kalerkantho


প্যারিসে হতভম্ব বার্সেলোনা

প্যারিসে,হতভম্ব,বার্সেলোনা   

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



প্যারিসে হতভম্ব বার্সেলোনা

কবি অন্নদাশংকর রায় তাঁর প্যারিস ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বর্ণনায় লিখেছিলেন, ‘অর্ধেক নগরী তুমি অর্ধেক কল্পনা। ’ বার্সেলোনার ফুটবলাররাও বোধহয় প্যারিস সফরে এমন মনোরম কোনো অভিজ্ঞতাই হবে বলে ধরে নিয়েছিলেন! অন্তত অতীত অভিজ্ঞতা তো সে নিশ্চয়তাই দিচ্ছিল। তাদের কাছে পার্ক দ্য প্রিন্সেসে খেলতে আসা মানেই তো জিতে বাড়ি ফেরা। গত কয়েক মৌসুমে নিয়ম করেই নকআউট পর্বে দেখা হচ্ছে বার্সেলোনা আর প্যারিস সেন্ত জার্মেইর। শেষ হাসিটা সব সময়ই ছিল কাতালানদের। তবে এবার কান পর্যন্ত লম্বা হাসি প্যারিসবাসীর। নকআউট পর্বের শুরুতেই, প্রথম লেগটা যে ৪-০ গোলে জিতে নিয়েছে পিএসজি। ফিরতি লেগে এই ব্যবধান ঘুচিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর নজির ইতিহাসে নেই। তাই বলা যায়, কোয়ার্টার ফাইনালে এক পা দিয়েই রাখল পিএসজি। যদিও পিএসজি কোচ উনাই এমেরি এখনো পা মাটিতেই রাখছেন। গত পরশুর অপর ম্যাচে বেনফিকা ১-০ গোলে হারিয়েছে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডকে।

চ্যাম্পিয়নস লিগে ৪-০ গোলের হার এই প্রথম নয় বার্সেলোনার। ২০১৩ সালেও সেমিফাইনালের প্রথম লেগে নিজের মাঠে বায়ার্ন মিউনিখ একই ব্যবধানে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল কাতালানদের। কিন্তু বছর চারেক পরের এই বার্সেলোনা তো আরো ধারাল। লিওনেল মেসি তো আছেনই, সঙ্গে যোগ হয়েছেন লুই সুয়ারেস এবং নেইমার। এই দুজনের যে কেউ একাই তো পারেন ম্যাচের রং পালটে দিতে!

প্যারিস যাত্রার প্রস্তুতিটা তারা সেরে এসেছিল অ্যালাভেসকে ৬-০তে হারিয়ে। অথচ পার্ক দ্য প্রিন্সেসে পা রেখে তারাই হয়ে গেল হতভম্ভ! খেলার প্রথম ১০ মিনিটেই অন্তত তিনখানা গোলের সুযোগ তৈরি করেছিল পিএসজি। এদিনসন কাভানি ডান পা না বাঁ পা—এই দ্বিধায় না ভুগে সরাসরি গোলে শটটা নিলে হয়তো শুরুতেই ১-০তে এগিয়ে যেতে পারত স্বাগতিকরা। উনাই এমেরি ছকটা কষেছিলেন দারুণ, আর সেই ছকে দারুণভাবে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন ইউলিয়ান ড্র্যাক্সলার। শীতকালীন দলবদলে জানুয়ারিতেই উলফসবার্গ থেকে পিএসজিতে এসেছেন এই উইঙ্গার/অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার। তীব্র গতি আর জোরালো শটে বার্সার রক্ষণকে ছত্রখান করতে তাঁর ছিল দারুণ ভূমিকা। এমেরির ৪-২-৩-১ ছকে পুরোদস্তুর ফরোয়ার্ড কাভানির পেছনে দুই উইঙ্গারের জায়গা নিয়েছিলেন আনহেল দি মারিয়া ও ড্র্যাক্সলার, মাঝে আক্রমণের উৎসগুলো তৈরি করেছেন বাইস মাতুইদি। মূলত এই চতুষ্টয়ের গতি, প্রেসিং, লং পাস আর শুটিংয়ের ধাক্কাতেই  উড়ে গেছে স্যামুয়েল উমতিতি-জেরার্দ পিকেদের নিয়ে গড়া বার্সার রক্ষণ।

