kalerkantho


ঘুমিয়ে পড়ার আগে মাতারা হারিকেন

১১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ঘুমিয়ে পড়ার আগে মাতারা হারিকেন

গল থেকে প্রতিনিধি : কলম্বোয় তিনি ‘কিউবা’ নামের যে রেস্তোরাঁটি চালান, সেটি আবার নাইট ক্লাবও। আগের দিন রাতে সেখানেই গভীর রাত অব্দি কাটিয়ে থাকবেন হয়তোবা। তার ওপর টেস্টের চতুর্থ দিনের খেলা ধরতে সাত সকালে নিজেই গাড়ি চালিয়ে এসেছেন গলে। সব মিলিয়ে ক্লান্তিতে বুজে আসতে চাওয়া দুই চোখ দুপুরের পর আর সামাল দিয়ে রাখতে পারলেন না তিনি। প্রেস বক্সের পাশেই শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের নির্বাচকদের জন্য সংরক্ষিত রুমে পর পর সাজানো চেয়ারে লম্বা হয়ে ঘুমিয়েই পড়লেন সনাৎ জয়াসুরিয়া!

এটিকে প্রতীকী একটি দৃশ্য বলে ধরতেই পারেন। কারণ গত কিছুদিন ধরে এই প্রশ্নটিও উচ্চারিত হচ্ছে যে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটও ঘুমিয়ে পড়ল কি না? ১৯৯৬-তে শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম রূপকাররা একে একে বিদায় নেওয়ার পরও তাঁদের ক্রিকেট কোনো সংকটে পড়েনি। বরং অর্জুনা রানাতুঙ্গা, অরবিন্দ ডি সিলভা ও জয়াসুরিয়াদের ছাড়াও শ্রীলঙ্কা বিশ্ব ক্রিকেটে কর্তৃত্ব করেছে। কারণ তাঁদের বিদায়ের আগে-পরে হাল ধরার জন্য তৈরিই ছিলেন কুমার সাঙ্গাকারা ও মাহেলা জয়াবর্ধনেরা। ঘুমিয়ে পড়ার আগে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপেও তাই জয়াসুরিয়াকে গর্ব করেই বলতে শোনা গেল, ‘এরপর (১৯৯৬-এর পর) আমরা হয়তো বিশ্বকাপ জিতিনি আর, তবে টানা দুইবার ফাইনাল (২০০৭ ও ২০১১) খেলেছি। একবার খেলেছি সেমিফাইনালও (২০০৩)। সব সময় যে জিততেই হবে, এমনও তো কোনো কথা নেই।

কাজেই আমার মনে হয় শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট আছে ঠিক পথেই। ’

কিন্তু এত দিন যাঁরা ঠিক পথে রেখে এসেছেন, সেই সাঙ্গাকারা-মাহেলারাও গেছেন অবসরে। এই কিংবদন্তিদের বিদায়ে তৈরি হওয়া শূন্যতা সহসাই পূরণ হওয়ার নয়। ব্যাপারটি অনেক সময়সাপেক্ষ বোঝাতেই হয়তো জয়াসুরিয়া বললেন, ‘আমরা তো আরেকটি অরবিন্দ ডি সিলভাই এখন পর্যন্ত পেলাম না। ’ আর সাঙ্গাকারা-মাহেলারা তো গেলেন এই সেদিন। এখনকার তরুণদের মধ্যে কেউ অচিরেই ওই মানের হয়ে উঠবেন, নেই সেই নিশ্চয়তাও। কাজেই লঙ্কান ক্রিকেটেরও ঘুমিয়ে পড়ার একটা আশঙ্কা আছে। কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে জয়াসুরিয়া যখন আবার পুরোদস্তুর প্রধান নির্বাচকের ভূমিকায়, তখন তো আশাহত হলে চলে না। দূরের বাতিঘরটা এ জন্যই দেখতে হলো তাঁকে, ‘রাতারাতি তো আর ওদের (সাঙ্গাকারা-মাহেলা) শূন্যতা পূরণ হবে না। এখন যারা আছে, তাদের অভিজ্ঞ হওয়ার সুযোগটা দিতে হবে। তাহলেই না একদিন ওদের নিয়েও কথা বলতে হবে আমাদের। ’

