kalerkantho


কোচ বললেন, তোর নাম দিলাম চিতাবাঘ

১০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



কোচ বললেন, তোর নাম দিলাম চিতাবাঘ

মনু নামটা স্মৃতির দুয়ার খুলে দিয়ে এক ঝটকায় নিয়ে যাবে ৩০-৩২ বছর আগে। ঢাকা স্টেডিয়ামের কোনো এক বিকেল, গ্যালারিতে গিজগিজ করছে মানুষ, এই আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ শুরু হলো বলে! সেই বুনো বিকেলে আবাহনীর টেনশনে মনু, মোহামেডানের শিহরণে মনু।

সামান্য-সাধারণ খেটে-খাওয়া মনুই কয়েক বছর আবাহনী-মোহামেডানের মহারণে ছিলেন নায়কের বেশি কিছু। চিরকাল ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখার মতো দু-দুটি গোল আছে আবাহনীর বিপক্ষে, আছে এমন আরো অনেক গোল। অনেক দৌড়। অনেক ড্রিবলিং। নোমান মোহাম্মদ বহু প্রার্থিত সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে যে মনির হোসেন মনুকে আবিষ্কার করলেন, তাঁকে যেন ঠিক বর্তমানে মানায় না। মানায় সেই বিকেলে, সেই উত্তেজনায়, সেই আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে!

 

প্রশ্ন : আপনার প্রসঙ্গ উঠতেই পুরনো দিনের ফুটবলপ্রেমীদের চোখে ভেসে ওঠে অপূর্ব সেই তিনটি গোল। ঢাকা লিগে মোহামেডানের হয়ে আবাহনীর বিপক্ষে পর পর দুই বছর এবং প্রেসিডেন্ট গোল্ড কাপে বাংলাদেশ সাদা দলের জার্সিতে চীনের বিপক্ষে গোলটি। এই গোলগুলো দিয়েই সাক্ষাৎকারটি শুরু করি?

মনির হোসেন মনু : আমাকে তো ‘মনু’ বানিয়েছে ওই গোলগুলোই। তবে তিনটি না, সঙ্গে আরো একটি গোল আছে।

ইস্টবেঙ্গলের বিপক্ষে গোলের কথা ভুলে গেলেন? ওদের গোলরক্ষক ভাস্কর গাঙ্গুলি বোকা হয়ে যায় একেবারে।

প্রশ্ন : এই চার গোলের মধ্যে আপনার নিজের সবচেয়ে প্রিয় কোনটি?

মনু : ১৯৮৬ সালে আবাহনীর বিপক্ষে গোলটি।

প্রশ্ন : কেন?

মনু : কেন? সেই ছোটবেলা থেকে মোহামেডানের জানদার সমর্থক আমি। সাদা-কালো জার্সিতে খেলাই আমার জন্য বিরাট সম্মানের। তার ওপর আবাহনীর বিপক্ষে গোল। খুশির কি কোনো শেষ আছে!

প্রশ্ন : না মানে জানতে চাইছিলাম, ওই গোলটিই সবচেয়ে প্রিয় কেন? আবাহনীর বিপক্ষে আগের বছরও তো গোল দিয়েছিলেন...

মনু : তা ঠিক। ওই গোলটি কেন প্রিয়? কেন সেরা? ৪০ গজ দূর থেকে শট মেরে গোল দিয়েছি, এটি একটি কারণ। আরেক কারণ হয়তো ওই ম্যাচে আমাদের জেতার কথা ছিল না। শিরোপার জন্য মোহামেডানের জিততেই হবে, ওদের ড্র করলে চলবে। আবাহনী সেবার অনেক ভালো দল। প্রেমলাল আড়াই প্যাঁচের ডজ মারে, পাকির আলী অসাধারণ খেলে, আসলাম ভাইয়ের মাথায় বল লাগালে গোল। তুলনায় মোহামেডান বেশ দুর্বল। বাদল ভাই, সালাম ভাই এমন কয়েকজন শুধু। তার ওপর ওই ম্যাচের আগে চিমা, মনোরঞ্জন, ভাস্কর গাঙ্গুলির মতো ফুটবলার ওরা নিয়ে আসে। মোহামেডানের অফিশিয়াল, কর্মকর্তা, সমর্থক সবাই তাই ধরে নেয়—আমরা হেরে যাব।

প্রশ্ন : আপনিও তাই ভেবেছিলেন?