গোটা ম্যাচে প্যারিসিয়ানরা গোলমুখে শট নিয়েছে ১০টি। এতেই বোঝা যাচ্ছে কতটা ব্যতিব্যস্ত ছিল বার্সার রক্ষণ। এসব সামাল দিতেই আক্রমণে বলের জোগান গেছে কমে। বলের দখল ধরে রাখার হারটা (৫৭%) প্রথাগতভাবে বেশি থাকলেও গোটা ম্যাচে গোলমুখে মাত্র একবারই শট নিয়েছে বার্সেলোনা। এতেই স্পষ্ট, কতটা নিষ্প্রভ ছিল এমএসএন ত্রিফলা। ফুটবল পরিসংখ্যান নিয়ে কাজ করা ‘অপ্টা’ বলছে, পাস কমপ্লিট করার জায়গাতেও বার্সাই এগিয়ে। ইনিয়েস্তা গোটা ম্যাচে ৬৭টা পাস নিজের দলের খেলোয়াড়ের পায়ে দিয়েছেন, নির্ভুলতার হার ৯৩ শতাংশ। উমতিতিও ৭১টা পাস বাড়িয়েছেন সতীর্থকে। তবে বিপদটা হয়েছে প্রতিপক্ষও সমানতালে ভালো খেলায়! ভেরাত্তি ও মাতুউদি, দুজনেই যে ৯০ শতাংশেরও বেশি বল পাঠাতে পেরেছেন সঠিক ঠিকানায়! বল ইন্টারসেপশনটা ভালো হয়নি বার্সার, সেই সঙ্গে পিএসজির হাই প্রেসিং ফুটবলের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি ক্রমশ এমএসএন নির্ভর হয়ে ওঠা বার্সেলোনা।

ঠিক কবে বার্সেলোনার বিপক্ষে প্রতিপক্ষ গোলের এতগুলো পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করেছিল, সেটা বলা কঠিন। ড্র্যাক্সলারের পা থেকে বল কাড়তে উমতিতির ডাইভের কারণে বক্সের বাইরে বিপজ্জনক জায়গায় ফ্রি কিক পায় পিএসজি। সেখান থেকে গোল করে জন্মদিনটা মনে রাখার মতো করে রাখেন আনহেল দি মারিয়া। ৪০তম মিনিটে, মেসির পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে র্যাবিও দেন ভেরাত্তিকে, এই ইতালিয়ানের পাস খুঁজে নেয় জার্মান উইঙ্গারকে, ড্র্যাক্সলারের জোরাল শট জালে জড়ালে বিরতির আগেই ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে বার্সেলোনা। ৫৫ মিনিটে দি মারিয়ার দ্বিতীয় গোলটাকে বলা যায় ম্যাচের সুন্দরতম মুহূর্ত! বক্সের প্রান্তসীমা থেকে বাঁ পায়ের শটে যেভাবে বলটা জালে পাঠালেন, তা দেখে আফসোস করতেই পারে রিয়াল মাদ্রিদ ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষ। এমন খেলোয়াড়কেই যে ছেড়ে দিয়েছে তারা! জন্মদিনে জোড়া গোল করে হাত দিয়ে ভালোবাসার প্রতীক দেখালেন দি মারিয়া। তাহলে আরেক ‘বার্থডে বয়’ কাভানিই বা পেছনে পড়ে থাকবেন কেন? মুনিয়ের নেইমারকে কাটালেন জগিং করার মতো অনায়াস ভঙ্গিতে, এরপর পাস দেন কাভানিকে। উরুগুয়ের এই ফরোয়ার্ডও জোরালো শটে বলটা পাঠিয়ে দেন গোলের ঠিকানায়।

ভালোবাসা দিবসের রাতে, ছবি আর জাদুঘরের শহর প্যারিসে হয়ে গেল নীরব এক ভূমিকম্প। তাতে ধসে গেল বার্সেলোনার গজদন্তের মিনার। জিততে হলে ন্যু ক্যাম্পে ৫ গোলের ব্যবধানে জিততে হবে বার্সেলোনাকে। ইউরোপিয়ান কাপ বা চ্যাম্পিয়নস লিগ, কোনো জমানাতেই এমন নজির নেই। নতুন ইতিহাস যদি লিখতে না পারেন মেসিরা, তাহলে বলা যায় ভালোবাসার রাতেই এই মৌসুমে ইউরোপসেরা হওয়ার স্বপ্নটা ভেঙে খান খান হয়ে গেল কাতালানদের।

রিয়াল মাদ্রিদকে পেছনে ফেলে গ্রুপ পর্বের শীর্ষ দল হয়েই নকআউটে এসেছিল বরুশিয়া ডর্টমুন্ট। গ্রুপে সবচেয়ে বেশি ২১ গোলও ছিল জার্মান দলটির। সেই ডর্টমুন্ড হোঁচট খেল প্রথম লেগে বেনফিকার মাঠে। কস্তাস মিক্রুগ্লুর ৪৮ মিনিটের গোলে ১-০ ব্যবধানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে পর্তুগিজ চ্যাম্পিয়নরা। ৫৮ মিনিটে সমতা ফেরানোর ভালো সুযোগ পেয়েছিল ডর্টমুন্ড। লুমোবির ফেসার হ্যান্ডবলে ৫৮ মিনিটে পাওয়া পেনাল্টি নষ্ট করেন পিয়েরে এমেরিক অবামায়েং। সোজা গোলরক্ষক এডারসন বরাবর শটটি মেরেছিলেন তিনি। উয়েফা, মেইল


মন্তব্য