kalerkantho


ফুটবল খেলে মাটির ঘর থেকে বিল্ডিংয়ে উঠেছি

১৯ মে, ২০১৭ ০০:০০



ফুটবল খেলে মাটির ঘর থেকে বিল্ডিংয়ে উঠেছি

ছবি : মীর ফরিদ

ঢাকা মাঠের স্টাইলিশ ফরোয়ার্ডদের কাতারে তিনি নিজেও রাখেন না নিজেকে। তবে সত্তরের দশকের ফুটবল উন্মাদনার দিনগুলোর স্মৃতিতে এখনো বড় জায়গা নিয়ে আছেন মোহাম্মদ মালা। বিপক্ষের গোলসীমানায় তিনি নির্দয় শিকারি, ব্যক্তিজীবনে আমুদে মালার অতীত-বর্তমানের জীবনমালা কালের কণ্ঠ’র পাঠকদের জন্য গেঁথেছেন নোমান মোহাম্মদ

 

প্রশ্ন : ঢাকার ফুটবলের বিখ্যাত স্ট্রাইকার জুটি এনায়েত-মালা। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম লিগ চ্যাম্পিয়ন বিজেআইসি দলে খেলেছেন একসঙ্গে। দুজনের বোঝাপড়া কেমন ছিল—এখান থেকেই সাক্ষাৎকার শুরু করতে চাই।

মোহাম্মদ মালা : দুজন না, আমি চারজনের কথা বলব। আমি, এনায়েত, গাজী ভাই ও সলিমুল্লাহ—ফরোয়ার্ড লাইনে এই চারজন। বোঝাপড়া অবশ্যই ভালো ছিল। ১৯৭২ সালের লিগ তো কয়েক ম্যাচ পর গণ্ডগোলের কারণে বন্ধ হয়ে যায়। প্রথম পূর্ণাঙ্গ লিগ হয় ১৯৭৩ সালে। সেবার আমরা চ্যাম্পিয়ন। এই বিজেআইসি স্বাধীনতার আগে ছিল ইপিআইডিসি; পরে আবার নাম পরিবর্তন করে হয় বিজেএমসি। যাই হোক, ১৯৭৩ সালের লিগে আমরা চার ফরোয়ার্ড মিলে অনেক গোল দিয়েছি। আর অনুশীলনে কোচ আমাদের প্রচুর খাটাতেন বলে ম্যাচে কাজটা সহজ হয়ে যায়।

প্রশ্ন : কোচ ছিলেন কে?

মালা : গফুর বেলুচ। উনি কিন্তু কয়েকটি ম্যাচ খেলেছেনও; মানে কোচ-কাম-খেলোয়াড় হিসেবে। ওস্তাদের আলাদা স্নেহ ছিল আমার ও এনায়েতের ওপর। ট্রেনিং করিয়ে সবাইকে ছুটি দিয়ে দিতেন, কিন্তু ছাড়তেন না আমাদের। আলাদা করে শ্যুটিং অনুশীলন করাতেন। এনায়েত আর আমার ভেতর থেকে সেরাটা বের করে আনার জন্য গফুর বেলুচ এমনও বলতেন, ‘দূর, কী করো? ওই গোলপোস্টের ভেতর দিয়ে দুটি হাতি দৌড়ে যেতে পারে, আর তোমরা এই ছোট্ট বলটাকে ওখানে ঢোকাতে পারো না!’ ওস্তাদের ওই কথাতে আমাদের আরো জিদ হতো। মনে হতো, গোল করতেই হবে।

প্রশ্ন : জিদ বোধহয় আপনার সঙ্গী এনায়েতেরই বেশি ছিল! মানে এমনিতেও নাকি ভীষণ রাগী ছিলেন?

মালা : এনায়েত সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণা আছে। ও কিন্তু খুব ভালো ছেলে। হ্যাঁ, ক্যারিয়ারের শেষ দিকে হয়তো রাগী হয়ে যায়। সেটাও কেন? দল হারলে ও সহ্য করতে পারত না। এটা তো খারাপ কিছু না। এমনিতে এনায়েত ভালো মানুষ, আমার সঙ্গে মাঠে-মাঠের বাইরে চমৎকার সম্পর্ক। বিজেআইসিতে তো বেশির ভাগ গোল ও আমাকে দিয়েই করিয়েছে।

প্রশ্ন : ক্যারিয়ারের সেরা সময় কি ওই ক্লাবেই?