মনু : আমি কখনো হেরে যাওয়ার কথা ভাবতাম না। এখানে মজার কিছু ঘটনা বলি। ম্যাচের দিন সকাল ১১টায় ক্লাবে আসেন মন্ত্রী স্বপন ভাই; উনি তখন মোহামেডানের প্রেসিডেন্ট। আমার পেটে ঘুষি মেরে বলেন, ‘এই যে আমার ম্যারাডোনা আছে। ও আজ গোল করবে। আর আমরা দুই গোলে জিতব। ’ ক্লাব থেকে বেরোনোর সময় দেখি খাটিয়ায় করে একজনের লাশ নিয়ে যাচ্ছে। আমি তখন থেকে মাজারভক্ত; এখনো তেমন আছি। লাশ দেখলে যাত্রা শুভ হয়—এমন একটি ব্যাপার বিশ্বাস করতাম। অধিনায়ক বাদল ভাইকে বললাম, ‘ভাই, লাশ দেখে ক্লাব থেকে বেরোচ্ছি, আজ অবশ্যই আমরা জিতব। ’ উনি বলেন, ‘মনু, তুই এসব কী বলিস?’ আমি বলি, ‘হ্যাঁ, আপনি চিন্তা করবেন না। জিতে গেছি। ’ এরপর আমরা পুরো দল হাইকোর্ট মাজার, মিরপুর মাজারে গেলাম। ফিরে এসে মাঠে গিয়েই তো ওই গোল।

প্রশ্ন : গোলটি কিভাবে হয়, একটু যদি স্মৃতিচারণা করেন...

মনু : মাঠে ঢোকার সময় দেখি, আমাদের গ্যালারিতে সমর্থকদের মুখ শুকিয়ে আছে। কারো মুখে হাসি নেই। তখন মনে হলো, আমিও তো একসময় সমর্থক হয়ে ওই গ্যালারিতে বসে খেলা দেখেছি। আজ ওদের আনন্দ দিতে হবে। চিমা যখন ‘কলার’ ঝাড়া দিয়ে মাঠে নামে, ওদের গ্যালারি থেকে চিৎকার ওঠে ‘চিমা চিমা’। সাংবাদিকরাও ছোটে ওদের ছবি তুলতে। আমাদের পাত্তাই দেয় না। আমি একজনকে ডেকে দুষ্টুমি করে বলি, ‘কী ভাই, শুধু ওদের ছবি তোলেন কেন?’

প্রশ্ন : গোলটির পাস পান কার কাছ থেকে?

মনু : আগের পাঁচ-দশ মিনিট তো কোনো পাসই পাইনি। মেজাজ গরম, মাথামুথা খারাপ। মিডফিল্ডের ইলিয়াস ভাই বল ছাড়েন না। হঠাৎ কায়সার হামিদের একটি থ্রু বল পাই লাইনে। মাঝমাঠের একটু পর, আবাহনীর গোললাইন থেকে অনেক দূরে। ওই সময়ে বল নিয়ে টান দিতেই এনায়েত ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। আগেই বললাম না, আমি গ্যালারিতে বসে মোহামেডানের জন্য গলা ফাটানো সমর্থক। এনায়েত ভাইয়ের শ্যুটিংয়ের খুব ভক্ত। তা ছাড়া আগের বছর উনি আমাদের কোচ ছিলেন। তখন বলতেন, ‘চেষ্টা করবে সব সময়। চেষ্টা না করলে তো গোল হবে না। ’ কায়সারের বল পেয়ে তাই মনে হলো, চেষ্টা করে দেখি না। একটা কাট করেই বল মেরে দিই ‘ধাম’ করে। ওদের গোলরক্ষক ভাস্কর গাঙ্গুলি বুঝেও নাই কী হলো!

প্রশ্ন : এরপর?

মনু : এরপর আমার মরে যাওয়ার অবস্থা। সবাই এসে যে খুশিতে ওপরে উঠে যায়, পাঁচ মিনিট উঠতেই পারিনি। আমার এক বন্ধু আহমেদ। ও পরে বলেছে, ‘মনু, তুই যখন গোল দিয়েছিস, ভিআইপি গ্যালারিতে তালি দিয়েছে প্রেসিডেন্ট এরশাদ। মনটা ভরে গিয়েছে। আমার বন্ধুর জন্য দেশের প্রেসিডেন্ট তালি দেয়! দোস্ত, তুই আমাদের গর্ব। ’ আমার মাইনাস থেকে ইলিয়াস ভাই আরেক গোল করে। জিতে যাই দুই গোলে। ক্লাবে ফেরার পর সমর্থকরা আমাকে পারে না মেরে ফেলে! মোহামেডানের বেশির ভাগ সমর্থক তো পুরান ঢাকার। সারাক্ষণ পান খায়। ওরা মুখে পিক নিয়েই আমাকে চুমা দিতে থাকে। আমার মুখ-জার্সি সব পানের পিকে লাল। তবু আমি খুশি। কারণ সমর্থকরাই তো সব; ওদের ছাড়া ফুটবলের কী মানে? দর্শক তালি না দিয়ে শিল্পী কি গান গেয়ে মজা পায়?

প্রশ্ন : আবাহনীর ভারতীয় গোলরক্ষক ভাস্কর গাঙ্গুলি নাকি খেলা শেষে মাঠে দাঁড়িয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলেছেন অনেকক্ষণ। কী বলেছিলেন, মনে আছে?

