kalerkantho


অমরত্বের আরেক চূড়ায় ফেদেরার

রাহেনুর ইসলাম   

১৭ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০



অমরত্বের আরেক চূড়ায় ফেদেরার

অমরত্ব না অঘটন? সুন্দর না নিষ্ঠুর? উইম্বলডন ছিল প্রথম দুটির অপেক্ষায়। সেটাই হলো।

রূপকথার ১৯ নম্বর গ্র্যান্ড স্লামের মাঝে থাকা মারিন সিলিচকে ফাইনালে বিধ্বস্তই করলেন রজার ফেদেরার। ৬-৩, ৬-১, ৬-৪ গেমে জিতে ইতিহাসের পাতাগুলোও করলেন ওলটপালট। উন্মুক্ত যুগে পিট সাম্প্রাস আর এর আগে উইলিয়াম রেনশর ঝুলিতে ছিল সাতটি করে উইম্বলডন। তাঁদের ছাড়িয়ে অষ্টম শিরোপা এখন ফেদেরারের। সবচেয়ে বেশি বয়সে উইম্বলডন জেতার রেকর্ডটাও তাঁর। ১৯৭৫ সালে আর্থার অ্যাশ জিতেছিলেন প্রায় ৩২ বছর বয়সে আর ফেদেরার ৩৫ বছর ১১ মাস ৮ দিনে। অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে ১৮তম গ্র্যান্ড স্লাম জিতে এমনিতেই ধরাছোঁয়ার বাইরে তিনি। গতকালের রূপকথার ১৯তম গ্র্যান্ড স্লাম জিতে অমরত্বের আরেক চূড়া জয় করলেন ফেদেরার। সেটিও কী দাপটের সঙ্গে! এবারের উইম্বলডনে সাত ম্যাচ জিতেছেন মাত্র ১১ ঘণ্টা ৩৭ মিনিটে, আগের ১৮ গ্র্যান্ড স্লামের কোনোটি আসেনি এত কম সময়ে।

শুধু তা-ই নয়, ফেদেরার এবারের উইম্বলডন জিতলেন একটিও সেট না হেরে। এই টুর্নামেন্টে কোনো সেট না হেরে শিরোপা জয়ের কীর্তি এত দিন ছিল কেবল বিয়ন বর্গের। সেন্টার কোর্টে দর্শকদের উজাড় করা ভালোবাসায় তাঁর পাশে এখন ফেদেরার। এটা যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না তাঁর, ‘কোনো সেট না হেরে উইম্বলডন জেতাটা অবিশ্বাস্য। ’ সেই অবিশ্বাস্য কীর্তি রয়্যাল বক্সে থেকে উপভোগ করলেন ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে, প্রিন্স উইলিয়াম, মোনাকোর প্রিন্স অ্যালবার্ট টু, লন্ডনের মেয়র সাদিক খান এবং নানা অঙ্গনের আরো বিখ্যাত সব সেলিব্রেটিরা। সঙ্গে যমজ দুই মেয়ে, যমজ দুই ছেলেকে নিয়ে ফেদেরারের পুরো পরিবারের সদস্যরা তো ছিলেনই।

ফাইনালের আগেই বলেছিলেন, যত বেশি সম্ভব ঘুমিয়ে সতেজ করতে চান শরীরটা। চূড়ান্ত ফিট ফেদেরারকে দেখে মনে হলো সেরাটা তুলে রেখেছিলেন ফাইনালের জন্যই। পেশিগুলোর বয়স যেন কমে গেছে ১০ বছর! প্রথম সেটে ২-২ সমতার পর প্রথম ব্রেকটা করেন ফেদেরার। এর পর থেকেই র‍্যাকেট থেকে যেন বের হচ্ছিল আগুনে গোলা। প্রথম সেটটা জিতে নেন ৬-৩ গেমে। কোর্টে একবার পড়ে যাওয়া সিলিচ দ্বিতীয় সেটের শুরুতে নিয়েছিলেন মেডিক্যাল ব্রেক। ব্যথা পেয়ে এ সময় কেঁদেও ফেলেন এই ক্রোয়াট। দ্বিতীয় সেটে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল চোটের জন্য নড়তে পারছেন না ঠিকঠাক। ফেদেরারের ভক্ত হলেও উপভোগ্য ম্যাচের জন্য দর্শকরা গলা ফাটাচ্ছিলেন সিলিচের জন্য। তাতেও অনুপ্রাণিত না হয়ে সেটটা হারলেন ৬-১ গেমে। অপ্রতিরোধ্য ফেদেরার সিলিচকে পাত্তা দেননি তৃতীয় সেটেও। ৫-৪ গেম আর ৪০-৩০ পয়েন্টে এগিয়ে থাকার সময় করলেন এইস, তাও দ্বিতীয় সার্ভে! এরপর দুহাত কয়েকবার ওপরে ঝাঁকিয়ে উদ্‌যাপন করলেন রেকর্ড অষ্টম উইম্বলডনের। তবে সান্ত্বনা জানতে ভোলেননি সিলিচকে, ‘এভাবে চোট পাওয়াটা নিষ্ঠুর। তার পরও লড়াই করে গেছে ও সত্যিকারের নায়কের মতো। ’