মালা : বলতে পারেন। ১৯৭৩ সালে যেবার লিগ চ্যাম্পিয়ন হই, সেবার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা আমি। সর্বোচ্চ গোল সালাউদ্দিনের। আর এনায়েত-মালা জুটির কথা তো এখনো সবাই বলে। কত বছর আগের কথা, কিন্তু আপনি তা মনে করিয়ে দিলেন। তবে মোহামেডানেও কিন্তু আমি খেলি অনেক বছর। সুনামের সঙ্গে খেলি। গোল করি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে। পুরনো দিনের মোহামেডান সমর্থকরা ওসব নিশ্চয়ই ভুলে যায়নি।

প্রশ্ন : কিন্তু মোহামেডানে অনেক গোল করলেও একটু আড়ালেই কি থেকে যাননি? মানে বিজেআইসি থেকে যখন ওই ক্লাবে যান, তখন সেখানে স্ট্রাইকার হিসেবে রাজত্ব করছে হাফিজ-নওশের জুটি। ওনারা চলে যেতে না যেতেই এনায়েত এলেন; বাদল-মোসাব্বেররাও। এতসব স্ট্রাইকারের ভিড়ে...

মালা : আপনার কথা কিছুটা সত্যি। সব ম্যাচে একাদশে খেলার সুযোগ পাইনি। আর যেসব স্ট্রাইকারের নাম বললেন, ওনারা অনেক ভালো। এটা স্বীকার করতেই হবে। ওদের সবার পায়ে গোল ছিল। কিন্তু এখানে আরো কিছু ব্যাপার ছিল। যেমন মোহামেডানে শরীফকে খেলাতে হতো। কেন? ওর ভাই নওশের তখন তুখোড় ফর্মে। কোচ আশরাফ ভাই তাই হয়তো বসিয়ে দিতেন আমাকে। তবে এসব নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই। যখন সুযোগ পেয়েছি, মোহামেডানের জন্য খেলেছি জান উজাড় করে। বড় বড় মানুষের গ্রুপিং ছিল। কিন্তু আমাদের ঢাকার মানুষের গ্রুপিং নেই। খেলতাম নিজেদের মতো। কাউকে তোয়াক্কা করে, কাউকে তোষামোদ করে ফুটবল খেলিনি কখনো। যত দিন খেলেছি, নিজের যোগ্যতায় খেলেছি।

প্রশ্ন : আপনি তো দীর্ঘদিন কোচিংও করিয়েছেন। এখনকার প্রজন্ম বরং কোচ হিসেবেই আপনাকে বেশি চেনে। একটু জানতে চাই, কোচ মালার চোখে খেলোয়াড় মালা কেমন?

মালা : আমি মোটামুটি মানের ফুটবলার। শ্যুটিং-হেডিং দুটোই ভালো; ড্রিবলিং ততটা না। তবে আমার কাছে বল এলে সমর্থকরা আশা করত যে, মালা কিছু একটা করবে। আর করেছিও অনেক গোল। সব সময় বড় বড় দলে খেলার কারণে শিরোপাও জিতি অনেক। পাই সমর্থকদের ভালোবাসা। কিন্তু শুধু শুধু চাপা মেরে লাভ নেই যে আমিই সেরা। ফরোয়ার্ড হিসেবে সালাউদ্দিন, এনায়েত, মেজর হাফিজ, নওশেররা আমার চেয়ে এগিয়ে। ওদের পরের ধাপে আমাকে ধরতে পারেন।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ফুটবলারে জনপ্রিয় এক বিতর্ক—সালাউদ্দিন নাকি এনায়েত? আপনার চোখে কে এগিয়ে?

মালা : দুজনের স্টাইল আলাদা। সালাউদ্দিনের ছিল গতি। থ্রু বলে খুব দ্রুত জায়গায় পৌঁছে ভালো শটে গোল করত। একমাত্র বাঙালি হিসেবে হংকং লিগ খেলেছে বলে ওর প্রচার ছিল আলাদা। এ ছাড়া আবাহনীর মতো জনপ্রিয় দলে খেলেছে, শেখ কামালের বন্ধু, বড় বড় চুল—সব কিছু মিলিয়ে সালাউদ্দিনের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। এনায়েত আবার তেমন জনপ্রিয় না। সালাউদ্দিনের মতো স্টাইলিশও না। কিন্তু ওর ফুটবল-ব্রেন মারাত্মক। পুরো দলকে খেলাত একাই। আর শ্যুটিং ভয়ংকর। দূর থেকে কামানের গোলার মতো শট নিত। দুজনের পার্থক্যটা আমি এক কথায় বলে দিই—এনায়েত পুরো দলকে খেলাত আর সালাউদ্দিনকে বল দিলে ও গোল করতে পারত।

প্রশ্ন : তাহলে বাংলাদেশের সেরা কে?