মনু : ওরা তো মাঠ থেকে ড্রেসিংরুমের দিকে যেতে পারছিল না। আবাহনী সমর্থকরা ঢিল-টিল ছুড়ছিল। সে কারণে ভাস্কর গাঙ্গুলি দাঁড়িয়ে ছিল। এটুকু মনে আছে, আমার সঙ্গে কথা বলার সময় গোলটির প্রশংসা করেছিল।

প্রশ্ন : পরে এই গোলরক্ষক ক্যারিয়ারের শেষ দিকে ভারতের বিখ্যাত ক্রীড়া ম্যাগাজিন ‘স্পোর্টস ওয়ার্ল্ড’-এ এক সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তাঁর ক্যারিয়ারে হজম করা সেরা যে চারটি গোলের উল্লেখ করেন, এর মধ্যে আছে আপনার করা সেই গোল। এই ঘটনা আপনার মনে আছে?

মনু : নাহ্্। তবে যে গোল দিয়েছিলাম সেদিন, তাতে ভাস্কর গাঙ্গুলির উপায় ছিল না, সেরা গোলগুলোর মধ্যে আমারটা না রাখা।

প্রশ্ন : আগের বছরও তো আবাহনীর বিপক্ষে গোল দিয়েছিলেন?

মনু : ওদের বিপক্ষে খেলার সময় আমার জিদ থাকত অন্য রকম। তবে সত্যি কথা বলি, ’৮৫ সালের সেই গোলটি কিন্তু আমি দিতে চাইনি।

প্রশ্ন : মানে!

মনু : মানে গোল করার জন্য তা মারিনি। রাইট উইং থেকে ক্রস করি এমনভাবে যেন বলটি সালাম ভাই অথবা বাদল ভাইয়ের মাথায় পড়ে। স্ক্রু হয়ে বল যায় ঘুরে; ঢুকে যায় জালে। ওদের গোলরক্ষক চন্দ্রসিড়ি বোঝেই নাই। আরে ভাই, ও কী বুঝবে! আমিই তো বুঝিনি (হাসি)।

প্রশ্ন : আশির দলকের ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’র কোনো এক লেখায় পড়েছি, ‘আবাহনীর বিপক্ষে শতাব্দীর সেরা গোল করেন মনু’। সেটি কি এই গোল?

মনু : এই গোলও হতে পারে, আবার পরের বছরেরটিও হতে পারে। তবে হ্যাঁ, ১৯৮৫ সালে আবাহনীর কোচ তো সালাউদ্দিন ভাই। উনি বলেছিলেন, ‘মনু যে গোল করেছে, এমন গোল ১০০ বছরে হয়নি। পরের ১০০ বছরেও হবে না। ’ কাছাকাছি ধরনের গোল করি ইস্টবেঙ্গলের বিপক্ষে, সেই ভাস্কর গাঙ্গুলিই তখন ওদের গোলরক্ষক। আমার লব সুইং করে ঘুরে হয়ে যায় গোল। ভাস্কর গাঙ্গুলিকে দুটি অসাধারণ গোল দিয়েছি। ওর তো আমাকে মনে রাখতেই হবে।

প্রশ্ন : আর বাংলাদেশ সাদা দলের হয়ে গোলটি?

মনু : এটি প্রেসিডেন্ট গোল্ড কাপে; সম্ভবত ১৯৮৭-৮৮ সালের দিকে। চীনের বিপক্ষে ম্যাচ। ওদের সব ফুটবলার ছয় ফুটের ওপর লম্বা। আমি পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি। আমাকে দেখে হয়তো ভেবেছে, এই পিচ্চি কী আর করবে! কিন্তু আমার গতি, কাটাকাটি দেখে ওদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। ওই বলটি পাই সেন্টারের একটু সামনে; মেরে দিই জোরে। ওদের গোলি বল চোখেও দেখেনি। ওই গোলেই তো পুরস্কার পাই সেরা খেলোয়াড়ের। আল বাকারা ব্যাংক এক হাজার মার্কিন ডলার দেয়।

প্রশ্ন : আপনার খেলার শক্তিশালী দিক ছিল কোনটি?

মনু : গতি ছিল কড়া। বল লাইনের ওপর রেখে দাগের বাইরে দিয়ে দৌড়াতাম। কেউ ধরতে পারত না। ঢাকা মাঠে আমি ‘হরিণ’ টাইটেল পেয়েছি; পেপারে লিখেছে। ‘চিতাবাঘ’ টাইটেল পেয়েছি। কোচ চান ভাই বলতেন, ‘মনু, তোর এত স্পিড! চীনের খেলোয়াড়রাও তোর সঙ্গে পারে না! যাহ্্, তোর নাম দিলাম চিতাবাঘ। ’ এ ছাড়া শ্যুটিং পাওয়ার ভালো ছিল। দূর থেকে শট মেরে গোল করি অনেক। আর আমার মাইনাসও মারাত্মক। একটা মাইনাস, একটা গোল। এমনভাবে মাইনাস করি যেন তা গোলি পাবে না কিন্তু স্ট্রাইকার পাবে।

