kalerkantho


আইসিসির সহযোগী সদস্য পদের আবেদন আমিই করেছিলাম

২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



আইসিসির সহযোগী সদস্য পদের আবেদন আমিই করেছিলাম

ছবি : মীর ফরিদ

সেসব দিন ছিল বটে! আজকের আলো ঝলমলে ক্রিকেটের শান-শওকত দেখে কে বলবে এ দেশে একসময় হাজারটা বাধা সামনে রেখে যাত্রা শুরু করেছিল ক্রিকেট? সেই শুরুর কারিগরদের অন্যতম রাইসউদ্দিন আহমেদ। একদা বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের সাধারণ সম্পাদকের কাছ থেকে অবিশ্বাস্য সেসব দিনলিপি তুলেছেন নোমান মোহাম্মদ

 

প্রশ্ন : ১৯৭৯ সালের ‘পাক্ষিক ক্রীড়াজগত’-এ আপনাকে নিয়ে একটি লেখা দেখছিলাম। শিরোনাম ‘ফেস টু ফেস উইথ রাইসউদ্দিন আহমেদ’। বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে অনেক স্বপ্নের কথা সেখানে বলেছেন আপনি। সত্যিই কি ১৯৭৯ সালের বাস্তবতায় বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে স্বপ্ন দেখার অবস্থা ছিল?

রাইসউদ্দিন আহমেদ : আমি সব সময় স্বপ্ন দেখেছি। বাংলাদেশ একদিন বিশ্বকাপ খেলব, আইসিসির পূর্ণাঙ্গ সদস্য হবে, টেস্ট খেলবে—এই বিশ্বাস বরাবরের। কেননা, আমাদের এই অঞ্চলে ক্রিকেট-সংস্কৃতি অনেক পুরনো। অবকাঠামোও ছিল। চেষ্টা করলে তাই কেন বিশ্ব পর্যায়ে যেতে পারব না? তবে এটি সত্যি যে কাজটি সহজ হয়নি। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে যখন দায়িত্ব নিই, তখন অবস্থা খুব খারাপ। বোর্ডের কোষাগার শূন্য।

এমনও দিন গেছে যে বিদ্যুতের বিল দেওয়ার টাকা পর্যন্ত বোর্ডের নেই। মোমবাতি জ্বালিয়ে কাজ করেছি আমরা। রেডক্রস থেকে দুধ এনে, হাই প্রোটিন বিস্কুট এনে খেলোয়াড়দের খাইয়েছি। ওরা কোনো অভিযোগ করেনি। যখন তা পারিনি, অনুশীলনের পর ক্রিকেটারদের কলা-বনরুটি খেতে দিতাম। মন খারাপ করেনি তবু। এই যে এমন কঠিন সময়, তখনো আমি স্বপ্ন দেখতাম। এখন যখন দেখি সত্যি বিশ্ব পর্যায়ের ক্রিকেটে সবার সঙ্গে সমানতালে লড়ছে বাংলাদেশ, গর্বে বুকটা ভরে ওঠে।

প্রশ্ন : ওই মধ্য-সত্তরে ক্রিকেট নিয়ে স্বপ্ন দেখাটা কি খুব দুঃসাহসিক ছিল না?

রাইসউদ্দিন : দুঃসাহসিক তো অবশ্যই। বাংলাদেশ ক্রিকেট তখন সম্ভাবনার জায়গাটুকুই ছিল কেবল; এর বাস্তবায়নের সামান্যতম পরিকল্পনাও সেখানে অনুপস্থিত। ছিল না ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা। বলতে পারেন, স্রোতের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে। এই অতীতটা সবার জানা উচিত। অতীত জানলে বর্তমান বিশ্লেষণ করতে পারব আর পারব ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করতে। শূন্য কোষাগারে আমি দায়িত্ব নিয়েছি এটি না জানলে অনেকে ভাবতে পারেন, ক্রিকেট বোর্ড হয়তো এখনকার মতোই ধনী ছিল সব সময়। আর বাংলাদেশও সব সময় এখনকার মতোই ভালো ক্রিকেট খেলত। কিন্তু সত্যিটা হলো, সেই হাঁটি হাঁটি পা পা যুগে ক্রিকেটের মান এমন ছিল যে আমাদের বিপক্ষে একবার কোর্ট-মার্শালের দাবি পর্যন্ত ওঠে।

প্রশ্ন : কোর্ট-মার্শাল!