মালা : এনায়েত-সালাউদ্দিনের কেউ না। আমি বলব গোলাম সারোয়ার টিপু ভাইয়ের কথা। ওনার খেলা তো আমি দেখেছি। কী ডজ দিতেন! কী স্কিল ছিল পায়ে! নিজে গোল করার চেয়ে উনি অন্যদের দিয়ে গোল করাতেন বেশি। সব মিলিয়ে আমার চোখে সর্বকালের সেরা টিপু ভাই।

প্রশ্ন : আর আপনি তো স্ট্রাইকার ছিলেন। ডিফেন্ডার হিসেবে সবচেয়ে সেরা মনে হয়েছে কাকে?

মালা : অনেকেই আছে। ছোট নাজির অসাধারণ। আইনুল ভাইও। লেফট ব্যাকে হাকিম; রাইট ব্যাকে জহির ভাই, ফারুকরা দুর্দান্ত। জাকারিয়ার পিন্টু ভাইয়ের ফুটবল সেন্সও খুব ভালো। তবে সব মিলিয়ে আমার কাছে সেরা ছোট নাজির ও আইনুল ভাই।

প্রশ্ন : এবার ক্যারিয়ারের শুরুটা একটু যদি জানান। রহমতগঞ্জেই তো শুরু?

মালা : রহমতগঞ্জ ক্লাবের তৃতীয় বিভাগের দলে। ১৯৬৬ সালে, তখন আমি ক্লাস এইটে পড়ি। রহমতগঞ্জ এলাকাতেই তো থাকতাম। ফুটবলের নেশা ছোটবেলা থেকে। খালি পায়ে ফুটবল খেলি। ক্লাবের অনুশীলন যখন হয়, বসে থাকি মাঠের বাইরে। বল বাইরে এলে ছুটে গিয়ে তা ভেতরে পাঠাই। আর তা কখনো হাতে নয়, পা দিয়ে কিক করে। আশা, বড়রা আমার কিক দেখে যদি খেলার সুযোগ দেন। এরই মধ্যে পাড়ায় মইনুল চৌধুরী টুর্নামেন্ট হয়। এই মইনুল চৌধুরী সাহেবের ফুটবলে অনেক অবদান। রহমতগঞ্জ মাঠ ছিল নদীর সঙ্গে; উনি মাটি ফেলে ১০ ফুট উঁচু করে মাঠ করে দেন। ফরাশগঞ্জের লালকুঠিকে সংগঠিত করে ওদের খেলার সুযোগ তৈরি করেন। অথচ এই লোকটির কথা এখন কেউ বলে না। যাই হোক, ওনার নামে যে টুর্নামেন্ট হয়, সেখানে আমাদের উদয়ন ক্লাব চ্যাম্পিয়ন। খুব ভালো খেলে আমি সবার নজরে পড়ে যাই।

প্রশ্ন : এরপর?

মালা : এরপর সুযোগ আসে রহমতগঞ্জ ক্লাব মাঠে অনুশীলন করার। মইনুল চৌধুরী সাহেব আমাদের উদয়ন ক্লাবকে ২২ জোড়া বুট উপহার দেন। তখন এক জোড়া বুটের দাম ১৬ টাকা, ১৮ টাকা করে। ওই আমরা বুট পরে শুরু করি অনুশীলন। কারণ এখান থেকেই তো রহমতগঞ্জ ভবিষ্যতের ফুটবলার পাবে। তখন কিন্তু রহমতগঞ্জ ক্লাবের তিন-চারটি দল ছিল। প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ, তৃতীয় বিভাগে। উদয়ন ক্লাবের সবার খেলা শুরু তৃতীয় বিভাগে। রহমতগঞ্জে আমিন ভাই নামে একজন ছিলেন। বড় কোনো পোস্টে না, কিন্তু দেখাশোনা করতেন সব কিছু। উনি আমাকে খেলান প্রথম। অবশ্য তখন তো রেজিস্ট্রেশনের খুব কড়াকড়ি ছিল না। তৃতীয় বিভাগে শুরু করলেও খেলোয়াড় কম পড়লে রহমতগঞ্জের দ্বিতীয় বিভাগেও খেলানো হয়েছে আমাকে। ওই প্রথম বছরেই।

প্রশ্ন : টাকা-পয়সা?

