kalerkantho


ওয়ার্নির ওপর দিয়েও ঝড় বইয়ে দিয়েছি

২১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ওয়ার্নির ওপর দিয়েও ঝড় বইয়ে দিয়েছি

প্রশ্ন : স্পিন খেলায় আপনি এমনই ওস্তাদ ছিলেন যে শেন ওয়ার্নও কখনো আপনাকে আউট করতে পারেননি। তা সর্বকালের সেরা লেগ স্পিনারকে নিজের উইকেটবঞ্চিত রাখার রহস্য জেনেই শুরু করতে চাই।

আশাঙ্কা গুরুসিনহা : (হাসি...) আসলে আমি অরবিন্দ ডি সিলভা কিংবা সনাৎ জয়াসুরিয়ার মতো চটকদার ব্যাটসম্যান ছিলাম না কখনোই। খুব বেশি ঝুঁকিও তাই আমি নিতাম না। ওয়ার্নিকে উইকেট না দেওয়ার সম্ভাব্য যে কারণগুলো, এর মধ্যে এটিও একটি। আমি ওর বিপক্ষে ভালো ব্যাটিং করতাম, ওকে বেশ পড়তেও পারতাম। আমি জানতাম যে ও কী করতে চলেছে। জানতাম বলেই ব্যাটিংয়ে সেটি কাজে লাগত। নিঃসন্দেহে সর্বকালের অন্যতম সেরা বোলার। তবে বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে ওর বোলিং অত ভালোও ছিল না। তো সেটিও আমার পক্ষে গেছে।

প্রশ্ন : নিজেই বললেন যে অরবিন্দ কিংবা জয়াসুরিয়ার মতো চটকদার ব্যাটসম্যান আপনি ছিলেন না। তাই বলে আগ্রাসী চেহারায় তো আপনাকেও কম দেখা যায়নি।

গুরুসিনহা : হ্যাঁ, আক্রমণাত্মক ব্যাটিং আমিও করতাম। কিন্তু ওই যে বললাম আমার ব্যাটিংয়ের মূল ব্যাপারই হলো ধৈর্য। আমি লম্বা সময় ধরে ব্যাটিং করতে পারতাম। সে জন্যই তেমন একটা ঝুঁকিও আমাকে নিতে হতো না। তবে চাইলে যখন-তখন চড়াও হওয়া ব্যাটিংও আমি করতে পারতাম। কোনো কোনো ম্যাচে তো ওয়ার্নির ওপর দিয়েও ঝড় বইয়ে দিয়েছি আমি। তবে ম্যাচ পরিস্থিতি দাবি করলেই শুধু আমি ওরকম ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নিতাম। আগেও বললাম যে বাঁহাতিদের বিপক্ষে সে অত ভালো বোলারও ছিলাম না, ওর রং’আনটাও (উল্টোটা) বিশেষ কার্যকর ছিল না। ওর বোলিংটাই ছিল মূলত লেগস্পিন ও ফ্লিপার নির্ভর। সুতরাং আপনি ওকে সোজা ব্যাটে খেললে রান হয়তো একটু কম পাবেন আবার ওয়ার্নিকে সামলে লম্বা সময় ব্যাটিংও করতে পারবেন।

প্রশ্ন : অরবিন্দ বা জয়াসুরিয়ার কথা যখন উঠলই, তখন এই সুযোগে আরেকটি প্রসঙ্গ তুলতেই হচ্ছে। ১৯৯৬-তে শ্রীলঙ্কাকে বিশ্বকাপ জেতানোর জন্য ওই দুজনই সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব পেয়ে থাকেন। লোকে তাঁদের নিয়েই কথা বলে বেশি। অথচ ওই বিশ্বকাপে আপনিও ৩০০-র বেশি রান করেছেন। তা নিজেকে কি কখনো কখনো ‘আনসাং হিরো’ মনে হয় আপনার?

গুরুসিনহা : (হাসি...) ‘আনসাং হিরো’ ব্যাপারটিই তো আমি বুঝি না। দলের জন্য আমি আমার কাজটা করেছি। সেই কাজ যে আমি করতে পারব, তা নিয়ে সতীর্থদের মনেও কোনো সংশয় ছিল না। লোকে না বলুক, ওরা সব সময়ই বিশ্বকাপ জয়ে আমার অবদান নিয়ে কথা বলে। আর আমার কাছে এটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাইরের লোকের ভাবনায় আক্রান্তই হই না আমি।

প্রশ্ন : সর্বকালের অন্যতম সেরা লেগস্পিনারকে নিয়ে কথা বললাম। এবার আসি টেস্টে সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক মুত্তিয়া মুরালিধরন প্রসঙ্গে। আন্তর্জাতিক ম্যাচে না হলেও নেটে এই অফস্পিনারকে আপনি খেলেছেন। সম্ভবত ক্লাব ক্রিকেটেও খেলেছেন। তা মুরালিকে কেমন সামলাতেন, সেটিও যদি একটু শুনতে চাই?

