kalerkantho


তোমাদের দেশে আমাদের ফাইনাল!

১৯ জুন, ২০১৭ ০০:০০



তোমাদের দেশে আমাদের ফাইনাল!

লন্ডনে এখন এমন গরম পড়েছে যে এই প্রথম শীতের কাপড় ছাড়া ঘোরাঘুরি করা যাচ্ছে। ২৮-৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রার সঙ্গে রোদ মিলিয়ে ঘামটামও বেরোচ্ছে। মানে একেবারে উপমহাদেশের আবহাওয়া। আর ওভালে এসে মনে হলো উপমহাদেশের আবহাওয়া কী, এটা তো উপমহাদেশই হয়ে গেছে। হয় ভারতীয় নয় পাকিস্তানি, হয় উর্দু নয় হিন্দি, হয় নীল না হয় সবুজ। মানুষ-আবহাওয়া-উত্তাপটা মিলিয়ে এমন অবস্থা যে একেকবার মনে হচ্ছিল লাহোর না মুম্বাইতে বসে আছি। দুই ভেন্যুতে ক্রিকেট কভারের অভিজ্ঞতা আছে এবং কালকের ওভালের সঙ্গে তাদের কোনো গুণগত পার্থক্য দেখা যায়নি।

ও হ্যাঁ, একটা পার্থক্য আছে। ওখানে আর যা-ই হোক সাদা রঙের কালোবাজারি পাওয়া যায় না। এখানে ওদের ভিড়। বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচেই দেখেছিলাম, ম্যাচের আগে যেখানে টিকিটের কোনো খোঁজই ছিল না, সেখানে ম্যাচের দিন মধ্যবয়সী শ্বেতাঙ্গরা চেঁচাচ্ছে, টিকিট লাগবে টিকিট! আসলে এরা নিজেরা ফাইনাল দেখার জন্য টিকিট কিনে রেখেছিল, এখন দাম চড়া হয়ে যাওয়াতে খেলা দেখার বদলে টু পাইস কামিয়ে নেওয়াই মনে হয়েছে লাভজনক।

আর তাতেও উপমহাদেশের জয় আরেকবার। ওরা ছুটে বেড়াচ্ছে দুই পয়সা কামানোর জন্য আর উপমহাদেশের মানুষজন, যারা একসময়ের শোষিত উপনিবেশ তারা টিকিট কিনছে পকেট থেকে বড় বড় নোট বের করে।

ঠিক এ রকম পকেট থেকে বড় বড় নোট বের হওয়ার মতো উইকেট থেকেও বিরাট রান আসবে জানা ছিল। কিন্তু পাকিস্তান এই রান করতে পারবে জানা ছিল না। শুরুর আগে কেউ যদি প্রশ্ন করত পাকিস্তান আগে ব্যাট করলে কত রান করবে তাহলে যত উত্তরই আসুক, কোনো উত্তরই বোধ হয় তিন শ পার হতো না। টুর্নামেন্টে আগে যারা কখনো তিন শ করেনি, তারাই কিনা ফাইনালে ৩৩৮, তাও সেটা আরো ২০-২৫ রান বেশি হতো যদি শেষদিকে ভারতীয়রা বোলিংয়ে ফিরে না আসত। ইমাদ ওয়াসিম আর মোহাম্মদ হাফিজ ইনিংসটা ঠিক যেখানে নিয়ে থামানো উচিত ছিল সেখানে নিয়ে যেতে পারেননি। উপমহাদেশের তিন দল ফাইনালে ওঠে এবং উপমহাদেশীয় ফাইনাল হয়ে এটা এরই মধ্যে আমাদের টুর্নামেন্ট। আর ফাইনালের মেজাজটাও ঠিক উপমহাদেশের ক্রিকেটের মতো। বড় রান, তবু সেটাকে নিশ্চিত মনে হয় না।