মালা : স্টেডিয়ামে যাওয়া-আসা, খাওয়ার জন্য হয়তো আট আনা পেতাম। মনে আছে, রহমতগঞ্জের প্রথম বিভাগের দলের খেলা দেখার জন্য বড় ভাইদের সঙ্গে যেতাম রিকশায়। ওনারা গদিতে বসতেন, আমরা পায়ের নিচে। আমাদের খেলার পর চলে যেতাম চকবাজারে কুন্নুর হোটেল। চার আনার নেহারি, দুই আনার রুটি খেতাম। পয়সা বড় ব্যাপার না কিন্তু আনন্দ-ফুর্তি হতো খুব।

প্রশ্ন : টাকা-পয়সার কথা যখন উঠলই, একটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি। আপনার পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব ভালো ছিল না বলে শুনেছি। আপনার বাবা ফল বিক্রি করতেন। অমন পরিবার থেকে ফুটবল যে খেলা শুরু করেন, মা-বাবা বাধা দেননি?

মালা : আমার সম্পর্কে দেখি অনেক কিছু জেনে এসেছেন। হ্যাঁ, এটি একদম সত্যি কথা। আমার বাবা চকবাজারের ফুটপাতে ফল বিক্রি করতেন। এটি কি জানেন যে রহমতগঞ্জে আমরা মাটির ঘরে থাকতাম?

প্রশ্ন : না।

মালা : জীবনের শুরুটা খুব কষ্টে কেটেছে। থাকতাম মাটির ঘরে। বৃষ্টি এলে চৌকিতে ঘুমাতে পারতাম না। ওপর দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ত বলে ওখানে পাতিল-প্লেট দিয়ে রাখত। আর ছালা বিছিয়ে চৌকির তলে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো আমাদের ভাই-বোনদের। ঘুমাতাম সেখানে। এখন আমি বিল্ডিংয়ে থাকলে কী হবে, ওই কষ্টটা মনে আছে।

প্রশ্ন : আপনার ভাই-বোন কতজন?

মালা : দুই ভাই, তিন বোন। এর মধ্যে আমি দ্বিতীয়। আমার বাবার নাম আকবর মিয়া; মা সুরত বিবি। বাবা তো রাস্তায় ফল বিক্রি করতেন। আমিও কত দিন মাথায় ফলের ঝাঁকা নিয়ে বাসা থেকে চকে গিয়েছি! বিশেষ করে রমজান মাসে বাবা যখন বাদামতলী-শ্যামবাজার থেকে ফল আনতে যেতেন, আমিই তখন চকের রাস্তার ওপর দোকান সাজাতাম। বিক্রি করতাম। বাপের প্রতি আমার খুব টান ছিল। তাঁর সঙ্গে থাকতাম সব সময়। সাহায্য করতাম। অনেক রাতে বাড়ি ফেরার সময় আলাউদ্দিন সুইটমিট থেকে বাবা পাতার ঠোঙায় হালুয়া, বুন্দিয়া, দই-মিষ্টি নিয়ে আসতেন। আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে এসব খাইয়ে আবার ঘুম পাড়িয়ে দিতেন। আর ফল তো খাওয়াতেনই। বাড়িতে গাইগরু পালা হতো। গাইয়ের দুধ খাওয়াতেন আমাকে; কেননা ফুটবল খেলার জন্য এটি দরকার। সেই অভ্যাসটা এখনো রয়ে গেছে। এখনো, এই বয়সেও আমি প্রতিদিন আধা কেজি গাইয়ের দুধ খাই। এখনকার খেলোয়াড়দের নাকি বিয়ার না খেলে শরীর চাঙ্গা হয় না। আমি তো গাইয়ের দুধ খেয়েই ফুটবল খেলেছি।

প্রশ্ন : ফুটবল যে খেলতেন, তাতে বাবার সায় ছিল?

মালা : উনি খুব পছন্দ করতেন। আর আমিও তো কখনো বাজে খরচ করিনি। মোহাম্মদপুরে পানির টাংকের পাশে ছোট্ট একটা মাঠ ছিল। সেখানে চার ফুট দশের খেলা খেলতে যেতাম দুই আনা বাস ভাড়া দিয়ে। খেলা শেষে কোনো দিন দুই টাকা দিত, কোনো দিন তিন টাকা। পুরো টাকাটা এনে তুলে দিতাম বাপের হাতে। ওনার কষ্ট আমার সহ্য হতো না। আল্লাহর কাছে শোকর যে বাবাকে আমি পরে ফুটবল খেলে ব্যবসা ধরিয়ে দিয়েছি। যে বাপ চকের রাস্তায় ফল বিক্রি করতেন, তাঁকে বাদামতলী ঘাটে করে দিয়েছি ফলের আড়ত। এটি ১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে। আমার ওপরও তাই বাবা সন্তুষ্ট ছিলেন। আর আমার খেলা দেখতে উনি তো মাঝেমধ্যে ঢাকা স্টেডিয়ামেও যেতেন। সবাই যে আমাকে চিনত, তাঁকে বলত ‘মালার বাপ’—এতে খুশি হতেন খুব।

প্রশ্ন : ফুটবল খেলতেন, বাবাকে ফল বিক্রিতে সাহায্য করতেন। আর পড়ালেখা?