গুরুসিনহা : ওর বিপক্ষে খুব বেশি যেহেতু খেলা হয়নি, তাই বলা মুশকিল। এই মুহূর্তে খুব বেশি মনেও পড়ছে না। তবে হ্যাঁ, এটা মনে আছে যে নেটেও ওকে সামলানোটা সত্যিকারের চ্যালেঞ্জই ছিল। নেটেও সে উইকেট পেতে চাইত। এটাই ছিল ওর বোলিংয়ের ধরন। মানসিকতাও গড়ে উঠেছিল সেভাবেই। এ জন্যই ও সর্বকালের অন্যতম সেরা বোলার হতে পেরেছে। ও শুধুই উইকেট নিতে চাইত। তবে আপনি যখন প্রতিদিনই একজনকে নেটে খেলবেন, তখন অনেকটাই অভ্যস্ততা তৈরি হয়ে যাবে। মুরালির ক্ষেত্রে আমারও হয়েছিল তা-ই।

প্রশ্ন : তাহলে এই সুযোগে এটিও জেনে নিতে হয় যে আপনার খেলা কঠিনতম স্পিনার কে?

গুরুসিনহা : অবশ্যই পাকিস্তানি লেগস্পিনার আব্দুল কাদির। মুরালির কথা বলবই না কারণ আমি ওর সঙ্গেই খেলেছি। ওর বিপক্ষে খুব খেলাও হয়নি আমার। হ্যাঁ, কাদিরের বল খেলতেই সবচেয়ে বেশি সমস্যা হতো আমার।

প্রশ্ন : বিশ্বকাপ জেতার বছরখানেকের মধ্যেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। তা এত আগে অবসরে যাওয়া নিয়ে আফসোস হয় এখন?

গুরুসিনহা : নাহ্, কোনো আফসোসই নেই আমার। হ্যাঁ, আমার ক্যারিয়ার আরো দীর্ঘ হতে পারত। অন্তত আরো তিন-চার বছর তো বটেই। তাই বলে আক্ষেপও নেই। ওই সময় পরিবারের সঙ্গে কথা বলেই অস্ট্রেলিয়ায় থিতু হওয়ার এবং নতুন জীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

প্রশ্ন : ওই সিদ্ধান্তে তো বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক অর্জুনা রানাতুঙ্গার সঙ্গে মনোমালিন্যের ব্যাপার ছিল বলেও জানি। উনি আপনাকে দেশে ফিরে অনুশীলনে যোগ দিতে বলেছিলেন আর আপনি না এসে মেলবোর্নে ক্লাব ক্রিকেট খেলাতেই আগ্রহী ছিলেন বেশি। রানাতুঙ্গার সঙ্গে দেখা হলে কি এখনো ওই বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি বোধ করেন?

গুরুসিনহা : (হাসি...) আমাদের মধ্যে আসলে এসব নিয়ে কোনো কথাই হয় না। আর আমরা খুব ভালো বন্ধুও। হ্যাঁ, আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল। তাই বলে তো আর সেটি নিয়ে সারা জীবন পড়ে থাকা যায় না। দেখা হলে আমাদের মধ্যে অনেক কথা হয়, অনেক প্রসঙ্গও উঠে আসে। তবে ওই বিষয়টি অবশ্যই নয়।

প্রশ্ন : অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হওয়ার পর শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের সঙ্গে তেমন কোনো যোগাযোগই রাখেননি বলা চলে। তা এত বছর পর ম্যানেজার হিসেবে ফেরার কারণ কী?

গুরুসিনহা : দুজনের কারণেই ফিরেছি। একজন আমার বন্ধু অরবিন্দ, যে কিনা এখন বোর্ডের ক্রিকেট কমিটিরও চেয়ারম্যান। ওর পাশাপাশি বোর্ডের প্রেসিডেন্ট থিলাঙ্গা সুমাথিপালাও চাইছিলেন যেন ফিরে দেশের ক্রিকেটের কাজে লাগি। আর আমারও মনে হলো তরুণ এবং অভিজ্ঞ দলটির সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা বিনিময় করার এটিই সেরা সময়।

প্রশ্ন : বাংলাদেশকে কেমন দেখলেন? কোন খেলোয়াড় নজর কাড়লেন বেশি?

গুরুসিনহা : অনেক উন্নতি করে দুর্দান্ত এক দল হয়ে উঠেছে। আর কোচ হিসেবে আমার বন্ধু হাতুরাসিংহেও কাজ করছে দারুণ। কঠিন পরিস্থিতি থেকে আরো কিছু ম্যাচ বের করতে পারলেই তারা আরো বেশি দক্ষ হয়ে উঠবে। খেলোয়াড়দের মধ্যে আমার নজর সবচেয়ে বেশি কেড়েছে অধিনায়ক মুশফিকুর। সাকিবও আগ্রাসী ও এন্টারটেইনিং খেলোয়াড়। তৃতীয় দিনে (পি সারা ওভাল টেস্টে) ও-ই তো ব্যাট হাতে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিল। তরুণ ফাস্ট বোলার মুস্তাফিজেও আমি মুগ্ধ।


মন্তব্য