প্রশ্ন : এবার একটু শুরুর কথা জানতে চাই। পরিবারের কথা, ফুটবলের সঙ্গে প্রেমের কথা।

মনু : আমার জন্ম আরামবাগ; ৫৯/১ মগার গলিতে। বাপ-মা সেভাবে দেখি নাই। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের আগেই ওনারা মারা যান। আমার ছয়-সাত বছর বয়সে মা; পরের বছর আব্বা। আব্বার নাম মহসিন মোল্লা; মায়ের নাম আম্বিয়া। আব্বা গৃহস্থি করতেন গ্রামে। জেঠারা বেঈমানি করায় উনি ঢাকা চলে আসেন। এখানে এসে একটা প্রতিষ্ঠানে ছোটখাটো চাকরি করে সংসার চালান। মা-বাবা মারা যাওয়ার পর ভাইদের সংসারে মানুষ হয়েছি আমি।

প্রশ্ন : শুনেছি যে, খুব অভাবের মধ্যে বড় হয়েছেন? এক হোটেলে নাকি কাজ করতে হয়েছে?

মনু : হ্যাঁ ভাই, সত্যি কথা। লজ্জা করার কিছু নাই। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে আমি সবার ছোট। এক ভাই তো ছোট থাকতেই মারা যায়। বাকি চার ভাই একসঙ্গে থেকেছি। ভাই-ভাবিরা আদর করতেন সত্যি কিন্তু সংসারে অনেক অভাব। সে কারণে পড়ালেখা করতে পারিনি; নানা কাজ করতে হয়েছে। আমাদের আরামবাগে ‘কাশেমের দোকান’ বলে একটা খাবারের দোকান ছিল। ওখানে কাজ করতাম। আর ফুটবল তো ভালো লাগত, ভালো খেলতাম ছোটবেলা থেকেই। তা খেপ খেলার জন্য আমাকে কোথায় পাওয়া যাবে? সবাই জানত, কাশেমের দোকানে গেলে পাওয়া যাবে মনুকে। এ ছাড়া আরামবাগে জজ ভাই নামে একজন ব্যাটারির কারখানা দিয়েছিলেন। চান্দা ব্যাটারির মতো সেটি ছিল বোয়িং ব্যাটারি। সেখানেও কাজ করেছি। আমাকে উনি আদর করতেন খুব। তাঁর ছেলে জাহাঙ্গীর এসে প্রায়ই ওর বাবার কাছে আবদার করত, ‘আব্বা, মনুকে ছুটি দেন। ওকে নিয়ে ফুটবল খেলতে যাব। ’ এভাবে কষ্ট করে মানুুষ হয়েছি কিন্তু ফুটবল ছাড়িনি। ভোর পাঁচটায় উঠে নটর ডেম কলেজে গিয়ে অনুশীলন করি। তুফান হলেও বল কাঁধে নিয়ে একা চলে যাই। দেয়ালের সঙ্গে বল মেরে মেরে করি প্র্যাকটিস।

প্রশ্ন : বিভাগীয় পর্যায়ে খেলা শুরু কিভাবে?

মনু : ১৯৮০ সালে এক বিদেশি কোচ এসে ঢাকা স্টেডিয়ামে বাচ্চা ছেলেপেলেদের অনুশীলন করায়। মালু ভাই, ফারুক ভাইরা আমাকে ঢুকিয়ে দেন সেখানে। পাইওনিয়ার লিগের সেই দল ২-২ গোলে ড্র করে চুন্নু ভাইদের জাতীয় দলের সঙ্গে। এই আমাকে মালু ভাই বলে, ‘তুই ইয়ংমেন্স ফকিরেরপুলে খেল। ’ চতুর্থ বিভাগের ওই দলে খেলা শুরু করি।

প্রশ্ন : প্রথম বিভাগে প্রথম খেলেন কবে?

মনু : আরো অনেক পরে। ১৯৮১ সালে তৃতীয় বিভাগে খেলি মন্টু ভাইয়ের মালিবাগ অভিযাত্রী ক্লাবে। ১৯৮২ সালে খেলি দ্বিতীয় বিভাগের দল বিআরটিসিতে। এখানেই আমার ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার অবস্থা হয়।

প্রশ্ন : কেন? ইনজুরির কারণে?

মনু : নাহ্্, মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবের সমর্থকদের মাইরে।

প্রশ্ন : ঘটনাটি যদি একটু বলেন...