মালা : গরিবের ঘরে পড়ালেখার দাম নাই। তার পরও আমি যতটুকু পারা যায়, চেষ্টা করেছি। নবকুমার স্কুল দলে খেলেছি নিয়মিত; চ্যাম্পিয়নও হয়েছি। ওরা আসলে আমাকে ছাড়ত না। ক্লাস নাইনে দুই-তিন বছর রেখে দিয়েছেন। মাস্টাররা বলতেন, ‘থাক ব্যাটা, ওপরে উঠে কী করবি? ফুটবল খেল। ’ পরে কোনো মতে পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছি ম্যাট্রিক। জগন্নাথ কলেজে ভর্তিও হয়েছি, খেলেছি এক বছর। কিন্তু পরে আর এগোতে পারিনি।

প্রশ্ন : প্রথম বিভাগে প্রথম খেলেন কবে?

মালা : এখানে মজার এক ব্যাপার; যা প্রায় কেউই জানেন না। ঢাকায় প্রথম বিভাগে আমি ও সালাউদ্দিন প্রথম মাঠে নামি একই দিনে। আমি রহমতগঞ্জের হয়ে, ও ওয়ারীর। এমনিতে সালাউদ্দিনের সঙ্গে আগে থেকেই পরিচয় ছিল। স্কুল ফুটবলে ও শাহীন স্কুলের হয়ে খেলত; আমি নবকুমারের। দ্বিতীয় বিভাগে খেলার সময়ও দেখা হয়েছে। এরপর প্রথম বিভাগে তো অভিষেক হয় একই ম্যাচে। ১৯৬৮ সালে। খেলাটিতে আমি গোল দিই; কিন্তু সালাউদ্দিনের দুই গোলে ওয়ারী জিতে যায় ২-১ গোলে। যুদ্ধের আগ পর্যন্ত রহমতগঞ্জেই খেলি। পরে চলে যাই ইপিডিআইসিতে, মানে যেটি নাম বদলে হয় বিজেআইসি।

প্রশ্ন : পাড়ার ক্লাব ছাড়লেন কেন?

মালা : এখানেও সেই গরিবের দুঃখ। আগেই তো বলেছি, রহমতগঞ্জে মাঠের পাশে বসে থাকতাম, বল বাইরে গেলে কিক করে ভেতরে পাঠাতাম। ওই ক্লাবে যাঁরা খেলেন, বেশির ভাগ বড়লোকের পোলাপান। তাদের আত্মীয়-স্বজনদের হাতেই ক্লাব। আমি গরিব বলে ওরা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত; খেলায় নিত না। আসলে বড়লোকদের ভেতর হিংসা ভরা। আমাদের গরিবদের ভেতর ওসব কিছু নেই। তবে ভেতরে ভেতরে রাগ ছিল। জিদ ছিল। একটা ঘটনা বলি। যুদ্ধের আগে যখন রহমতগঞ্জের প্রথম বিভাগ দলে খেলি, তখন আমাকে দেওয়া হয় তিন শ টাকা। এই টাকা নিয়ে আপত্তি নেই। কিন্তু ওরা আমাকে তিন শ টাকা দেয় পুরোটাই রেজগি। মানে চার আনা, আট আনা, এক টাকার খুচরা পয়সা। তিন শ টাকাই এমন রেজগি। ব্যাপারটা গায়ে লাগে খুব। দেশ স্বাধীনের পর বিজেআইসি থেকে যখন আমাকে খেলার প্রস্তাব দিল, চলে যাই।

প্রশ্ন : কত টাকায়, মনে আছে?