১১ সংখ্যাটা জড়িয়ে ছিল দুজনের সঙ্গে। ফেদেরার গতকাল খেলেছেন ১১তম উইম্বলডন ফাইনাল। আর সিলিচ ১১ বারের চেষ্টায় প্রথম স্বাদ পান উইম্বলডন ফাইনালে পৌঁছানোর। দুটিই রেকর্ড। একমাত্র ক্রোয়াট হিসেবে উইম্বলডন জয়ের কীর্তিটা ছিল গোরান ইভানোসেভিচের। একটা সময় সিলিচের কোচ থাকা সেই ইভানোসেভিচ উইম্বলডন জিতেছেন চারবার ফাইনাল খেলার পর! ১৯৯২, ১৯৯৪, ১৯৯৮ সালে হারার পর ২০০১ সালে মহাকাব্যিক ফাইনালে প্যাট রাফটারকে হারান ৬-৩, ৩-৬, ৬-৩, ২-৬, ৯-৭ গেমে। তাঁর সামনে আরো সুযোগ আছে ভেবে সান্ত্বনা পেতেই পারেন সিলিচ!

একসময়ের রাজত্ব হারিয়ে প্রাপ্তির খাতা শূন্য হয়ে পড়েছিল ফেদেরারের। এরপর চোটে পড়ে গত বছর ছয় মাস কোর্টের বাইরে কাটানোর সময় অনেকে শেষও দেখে ফেলেছিলেন। কিন্তু প্রত্যাবর্তনের পর এতটাই ধারালো যে হতবাক সবাই। এ বছর সাত টুর্নামেন্টে শিরোপা জয়; সাকুল্যে খেলা ৩১ ম্যাচের মধ্যে হার মাত্র দুটিতে। রাফায়েল নাদালের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে জিতেছিলেন ১৮তম গ্র্যান্ড স্লাম। এবারের উইম্বলডন জিতলেন কোনো সেট না হেরে।

এবারের উইম্বলডনে প্রধান অস্ত্র বিখ্যাত ফোরহ্যান্ড ভালোভাবে ফিরে এসেছে ফেদেরারের। অসামান্য ড্রপ শট, ভলির সঙ্গে বিষাক্ত এইস। ব্যাকহ্যান্ড স্লাইসও আগের চেয়ে অনেক ধারালো। ইভান লুবিসিচ কোচ হওয়ার পর ব্যাকহ্যান্ড আর কেবল রক্ষণের অস্ত্র নয় ফেদেরারের। গতকাল সেটা দেখালেন আরো ভালোভাবে। এগিয়ে ছিলেন দৃঢ় মানসিকতার জন্যও। কোর্টে অবিশ্বাস্য ছন্দে থাকলেও ফেদেরার জানেন টেনিসে তাঁর সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। বড় টুর্নামেন্টে ভালো করতে তাঁর প্রেরণা এটাই। এর পরও জানালেন ভবিষ্যতে এই সেন্টার কোর্টে ফেরার আকুতি, ‘অবশ্যই আগামী বছর এখানে ফিরতে চাই। এমন মর্যাদার একটা টুর্নামেন্টে আটবার শিরোপা জেতাটা অবিশ্বাস্য। আমার পরিবারের সবাই এসেছিল ফাইনাল উপভোগ করতে। সবাইকে ধন্যবাদ। ’


মন্তব্য