kalerkantho


হায়দরাবাদ আমাদের লাকি ভেন্যু

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



হায়দরাবাদ আমাদের লাকি ভেন্যু

যা কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি, ২০০০ সালের ১১ নভেম্বর সেটাই করেছিলেন আমিনুল ইসলাম। বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টেই করেছিলেন সেঞ্চুরি। সেদিনের প্রতিপক্ষ ভারতের বিপক্ষে আজ প্রথমবার অ্যাওয়ে টেস্ট খেলতে নামছেন তাঁর উত্তরসূরিরা। সুদূর মেলবোর্ন থেকে গতকাল টেলিফোনে মাসুদ পারভেজকে আমিনুল জানিয়েছেন এ ম্যাচকে ঘিরে নিজের স্বপ্নের কথা

 

প্রশ্ন : এই সময় না আপনার হায়দরাবাদেই থাকার কথা শুনেছিলাম?

আমিনুল ইসলাম : হ্যাঁ, হায়দরাবাদ যাওয়ার আমন্ত্রণ ছিল। অন্তত টেস্টের যেকোনো একদিন উপস্থিত থাকতে পারলেও ভালো লাগত। কিন্তু অন্তহীন ব্যস্ততায় যেতেই পারলাম না আর।

প্রশ্ন : কী নিয়ে এত ব্যস্ত এখন?

আমিনুল : আফগানিস্তানকে টেস্ট মর্যাদা দেওয়ার একটি আলোচনা শুনেছেন নিশ্চয়ই। তা আইসিসির ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার হিসেবে ওদের প্রজেক্ট পেপার তৈরির সঙ্গেও যুক্ত আছি। এ ছাড়া আইসিসি সারা বিশ্বের ২৫টি দেশকে ‘সাপোর্ট প্যাকেজ’ অফার করবে। এর মধ্যে চীনসহ এশিয়ার ৯টি দেশ সরাসরি আমার তত্ত্বাবধানে আছে। তা ব্যস্ততা এদের ক্রিকেট নিয়েও আছে।

প্রশ্ন : তা দূর মেলবোর্নে বসেও হায়দরাবাদে ভারত-বাংলাদেশ টেস্টের উত্তাপ গায়ে লাগছে কতটা?

আমিনুল : বেশ ভালোই লাগছে। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে টেস্ট মানেই আমি ভারতীয় সাংবাদিকদের ফোন পেতে শুরু করি। এবারও তাঁর ব্যতিক্রম হয়নি। যথারীতি তাঁরা আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন অভিষেক টেস্টে খেলা আমার সেই ১৪৫ রানের ইনিংসটির কথা, যেটি ‘সিগনেচার অব মাই লাইফ’।

প্রশ্ন : গুণে গুণে ১৬টি বছর পার করে এসে কোন ব্যাপারটি ভাবলে সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে?

আমিনুল : আমি সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকেই বলি। একাত্তরে নতুন একটি দেশ জন্ম নিয়েছিল। ক্রিকেটও ছিল সদ্যোজাত এক শিশু। এরপর সেই শিশুটি হামাগুড়ি দিতে শিখল। ধীরে ধীরে শিখল হাঁটতেও। দৌড়ানোর মতো অবস্থায় পৌঁছানোর সময় আমরা পেলাম টেস্ট মর্যাদা। এখন আমাদের সেই বাংলাদেশ দল রীতিমতো স্প্রিন্ট টানতে শুরু করে দিয়েছে। এভাবেই ভাবতে ভালো লাগে আমার।

প্রশ্ন : যদি ২০০০ সালের নভেম্বরে ভারতের বিপক্ষে সেই অভিষেক টেস্টের সময়টায় ফিরে যেতে বলি, সবচেয়ে সুখের স্মৃতি মনে হয় কোনটিকে?

আমিনুল : একাদশে থাকতে পেরেছিলাম, এটাই সবচেয়ে বড় সুখস্মৃতি (হাসি...)। সত্যি কথা বললে ওই সময়টায় আমি মনও খারাপ করে থাকতাম। টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার সময় আমি ছিলাম অধিনায়ক অথচ প্রথম টেস্টটি খেলার সময় নই। বলতে দ্বিধা নেই এটা ভেবে খুব খারাপ লাগত আমার। অভিষেক টেস্ট যত ঘনিয়ে আসতে শুরু করল, বাড়তে থাকল আমার খারাপ লাগাও। আমি যাঁদের কাছের মানুষ ভাবতাম, তাঁরাই চাইল না যে আমি টেস্ট খেলি। তবে জীবন দিয়ে খেলা ইনিংসটির কারণে ২৫-৩০ ঘণ্টার মধ্যে আমি সেইসব লোকদের মাঝে বিরাট পরিবর্তনও লক্ষ করেছিলাম। যাঁরা চায়নি আমি খেলি, তাঁরাই কিনা আমার পিছু ঘুরতে শুরু করেছিল। এঁদের মধ্যে কিন্তু আপনাদের মিডিয়ার লোকও ছিল (হাসি...)। এখন ভাবতে ভালো লাগে যে আমি ওই ম্যাচে ব্যাট হাতে যা করেছি, সেটি কেউ কখনো কোনোদিন মুছে দিতে পারবে না।

প্রশ্ন : আপনার সেই ইনিংস দিয়ে বাংলাদেশের টেস্টেরও শুরু। তা এত দিনে টেস্ট ক্রিকেটে কতটা এগোনো গেছে বলে মনে করেন?

