kalerkantho


চেনা মুস্তাফিজের ফেরা

২০ মে, ২০১৭ ০০:০০



চেনা মুস্তাফিজের ফেরা

উজ্জ্বল অভিষেক : অভিষেকেই উজ্জ্বল পারফরম্যান্স সানজামুল ইসলামের। ৫ ওভার বল করে ২২ রানে নিয়েছেন ২ উইকেট। দারুণ কার্যকরী ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমানও। ৪ উইকেট নিয়ে আইরিশদের ১৮১ রানে আটকে রাখার আসল রূপকার ছিলেন বাংলাদেশের এই পেসারই। ছবি : ক্রিকইনফো

ক্রীড়া প্রতিবেদক : আগমনটা ছিল সাড়ম্বরে; আষাঢ়ের মেঘের মতো গুরুগম্ভীর গর্জনে। হালফিলে বরং তিনি অনেকটাই অনাড়ম্বর; শরতের আকাশের মতো তাঁর পারফরম্যান্সেও যে মেঘ-রোদ্দুরের লুকোচুরি! মুস্তাফিজুর রহমান অবশেষে ফিরলেন চেনা চেহারায়।

প্রতিপক্ষকে নাকানি-চুবানি খাওয়ানো সেই বিস্ফোরক রূপে। এই বাঁহাতি পেসারের আগুনে ছারখার বলেই না বাংলাদেশের বিপক্ষে আয়ারল্যান্ডের স্কোর কাল দুই শও স্পর্শ করল না!

এমনিতে খুব খারাপ করছিলেন না মুস্তাফিজ। এই তো শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মাশরাফি বিন মর্তুজার বিদায়ী টি-টোয়েন্টিতেও ছিলেন দলের জয়ের অন্যতম রূপকার। মাত্র তিন ওভার বোলিং করে চার উইকেট নিয়ে। ত্রিদেশীয় সিরিজের আগের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে যা একটু বেগ দিয়েছেন তিনিই; ৯ ওভারে ৩৩ রানে দুই উইকেট শিকারে। তবু ব্যাটসম্যানদের বুকে কাঁপন ধরানো সেই ‘কাটার মাস্টার’কে যেন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। গতবার অভিষেকেই আইপিএলের সেরা উদীয়মান তারকার তাই এবার একটির বেশি ম্যাচে একাদশে সুযোগ হয় না। ডেল স্টেইনের মতো কিংবদন্তি পর্যন্ত তাঁকে নিয়ে হন উদ্বিগ্ন। কিন্তু ওই প্রোটিয়া ফাস্ট বোলারের টুইটের জবাবে যেভাবে আশ্বস্ত করেন মুস্তাফিজ, কাল তেমনই ভরসা দেন পারফরম্যান্সে।

৯-২-২৩-৪ বোলিং বিশ্লেষণই তা বলছে।

কাল তাঁর শুরু একেবারে শুরুতেই। নিজের সেটি প্রথম ওভার; ইনিংসের দ্বিতীয়। সেই ওভারের তৃতীয় বলেই পল স্টারলিংয়ের উইকেট। ব্যাটের কানা ছুঁয়ে যাওয়া বল শর্ট থার্ডম্যানে জমে যায় সাব্বির রহমানের হাতে। ওখানে ফিল্ডার রাখার জন্য অধিনায়ক মাশরাফিরও হাততালি প্রাপ্য। কিন্তু অমন শুরুর পরও মুস্তাফিজের প্রথম স্পেলটি দুই ওভারের বেশি করাননি। ফেরান আবার ইনিংসের ১৪ নম্বর ওভারে। এবারের স্পেল এক ওভারের। তখনো বোঝা যাচ্ছিল না, বিষ মাখানো স্পেলের জন্য তৈরি হচ্ছেন ‘দ্য ফিজ’।

