kalerkantho


নয়তো বাউন্সার মারতাম কোহলিকে

টেস্ট খেলেন না অনেক দিন। ভাঙা আঙুল নিয়ে মাঠ ছেড়ে এখন একরকম ‘গৃহবন্দি’ বাংলাদেশের ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। তবে মন পড়ে হায়দরাবাদে, গতকাল সকালে তাই তাঁকে বাসাতেই পেলেন সাইদুজ্জামান।

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



নয়তো বাউন্সার মারতাম কোহলিকে

প্রশ্ন : ভারতের বিপক্ষে খেলার সময় সব দেশের ক্রিকেটারের মধ্যেই অন্য রকম একটা তাড়না দেখা যায়। বাংলাদেশের বেলায়ও তেমনটা দেখা গেছে বরাবর। আপনার নিজেরও কি তাই মনে হয়? মনে হলে কী কারণে এমনটা হয়?

মাশরাফি বিন মর্তুজা : এক্সপোজারটা বেশি। সব দেশের খেলাই টিভিতে দেখায়। তবে ভারতের জনসংখ্যা একটা ব্যাপার। ভারত আর বাংলাদেশের মতো করে ক্রিকেটকে এভাবে আর কোথাও অনুসরণ করা হয় বলে আমার মনে হয় না। এ দুটি দেশে বেশি মানুষ খেলাটা দেখে। তাই ভালো করলে ফিডব্যাকও আসে বেশি। ২০০৪ সাল থেকে তো তা-ই দেখে আসছি।

প্রশ্ন : আপনার নিজেরটা কিন্তু বললেন না, ভারত ম্যাচে আপনিও নিজেকে তুঙ্গে তুলে নিয়েছেন বারবার।

মাশরাফি : ব্যাপারটা ঠিক তা নয়, খেলার সময় আমার কাছে সব প্রতিপক্ষই এক।

প্রতিটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে আমার নিজের কাছে নিজের একই রকম প্রত্যাশা থাকে। সবার সঙ্গেই জিততে চাই। চাপও সমান, সেটা প্রতিপক্ষ ভারতের বদলে অস্ট্রেলিয়া কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকা—যে দলই হোক না কেন। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতেছি, সেটাই হয়তো সবার মনে আছে (হাসি)।

প্রশ্ন : ভারতের বিপক্ষে খেলা মানেই একটা নাম আলোচনায় উঠে আসে, বিরাট কোহলি। বাংলাদেশ দলের কথাবার্তায়ও পরিষ্কার, ভারত অধিনায়কের উইকেটটা বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে। বোলার হিসেবে কেমন লাগে কোহলির উইকেট পেলে?

মাশরাফি : অন্য রকম আনন্দ হয়। একটা সময় ছিল, যখন টেস্টে শচীন টেন্ডুলকার, রাহুল দ্রাবিড় কিংবা ব্রায়ান লারার উইকেটটা যেকোনো বোলারের কাছে স্বপ্নের মতো ব্যাপার ছিল। এখন যেমন এবি ডি ভিলিয়ার্স, বিরাট কোহলির উইকেট চায় সব বোলার। তবে আমার কাছে সবচেয়ে দামি কোহলির উইকেট। ডি ভিলিয়ার্স কিংবা (কেন) উইলিয়ামসনের সামর্থ্য নিয়ে কোনো সংশয় নেই। তবে টেকনিক্যালি এবং ম্যাচ জেতানোয় কোহলি ওদের থেকে এগিয়ে। ও এখন আউট অব দ্য ওয়ার্ল্ড ব্যাটিং করছে।

প্রশ্ন : তার পরও কোহলি আউট হন। তার মানে দুর্বলতা তাঁরও আছে। বাংলাদেশের বোলিং ইউনিটের জন্য কোনো টিপস?

মাশরাফি : সব মানুষেরই তো দুর্বলতা থাকে। তবে কোহলির সুবিধা হলো, খুব দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে। বিশেষ ধরনের ডেলিভারি বিভিন্নভাবে খেলতে পারে। ফিল্ডিং সাজিয়ে দেখলেন যে কোহলি অন্যদিক দিয়ে অনায়াসে খেলে দিয়েছে। এর চেয়েও বেশি ভালো লাগে ওর মানসিকতা। হাল ছাড়ে না। একটা উদাহরণ দিয়ে বলি, নিউজিল্যান্ড সফরে বাংলাদেশ দলের অনেক অর্জন নিয়ে কথা হয়েছে। তবে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে রাব্বির (কামরুল ইসলাম) ব্যাটিং। ক্রিকেট খেলতে এমন মানসিকতা লাগে। বিরাট কোহলি একদিনে হয়নি। ভেতরের সাহসটাই দিনে দিনে তৈরি করেছে কোহলিকে।

প্রশ্ন : কোহলির প্রশংসায় তাঁকে আউট করার ছকটা কিন্তু বলতে ভুলে গেছেন...