মনু : সেবার বিআরটিসিকে চ্যাম্পিয়ন করিয়ে প্রথম বিভাগে তুলি ১২ বছর পর। আমি ১৪ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা। এ ক্ষেত্রে আমার লড়াই হয় ‘লাকি গোবিন্দদা’র সঙ্গে। উনি নামলেই গোল করতেন, এ জন্য নামের আগে বসে যায় ‘লাকি’ টাইটেল। সেবার শেষ ম্যাচের আগে এমন অবস্থা, মুক্তিযোদ্ধা ড্র করলে চ্যাম্পিয়ন আর আমাদের জিততেই হবে। ঢাকা স্টেডিয়ামে ফ্লাডলাইটে খেলা। আগামীবার কোন দল প্রথম বিভাগে খেলবে, তা নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ। গ্যালারিতে দর্শকের জায়গা হয় না। ম্যাচ শুরুর আগে সেন্টারে বল বসাতেই লাকি গোবিন্দদা ফট করে আমার পুরো চেহারায় মেরে দেন থুতু। আমি হতভম্ব। জিজ্ঞেস করি, ‘এটি কী করলেন?’ উনি গালি দিয়ে জবাব দেন, ‘চুপ কর হাউয়ার পো। আজ মাঠ থেকে যেতে পারবি না। পা কেটে রেখে দেব। ’ পাশ থেকে আমাদের দলের রনজিত্দা বলেন, ‘মনু, তুই মাইন্ড করিস না। তোকে নার্ভাস করার জন্য এটি করেছে। ’

প্রশ্ন : মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবের সমর্থকদের মারধরের কথা বলছিলেন...

মনু : তার আগে ওদের খেলোয়াড়দের মাইর। মাইরের চোটে আট-নয়বার আমি মাঠের বাইরে যাই। বরফ লাগিয়ে আবার ফিরি। এর মধ্যেই দুই গোল দিয়ে হারিয়ে দিই মুক্তিযোদ্ধাকে। ১২ বছর পর বিআরটিসি উঠে প্রথম বিভাগে। কিন্তু তা নিয়ে আনন্দ করব কিভাবে? রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই আমরা যে যেদিকে পারি, দৌড়ে যাই পালিয়ে। রাতের বেলা বিআরটিসি ক্লাবে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবের সমর্থকরা চালায় হামলা। সব কিছু ভেঙে ফেলে; সামনে যাকে পায় তাকেই মারে। আমি পালানোর সময় পাইনি। এমন মাইর শুরু হলো! আমার শুধু মনে আছে ওরা বলছে, ‘এই মনুর কারণে আমরা হেরেছি। ওকে মেরে ফেল। ’ হকি স্টিক দিয়ে মাথায় মারে। এই যে হাত দিয়ে দেখুন, এখনো এখানে কী গভীর গর্ত হয়ে আছে! তীরের মতো রক্ত বের হচ্ছিল মাথা থেকে। আর কিছু মনে নেই। ক্লাবের মধ্যে একটা ‘গাঁড়া’ আছে। সেখানে ক্লাবের বাবুর্চি ময়লা পানি, মাছের আঁশ এসব ফেলে। মুক্তিযোদ্ধার সমর্থকরা আমাকে মেরে পা ধরে সেই পাঁকের মধ্যে ছুড়ে ফেলে দিয়ে যায়। জ্ঞান ফেরে অনেক রাতে। কোনোমতে হেঁটে খালি গায়ে আরামবাগে আসি। বড় ভাই শরীফ বন্ধুদের নিয়ে মোড়ে আড্ডা দেয়। উনি দেখে দৌড়ে এসে আমাকে ধরেন। পরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে মাথায় দেওয়া হয় আটটি সেলাই। ফেলে দিই মাথার চুল। দুই মাস বিছানা থেকে উঠতে পারিনি। তখনই মনে হয়, দূর, আর ফুটবল খেলব না।

প্রশ্ন : এই অভিমান কিংবা রাগ কাটে কিভাবে?

মনু : ফুটবল আমার জীবন—এর সঙ্গে রাগ করে থাকা যায়? ঠিকই নটর ডেম কলেজে গিয়ে আবার ছেলেদের সঙ্গে খেলা শুরু করি। পরের মৌসুমে ওই বিআরটিসির হয়ে খেলি প্রথম বিভাগ।

প্রশ্ন : মোহামেডানে তো পরের বছর?

মনু : হ্যাঁ। ১৯৮৩ সালে শেরে বাংলা কাপে চ্যাম্পিয়ন করাই সিলেটকে। ফাইনালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপক্ষে আমার দুই গোল। একটিতে ৪০ গজ দূর থেকে শট মারি, গোলরক্ষক মহসিন ভাই বোঝেনইনি। রেফারি আজিজ ভাই এসে বলে, ‘গোল তো হয়ে গেছে, বল জালের ভেতরে। ’ পরে আরেকবার শেরে বাংলা কাপ খেলি ঢাকা জেলার হয়ে। সেখানেও চ্যাম্পিয়ন। ফাইনালে আসলাম ভাইদের খুলনাকে হারাই দুই গোলে। এক গোল আমার, এক গোল অপুর। যাই হোক, ওই ’৮৩-র শেরে বাংলা কাপে ভালো খেলার পর মোহামেডান থেকে প্রস্তাব পাই।

প্রশ্ন : নিশ্চয়ই লাফিয়ে ওঠেন? আপনার ছোটবেলার স্বপ্নের দলে খেলার প্রস্তাব বলে কথা?