রাইসউদ্দিন : নাহ্, ঠিক ওভাবে না। ঘটনাটি বলি, তাহলে বুঝবেন। এমসিসি কয়েকবার বাংলাদেশ সফর করে যাওয়ার পর শ্রীলঙ্কা জাতীয় দলকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসি। ওরা তখন টেস্ট মর্যাদা পায়নি কিন্তু ভীষণ শক্তিশালী দল। স্বাভাবিক কারণেই সবগুলো ম্যাচ হারলাম আমরা। তখন ‘স্টেডিয়াম’ নামে এক পত্রিকায় ক্রীড়া সাংবাদিক কামরুজ্জামান আমাদের উদ্দেশ করে বিশাল শিরোনামে লিখলেন, ‘এদের সবার কোর্ট-মার্শাল হওয়া উচিত। ’ আমি পরদিন জামানের সঙ্গে বসে চা-খাস্তা খাই। এরপর নিজেই তুলি কথাটি। বলি, ‘আমি জানতাম, শ্রীলঙ্কার কাছে সবগুলো ম্যাচ হারব। গো-হারাই হারব। তবু ওদের এনেছি। কারণ সব সময় এমসিসির বুড়ো খেলোয়াড়দের এনে ওদের হারাব কিংবা ড্র করব—আর সবাই হাততালি দেবে, এভাবে তো দেশের ক্রিকেট এগোবে না। বাংলাদেশ ক্রিকেট কোন অবস্থানে রয়েছে, তা বোঝার জন্য শ্রীলঙ্কাকে এই সফরে ডেকেছি আমি। ’ এমনিতে কিন্তু জামানের সঙ্গে আমার এখনো খুব খাতির। আন্তর্জাতিক ম্যাচের সময় প্রেসবক্সে গেলে দেখেন না, আমি ওর সঙ্গেই গল্প করি। সপ্তাহে এক দিন প্রেসক্লাবে গিয়ে আড্ডা মেরে আসি। তবু ঘটনাটি এ কারণে বললাম যে, বাংলাদেশ ক্রিকেট তখন কোন জায়গায় ছিল আর এখন কোথায়।

প্রশ্ন : আপনি বোর্ডের সাধারণ সম্পাদক থাকার সময়ই তো আইসিসির সহযোগী সদস্য হয় বাংলাদেশ। পরিকল্পনাটি কার?

রাইসউদ্দিন : আমার। স্বপ্ন তো দেখতাম অনেক বড়—এক সময় পূর্ণ সদস্য হব, টেস্ট খেলব। তাই বলে লাফ দিয়ে যে একবারে গাছের ডালে চড়া যাবে না, জানতাম তা-ও। এ কারণে এগোতে চেয়েছি ধাপে ধাপে। আমিই বোর্ডের যুগ্ম সম্পাদক রেজা-ই-করিমকে বললাম যে, আইসিসির সহযোগী সদস্য পদের জন্য আবেদন করতে হবে। আবেদন করার পর এমসিসির কাছে গিয়ে নিয়মিত খোঁজখবর করতাম যে, তা এগোল কতটা। বাংলাদেশ বিমানে চাকরির সুবাদে মাসে-দুই মাসে আমার একবার লন্ডন যাওয়া হতোই। সেখানে আমাদের সেই আবেদন নিয়ে কথা বলে আসতাম। তখন আইসিসি ও এমসিসি মোটামুটি একই। এমসিসির সেক্রেটারি জ্যাক বেরি আমাকে বলল, ভালো মাঠ, ভালো দর্শক সমর্থন, ভালো আম্পায়ারিং এবং যথেষ্ট পরিমাণ ভালো খেলোয়াড়—এই চারটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে তোমরা আইসিসির সহযোগী সদস্য পদ পাবে।

প্রশ্ন : কিভাবে তা নিশ্চিত করেন?

রাইসউদ্দিন : এ অঞ্চলের ক্রিকেট-সংস্কৃতি অনেক বছরের পুরনো। ওই চারটি বিষয় নিশ্চিতের ব্যাপারে আমার তাই আত্মবিশ্বাস ছিল। তা ছাড়া জ্যাক বেরি আমাকে পথ দেখিয়ে দেন এই বলে, ‘সবচেয়ে ভালো হয়, তোমরা যদি এমসিসি দলকে আমন্ত্রণ জানাও। ওরা খেলে এসে ইতিবাচক প্রতিবেদন দিলে আইসিসি সহযোগী সদস্য পদ পেয়ে যাবে বাংলাদেশ। ’ ভাবলাম না এক মুহূর্তও। জ্যাক বেরিকে বলি, ‘ওই কথাই চূড়ান্ত। দেশে ফিরেই আমি আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়ে দিচ্ছি। তোমার এমসিসি আমার দেশে আসছে তাহলে। ’ ওটি যে কতটা দুঃসাহসিক ছিল, এখনকার বাস্তবতায় বোঝা যাবে না তা। বোর্ডের কোষাগারে এক পয়সা নেই, মাঠ পাব কি না নিশ্চয়তা নেই, পিচ বানাতে পারব কি না, কে জানে—তবু আমন্ত্রণ জানিয়ে বসলাম এমসিসিকে।

প্রশ্ন : দেশে ফেরার পর প্রস্তুতি পর্ব নিশ্চয়ই খুব কঠিন হয়েছিল?