২৭ ওভারে তিন উইকেটে ১১৫ রানের স্বস্তিদায়ক অবস্থানে যখন চলে যায় আয়ারল্যান্ড, অধিনায়কের তখন আরেক দফা মুস্তাফিজ-শরণ। ফল? ফিরে তৃতীয় বলে থিতু হয়ে যাওয়া নিয়াল ও’ব্রায়েনকে প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠানো। এবার থার্ডম্যানে  ক্যাচ মুঠোবন্দি তামিম ইকবালের। নতুন ব্যাটসম্যান গ্যারি উইলসনের নিলেন অগ্নিপরীক্ষা। আউট হতে হতে কয়েকবার বেঁচে যান তিনি। তবে সে সৌভাগ্য হয়নি কেভিন ও’ব্রায়েনের। ভাইয়ের মতো তিনিও মুস্তাফিজের শিকার। এ ক্ষেত্রে অবশ্য কাভার বাউন্ডারি থেকে দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্যাচ নেওয়া মোসাদ্দেকের প্রশংসাও প্রাপ্য।

ততক্ষণে আইরিশদের বড় স্কোরের আশা শেষ। কিন্তু শেষ হয় না মুস্তাফিজের কারিকুরি। তাঁর পরের শিকার উইলসন। লেগ সাইড দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া বলে কট বিহাইন্ড। না হয় আম্পায়ারের ওই সিদ্ধান্তটি প্রশ্নবিদ্ধ, তবে ফিজের ফিরে আসা নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন থাকে না। নিজেকে বরং দুর্ভাগা ভাবার অনেক কারণ রয়েছে তাঁর। ব্যাটসম্যানের ব্যাট শিস কেটে কত বল যে বেরিয়ে গেছে! নইলে ইনিংসে পাঁচ উইকেটও তো কাল হতে পারত মুস্তাফিজের।

ক্যারিয়ারের প্রথম দুই ওয়ানডেই ছিল তাঁর অমন অর্জন। পরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে এবং নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে আরো দুইবার। কিন্তু অবিশ্বাস্য সেই উত্থানের পর অনিবার্য পতনটা এরই মধ্যে ক্যারিয়ারে দেখা হয়ে গেছে মুস্তাফিজের। গত বছর কাঁধে অস্ত্রোপচারের কারণে মাঠের বাইরে কাটাতে হয় অনেকটা সময়। এরপর খেলায় ফিরেছেন বটে, কিন্তু স্বরূপে ফিরতে পারছিলেন না। নিজজিল্যান্ড সফরে ছিলেন বেশ বিবর্ণ। শ্রীলঙ্কায় তাঁর পারফরম্যান্সে রং ফেরার প্রতিশ্রুতি ছিল বটে; কিন্তু প্রজাপতির মতো রঙিন পারফরম্যান্স করতে পারছিলেন কই! কালকের মুস্তাফিজের বোলিং দেখার পর আবার ফিরেছে পুরনো আস্থা। পুরনো মুস্তাফিজ ফিরছেন যে!

তাঁর প্রত্যাবর্তনের দিনে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষেও তো জয়ের কক্ষপথে ছিল বাংলাদেশ। মুস্তাফিজের চার শিকারের সঙ্গে অধিনায়ক মাশরাফি এবং অভিষিক্ত সানজামুল ইসলাম নেন দুটি করে উইকেট। তাতেই ৪৬.৩ ওভারে ১৮১ রানে অলআউট স্বাগতিকরা। আইরিশ কন্ডিশনের চোখরাঙানিতে এটিকেও অনেক রান বলে ভাবতে পারেন অনেকে। ২০১০ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে ১-১ সমতার স্মৃতিও উঁকি মারতে পারে ইতিহাসের পাতা থেকে। কিন্তু সেই বাংলাদেশ তো আর এই বাংলাদেশ নয়।

এই বাংলাদেশ মুস্তাফিজের বাংলাদেশ। আর তিনি হাসলে দল তো হাসবেই!


মন্তব্য