হতে পারে তাঁদের একজন হতে পারেন কুশল মেন্ডিসও। যাঁকে আপাতত বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের জন্য উদাহরণ হিসেবেই দাঁড় করিয়ে দিলেন ১৯৯৬-এর বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়, ‘বাংলাদেশ খুব ভালো করছে। উন্নতি করে সামনের দিকে এগিয়েও যাচ্ছে। কিন্তু টেস্টে সেট হয়ে বড় ইনিংস খেলতে না পারা ভালো ব্যাপার নয়। এখানে কেউ ফিফটি করলে তাকে সেঞ্চুরি করতে হবে, সেঞ্চুরি করলে খেলতে হবে আরো বড় ইনিংস। এটি পুরোপুরি মানসিক ব্যাপার। কেউ সুযোগ পেলে তার উচিত কুশল মেন্ডিসের মতো বড় সেঞ্চুরি করা। ’ বাংলাদেশের বিপক্ষে এই গল টেস্টেই ১৯৪ রানের ইনিংস খেলার আগে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৭৪ ছিল মেন্ডিসের ক্যারিয়ার সর্বোচ্চ। অবশ্য ১১০ টেস্টের ক্যারিয়ারে জয়াসুরিয়ার নিজেরও বড় ইনিংসের অভাব নেই কোনো।

সম্ভবত এ জন্যই টি-টোয়েন্টি বিষয়ক আলোচনায় খুব একটা আগ্রহী হলেন না। যদিও তাঁর ব্যাটিংয়ের ধরন ছিল সংক্ষিপ্ততম সংস্করণের জন্য আদর্শ। আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের জন্য ‘মাতারা হারিকেন’ নাম পেয়ে যাওয়া এ ব্যাটসম্যানের ৩১ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারও আছে। তবে তিনি অবসরে যাওয়ার পর যখন ক্রমেই এই ফরম্যাট আরো জাঁকিয়ে বসছে, তখন আফসোস হয় নিশ্চয়ই? জয়াসুরিয়ার উত্তরটা শুনুন, ‘টি-টোয়েন্টি সবাই উপভোগ করে। করি আমিও। তবে আমার কাছে টেস্ট ক্রিকেটই সবার আগে। আর হ্যাঁ, আমি আক্রমণাত্মক হলেও আমার ব্যাটিংয়ের ধরন সব ফরম্যাটের জন্যই উপযোগী ছিল। ’ এই কথা যখন বলছেন, তখন মনে মনে হয়তো ১৯৯৭-এর আগস্টের প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামেও এক পাক ঘুরে এসেছেন। যেখানে ভারতের বিপক্ষে খেলা তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ার সর্বোচ্চ ৩৪০ রানের ইনিংসটি সব ফরম্যাটেই জয়াসুরিয়ার উপযোগিতার আদর্শ দলিল হয়ে আছে।

দীর্ঘ ক্যারিয়ার অনেক পেছনে ফেলে এলেও কিছু ব্যাপার এখনো আগের মতোই। যেমন আগের মতোই মুণ্ডিত মস্তক জয়াসুরিয়া অবশ্য এখন আর রাজনীতিক নন। নিজের এলাকা মাতারা থেকে ইউনাইটেড পিপলস ফ্রিডম অ্যালায়েন্সের (ইউপিএফএ) মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের মন্ত্রিসভায় ডাক বিভাগের উপমন্ত্রীর পদও পেয়েছিলেন। অথচ সবশেষ সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করেননি আর। সে প্রসঙ্গ তুলতে না তুলতেই থামিয়ে দিলেন, মুখ কিছুটা অন্ধকার করে বললেন, ‘চলুন, ক্রিকেট নিয়েই শুধু কথা বলি। ’ তাঁর বর্ণময় ক্রিকেট জীবনের ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট পর্ব তুলতেই অবশ্য অন্ধকারে আলো ফুটল। এবার হাসি ফুটল মুখে, ‘আমার ক্লাব মোহামেডান। ওদের হয়ে সময়টা খুব উপভোগ করেছি। ওরাও আমার খুব ভালো দেখাশোনা করেছে। ’ প্রতীকী দৃশ্য হিসেবে এখনকার শ্রীলঙ্কার সঙ্গে যাক বা না যাক, জয়াসুরিয়ার ঘুমিয়ে পড়ার সঙ্গে কিন্তু মোহামেডানের বর্তমান ক্রিকেট দলটা খুব যাচ্ছে। একসময়ের পরাক্রমশালী দল যে এখন শিরোপার লড়াইয়েই থাকে না!


মন্তব্য