kalerkantho


সাইকেলের চাকা থামালেন এক ‘যোদ্ধা’ নারী

১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০




সাইকেলের চাকা থামালেন এক ‘যোদ্ধা’ নারী

কাকতালীয়ভাবে বড় ছেলে শিমুল মোল্লা সাইক্লিং শুরু করেন মা ফারহানা সুলতানা শিলার ইতি টানার বছরে।

ক্রীড়া প্রতিবেদক : একেবারে অন্য রকম জীবনবোধে গড়া এক নারী। তাঁর অঙ্গে কন্যা-জায়া-জননীর রূপ ছিল। প্রথম দুটি পরিচয় তিনি অবলীলায় বিসর্জন দিয়েছিলেন খেলাকে ভালোবেসে। সেই টান কি শুধু এক খেলায়—ফুটবল, কাবাডি, অ্যাথলেটিকস, ভলিবল, সাইক্লিংয়ে বাঁধা ছিল তাঁর জীবন। শেষমেশ কাল সাইকেলের চাকাও থামিয়ে দিয়ে শিলা ধরা গলায় বলছেন, ‘আমি আর সাইকেল চালাব না। কারো মনে অজান্তে দুঃখ দিলে ক্ষমা করে দেবেন।’

 

বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ২১ বছরের সাইক্লিং ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন ফারহানা সুলতানা শিলা। ৩৮তম জাতীয় সাইক্লিংয়ে ৪০ বছর বয়সী এই সাইক্লিস্ট পাঁচটি ইভেন্টে তিনটি রুপা ও একটি ব্রোঞ্জ জিতে শেষ করেছেন, ‘এই প্রথম কোনো স্বর্ণপদক জিততে পারিনি। জীবনের শেষ ইভেন্টে ২০০০ মিটার স্ক্র্যাচ রেসে শেষ মুহূর্তে একজনের সঙ্গে ধাক্কা লেগে পড়ে গিয়ে স্বর্ণপদক মিস করেছি।’ এর পরও বিজেএমসির চ্যাম্পিয়ন সাইক্লিস্টের কোনো আক্ষেপ নেই। দীনহীন ফেডারেশনেরও হয়তো অনেক সীমাবদ্ধতা। আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেনি সাইক্লিস্টের। এর পরও তার মনে এতটুকু অতৃপ্তি নেই, ‘খেলোয়াড়দের মনঃকষ্ট থাকতে নেই। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মধ্য দিয়েই এগোতে হবে। সব সময় উপভোগের মন নিয়েই মাঠে আসতে হয় আমাদের।’ কী অসাধারণ জীবনবোধ! একমাত্র খেলাকে ভালোবাসলেই এভাবে বলা যায়। 

শিলা তারপর শুরু করলেন সেই ভালোবাসার গল্প, ‘ক্রীড়া আমার শখ এবং ভালোবাসা দুটোই। আমি আসলে আমার পরিবার থেকে বিতাড়িত। কারণ আমাদের হাজি পরিবার, এই পরিবারের কোনো মেয়ে খেলাধুলা করবে, এটা কেউ মেনে নিতে পারেনি। তাই অনেক আগেই পরিবার থেকে আমি বিতাড়িত। আমার স্যার (আব্দুল কুদ্দুস) আমাকে বিয়ে দিয়েছেন। তিনি আমার উকিল বাবাও।’ শিলার জন্মের আগেই বাবা গত হন। একটু বড় হওয়ার পর খেলাধুলায় তাঁর আগ্রহটা ভাইদের পছন্দ হয়নি। কিন্তু অন্যদের পছন্দে যে তাঁর মন বসে না। তাই ঘরছাড়া মেয়েটি কাবাডি, ফুটবল, ভলিবলে মেতে থাকেন। এরপর কোচ আব্দুল কুদ্দুসের হাত ধরে ১৯৯৬ সালে তাঁর সাইক্লিং শেখা, খেলেছেন বিজেএমসির হয়ে। এর মধ্যে স্বামীর ঘরও তাঁর সয়নি। ২০০৮ সালে নির্যাতনের শিকার হয়ে বেরিয়ে যান তিন সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে। কাকতালীয়ভাবে বড় ছেলে শিমুল মোল্লা সাইক্লিং শুরু করেন মায়ের ইতি টানার বছরে। শুরুর বছরে কোনো অর্জন না থাকলেও শিমুলের স্বপ্ন, ‘মাকে দেখেই আমি সাইক্লিংয়ে এসেছি। মায়ের মতো বড় সাইক্লিস্ট হতে চাই।’

মায়ের বড় অর্জন ২০০০ সালে দিল্লিতে এশিয়ান আন্তর্জাতিক ক্লাব কাপে দুটি রুপা ও দুটি ব্রোঞ্জ এবং চার বছর পর ২০১৪ এশিয়ান ট্র্যাক অ্যান্ড সাইক্লিংয়ে একটি রুপা ও একটি ব্রোঞ্জ জয়। ভালো ট্রেনার পেলে হয়তো আরো বড় স্বপ্ন পূরণ হতো তাঁর। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তাঁর আহ্বান, ‘সাইক্লিস্টদের ভালো ট্রেনিংয়ের সুযোগ করে দিতে হবে। আমার মনে হয় বাংলাদেশের সাইক্লিং পিছিয়ে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ আমাদের কোনো ভ্যালোড্রাম (বিশেষায়িত সাইক্লিং ট্র্যাক) নেই। বিশ্বের কোথাও দেখিনি অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকে সাইক্লিং হতে। আর অনুশীলন তো হয় আমাদের কাদামাটিতে।’ ট্র্যাকের সীমাবদ্ধতা আর স্বজনদের উপেক্ষা সয়ে শিলা ২১ বছরের সাইক্লিং জীবন শেষ করে এবার নতুন লড়াইয়ে নামার কথা ভাবছেন, ‘আশুলিয়ায় আমার ছোট একটা জায়গা আছে। সেখানে সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের নিয়ে একটা কুটির শিল্প গড়ার কথা ভাবছি।’ নিজের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ জীবনের শিক্ষা এটা!



মন্তব্য