মালা : ছয় হাজার টাকা। সলিমুল্লাহ ভাই আমাকে সেখানে নিয়ে যান। ওখানকার এক কর্মকর্তা ছিলেন সাঈদ ভাই নামে। উনি বলেন, ‘তুমি শুধু খেলো, বাকিটা আমরা দেখব। ’ এই সাইদ ভাইয়ের মতো ভালো লোক ফুটবলে আমি দেখিনি। খুব দিলদরিয়া লোক ছিলেন।

প্রশ্ন : ১৯৭২ সালে কয়েকটি ম্যাচ হওয়ার পর লিগ পণ্ড হয়ে যায়। ১৯৭৩ সালের লিগের প্রথম ম্যাচে বিজেআইসি হারিয়ে দেয় আবাহনীকে। প্রথম গোল আপনার, পরেরটি এনায়েতের। সেই হিসাবে তো স্বাধীন বাংলাদেশের লিগে প্রথম গোল আপনার। এ নিয়ে গর্ব হয় নিশ্চয়ই?

মালা : আসলে আমার পুরো ফুটবল ক্যারিয়ারটাই গর্বের। এ খেলার কারণেই মাটির ঘর থেকে বিল্ডিংয়ে উঠেছি, বাবাকে চকের ফুটপাত থেকে বাদামতলীতে আড়ত করে দিতে পেরেছি। আপনি যেভাবে বললেন, সেই হিসাবে স্বাধীন বাংলাদেশে লিগে প্রথম গোল তো আমারই। কিন্তু তা কে মনে রেখেছে বলুন? সে জন্য আমি পাবলিককে দোষ দিই না। খেললাম এতটুকু কিন্তু বললাম এত্ত বড়—অমন চাপা তো ভাই মারতে পারি না। তবু ফুটবল খেলে জীবনে যা পেয়েছি, তাই অনেক। আপনাদের সাংবাদিক দিলু খন্দকার আছেন না! কিছুদিন আগে আজিমপুরের এক অনুষ্ঠানে ওঁর সঙ্গে দেখা। সঙ্গে তাঁর বড় ভাই খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। সরকারের বড় সচিব। উনারা আমাকে দেখে একেবারে জড়িয়ে ধরেন। দিলুর ভাবিও তো সচিব; তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে দিলুর ভাই বলেন, ‘আমি আপনার অনেক বড় ভক্ত ছিলাম। স্টেডিয়ামে গিয়ে কত খেলা দেখেছি!’ এসবই তো জীবনের প্রাপ্তি, তাই না?

প্রশ্ন : বিজেআইসি থেকে যান মোহামেডানে। কিন্তু যতটুকু শুনেছি, বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল আপনাকে আবাহনীতে খেলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সত্যি?

মালা : সত্যি। কামাল তো রহমতগঞ্জে আমার মাটির ঘরে পর্যন্ত গিয়েছিল আবাহনীতে খেলার প্রস্তাব নিয়ে। ঢাকা কলেজের পাশে এক অফিসে ও বসত। যেতে বলেছিল ওখানে। কিন্তু ঘটনা হলো, সলিমুল্লাহ ভাই, সাঈদ ভাইরা আমাকে পছন্দ করতেন খুব। ওনারা বিজেআইসি থেকে ছাড়তে চাইলেন না। সে কারণে আর যাইনি। মোহামেডানে তো গিয়েছি পরে। তবে ওই যে আবাহনীতে গেলাম না, তাতে কিন্তু শেখ কামালের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খারাপ হয়নি। তখন তো ঢাকা শহর ছোট। নিউ মার্কেট, ঢাকা কলেজ এলাকায় হঠাৎ হঠাৎ রাস্তায় ওর সঙ্গে দেখা হয়ে যেত। গাড়ি থামিয়ে তুলে নিত আমাকে। নামিয়ে দিয়ে আসত লালবাগে। কামাল যে দেশের প্রধানমন্ত্রীর ছেলে, ওর আচার-আচরণে বোঝাই যেত না। পরে তো বিয়ে করল সুলতানাকে, ওর বাড়ি আবার বকশীবাজার। আমাকে দাওয়াত দিয়ে কামাল বলেছিল, ‘বিয়েতে আসিস। তোদের মহল্লার বোনকে বিয়ে করছি। ’ গিয়েছিলাম সেই বিয়ে খেতে।

প্রশ্ন : ক্লাব ফুটবলে শেষ খেলেন কবে?

মালা : মোহামেডানে যাই ১৯৭৫ সালের শেষে। মাঝে দুই বছর সাধারণ বীমায় খেলে আসি। ওরা ওই সময় ২০ হাজার করে ৪০ হাজার টাকা দেয়; এটি আমার সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক। ওই টাকা মিলিয়ে শেখ সাহেব বাজার রোডের সোয়া দুই কাঠার এই জমি কিনি। তখন এখানে টিনশেড হাফ বিল্ডিং ছিল; পরে করি পাঁচতলা বিল্ডিং। আমার বাবা সেই বিল্ডিং দেখে যেতে পারেননি, তবে জমি কিনেছি যে, তা দেখেছেন। খুশিও হন খুব। সাধারণ বীমা থেকে পরে আবার আসি মোহামেডানে। খেলি ১৯৮৩-৮৪ সাল পর্যন্ত। তবে শেষ দিকে খেলার চেয়ে কোচিংয়ে মন দিই বেশি। টিপু ভাই আমাকে এ লাইনে নিয়ে আসেন।

প্রশ্ন : জাতীয় দলে খেলেন কত দিন?