রাইসউদ্দিন : খুবই। বাধা পেয়েছি প্রতি ধাপে ধাপে। কিন্তু হাল ছাড়িনি। লেগে ছিলাম একগুয়ের মতো। জেনারেল এরশাদ তখন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের চেয়ারম্যান। তাঁর কাছে গিয়ে এমসিসির সফরের কথা জানাতেই উনি বলে দেন, ‘সাদা চামড়াদের এনে কেন খেলাবেন? আমরা তো ওদের সঙ্গে হেরে যাব। ’ তাঁকে বোঝালাম যে, ‘জয়-হারের চেয়েও এই সফর অন্য কারণে গুরুত্বপূর্ণ—আইসিসি সহযোগী সদস্য পদ পাওয়ার জন্য। আর আপনি যদি এমসিসির সফরের অনুমতি না দেন, তাহলে ক্রিকেট বোর্ড থাকারই তো কোনো মানে নেই। ’ এমন অনেক বলে-কয়ে, জেদাজেদি করে শেষে অনুমতি নিই এরশাদের। কিন্তু সঙ্গে তিনি জুড়ে দেন, ‘অনুমতি দিলাম, তবে কোনো টাকা দিতে পারব না। ’

প্রশ্ন : তাহলে টাকা জোগাড় হয় কিভাবে?

রাইসউদ্দিন : আমি তখন বাংলাদেশ বিমানের চিফ অব অ্যাডমিন। আর বিমানের মার্কেটিংয়ের প্রধান রশিদ আহমেদ। এমসিসিকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়ে পরদিন অফিসে গিয়ে বসে ভাবছি, কিভাবে টাকা জোগাড় করা যায়। রশিদ আহমেদ আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কী রে, তুই চুপচাপ বসে আছিস। কী হয়েছে?’ ঘটনা বললাম। সঙ্গে যোগ করি, ‘ওদের আনার একটাই উপায় যদি বাংলাদেশ বিমান স্পন্সর করে। ’ তিনি আমাকে বলেন, ‘তুই আর আমিই তো বিমান। চল দেখি, একটা ব্যবস্থা হবেই। ’ এরপর আমরা দুজন মিলে যাই বিমানের চেয়ারম্যান হেদায়েত আহমেদের কাছে। ওনার কাছে বলতেই এমসিসি দলের ঢাকা-লন্ডন-ঢাকা টিকিটের টাকা দিতে রাজি হয় বাংলাদেশ বিমান। শুধু তা-ই নয়, যশোর, রাজশাহী, চট্টগ্রামে যাতায়াতের টিকিটের ব্যবস্থাও। এই প্রথম বাংলাদেশ ক্রিকেটে চালু হয় স্পন্সর প্রথা।

প্রশ্ন : কিন্তু যাতায়াত বাদেও আরো অনেক খরচ তো আছে?

রাইসউদ্দিন : অনেক খরচ। হোটেল পূর্বাণীতে রাজি করিয়ে ফেলি খাওয়াদাওয়া ৩৩ শতাংশ ডিসকাউন্টে দেওয়ার ব্যাপারে; সঙ্গে ম্যাচের দিন লাঞ্চ ফ্রি। ঢাকার বাইরের খেলাগুলোয় কী করি? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে আমার এক সুবিধা ছিল। বাংলাদেশের তখন বেশির ভাগ সিএসপি অফিসার আমার সমসাময়িক অথবা এক-দুই বছরের বড়-ছোট। ওরাই তখন বেশির ভাগ জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে। আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি, ওখানে গিয়ে দেখা করি, এমসিসির সফরের গুরুত্ব তুলে ধরে রাজি করাই সব কিছু প্রস্তুত করার ব্যাপারে। চ্যালেঞ্জটা সবচেয়ে বেশি ছিল যশোরে। ওখানকার ডিসি তখন মহিউদ্দীন খান আলমগীর, পরে যিনি মন্ত্রী হয়েছেন। তাঁকে বলে, একেবারে নতুন আসবাবপত্র কিনে, সব কিছু নতুন করে তৈরি করে থাকার ব্যবস্থা করি ক্রিকেটারদের। সার্কিট হাউসে এমসিসি দল এবং ওয়াপদা, রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজের মতো অন্য সরকারি রেস্ট হাউসগুলোয় বাংলাদেশ দল, অফিশিয়িয়াল ও অন্যদের। এ ছাড়া সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এরশাদকে বলে যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে যন্ত্রপাতি-রোলার এনে মাঠ সমান করি। ঢাকা থেকে কিউরেটর লতিফ ভাইকে পাঠিয়ে তৈরি করি পিচ। সব মিলিয়েই চ্যালেঞ্জটা ছিল অনেক বড়।

প্রশ্ন : এমসিসি দল সন্তুষ্ট হয়েছিল?