মনু : খুশি তো অবশ্যই। পাশাপাশি আরেক কথাও ভাবছিলাম—মোহামেডানে আমি কি খেলার সুযোগ পাব? বাদল ভাই, সালাম ভাই, মোসাব্বের ভাই, কোহিনূর ভাইরা থাকতে কোচ আমাকে কেন খেলাবেন? আর জানেন কিনা, ক্যারিয়ারে তখন পর্যন্ত আমি কিন্তু স্ট্রাইকার।

প্রশ্ন : তাই নাকি!

মনু : হ্যাঁ। সে কারণেই ভাবছিলাম, মোহামেডানে গেলে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে কেবল বালতি টানতে হবে। নষ্ট হয়ে যাবে ক্যারিয়ার। তবু ভালোবাসার ক্লাবে খেলার লোভে চলে এলাম। খেলতে পারি আর না পারি, মোহামেডানের জার্সি তো পাব। আর ওই ক্লাবে গিয়েই কোচ টিপু ভাই আমাকে স্ট্রাইকার থেকে বানিয়ে দেন উইঙ্গার।

প্রশ্ন : মোহামেডানে শুরু থেকেই কি সাফল্য পেলেন?

মনু : নাহ্। বসে থাকতে হয় প্রথম তিন ম্যাচ। যদিও অনুশীলন করি খুব মনোযোগ দিয়ে। মোহামেডানের প্র্যাকটিস তখন ঢাকা ভার্সিটি মাঠে। আমার হাতের মাসল, থাই ছিল মারাত্মক। একেবারে নিগ্রোদের মতো। মহসিন ভাই, কায়সার, মানিক ভাইরা উৎসাহ দেন খুব। কিন্তু প্রথম তিন ম্যাচে আমাকে মাঠে নামানো হয়নি। চিন্তা করি, ‘কেন মোহামেডানে এলাম?’ আরামবাগে এলে বন্ধুরা গালি দেয়। যাই হোক, চতুর্থ ম্যাচটি সম্ভবত রহমতগঞ্জের সঙ্গে। সাত মিনিট বাকি থাকতে কোচ টিপু ভাই বলেন, ‘ওয়ার্মআপ কর। ’ আমি বলি, ‘এক দৌড় দিলেই তো সাত মিনিট শেষ। কী খেলব?’ তবু কোহিনূর ভাইকে তুলে আমাকে নামানো হয়। স্ট্রাইকার বাদল ভাই, সালাম ভাই। আমি রাইট আউট থেকে দুটি মাইনাস করি। তাতে গোল হয়নি। তবে ম্যাচের পর টিপু ভাই বলেন, ‘আমার যা দেখার, দেখেছি। তুই আগামী ম্যাচ থেকে শুরুতে খেলবি। ’ ওই যে সাত মিনিটের জন্য ঢুকলাম, মোহামেডানে আর এক সেকেন্ডও বসিনি। পরের ম্যাচের শুরু থেকেই খেলি একটানা।

প্রশ্ন : মোহামেডানে কত টাকা পেয়েছিলেন, মনে আছে?

মনু : এক লাখ পঁচিশ হাজার।

প্রশ্ন : আবাহনীতে খেলার প্রস্তাব পাননি কখনো?

মনু : কত বার! সালাউদ্দিন ভাই, আসলাম ভাই অনেক বলেছেন! ১৯৮৫ সালে একবার তো ওদের কাছ থেকে টাকাও নিই। পরে ফেরত দিই আবার। এ কারণে সাফ গেমসে সালাউদ্দিন ভাই আমাকে খেলায়নি। দলে ছিলাম কিন্তু মাঠে নামাননি এক ম্যাচেও। এই জিদ মজেছে আবাহনীকে হারিয়ে। ১৯৮৬ সালে আবাহনীকে হারানোর পর বন্ধু মুন্নার সঙ্গে মজার একটি ঘটনা আছে। বলব?

প্রশ্ন : বলুন না প্লিজ...