আমিনুল : এগিয়েছে তো অবশ্যই। না হলে কেন বললাম যে আমরা এখন স্প্রিন্ট টানছি! তবে টেস্টে কিছু সংকট এখনো রয়ে গেছে। অভিষেক টেস্টে আমরা ৪০০ রান করলাম আর তাতেই ড্রেসিংরুমটা রীতিমতো বাজারে পরিণত হলো! মন্ত্রী, সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে এমন কেউ ছিলেন না যিনি ড্রেসিংরুমে ঢুকে পড়েননি! সবাই ভুলেই গিয়েছিল যে আরেকটি ইনিংস তখনো বাকি। মনে আছে নিশ্চয়ই যে দ্বিতীয় ইনিংসে আমরা ধসে পড়েছিলাম। ১৬ বছর পর ওয়েলিংটনেও সেই একই অবস্থা দেখলাম, দ্বিতীয় ইনিংসের বিপর্যয়। এতেই বোঝা যায় টেস্ট ম্যাচ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারাটা আমরা এখনো পুরোপুরি শিখিনি। না হলে ওয়েলিংটনের ওই টেস্ট কেউ হারে নাকি?

প্রশ্ন : তাই বলে হায়দরাবাদে ভালো কিছুর প্রত্যাশা করবেন না?

আমিনুল : আরে, কেন করব না! তা ছাড়া হায়দরাবাদ আমাদের লাকি ভেন্যু। সবাই ১৯৯৭ সালে প্রথম ওয়ানডে জয়ের কথাই বলেন। আমি বলব আরো আগের কথা। আমাদের প্রজন্মের ক্রিকেটারদের তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রেও ওই জায়গাটার অবদান আছে। একসময় বিসিবি একাদশ নাম নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় দল হায়দরাবাদে মঈনুদ্দৌলা ট্রফি খেলতে যেত। দলে না থাকলেও সানরাইজার্স হায়দরাবাদের হয়ে সুখস্মৃতি আছে আমাদের মুস্তাফিজেরও। তবে সব কথার শেষ কথা হলো, ভারত ১৬ বছর পর আমাদের খেলতে নিয়েছে। আমি চাই ছেলেরা সেই জেদ থেকে আরো ভালো খেলুক। যাতে এখন থেকে খেলার আমন্ত্রণ আসে ঘন ঘন। ব্যক্তিগতভাবে আমি পাঁচটি দিনই তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে চাই। মুশফিকরা হারলেও যেন ছাপ রেখে আসে। যেন প্রমাণ করে আসতে পারে বাংলাদেশ যোগ্য দল।

প্রশ্ন : জিতে যোগ্য দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করার কোনো সুযোগ কি দেখছেন?

আমিনুল : আমি অত দূর যাওয়ার আগে সবাইকে একটু বাস্তবতা ভেবে দেখার অনুরোধ করব। ভারতীয় দলের লম্বা ব্যাটিং লাইনের নামগুলো নিয়ে নিশ্চয়ই আমার আলাদা করে কিছু বলার দরকার নেই। আর ভারতের বোলিংও সুস্থির হয়ে খেলার কোনো সুযোগ নেই। এই টেস্টের ভাগ্য নির্ধারণে স্পিনাররাই বড় ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। এবার আসুন অশ্বিনকে সামলানোর সমস্যাটা বলি। দুজনেই অফস্পিনার হলেও মুরালিধরনের সঙ্গে ওর একটা বড় পার্থক্য আছে। মুরালির বলে এক-দেড় হাত টার্ন ছিল। তাতে ব্যাটসম্যান অনায়াসে পরাস্তও হতো। অথচ অশ্বিনের টার্ন দুই-আড়াই ইঞ্চির হলেও অনেক বেশি কার্যকরী। ব্যাটের ব্যাস যখন সাড়ে ৪ ইঞ্চি, তখন ব্যাটসম্যান মাঝব্যাটে খেলতে গেলে ওইটুকু টার্নেই ‘এজ’ নেওয়ার বড় সুযোগ থাকে। আর রবীন্দ্র জাদেজার বড় শক্তি হলো ওর বলের রেগুলেশন। ব্যাটসম্যানের ব্যাটের স্পিডের চেয়ে বল জোরে ঘোরাটাই ওকে সাফল্য এনে দেয়। মুশকিলের ব্যাপার হলো এঁদের বেশি মনোযোগ দিতে গেলে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের বিপদে ফেলার জন্য দুই পেসার ইশান্ত শর্মা এবং উমেশ যাদবও আছে। ভারতের বোলিং সামলানোটা মুশফিকদের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জের হবে। বাংলাদেশি হিসেবে আমি তো চাইবই যে বাংলাদেশ জিতুক। এটা আমার আবেগের কথা। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথাই!

প্রশ্ন : আর ভারতের ব্যাটসম্যান বিশেষ করে বিরাট কোহলিকে আটকানোর উপায়?

আমিনুল : টানা ভালো বল করে যাওয়াই ওকে আটকানোর উপায়। কারণ ভালো বল তো সবার জন্যই ভালো বল।

 


মন্তব্য