ভারত সেই ব্যাটিং লড়াইয়ে রাজত্ব করবে। করার কথা। টুর্নামেন্টে যে ম্যাচ হেরেছে সেখানেও তারা তিন শ ছাড়ানো স্কোর করেছে এবং তাদের প্রথম তিন ব্যাটসম্যান বাকি ব্যাটসম্যানদের বলা যায় খুব বেশি সুযোগই দেননি। কিন্তু পাকিস্তান! যতটুকু এসেছে তার প্রায় পুরোটাই বোলারদের জোরে, সেই বোলারদের প্লেটে ব্যাটসম্যানরা তুলে দিলেন যথেষ্ট রান। নেতৃত্ব দিলেন ফখর জামান, যাঁকে সেই মাপের প্রতিভা পাকিস্তানিদেরও মনে হয়নি বলে অভিষেক হয়েছে ২৭ বছর বয়সে, এই টুর্নামেন্টে। কাল ছিল চতুর্থ ম্যাচ। মাত্র চতুর্থ ম্যাচই ফাইনাল, তাও শুরুতে একবার আউট হয়ে নো বলের কল্যাণে বেঁচেছেন, সেটা মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বিধ্বস্ত মনে হওয়ার কথা সিনিয়র সঙ্গী আজহার আলীকে নিজের ভুলে আউট করার অনুতাপেও। কিন্তু চাপ-অনুতাপটা ব্যাটের আঘাতে দূর থেকে দূরেই রাখলেন। আর আজহার যাওয়ার পর বের হলেন খোলস থেকে। এমন একটা ব্যাপার যেন পাপের প্রায়শ্চিত্ত অচিরেই করে ছাড়বেন। এভাবে মাথা গরমেও গোলমাল হওয়ার কথা। হলো না। ভাগ্য সাহসের পক্ষে থাকে জানি, কাল জানলাম সাহস যখন পরিকল্পনার অংশ হয় তখন সেটা কাজ করতে বাধ্য। ফখর জামান যখন আজহারের বিদায়ের পর মারতে শুরু করলেন তখন মনে হওয়া স্বাভাবিক ভুল শোধরানোর তরুণসুলভ অঙ্ক থেকেই এমন সিদ্ধাস্ত। কিন্তু পরে খেয়াল করলাম কেউ আউট হলে যিনি থেকে যাচ্ছেন তিনি মারতে শুরু করেছেন। আর নতুন আসা জন সময় নিচ্ছেন সেটল হতে। পর পর দুই উইকেট পড়া ব্যাটিংয়ের বড় অভিশাপগুলোর মধ্যে একটি, সেটা থেকে দূর থাকতেই বোধ হয় এই কৌশল। কে বলে, পাকিস্তানের ক্রিকেটে মস্তিষ্ক নেই। শুধুই শরীর আর সাহস। সেটা ওদের আছে, সঙ্গে এই সব চিন্তা আর পরিকল্পনা যোগ হয়ে গোপনে গোপনে তৈরি হয়ে গেছে টুর্নামেন্টে আধিপত্যের পথে।

ভারত-পাকিস্তান বহু অপেক্ষার ফাইনাল। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেললেও আইসিসির ওয়ানডে আসরে এই প্রথম। বহু অপেক্ষার পর সেই ফাইনালটা মনে হচ্ছিল সঠিক জায়গায় হচ্ছে না। ইংল্যান্ড আর সেভাবে ক্রিকেটের দেশ নয় বলে লন্ডনের জনমানসে সেই অর্থে কোনো উত্তেজনার ছাপ নেই। পত্রিকাগুলো সব সময় মেতে থাকে ফুটবল নিয়ে, ইদানীং রাগবি নিয়েও ওদের তুমুল উৎসাহ। আবহে ঠিক আওয়াজটা মিলছিল না। মিলল যখন সকালে মাঠে আসার পথে টিউব স্টেশনে পৌঁছলাম। ওভালমুখী নর্দান লাইনের ট্রেনটার একটা কামরা ভারতীয় সমর্থকে ভর্তি। ওভালের ঠিক আগের স্টেশন কেনিংটনে হঠাৎ স্রোতের মতো উঠে পড়ল অনেক পাকিস্তানি। ভারত-পাকিস্তান টিউব স্টেশনে মুখোমুখি, একটা ঝগড়া লেগে গেলে লেখার জন্য মারাত্মক ব্যাপার হয়, ‘লন্ডনের টিউবে ভারত-পাকিস্তান লড়াই’। কিসের কী! দুই পক্ষ দুই পক্ষকে এমন শুভ কামনা জানাতে শুরু করল যে ঝাঁজটাই নেই। ঠিক আগের দিন মাঠে ঢোকার মুখে দেখেছিলাম দুই দলের দুই আইকন সাপোর্টার আব্দুল জলিল আর সুধীর নায়েক পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছবি ওঠাচ্ছেন। চূড়ান্তরকম মিল-মহব্বত। মাঠেও পাশাপাশি দুই দলের সমর্থকরা বসে এবং সমানে নিজেদের দলকে উৎসাহ জুগিয়ে গেলেও বন্ধুত্বপূর্ণ হাওয়া। এমন হতে পারে যে, এরা সব ইংল্যান্ডে বড় হওয়ার সুবাদে ঠিক দেশের জন্য অতটা উগ্র নন। ভারত-পাকিস্তান বিভেদটা ওদের অন্তরে অত জোরালো নয়। সব মিলিয়ে বন্ধুত্বেরই একটা প্রদর্শনী যেন। ওদের দেশে বা দেশের মানুষের কাছে বা সীমান্তের যোদ্ধাদের কাছে এর আবেদন অন্য রকম জানি, কিন্তু লন্ডনে এবং ওভালে বন্ধুত্ব। দেখতে দেখতে মনে হলো এক অর্থে লড়াইটা আসলে এখানে অন্য রকম। ভারত-পাকিস্তান প্রতিপক্ষ না হয়ে একসঙ্গে মিলে লড়ছে অন্য একটা লড়াই। ইংলিশ বা ক্রিকেটের জন্মদাতাদের উপমহাদেশের ক্রিকেট শক্তি দেখানো এবং জানানো। ক্রিকেটের জন্মভূমিতে ঘোষণা দিয়ে যাওয়া ক্রিকেট এখন আমাদের। তোমরা জন্ম দিয়েছ, ধন্যবাদ। এখন লালন-পালন আমরাই করছি। আর ঠিকঠাক করছি বলেই ক্রিকেট আমাদের ভালোবাসা ফিরিয়েও দিচ্ছে।

আর তাই তোমাদের দেশে আমাদের ফাইনাল!


মন্তব্য