মনু : মুন্না আর আমি খুব ভালো বন্ধু। ওর কাছে শুনেছি যে, আবাহনী ক্লাবে ব্রিফিং হতো আমাকে নিয়ে। বলে দিত, ‘যেভাবেই হোক, মনুকে আটকাবি। ’ ১৯৮৬ সালের আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচের কিছু দিন পর মুন্নার সঙ্গে ঘুরতে যাই নারায়ণগঞ্জে। আবাহনীর সমর্থকরা এসে ওকে বলে, ‘মনু কী গোলটা করল! ওকে আটকাতে পারলেন না? আপনি ওর পা ভেঙে দিতেন। আর আমাদের তো মন চায়, মনুর পায়ে গুলি করে দিতে। ’ আমি মুন্নার পাশে বসা, কিন্তু ওরা আমাকে চেনেনি। ওই সময় আবাহনী-মোহামেডানের দুজনের এমন দোস্তি থাকতে পারে, সমর্থকরা ভাবতেও পারত না। তো মুন্না আমাকে চোখ টিপি দিয়ে বলে চুপ থাকতে। আবাহনীর সমর্থকদের কথাবার্তা শুনে মজা পাই বেশ। আধঘণ্টা পর চা-মোগলাই খাওয়া শেষে মুন্না আমাকে দেখিয়ে বলে, ‘এইটা কে?’ আমি পিচ্চি পোলা, ওরা চেনেনি। মুন্না বলে দেয়, ‘আরে, এটাই তো মনু। ’ ওরা জিবে কামড় দেয়। বলে, ‘স্যরি মনু ভাই, কিছু মনে করবেন না। আপনি আমাদের দলে চলে আসেন। আবাহনীতে খেলেন। কত টাকা চান আপনি, বলুন। ’

প্রশ্ন : মোহামেডান থেকে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পেয়েছেন কত?

মনু : ছয়-সাত লাখ টাকার মতো। আবাহনীর কর্মকর্তারা খালি চেক দিয়ে বলেছে, ‘তুই কত টাকা চাস বল?’ কিন্তু আমি মোহামেডান ছাড়িনি। ছোটবেলার ভালোবাসার ক্লাব। টাকাই তো সব না রে ভাই। সে কারণে মোহামেডানে থেকে যাই। যদিও মোহামেডান থেকে অন্যরা যত টাকা পেয়েছে, আমাকে তা দেওয়া হয়নি। কারণ ওই যে কর্মকর্তারা জানেন, আমি ক্লাব ছাড়ব না। মায়ার জালের কারণে।

প্রশ্ন : মোহামেডানে তো খুব বেশি সময় খেলেননি?

মনু : মাত্র চার বছর। ’৮৪, ’৮৫, ’৮৬, ’৮৭। শেষ বছর পায়ে ব্যথা পাই। কিভাবে কী হলো, জানি না। হাঁটুতে টিউমারের মতো হয়ে যায়। তালুকদার স্যার করেন অপারেশন। কিন্তু আর ভালো হলো না। কী দুর্ভাগ্য, ওই বছর মোহনবাগানের কোচ না কর্মকর্তা কে যেন বাংলাদেশে এলেন আমাকে দেখার জন্য। পছন্দ হলে কলকাতায় খেলানোর জন্য নিয়ে যাবেন। কিন্তু আমি তো তখন অপারেশনের পর অসুস্থ। মোহনবাগানের ওই অফিশিয়ালকে আমি পা ছুঁয়ে সালাম করি। বলি, ‘আপনি যে আমার খেলা দেখার জন্য বাংলার মাটিতে এসেছেন, তাতেই আমি ধন্য। ’ উনি মাথায় হাত দিয়ে আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে যান। দোয়া করেন।

প্রশ্ন : অপারেশনের পর আর বেশি দিন খেলতে পারেননি?

মনু : ভাগ্য আমার সঙ্গে বেঈমানি করেছে। ইউসুফ ভাই, বাদল ভাইদের এমন অপারেশন করে দিয়েছেন তালুকদার স্যার। তারা ভালো হয়ে গেল, আমি হলাম না। দুর্ভাগ্য না? পরে আরামবাগে খেলি এক বছর। ফকিরেরপুলের অধিনায়ক হিসেবে খেলি ১৯৮৯ সালে। ওই বছর মোহামেডানের সঙ্গে খেলায় কায়সার হামিদের সঙ্গে বাড়ি খাই। অ্যাংকেল যায় ভেঙে। আর ঠিক হলো না। এই দেখুন, এখনো অ্যাংকেলের জায়গাটি কেমন ফোলা ফোলা। ব্যস, ছেড়ে দিই খেলা।

প্রশ্ন : পরে কোচ কিংবা সংগঠক—কোনো ভূমিকায় আপনাকে আর ফুটবলের সঙ্গে দেখা যায়নি। কেন?

মনু : ভালো লাগে না ভাই। অনেক নোংরামি। কী দরকার! যত দিন খেলেছি, মনে রাখার মতো খেলেছি; মানুষ তাই মনে রেখেছেন। এখনকার ছেলেদের মন জুগিয়ে কোচিং করানো কিংবা নিজের লাভের জন্য সংগঠক হওয়া—এসব আমাকে দিয়ে হবে না। মরা বাপ-মাকে গাল খাওয়াব নাকি? এর চেয়ে ডাল দিয়ে ভাত খাব। সেটাই ভালো।

প্রশ্ন : শেষ দিকে ঝটপট কিছু প্রশ্ন করি। যাঁদের সঙ্গে খেলেছেন, সেরা ডিফেন্ডার কাকে মনে হয়েছে?

