kalerkantho


কাদায় মাখামাখি ফুটবল

১৬ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



কাদায় মাখামাখি ফুটবল

ক্রীড়া প্রতিবেদক : আবাহনী-মোহামেডানের ম্যাচ দেখতে এসেছিলেন রিফাত। ইউরোপিয়ান লিগগুলোর সুবাদে এই কলেজপড়ুয়ার ফুটবল আকর্ষণ। আবাহনীর সমর্থনে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে হাজির হলেও খেলা তাঁর মোটেও মনে ধরেনি, ‘এই ম্যাচে আলাদা কিছু আশা করেছিলাম। গতবারও আবাহনীর কয়েকটা ম্যাচ দেখেছিলাম, লি টাকের খেলা তৈরি করা এবং বক্সের ওপরে কয়েকটা পাস খেলে ডিফেন্স ভাঙার চেষ্টা দেখে ভালো লেগেছিল। কিন্তু সেসব কিছুই দেখিনি এ ম্যাচে। ’ আবাহনী-মোহামেডানের ঝাঁজালো দ্বৈরথের দিন কবেই ফুরিয়ে গেছে। আগের মতো দর্শক-সমর্থকের উন্মাদনা নেই, খেলার মানও নেমে গেছে প্রত্যাশার চেয়ে নিচে। তাই ওই ম্যাচে শেষ মুহূর্তের গোলে আবাহনী জিতলেও খেলা দেখে মন ভরেনি আবাহনী সমর্থক রিফাতের।

তাহলে জয়-পরাজয়ের মতো মাঠে ৯০ মিনিটের পারফরম্যান্সটাও দেখে এখনকার দর্শকরা। সংগীতের সমঝদার শ্রোতার মতো। গানের কঠিন জায়গাটি সুর-তালের মেলবন্ধনে উত্তীর্ণ হতে দেখে স্রোতা যেমন খুশিতে ‘বাহ-বাহ’ করে ওঠে।

ফুটবলেও চমৎকার মুভ কিংবা পায়ের কারুকাজের তারিফ করে স্টেডিয়াম হাততালি দিয়ে ওঠে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে গিয়ে সেই মন ভরানো জিনিস বারবার চাইলে আপনি পাবেন না। একদম যে হয় না, তা নয়। হয়, তবে খুব ক্বচিৎ। যেটা সচরাচর হয়—মাঝমাঠ পর্যন্ত অনায়াসে বল নিয়ে উঠে কয়েকটা পাস খেলে আবার প্রতিপক্ষের পায়ে জমা করে দেওয়া। মাঝমাঠ পর্যন্ত দেখলে মনে হবে, তারা চমৎকার খেলে। ভালো পাসিং করে। কিন্তু অ্যাটাকিং থার্ডে প্রতিপক্ষ যখন চ্যালেঞ্জ করে, তখন সব চমৎকারিত্ব উধাও। ওখানে পাস খেলা, জায়গা করা, ‘ওয়ান টু ওয়ানে’ এগোনো—এসব আর ঠিকঠাক হয় না বাংলাদেশ প্রিমিয়ার ফুটবল লিগে।