মাশরাফি : উপায় তো নিশ্চয়ই আছে। ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া কোহলির অফস্টাম্পকে টার্গেট করেছিল। আমরাও সেটা করেছিলাম। টি-টোয়েন্টিতে অফস্টাম্পে বল রেখে ওর উইকেট নিয়েছিলাম আমি। কিন্তু সেই কোহলিই ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অফস্টাম্প লাইনের বল দারুণ খেলেছে। তার মানে ওই দুর্বলতা সে কাটিয়ে উঠেছে। এ কারণেই কোহলিকে আউট করা কঠিন। তবে অসম্ভব নয়। আমি হলে অফস্টাম্পই টার্গেট করতাম। নয়ত বাউন্সার মারতাম কোহলিকে। রাহুল দ্রাবিড়ের মতো বল ছাড়ে না কোহলি। তাই বাউন্সার খেলিয়ে ওর উইকেট আদায় করা সম্ভব। তবে বাউন্সারটা বাউন্সারের মতো হতে হবে। মোট কথা কার্যকর বোলিং করতে হবে। ৬-৭ ওভারের গড়পড়তা বোলিং দরকার নেই, ৩-৪ ওভারের স্পেলটা যেন কার্যকর হয়—পেসারদের প্রতি এটাই আমার পরামর্শ।

প্রশ্ন : রবিচন্দ্রন অশ্বিনকে নিয়েও বিস্তর কথাবার্তা হচ্ছে...

মাশরাফি : অশ্বিন অবশ্যই স্পেশাল। তবে তারও আগে ভারতের দুই পেসার সামি আর যাদবকে খেলতে হবে। দুজনই ১৪৫ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বল করে। নতুন বলে সুইং করাতে পারে, রিভার্স সুইংও নিয়মিত করাচ্ছে। ইংল্যান্ড পেস বোলিং ভালো খেলে। ওদের বিপক্ষেও সামি আর যাদব ব্রেক থ্রু দিয়েছে। এরপর জাজেদাও আছে। তাই শুধু অশ্বিনকে নিয়ে চিন্তা করলে হবে না।

প্রশ্ন : কোনো প্রেডিকশন হায়দরাবাদ টেস্ট নিয়ে?

মাশরাফি : উইকেট কেমন হবে, জানি না। হায়দরাবাদে কোনো টেস্ট তো আর দেখিনি। প্রস্তুতি ম্যাচের উইকেটটা স্পোর্টিং ছিল। সে রকম হলে আমাদের ভালো খেলারই কথা। কেননা নিউজিল্যান্ডে খেলে আসার অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে। আর বোলিংয়ে বৈচিত্র্য আছে। মিরাজ (মেহেদী হাসান) আর সাকিব আছে। আর পেসারদের বলব, ধৈর্যহারা হলে চলবে না। টেস্ট ক্রিকেটে হয় আপনাকে নতুন বলে সুইং ও পুরনো বলে রিভার্স সুইং করাতে জানতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের কিছুটা ঘাটতি আছে। তাই আমাদের ধৈর্য ধারণ করতে হবে। পরিকল্পনামতো বোলিং করতে হবে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জন্য এটা কঠিন চ্যালেঞ্জ। ভারত অনেক শক্তিশালী দল। বাংলাদেশ দলের কাছে আমার ব্যক্তিগত চাওয়া সেই ক্যারেক্টারটা, হাল ছেড়ে না দেওয়ার মরিয়া ভাবটা। আর কঠিন চ্যালেঞ্জটা যদি উতরে যেতে পারে, তাহলে দারুণ গর্ববোধ করব।

প্রশ্ন : নিউজিল্যান্ডে অনভিজ্ঞ পেস আক্রমণ কিন্তু খারাপ করেননি, আপনার কী মনে হয়েছে?

মাশরাফি : টেস্ট খেলতে প্যাশন লাগে। রাব্বিকে দারুণ লেগেছে। উইকেট পাক বা না পাক, ডেডিকেশন লেভেল অনেক উঁচুতে। তাসকিন সব সময়ই বলে এসেছে যে সে টেস্ট ক্রিকেট খেলতে চায়। ও নিউজিল্যান্ডে সেটা প্রমাণও করেছে। তবে দুজনেরই কেবলই শুরু, সামনে অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ আসবে। এখন সে চ্যালেঞ্জের সামনে ওরা কিভাবে রিঅ্যাক্ট করে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। ক্রিকেটে কেউ এসেই কিংবদন্তি হয়নি। খেলে খেলে জেনেছে টেস্টে কখন কী করতে হবে। প্যাশন থাকলে সেটা আপনি শিখতে পারবেন। তো, সেটা রাব্বি আর তাসকিনের মধ্যে আমি দেখেছি। আশা করি ওরা এটা ধরে করবে।

প্রশ্ন : একেবারে শেষ মুহূর্তে ইমরুল কায়েসের ইনজুরিতে মোসাদ্দেক হোসেন হায়দরাবাদে গেলেন। এখন যদি দল আচমকা আপনাকেও ডাকে, তাহলে কেমন লাগবে?

মাশরাফি : (হাসি) এখন তো আমি টেস্ট ফিট নই! আর আমি এমন আশা করবও না যে বাংলাদেশের এমন অবস্থা হোক যে আমাকে ডাকতেই হবে। তবে হ্যাঁ, টেস্ট বলে কথা। যদি কখনো ডাক পাই, তবে চোখ বন্ধ করে মাঠে ছুটে যাব (হাসি)!


মন্তব্য