kalerkantho


‘বোলিংয়ের সাকিব আর আগের সাকিব নেই’

১৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



‘বোলিংয়ের সাকিব আর আগের সাকিব নেই’

তাঁর জন্য অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের কাউকে কাউকে দরদর করে ঘামতে দেখেই বললেন, ‘এই সময়টায় শ্রীলঙ্কায় এরকম প্রচণ্ড গরমই পড়ে। ’ নিজের দেশ বলে কথা! চন্দিকা হাতুরাসিংহে তো জানবেনই।

এখানকার আলো-হাওয়ায় বড় হওয়া বাংলাদেশ দলের হেড কোচের অজানা নয় শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন টেস্ট ভেন্যুর উইকেটের চরিত্রও। জানেন বলেই ১৫ মার্চ থেকে পি সারা ওভালে শুরু হতে যাওয়া বাংলাদেশের শততম টেস্টের একাদশে কোনো পরিবর্তন আসতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মনে হলো এখানকার উইকেটও হাতের তালুর মতোই চেনা তাঁর, ‘শততম টেস্ট বলে নয়, এখানকার কন্ডিশনের কারণে একাদশে পরিবর্তন অবশ্যই আনা হবে। ’

কিন্তু সমস্যা হলো নিজের দেশে ফিরে যেমন তিনি চেনা ব্যাপারগুলো একে একে মিলিয়ে নিতে শুরু করেছেন, তেমনি চেনা বাংলাদেশ দলের কাউকে কাউকে নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এবং অবস্থানও বদলাতে শুরু করে দিয়েছে। যদিও দলসংশ্লিষ্টরা ঘন ঘন তাঁর অবস্থান বদলের সঙ্গে অপরিচিত নন। দলের অন্দরমহল ছেড়ে যে খবর খুব বাইরেও আসে না। তবে প্রকাশ্যে বলা অনেক কথাও তাঁকে পরে দিব্যি চেপে যেতে দেখা গেছে! গত অক্টোবরে চট্টগ্রামের এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিসিবি একাদশের দুই দিনের প্রস্তুতি ম্যাচের সময় নিজ দলের ২০ উইকেট তুলে নেওয়ার সামর্থ্য নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছিলেন হাতুরাসিংহে।   

অথচ সে কথা বলতে না বলতেই চট্টগ্রামে সিরিজের প্রথম টেস্টেই ইংল্যান্ডের ২০ উইকেট তুলে নিয়েছিল বাংলাদেশ। ঢাকায় পরের টেস্টে ঐতিহাসিক জয়েও আরেকবার বোলারদের সে সাফল্য। যে সাফল্যের হাওয়ায় উল্টো ঘুরে পরে হাতুরাসিংহে দাবি করেছিলেন, তিনি ওরকম কিছু নাকি বলেনইনি! আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওই দুই টেস্টের সিরিজের সেরা বোলার মেহেদী হাসান মিরাজ হলেও দলের জন্য সাকিব আল হাসানেরও বিশেষ অবদান ছিল।

২২ রানে হারা চট্টগ্রাম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ৮৬ রানে ৫ উইকেট নেওয়া এই বাঁহাতি স্পিনার দুই ইনিংস মিলিয়ে নিয়েছিলেন ৭ উইকেট। ঢাকায় ৭৭ রানে ৬ উইকেট নিয়ে ম্যাচ জয়ের নায়ক অফস্পিনার মিরাজের পাশে কম উজ্জ্বল ছিলেন না সাকিবও। ৪৯ রান খরচায় ৪ উইকেট নেওয়ার পথে ইংলিশ অলরাউন্ডার বেন স্টোকসকে বোল্ড করে দেওয়া তাঁর ‘স্যালুট’ তো পরের কিছুদিন ক্রিকেট বিশ্বেরই মূল আলোচ্য হয়ে উঠেছিল।