মালা : পাকিস্তান আমলেই তো পূর্ব পাকিস্তান যুব দলে খেলেছি। পরে স্বাধীন বাংলাদেশে যুব দলের হয়ে কুয়েত খেলতে যাই। হংকংয়ের বিপক্ষে গোলও করি। এ ছাড়া স্বাধীনতার পর পর রাষ্ট্রপতি একাদশ, প্রধান বিচারপতি একাদশ নামে যে খেলা হয়, সেখানেও ছিলাম। আমাদের জাতীয় দল সম্ভবত ১৯৭২-৭৩ সালের দিকে খেলতে যায় গৌহাটিতে। সেখানে অবশ্য খেলি আমরা ‘ঢাকা একাদশ’ নামে। ওই দলে ছিলাম আমি। ফাইনালে হেরে যাই ইস্টবেঙ্গলের কাছে। এরপর মারদেকায় দলে ঢোকে এনায়েত; বাদ পড়ে যাই আমি।

প্রশ্ন : স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে খেলতে যাননি?

মালা : ওখানে সব সিনিয়র ভাইরা খেলেছেন। আমি তখন খুব ছোট। যুদ্ধের সময় থাকতাম রহমতগঞ্জেই। একদিন আইনুল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুই যাবি নাকি রে স্বাধীন বাংলা দলে?’ কিন্তু অত ছোট আমাকে বাসা থেকে ছাড়েনি। আর আমিও তো বাপ ছাড়া কিছু বুঝতাম না; তাই যাইনি।

প্রশ্ন : ক্যারিয়ারের স্মরণীয় কয়েকটি ম্যাচের কথা যদি বলেন?

মালা : ১৯৭৪ সালের স্বাধীনতা কাপের কথা বলতে পারি। মোহামেডানের বিপক্ষে আমরা হারার পথে। শেষ মুহূর্তে আমি গোল করায় খেলা যায় টাইব্রেকারে। সেখানে জিতে বিজেআইসি ফাইনালে। সেই ফাইনাল পুলিশকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হই আমরা। ১৯৭৭ আগা খান গোল্ডকাপে মালয়েশিয়ার বিপক্ষে ইসা বাকার, আবু বাকারদের বিপক্ষে খেলাটা স্মরণীয়। যদিও ওই ম্যাচটি আমরা হেরেছি। সেমিফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আমার গোলে জিতে মোহামেডান ফাইনালে যায়। বৃষ্টির মাঠে রানিং বলে বাঁ পায়ে শট করে গোল করি। এ ছাড়া শেরে বাংলা কাপে পর পর তিনবার চ্যাম্পিয়ন হই। বিজেআইসি, মোহামেডানের হয়ে লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়াটাও স্মরণীয়।

প্রশ্ন : ১৯৭৩ সালে মোহামেডানের বিপক্ষে বিজেএসসির ২-০ গোলের জয়ে নাকি ৩০-৩৫ গজ দূর থেকে নেওয়া শটে গোল করেছিলেন?

মালা : সেটিও দারুণ গোল। আরেকবার পিডাব্লিউডির বিপক্ষে মোহামেডানকে জেতাই। শেষ সময়ে গোল দিয়েছিলাম। পরে অতিরিক্ত সময়ে আরেক গোল। অমন অনেক গোল আছে। এত দিন পর সব মনেও নেই।

প্রশ্ন : এবার একটু কোচিং ক্যারিয়ারে আসি। পরের প্রজন্ম কিন্তু আপনাকে খেলোয়াড়ের চেয়ে কোচ পরিচয়েই বেশি চেনে। অনেক ফুটবলার তৈরি করেছেন। কয়েকজনের কথা যদি বলেন?