তবে লিগের শীর্ষ দল চট্টগ্রাম আবাহনীর কোচ সাইফুল বারীর চোখে ফুটবল মানের খুব হেরফের হয়নি, ‘একটা বিদেশি কমে যাওয়ায় মান পড়ে যাবে ভেবেছিলাম। এখন মনে হয়, মানে সে রকম পড়েনি। মাঠে কারো নিরঙ্কুশ প্রাধান্য নেই বলে মাঠে খুব লড়াই হচ্ছে। এ জন্য মানের হেরফের মনে হতে পারে। তবে এটা ঠিক, মানোত্তীর্ণ বিদেশি নেই এবার। ’ তিন বিদেশি থেকে এবার দুই বিদেশিতে নেমেছে লিগ। তাতে বিদেশি ফুটবলারের মান বাড়ার কথা ছিল। ম্যাচ উইনার যোগ হওয়ার কথা ছিল। হয়েছে উল্টো—গতবারের চেয়েও নিচে নেমেছে মান। লি টাক, সানডে কিংবা ওয়েডসনের মতো বিদেশি তো নেই এই লিগে। এই মানের পাঁচ-ছয়জন বিদেশি থাকলে লিগের সামগ্রিক মানের সঙ্গে আকর্ষণও বাড়ে। ক্লাবগুলো কোটি কোটি টাকা খরচ করলেও মানসম্পন্ন বিদেশির বেলায় খুব রক্ষণশীল। তবে বিদেশি কমায় একজন করে দেশি ফুটবলার বেশি খেলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সাইফুল বারী মনে করেন, ‘এটা ইতিবাচক হয়েছে আমাদের ফুটবলের জন্য। দেশি খেলোয়াড়রা ফরোয়ার্ড লাইনে ভালো খেলার চেষ্টা করছে। গোলও করছে। তবে এখনই কাউকে আলাদা করে চিহ্নিত করার সময় আসেনি। ’ লিগের চতুর্থ রাউন্ড চলছে বলেই কারো নাম কোচ আলাদা করে বলতে না, চাইলেও চার ম্যাচে ৪ গোল করে এরই মধ্যে চমকে দিয়েছেন তৌহিদুল আলম সবুজ। অবিশ্বাস্য হলো, চট্টগ্রাম আবাহনীর এই ফরোয়ার্ড এখনো গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে!

৪ ম্যাচ জিতে পয়েন্ট তালিকায়ও শীর্ষে চট্টগ্রাম আবাহনী। একটি হার ও একটি ড্রয়ে অনেকখানি পেছনে পড়ে গেছে চ্যাম্পিয়ন ঢাকা আবাহনী। তারকাবর্জিত দল শেখ জামাল ধানমণ্ডি তরুণদের নিয়ে দারুণ খেলে পয়েন্ট তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে। নবাগত সাইফ স্পোর্টিংয়ের খেলায় গতি আছে। প্রতিপক্ষকে দাপট দেখানোর সামর্থ্যও আছে; কিন্তু গোলের সামর্থ্য একেবারে কম। শিরোপার লড়াইটা এই কটি দলের মধ্যে থাকবে ধরা হচ্ছে। তবে হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দেওয়ার জন্য মাঝারি মানের দলগুলো যথেষ্ট। আগের তুলনায় বড়-ছোট দলের ব্যবধানও ঘুচে গেছে অনেকখানি। তারকার চেয়ে বরং তারুণ্যে নির্ভরতা বেড়েছে এই লিগে। কিন্তু তারুণ্যে ঝলমল শেখ জামাল ধানমণ্ডির ম্যানেজার আনোয়ারুল করিম হেলাল আফসোস করেন মাঠের অবস্থা দেখে, ‘কিন্তু এই মাঠে খেলে কি কিছু প্রমাণ করা যায় ! একটা ধানক্ষেতে খেলে যাচ্ছি, বাফুফের কোনো হেলদোল নেই। এমন মাঠে খেলোয়াড়দের মান যাচাই হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নইলে আবাহনী কী ফরাশগঞ্জের কাছে হারার মতো দল! এই মাঠে যে কেউ পয়েন্ট হারাতে পারে, যেকোনো খেলোয়াড় ইনজুরিতে পড়তে পারে। ’

সেই প্রথম রাউন্ডের পর শুরু হয়েছে বৃষ্টি। আর বৃষ্টি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাফুফের খেলার তাগিদও বেড়েছে। থিকথিকে কাদায় খেলতে বাধ্য করে ফেডারেশন যেন বুঝিয়ে দিতে চাইছে দেশের ফুটবল ধানক্ষেতের পর্যায়ে নেমে এসেছে! তাই রহমতগঞ্জের কোচ কামাল বাবু বলছেন, ‘মাঠেরই তো কোনো মান নেই। এখানে খেলার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই। কাদা মাঠে বল নাড়ানো যায় না, আর তাই দেখে জাতীয় দলের কোচ পারফরম্যান্স বিচার করছেন খেলোয়াড়দের। ’ অ্যান্ড্রু ওর্ড কোথায় এসে পড়েছেন! প্রতিদিন ‘কাদা-বল’-এর লড়াই দেখে খেলোয়াড় বাছাই করছেন। খেলোয়াড় কজন পেয়েছেন কে জানে, তবে কাদায় জমেছে লিগের লড়াই।


মন্তব্য