রাইসউদ্দিন : খুব খুশি হয়। এমনিতে বাঙালি তো অতিথিপরায়ণ জাতি। ওরা যেখানে গেছে, ফুলের মালায় এমন অবস্থা যে, চেহারা দেখা যায় না। মাঠ-উইকেট-আবাসন-খাওয়া সব কিছুতে ওরা খুশি। দেশে ফেরার পর এমসিসি দল ভালো রিপোর্ট দেওয়ায় বাংলাদেশের আইসিসি সহযোগী সদস্য হওয়ার পথ খুলে যায়। এ ক্ষেত্রে আরেকজনের কথাও বলতে হবে—রবিন মার্লার। ‘সানডে টাইমস’ পত্রিকার সাংবাদিক তিনি। সত্তরের দশকের মাঝামাঝিতে ভারত-ইংল্যান্ড টেস্ট সিরিজ কাভার করার জন্য উনি আসেন ভারতে। ওই সময় নিজ উদ্যোগে ঢাকা ঘুরে যান রবিন মার্লার। প্রেসক্লাবে গিয়ে দেখা করেন এবিএম মূসা ভাইয়ের সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে আগে থেকেই বোধহয় পরিচয় ছিল। আর মূসা ভাইয়ের সঙ্গে তো আমার ঘনিষ্ঠতা অনেক আগের। উনি ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল সেক্রেটারি। আমি প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন। মূসা ভাই আমাকে ডেকে রবিন মার্লারের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেন। আমি ওকে ঢাকা স্টেডিয়ামে নিয়ে যাই, ধারণা দিই বাংলাদেশ ক্রিকেটের নানা বিষয় সম্পর্কে। আমি কিন্তু তখনো ক্রিকেট বোর্ডে ঢুকিনি। পরবর্তী সময়ে আইসিসি সহযোগী সদস্য পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে রবিন মার্লার খুব বড় ভূমিকা রাখেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কলাম লিখেছেন বাংলাদেশের পক্ষে, আমাকে নিয়ে নানা প্রভাবশালী জায়গায় গিয়েছেন। সৈয়দ আশরাফুল হকও তখন পড়াশোনার জন্য ইংল্যান্ডে। সে-ও এমসিসি গিয়ে বাংলাদেশের ব্যাপারে কথাবার্তা বলত; ইতিবাচক ধারণা দিত। সবার চেষ্টাতেই আইসিসির সহযোগী সদস্য হয় বাংলাদেশ।

প্রশ্ন : ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত আপনি বোর্ডের জেনারেল সেক্রেটারি। এরপর বোর্ড থেকে বেরিয়ে গেলেন কেন?

রাইসউদ্দিন : জেনারেল এরশাদের সঙ্গে ঝগড়া হয়ে গেল যে!

প্রশ্ন : ঝগড়া!

রাইসউদ্দিন : হ্যাঁ, ঝগড়ার মতোই। ক্রিকেট বোর্ডের ওপর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের খরবদারি ছিল প্রবলভাবে। এনএসসির চেয়ারম্যান এরশাদ সাহেবকে তা বলি অনেকবার। কাজ হয় না। ক্রিকেট বোর্ডকে কোনো টাকা দেয় না এনএসসি কিন্তু হঠাৎ জানিয়ে দেয় যে, টিকিট বিক্রি থেকে ১০ শতাংশ টাকা তাদের দিতে হবে। আমি এরশাদ সাহবেকে বলি, ‘স্টেডিয়ামের মালিকানা এনএসসির সত্যি। কিন্তু বাংলাদেশের সব খেলা প্রচার-প্রসারের দায়িত্বও তো তাদের। আপনারা সে কাজে অর্থ দিয়ে আমাদের কোনো সাহায্য করবেন না, উল্টো আমাদের টিকিট বিক্রি থেকে অর্থ নেবেন—এটি কেমন কথা?’ এই নিয়ে ঝগড়া করে বেরিয়ে আসি বোর্ড থেকে। সঙ্গে আরো কিছু বিষয়ে মতবিরোধ ছিল। আমি যেমন বলেছিলাম, সবগুলো ক্রীড়া ফেডারেশনে নির্বাচন দিতে হবে। সব মিলিয়েই থাকা হয়নি আর।

প্রশ্ন : আচ্ছা, বোর্ডে ঢুকেছিলেন কিভাবে, তা কিন্তু শোনা হয়নি...