মালা : আগেই তো বলেছি, টিপু ভাই আমাকে কোচিং লাইনে নিয়ে আসেন। আমার হাত দিয়ে অনেক ফুটবলার বেরিয়েছে। কায়সার হামিদ, ইলিয়াস, আবুল, স্বপন, গাফফার, সাব্বির, পনির, রুমি—অনেক অনেক নাম। নিজের কথা আমি কী বলব, ওদের জিজ্ঞেস করলেই জানবেন। যাদের কোচিং করিয়েছি, তাদের অনেকে আমার চেয়ে বড় ফুটবলার হয়ে গেছে। কোচ হিসেবে এটি অবশ্যই গর্বের। এ ছাড়া ওদের সঙ্গে এখনো দেখা হলে খুব সম্মান করে। এটিও বড় প্রাপ্তি। এখনকার অনেক কোচের কথা তো শুনি যে, খেলোয়াড়দের কাছ থেকে পয়সা খায়। তাহলে সম্মানটা পাবে কিভাবে? শিক্ষকরা যদি ছাত্রের কাছ থেকে পয়সা নেয়, তাহলে অমন শিক্ষকদের কেউ মানবে?

প্রশ্ন : কোচিং করিয়েছেন কোন কোন ক্লাবে?

মালা : মোহামেডান, রহমতগঞ্জ, সাধারণ বীমা, ওয়ারী, লালবাগ, মুক্তিযোদ্ধা এমন অনেক ক্লাব। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দলও খেলেছে আমার অধীনে। জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়ে সালাউদ্দিন ও আমি বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে দলকে খেলাই। প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপে বাংলাদেশ লাল দলের কোচ ছিলাম কায়কোবাদ ভাইয়ের সঙ্গে। অনূর্ধ্ব-১৬, অনূর্ধ্ব-১৯ দলের দায়িত্বেও ছিলাম। ২০১১-১২ সালে রহমতগঞ্জে কোচিং করাই সর্বশেষ। এখন কোচিং ছাড়লেও আছি রহমতগঞ্জ ক্লাবে পরামর্শক হিসেবে।

প্রশ্ন : ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে একটু জানতে চাই। বিয়ে করেন কবে?

মালা : বিয়ে করেছি ২৭ বছর হলো। মানে হিসাব করে দেখুন, ১৯৯০ সালে। স্ত্রীর সাইমুন নাহার নাজু। আমাদের তিন ছেলে-মেয়ে। বড় মেয়ে আসমা নেহার উপমাকে বিয়ে দিয়েছি বংশালে। ছেলে ওয়ালিউল ইসলাম নীলয়; ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে চাকরি করছে। ছোট ছেলে সাদেকুল ইসলাম তনয় ভর্তি হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আছে। আমার খুব শখ ছিল একটা ছেলেকে আর্মি অফিসার বানানোর। সে শখ পূরণ হয়েছে। আর কোচিংয়ের পাশাপাশি আমি চামড়ার ব্যবসা করতাম। পোস্তায় আড়ত ছিল। কিন্তু এখন তো সব ফ্যাক্টরি হাজারীবাগ থেকে নিয়ে যাচ্ছে সাভার। ওখানে গিয়ে ব্যবসা করা সম্ভব না। যাক, মেয়ের বিয়ে দিয়েছি, ছেলে দুটো প্রতিষ্ঠিত, বাড়ি ভাড়া থেকেও মাসে ৮০-৯০ হাজার টাকা পাই। আমার আর চিন্তা নেই।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। ক্যারিয়ার নিয়ে, জীবন নিয়ে আপনার তৃপ্তি কতটা?

মালা : ফুটবলের কারণে আমাকে ‘মালা’ নামে সবাই চেনেন। সম্মান-ইজ্জত, টাকা-পয়সা সব ফুটবলের জন্য। আমি হিরো না, ফিল্ম অ্যাক্টর না—শুধু একটা সময় ফুটবল খেলেছি বলে জীবনে এত কিছু করতে পেরেছি। এখনো কোথাও কোনো কাজে গিয়ে নিজের ফুটবলার পরিচয় দিলে আলাদা ইজ্জত পাই। আর আমি তো ভাই পাঁচ-ছয় মাস আগে মারাই গিয়েছিলাম। হার্ট অ্যাটাক হয়েছে; পরে রিং লাগিয়েছে দুটি। সবার দোয়াতে বেঁচে আছি। সব মিলিয়ে ভালো আছি খুব। ফুটবল খেলে মাটির ঘর থেকে বিল্ডিংয়ে উঠেছি। বাপকে ফুটপাত থেকে বাদামতলীতে ফলের আড়ত করে দিতে পেরেছি। তিন বোনের বিয়ে, ভাতিজিদের বিয়ে দিয়েছি এই খেলার টাকায়। সব মিলিয়ে আল্লাহ আমাকে কত ভালো রেখেছেন!


মন্তব্য