেডিসিন বিভাগের সাবেক প্রধান এ কে এম আনোয়ার উল্লাহ জানালেন, ‘আমাদের শরীরে সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করে জিন। সেটা মস্তিষ্কের মোটর নিউরন হতে পারে বা অন্য নিউরন। তিন বছর বয়স থেকে বাড়তে শুরু করে  ক্ষমতা। ছয় থেকে আট বছরের মধ্যে বাড়ে গতি। সহনশীলতা ছাড়া ১১ বছরের মধ্যে মোটর নিউরন অ্যাবিলিটির চারটি অংশ প্রস্তুত হয়ে যায়। ১৩ বছরের মধ্যে হয়ে যায় মোটর নিউরন কোয়ালিটির অংশ দক্ষতা ও কৌশল বাড়ার কাজ। সহনশীলতার ধাপ এর পরে। শরীরের এই বিজ্ঞান মেনে নিয়ে খেলোয়াড় গড়ে তুলতে পারলে সাফল্য না আসার কারণ নেই। ’

ঢাকা শিশু হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ বিশ্বনাথ বাপন আরো একটু ভেঙে বললেন, ‘কে কখন কোন কাজ করবে, সেই দায়িত্ব জিনগুলোর মধ্যে গাণিতিক নিয়মে ভাগ করে দেওয়া থাকে। মস্তিষ্কের মোটর নিউরনের অ্যাবিলিটি ও কোয়ালিটির ধাপগুলোয় সমস্যা হলে সেই জিন-সজ্জায় ঝাঁকুনি লাগে। এ জন্য পরে কঠোর পরিশ্রম আর অনুশীলন করলেও জিনগুলো বিব্রত থাকে, যা অ্যাথলেটদের আশানুরূপ মানে পৌঁছতে দেয় না। অনুশীলনের মাধ্যমে শরীরে কয়েকটি নির্দিষ্ট হরমোনের ক্ষরণের পরিমাণ বাড়িয়ে বা কমিয়ে খেলোয়াড়দের শক্তির তারতম্য ঘটানো যায়। এ জন্য সবচেয়ে ভালো হয় একেবারে কম বয়স থেকে শুরুটা করলে। ’

সেই বয়সটা কত? উন্নত দেশগুলোতে পাঁচ থেকে ছয় বছরের মধ্যে খুঁজে নেওয়া হয় ক্রীড়া প্রতিভা, এরপর ঘষে-মেজে ১৬-১৮ বছরের মধ্যে প্রস্তুত করা হয় তাদের। অথচ বাংলাদেশে শুরুটাই হয় ১৬ বছর বয়সে! তাও প্রতিভা বাছাই না করে। এ জন্য হচ্ছে না ‘বেসিক’ অনুশীলন, ব্যবধান কমাটাও কঠিন থেকে অসম্ভব হচ্ছে তাতে। কারণ আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগীদের চেয়ে শারীরিক গঠনে অনেক পিছিয়ে আমাদের খেলোয়াড়রা।

উদাহরণ হিসেবে স্টেফি গ্রাফ ও বরিস বেকারের কথা বলা যায়। স্টেফির বয়স যখন তিন বছর তখন তাঁর পারিবারিক ডাক্তার মা-বাবাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন মেয়েকে টেনিসে দিতে। কারণ স্টেফির কবজির গঠন খুব ভালো ছিল। স্টেফির পরিবার ডাক্তারের কথা না শুনলে আমরা হারাতাম ২২ গ্র্যান্ড স্লাম জেতা এক টেনিস কিংবদন্তিকে। টেনিসের আরেক কিংবদন্তি বরিস বেকার শৈশবে ছিলেন ফুটবল অন্তপ্রাণ। ডাক্তাররা তাঁর শারীরিক গঠন দেখে পরামর্শ দেন টেনিসে নাম লেখানোর। ডাক্তারদের কথা শুনে ঘাম ঝরানো অনুশীলনে ক্যারিয়ারের ছয় গ্র্যান্ড স্লামের পাঁচটি ১৭ বছর বয়সেই জেতেন এই জার্মান কিংবদন্তি।

বাংলাদেশে এ ধরনের গবেষণা বা ডাক্তারিভাবে খেলোয়াড় বেছে নেওয়ার নজির নেই। কারণ অবকাঠামোই নেই। তাই আফসোস ঝরল অ্যাথলেটিকস কোচ ও অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক কিতাব আলীর কণ্ঠে, ‘আমাদের শরীরে আছে হোয়াইট মাসল ফাইবার, রেড মাসল ফাইবার ও ইন্টারমিডিয়েট মাসল ফাইবার। শরীরে হোয়াইট মাসল ফাইবার বেশি থাকলে দ্রুততা বাড়ে, তাই হওয়া যায় স্প্রিন্টার বা ক্রিকেটের ফাস্ট বোলার। যাদের শরীরে রেড মাসল ফাইবার বেশি তাদের দমও বেশি। ওরা দূরপাল্লার দৌড়বিদ কিংবা ফুটবলে ৯০ মিনিটই মাঠ চষে বেড়ানো মিডফিল্ডার হতে পারে। আমাদের কোন খেলোয়াড়ের শরীরে কোন ফাইবার বেশি বা কম, কেউ জানে না। কারণ গবেষণা নেই। ভালো খেলোয়াড়ের জন্য গবেষণাগার আর ডাক্তারদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। আমাদের যেহেতু প্রতিভা খোঁজার তেমন কার্যক্রম নেই, তাই গুরুত্ব দিতে হবে স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়ায়। সেখান থেকেই উঠে আসে আসল প্রতিভা। আর সবাইকে বুঝতে হবে অ্যাথলেটিকস হচ্ছে মাদার অব অল স্পোর্টস। ভালো অ্যাথলেট না হলে কোনো খেলাতেই ভালো করার সম্ভাবনা নেই?’ মানে গলদ আছে শুরুতেই। তাই শুরুটা করতে হবে একেবারে শুরু থেকে।


মন্তব্য