রাইসউদ্দিন : ১৯৭৫ সালের একদিনে বসে ছিলাম বিমান অফিসে। হুদা ভাই ও চান্দ খান এসে বললেন, ‘ক্রিকেট চালানোর মতো লোক পাওয়া যাচ্ছে না; তোমাকে দায়িত্ব নিতে হবে। ’ হুদা ভাই আমাকে চিনতেন পূর্ব পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনে থাকার সময়ই। আমি ১৯৬৫ সাল থেকে ওখানকার ক্রিকেট কমিটিতে জড়িত। ১৯৬৭ সালে এমসিসির সফরের সময় ছিলাম ক্রিকেট সেক্রেটারি। আর চান্দ ভাইয়ের সঙ্গে তো ক্রিকেটও খেলেছি। ওনার ব্যাপারে আমার বিশেষ দুর্বলতা। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আমার ওয়ারীর বাসায় একদল বিহারি আসে লুটপাটের উদ্দেশ্যে। চান্দ ভাই থাকতেন কাছেই। উনি দৌড়ে এসে ওদের গালিগালাজ করে তাড়িয়ে দেন। এই হুদা ভাই ও চান্দ ভাই এসে ক্রিকেট বোর্ডে ঢোকার কথা বললেও শুরুতে দায়িত্ব নিতে চাইনি। রাজি হই পীড়াপীড়িতে। এই সৈয়দ সামসুল হুদা হন ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট; আমি জেনারেল সেক্রেটারি।

প্রশ্ন :  ছয় বছর থাকার পর ১৯৮১ সালে বেরিয়ে যান। এর ১০ বছর পর ফেরেন আবার ক্রিকেট বোর্ডে। এবার সহসভাপতি হিসেবে। এই ফেরাটা কিভাবে?

রাইসউদ্দিন : মাঝের সময়টায় প্রস্তাব আসে বেশ কয়েকবার। কে জেড ইসলামও বলেন। কিন্তু আর বোর্ডে কাজ করতে চাইনি। ১৯৯১ সালে আবার এলাম কিভাবে? পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান তখন চট্টগ্রাম যাচ্ছেন কোনো এক সফরে। বিমানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে তাঁকে বিদায় জানানো আমাদের একরকম কর্তব্য। এমনিতে ওনাকে আমি আগে থেকে চিনতাম। উনি ওয়ারীতে ক্রিকেট খেলতেন, আমরা ঈগলেটসে। ‘মোস্তু ভাই’ বলে ডাকতাম তাঁকে। উনি বিমানবন্দরে আমাকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে বলেন, ‘আমি ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হচ্ছি। ’ শুনে বলি, ‘অভিনন্দন’। উনি বলেন, ‘শুধু অভিনন্দন দিলে হবে না। তুমি ক্রিকেট বোর্ডে আগে ছিলে। আবার আমার সময়ে আসতে হবে। নামে আমি বোর্ড প্রেসিডেন্ট থাকব কিন্তু চালাবে তুমি। ’ আমি তো তেমন আগ্রহী না; কিন্তু স্বয়ং মন্ত্রী বলছেন! হেসে জিজ্ঞেস করি, ‘‘আমার কি ‘না’ বলার সুযোগ আছে নাকি এটি নির্দেশ?’’ মোস্তু ভাইও হেসে জবাব দেন, ‘সেভাবে যদি ভাবো, তাহলে নির্দেশই। ’ কী আর করা! সহসভাপতি হিসেবে বোর্ডে ঢুকি আবার। জেনারেল সেক্রেটারি হয় আমিনুল হক মনি।

প্রশ্ন : ওই সময় সার্ক ক্রিকেট নামে একটি টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয় বাংলাদেশ। এই প্রতিযোগিতার ধারণাটা কিভাবে?

রাইসউদ্দিন : আমিই দিই ধারণাটি। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার ‘এ’ দলের বিপক্ষে আমাদের জাতীয় দলের খেলায় নিজেদের অবস্থানটি জানতে পারব। আর ওদের ‘এ’ দল মানে তো টেস্ট খেলা কিংবা কিছু দিনের মধ্যে টেস্ট খেলবে—অমন ক্রিকেটারদের নিয়ে গড়া দল। তাদের বিপক্ষে খেললে আইসিসি ট্রফিতে ভালো করার সুযোগ বাড়বে বাংলাদেশের।

প্রশ্ন : সার্ক ক্রিকেট খুব সফল টুর্নামেন্ট। কিন্তু ১৯৯৪ আইসিসি ট্রফিতেও বাংলাদেশ সাফল্য পায়নি। অনেকের অভিযোগ, কোচ মহিন্দর অমরনাথ ক্রিকেটারদের একটা দল হিসেবে গড়ে তুলতে পারেননি বলেই অমন ব্যর্থতা...