নিজের বোলিং সামর্থ্যের জন্য অবশ্য এখন আর হাতুরাসিংহের ‘স্যালুট’ পাচ্ছেন না সাকিব। পাচ্ছেন না বলেই অক্টোবরের ইংল্যান্ড সিরিজে তাঁর বোলিং পারফরম্যান্স প্রাসঙ্গিকভাবে তুলে আনা হলো। এরপর আর দুটি সিরিজের মাত্র তিনটি টেস্ট খেলেই শ্রীলঙ্কায় এসেছে বাংলাদেশ। এসে খেলা গল টেস্টের দুই ইনিংসেই ১০০-র বেশি রান (১০০ ও ১০৪) খরচ করা সাকিব ছিলেন নিষ্প্রভ। আর তাতেই কি তাঁকে নিয়ে অবস্থান বদলে গেল হাতুরাসিংহের? গল টেস্টে হারের পরপরই কলম্বোর পথে যাত্রা করা দল গতকাল পি সারা ওভালে ঐচ্ছিক অনুশীলন করল, আর তাঁর এক ফাঁকে এসে হেড কোচ জানিয়ে গেলেন সাকিবের বিষয়ে তাঁর সবশেষ দৃষ্টিভঙ্গি।

বোলিংয়ের সাকিব নাকি আর আগের সাকিব নেই! সত্যি সত্যিই বললেন অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হওয়া এই শ্রীলঙ্কান, ‘২০১০ সাল থেকে যে সাকিবকে আমরা দেখে এসেছি, যে কিনা অনুকূল কন্ডিশনে দলকে টেনে নিত, সেই একই সাকিব কিন্তু আর নেই। ’ সুবাদে এই প্রশ্নও এখন উঠে যাওয়া বিচিত্র নয় যে গল টেস্টে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মতো কোচেরও ধৈর্যচ্যুতি ঘটল কি না! একেই ইংল্যান্ড সিরিজ খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, এরপর নিউজিল্যান্ডেও ক্রাইস্টচার্চ টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৫০ রানে ৪ উইকেট নিয়েছিলেন টেস্টের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। ভারতের বিপক্ষে হায়দরাবাদ টেস্টেই শুধু অনুজ্জ্বল ছিলেন বোলার সাকিব।  

এই সাকিবকে বাদ দিলে দলের বোলিং অ্যাটাকও বড্ড নাজুক মনে হচ্ছে হাতুরাসিংহের, ‘আমাদের ২০ উইকেট নেওয়ার উপায় খুঁজতে হবে। খুবই অনভিজ্ঞ বোলিং অ্যাটাক আমাদের। সাকিবকে বাদ দিয়ে হিসাব করলে বাকি চার বোলারের সম্মিলিত টেস্ট অভিজ্ঞতা মাত্র ১৫ ম্যাচের। আসলে টেস্ট ক্রিকেটে পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পেতে লড়ছে, এমন একটি দলের কাছে খুব বেশিই চেয়ে ফেলা হচ্ছে। এবং এটাই সত্যি। ’ অথচ কলম্বোতে বাংলাদেশ দলের ঠিকানা তাজ সমুদ্র হোটেলে সফরের শুরুতে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনেই না হাতুরাসিংহেকে বলতে শোনা গিয়েছিল যে শ্রীলঙ্কাকে বাংলাদেশ হালকাভাবে নিচ্ছে না!

সাকিবের বোলিংয়ে ধার কমে গিয়ে থাকলে খেলাতে পারতেন বাড়তি একজন স্পিনার। তা না খেলিয়ে তিন পেসার খেলানোর সিদ্ধান্তকেও বলছেন খুব যৌক্তিক। ওদিকে আবার গল টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমের লেগ স্টাম্পের বাইরের বল তাড়া করতে গিয়ে আউট হওয়া নিয়েও তাঁর কোনো আপত্তি নেই। সম্ভবত এ জন্যই যে অধিনায়ক এখন রানে আছেন। দলের ভেতরে হাতুরাসিংহের এরকম হাওয়ার অনুকূলে থাকা নিয়েও তো কম কানাঘুষা হয় না। আগের দিন গল টেস্টের গোলমেলে ব্যাটিং পারফরম্যান্সের কথা লিখেছিলাম। এই ব্যর্থতা কোচের মনোজগতেও গোলমাল বাধিয়ে দিল কিনা কে জানে! না হলে দুই সিরিজ আগের উজ্জ্বল বোলার সাকিবকে এত অবলীলায় ভুলে যান কী করে!


মন্তব্য