মনু : পাকির আলী, মুন্না, ইউসুফ ভাই, বরিশালের বাদল ভাই। এমন ডিফেন্ডার এখন নেই।

প্রশ্ন : কার সঙ্গে আপনার বোঝাপড়া ছিল ভালো?

মনু : এমিলি, আশীষ ভদ্র। বিশেষ করে আশীষ ভদ্র চোখ দিয়ে ইশারা করত, বল পেয়ে যেতাম। এ ছাড়া আমার প্রিয় ফুটবলার এনায়েত ভাইকে কোচ হিসেবে পেয়েছি, তা-ও অনেক বড় ব্যাপার। উনি একবার পিরিচকে দূর থেকে শট মারেন। গ্যালারি থেকে আমরা দেখি, বল ধরে পিরিচ দুই মিনিট বসে আছে; উঠতে পারছে না। এনায়েত ভাইয়ের শটে এমন পাওয়ার! উনাকে কোচ হিসেবে পেয়েছি। বাবা রে বাবা, কী রাগী যে ছিলেন! এখনকার জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা যদি এনায়েত ভাইয়ের প্র্যাকটিস পায়, সবাই ফুটবল ছেড়ে গ্রামে চলে যাবে।

প্রশ্ন : বিদেশি খেলোয়াড়দের মধ্যে সেরা কে?

মনু : পাকির আলী আর প্রেমলাল। যদিও ওরা আবাহনীতে খেলেছে। কিন্তু আমার চোখে ওরাই সেরা।

প্রশ্ন : জাতীয় দলে খেলেছেন কত দিন?

মনু : ১৯৮৫ সালে প্রথম সুযোগ পাই। সাফ গেমসের দলে ছিলাম, পাকিস্তান যাই একটি টুর্নামেন্ট খেলতে। পরে যাই নেপাল। দেশের মাটিতে প্রেসিডেন্ট গোল্ড কাপ খেলেছি। তখন তো আর জাতীয় দলের এত ম্যাচ ছিল না। এই কয়েকটি প্রতিযোগিতার কথা মনে আছে।

প্রশ্ন : পরিবারের কথা একটু বলুন। বিয়ে করেছেন কবে?

মনু : বিয়ে করেছি খালাতো বোন আসমাকে; ১৯৯২ সালে। আমাদের দুই মেয়ে। বড় মেয়ে মেঘলাকে ইন্টারমেডিয়েট পাস করিয়ে বিয়ে দিয়েছি। ও এখন স্বামী-সন্তান নিয়ে সৌদি আরব থাকে। ছোট মেয়ে কাজল এবার দেবে ইন্টার পরীক্ষা।

প্রশ্ন : খেলা ছাড়ার পর কোচিং লাইনে আসেননি। জীবনধারণের জন্য কি ব্যবসা-ট্যবসা করেছেন?

মনু : কিছু করেছিলাম কিন্তু টিকতে পারিনি। খেলার টাকা দিয়ে মুগদায় দোতলা একটি বাড়ি কিনেছি, আরেকটি টিনশেড করেছি। ওখান থেকে মাসে ৩০-৩৫ হাজার টাকা ভাড়া আসে। এ দিয়ে ডালভাত খেয়ে দিন কেটে যায়। আলহামদুলিল্লাহ, আমি খুশি।

প্রশ্ন : এবার শেষ প্রশ্ন। সব মিলিয়ে জীবন নিয়ে, ক্যারিয়ার নিয়ে আপনি কতটা তৃপ্ত?

মনু : ওই যে বললাম, আলহামদুলিল্লাহ। কোনো আফসোস নেই। ফুটবল আমাকে অনেক দিয়েছে। অনেকে মনে করে, আমি আমেরিকা-ইতালিতে থাকি। ছোটখাটো মানুষ তো, দেখলে অনেকে বিশ্বাস করে না আমি ফুটবলার মনু। কিন্তু জানার পর কী সম্মান যে করে! সেদিন এক সাংবাদিকের সঙ্গে এলাকায় হঠাৎ দেখা। আমি চটপটি খাচ্ছি। উনি বললেন, ‘মনু ভাই, আপনি এখানে দাঁড়িয়ে চটপটি খাচ্ছেন। সেই আমল হলে কী পারতেন?’ সাংবাদিক ভাই তাঁর ছেলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘এই হচ্ছে মনু। অনেক বড় ফুটবলার। সালাম করো তাঁকে। ’ এসব শুনে ভালো লাগে। ভরে ওঠে বুকটা। দেখুন, ছোটবেলায় আমার স্বপ্ন ছিল একটাই—এক দিন যেন মোহামেডানের জার্সি গায়ে ওঠাতে পারি। সেই আমি মোহামেডানে চার বছর খেলেছি। অন্যরা যা ১০ বছরে পারে না, আমি ওই চার বছরে তা করেছি। আমার মতো অনেক মনু রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, কেউ পাত্তা দেয় না। আর আমি এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় এখনো দিনে তিন শ সালাম পাই। এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী!


মন্তব্য