রাইসউদ্দিন : আমার তা মনে হয় না।

প্রশ্ন : অনেকে এমনও বলেন, অমরনাথের মতো ক্রিকেট ব্যক্তিত্বকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি বলেই তিনি নিজের ইচ্ছেমতো অনেক কিছু করতে পেরেছেন। এই অভিযোগ খণ্ডন করবেন কিভাবে?

রাইসউদ্দিন : আমাদের আসলে কোচ হিসেবে আনার কথা ছিল পাকিস্তানের হারুনুর রশিদকে। শেষ সময়ে ওকে পেলাম না। যোগাযোগ করি ভারতের বোর্ডের সঙ্গে। ওরাই আমাকে বলে অমরনাথের কথা। ও ভালো কোচ। আর অমরনাথের ওপর বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ ছিল না বলাটাও ঠিক না। একটা জায়গাতেই কেবল ঝামেলা বাধে—নান্নুকে (মিনহাজুল আবেদীন) নিয়ে। কেনিয়ার আইসিসি ট্রফির আগে আমরা ভারতে যাই কিছু অনুশীলন ম্যাচ খেলতে। সেখানেই অমরনাথ-নান্নুর ঝামেলার শুরু। দেশে ফেরার পর অমরনাথ জানায়, ‘নান্নু দলে থাকলে আমি আর কোচ থাকব না। ’ কী মুসিবত! অমরনাথ চলে গেলে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে খুব। এ ছাড়া সম্পর্ক খারাপ হবে ভারতীয় বোর্ডের সঙ্গে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যতের জন্য তা ভালো না। আমার অফিসে মিটিং করি সবাই মিলে। শেষে ঠিক হয়, নান্নু দলে থাকবে তবে অধিনায়ক থাকবে না। অমরনাথ তা মেনে নেয়। তবে এ কারণে কিংবা অমরনাথের জন্য ১৯৯৪ আইসিসি ট্রফিতে বাংলাদেশ ভালো করতে পারেনি, আমি তা বিশ্বাস করি না। দুর্ভাগ্যের কারণেই পারিনি সেবার।

প্রশ্ন : যখন সাবের হোসেন চৌধুরী বিসিবি প্রেসিডেন্ট, সৈয়দ আশরাফুল হক জেনারেল সেক্রেটারি, সেই বোর্ডেও আপনি ছিলেন। সহসভাপতি হিসেবেই। ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জিতে বাংলাদেশ যে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করল, তা কতটা গর্বের ছিল?

রাইসউদ্দিন : ভীষণ গর্বের। ভীষণ আনন্দের। কী যে খুশি হই তখন, কাউকে বলে বোঝানো যাবে না। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচটির কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। বৃষ্টির কারণে খেলা না হওয়ার অবস্থা। তাহলে আমাদের স্বপ্ন ধাক্কা খাবে আবারও। তখন উপস্থিত সবাই মিলে তোয়ালে দিয়ে, জামা খুলে, গেঞ্জি দিয়ে নিজেরাই মাঠের পানি তুলে বাইরে ফেলেছি। বাংলাদেশের খেলোয়াড়, কোচ, কর্মকর্তা এমনকি সাংবাদিক-সমর্থকরাও সবাই করেন তা। আমি নিজেও তোয়ালে নিয়ে পানি তুলি। ফটোগ্রাফার টেংকুর কাছে সেই ছবি আছে এখনো। পাগল না হলে এমন কেউ করে! সেই আমরা যখন আইসিসি ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিশ্বকাপ খেলার টিকিট পাই, ভালো লাগাটা বুঝতেই পারছেন। আমার তখন খুব করে মনে পড়ছিল সেই শুরুর দিনগুলোর কথা। এমসিসিকে নিয়ে আসা, সহযোগী সদস্য পদ পাওয়া, প্রথম আইসিসি ট্রফি খেলা—সেসব।

প্রশ্ন : ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপ খেলে বাংলাদেশ, পরের বছরই টেস্ট। আপনার আরেক স্বপ্নের পূর্ণতায় ভালো লাগাটা নিশ্চয়ই আকাশ ছুঁয়েছিল?

রাইসউদ্দিন : মনে হয়েছে, আমার সব স্বপ্ন অবশেষে পূরণ হলো। দেখুন, ওই মধ্য সত্তরে যখন আইসিসি সহযোগী সদস্য পদের জন্য আবেদন করি, তখন অনেকে আমাকে পাগল ভেবেছে। মনে করেছে, অবাস্তব এক স্বপ্নের পেছনে ছুটছি। কিন্তু অনেক বছর পর হলেও সেই স্বপ্নের জায়গাটায় তো যেতে পারে বাংলাদেশ। আর ব্যক্তিগত গর্বের কথা বললে, আমি ক্রিকেট বোর্ডে থাকার সময় বাংলাদেশ আইসিসি সহযোগী সদস্য হয়েছে, আইসিসি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, বিশ্বকাপ খেলেছে, ওয়ানডে মর্যাদা পেয়েছে, টেস্ট মর্যাদা পেয়েছে। এর চেয়ে বড় গর্ব আমার আর কী হতে পারে!

প্রশ্ন : ২০০১ সালের পর তো আর ক্রিকেট বোর্ডে ফেরেননি?

রাইসউদ্দিন : না। সিনা ইবনে জামালি বিসিবি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর একদিন ফোন দেন। ক্রিকেট বোর্ডের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রুল, পারচেস পলিসি, ফিন্যান্স পলিসি—এমন আরো অনেক কিছু ঠিক করার জন্য একটি কমিটি করে সেখানে রাখেন আমাকে। আমি রিপোর্টটি তৈরি করে দিলে তিনি পছন্দ করেন খুব। বলেন, বিসিবি পরিচালক হওয়ার জন্য নির্বাচন করতে। এনএসসি কোটায় কাউন্সিলরও করা হয়। কিন্তু আমি নির্বাচন করিনি। বোর্ডের সঙ্গেও পরবর্তী সময়ে কাজ করা হয়নি আর।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সংগঠক হিসেবে আপনার কীর্তির জায়গায় আলো ফেলার চেষ্টা করলাম আমরা। তবে শুরুর কথা কিছুই জানা হলো না। শেষে এসে সেই শুরুর কথাগুলো যদি কিছুটা বলেন?

রাইসউদ্দিন : আমার আব্বা মোহাম্মদ হারুন মল্লিক সরকারি চাকরি করতেন। সেই চাকরির সুবাদেই আমরা ছমাস  থাকতাম কলকাতা, ছমাস দার্জিলিং। খেলাধুলার হাতেখড়ি সেখানেই। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ঢাকা চলে আসি আমরা। আমার মা রাইসা হারুন ছিলেন নারী অধিকারকর্মী। পাঁচ বোন, তিন ভাইয়ের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। ছোটবেলা থেকেই বাসায় দেখেছি খোলামেলা এক পরিবেশ, যেখানে খেলাধুলার অবারিত সুযোগ ছিল।

প্রশ্ন : আপনার স্কুল সেন্ট গ্রেগরিসের পরিবেশও তো ভীষণ খেলাধুলা-সহায়ক...

রাইসউদ্দিন : হ্যাঁ। স্কুলে সব খেলা খেলেছি। ফুটবল, ক্রিকেট, সফটবল, বাস্কেটবল, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন—সব। শুধু টেনিসটা খেলিনি সেভাবে। এ ছাড়া নটর ডেম কলেজে পড়ার সময় আমি ইন্টার কলেজ স্পোর্টসে হাই জাম্প, লং জাম্প, ১০০ ও ২০০ মিটারে ফার্স্ট হয়েছি। পরে ভর্তি হয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। খেলাধুলার চর্চা অব্যাহত সেখানেও।

প্রশ্ন : কোথায় যেন পড়েছিলাম, ঢাকার প্রথম বিভাগ ফুটবল ও ক্রিকেট লিগের আপনি সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়। সত্যি?

রাইসউদ্দিন : সত্যি। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ভিক্টোরিয়ায় ফুটবল-ক্রিকেট শুরু করি। তখন আমার বয়স ১৫ বছর। ফুটবলে খেলতাম লেফট ইন কিংবা লেফট আউটে। ভিক্টোরিয়ার পর খেলি ওয়ান্ডারার্সে। সেখানে এক ম্যাচে ব্যথা পেয়ে লিগামেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফুটবল আর খেলা হয়নি। ক্রিকেটে ডানহাতি ওপেনিং ব্যাটসম্যান ছিলাম; সঙ্গে লেগ স্পিন বোলার। ঈগলেটসের হয়ে ঢাকা লিগে একবার আমি ও আরিফ উদ্বোধনী জুটিতে তুলি ২৬৫ রান। দুজনই করি সেঞ্চুরি। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিলাম। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট খেলি কায়েদে আজম ট্রফিতে। এ ছাড়া ভলিবল, বাস্কেটবলের মতো খেলাতেও প্রথম বিভাগে খেলেছি। বাস্কেটবলে তো পূর্ব পাকিস্তান দলের অধিনায়ক, পরে কোচও ছিলাম। পাকিস্তান-নিউজিল্যান্ড ম্যাচে একবার ধারাভাষ্যও দিই।

প্রশ্ন : তবে এসব ছাপিয়ে আপনার সংগঠক পরিচয়টাই বড়। এই সাংগঠনিক কাজে আগ্রহ কি শৈশব থেকেই?

রাইসউদ্দিন : তা বলা যায়। স্কুল-কলেজের টুর্নামেন্টগুলো আয়োজনে মজা পেতাম। স্কুলে থাকা অবস্থায় আরো কয়েকজনের সঙ্গে মিলে গড়ে তুলি ওয়ারী বয়েজ অ্যাথলেটিক ক্লাব। আর পূর্ব পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনের কাউন্সিলর হই নটর ডেম কলেজে পড়ার সময়ই; ১৯৫৫ সালে। সাংগঠনিক ব্যাপারটা তাই ছোটবেলা থেকেই ছিল। পরে পূর্ব পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনের সেক্রেটারি হই ১৯৬৫ সালে। আমার আগে এই পদটি কার ছিল জানেন? এখনকার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ভাইয়ের। তখন পূর্ব পাকিস্তানের বৈষম্য নিয়ে মিটিং থেকে আমি ওয়াকআউট করি পর্যন্ত। পাকিস্তান বাস্কেটবল ফেডারেশনে সহসভাপতি ছিলাম। ঈগলেটস ক্লাবের আমরা কয়েকজন মিলে কারদার সামার ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করি ১৪ বছর। সেখানে ডাবল সেঞ্চুরি করেই জহির আব্বাস সুযোগ পান পাকিস্তান জাতীয় দলে। পরে যতবারই ওর সঙ্গে দেখা হয়েছে, আমাকে তা মনে করিয়ে দিয়েছে।

প্রশ্ন : এমন একজন যে পরবর্তীতে বাংলাদেশ ক্রিকেটের শিকড় ছড়ানোর কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাতে আর আশ্চর্য কী!

রাইসউদ্দিন : আমি চেষ্টাটাই করে গেছি কেবল। শতভাগ আত্মনিবেদন দিয়ে সৎ চেষ্টা। আমার যেমন মনে হয়েছিল, ক্রিকেটকে কেবল ঢাকাকেন্দ্রিক রাখলে চলবে না। সে কারণে এমসিসি, শ্রীলঙ্কা, হায়দরাবাদ ব্লুজ, পশ্চিমবঙ্গ—এসব দলকে এনে নিয়ে যাই যশোর, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, চট্টগ্রামের মতো নানা জায়গায়। বিদেশিদের কাছ থেকে শেখার জন্য, ওদের নিয়ে ভয় ভাঙিয়ে দেওয়ার জন্য ঢাকা লিগে বিদেশি খেলোয়াড়ের অনুমতি প্রথম দিই আমিই; ১৯৭৫ সালে। চালু করি স্কুল ক্রিকেট। এমন অনেক কিছুই করেছি তখন। যার সুফল পরবর্তী সময়ে পেয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট।

প্রশ্ন : একটু পরিবার নিয়ে জানতে চাই। বিয়ে করেন কবে?

রাইসউদ্দিন : ১৯৭৪ সালে। স্ত্রীর নাম হাবিবা আহমেদ। আমাদের দুই সন্তান। ছেলে আশফাক আহমেদ ব্যবসা করছে গার্মেন্ট ও স্পোর্টস মার্কেটিংয়ের। মেয়ে ডক্টর নাদিয়া আহমেদ ইব্রাহিম কার্ডিয়াকের অ্যাসিসট্যান্ট রেজিস্ট্রার।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। জীবন নিয়ে এবং ক্রীড়া-সংগঠক জীবন নিয়ে তৃপ্তি কতটা?

রাইসউদ্দিন : বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাংগঠনিক অর্জনের শুরুর দিকের সবগুলো পর্যায়েই আমি বোর্ডে ছিলাম। এটি ভীষণ তৃপ্তির। আরো অনেক সন্তুষ্টির জায়গা রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশে ক্রিকেট উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য এমসিসি থেকে সম্মানসূচক আজীবন সদস্য হয়েছি সেই ১৯৮২ সালে। ওরা এটি সবাইকে দেয় না, তদ্বির করেও পাওয়া যায় না তা। এ ছাড়া বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার’ পেয়েছি। বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি, বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন আমাকে যোগ্য মনে করেছে সেরা সংগঠক হিসেবে। ১৯৮১ ও ১৯৮৪ সালে পেয়েছি সেসব পুরস্কার। এই বছর পেলাম দৈনিক প্রথম আলোর ক্রীড়া পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা। এগুলো বাংলাদেশ ক্রিকেটে আমার নিঃস্বার্থ সেবার স্বীকৃতি। মোমবাতি জ্বালানো অবস্থায় যদি বাংলাদেশ ক্রিকেটকে আঁকড়ে না ধরতাম, তাহলে এখনকার রমরমা অবস্থা হয়তো হতো না।

জীবন নিয়েও আমি সন্তুষ্ট। ভালো চাকরি করেছি। ছেলে-মেয়ে দুটোকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি। এখন অবসর জীবনেও ভালো আছি খুব। সব মিলিয়ে আফসোসের জায়গা তেমন একটা নেই।


মন্তব্য