kalerkantho


মিলখার ছুটে চলা

শাহজাহান কবির   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মিলখার ছুটে চলা

‘নাহ্, আমি দৌড়াইনি, হাঁটার খেলা বেছে নিয়েছি’—হেসে বলছিলেন জিভ মিলখা সিং। মনে মনে হয়তো ভাবছিলেন, কত সহজেই হয়ে গেল বলা! তাঁর বাবার দৌড়ের পেছনে যে রক্তক্ষরণের ইতিহাস। দেশভাগের সময় নিজের চোখের সামনে মা-বাবাকে খুন হতে দেখেছিলেন মিলখা সিং। ১৯৬০ রোম অলিম্পিকে সেই দুঃস্মৃতিই যেন তাড়িয়ে বেড়িয়েছিল তাঁকে। নইলে ২০০ মিটার পর্যন্ত সবার চেয়ে এগিয়ে থেকেও হুট করে সব উদ্যম হারিয়ে ফেলবেন কেন! ৪০০ মিটারের সেই দৌড়ে শেষ পর্যন্ত চতুর্থ হয়েছিলেন ‘ফ্লাইং শিখ’। ‘ভাগ মিলখা ভাগ’ ছবিতে ফারহান আক্তার যে ট্র্যাজেডি ফুটিয়ে তুলেছেন। কাল কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবের রেঞ্জে দাঁড়িয়ে বাবার জীবনী নিয়ে করা সেই সিনেমা বিষয়েও গল্পে মাতলেন গলফার জিভ মিলখা।

বাবার কাছেই তাঁর এই খেলাটায় হাতেখড়ি। অবসরে যাওয়ার পর গলফের নেশায় মেতেছিলেন মিলখা সিং। ৯ বছর বয়সে জিভের খেলাটা শিখে ফেলা তাঁর কাছেই। ভারতীয় সেই গ্রেট অ্যাথলেটের সন্তান কিন্তু বাবার ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে ভারতের গলফে লিখেছেন নতুন ইতিহাস। ভারতের প্রথম পেশাদার গলফার হিসেবে খেলেছেন ইউরোপিয়ান ট্যুরে, সবচেয়ে বেশি ইউরোপিয়ান ট্যুর শিরোপা, সবচেয়ে বেশি এশিয়ান ট্যুর শিরোপাসহ মেজর চ্যাম্পিয়নশিপেও ভারতীয়দের মধ্যে এ পর্যন্ত সেরা অবস্থান তাঁর। বয়স ৪৫ ছুঁয়েছে, এর মধ্যে সিনিয়র ট্যুরেও খেলা শুরু করেছেন জিভ। কিন্তু সত্যিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার নেশাটা তাঁর ছেড়ে যায়নি, তাই এখন যখন-তখনই তরুণ গলফারদের সঙ্গেও নেমে যাচ্ছেন যেকোনো টুর্নামেন্টে। বসুন্ধরা বাংলাদেশ ওপেনে খেলার সিদ্ধান্তটা একেবারে শেষ মুহূর্তে, ‘গত শুক্রবার আমি ঠিক করলাম বাংলাদেশে খেলব। আয়োজকদের থেকে আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। আর আমিও খেলার মধ্যে আছি। শুনেছি এখানকার কোর্সটাও নাকি খুব ভালো অবস্থায় আছে, তাই চলে এলাম। ’ বাংলাদেশের গলফে সিদ্দিকুর রহমান যেমন, তেমনি ভারতীয় গলফে পাইওনিয়ার এই জিভ মিলখা। নব্বইয়ের দশকে তিনি যখন ইউরোপিয়ান ট্যুরে খেলতে যান, তখন এমনটা চিন্তা করাও অসম্ভব ব্যাপার ছিল ভারতের অন্য গলফারদের জন্য। কিন্তু জিভ মিলখা শুধু খেললেনই না, কয়েক বছরের মধ্যেই জিতে নিলেন শিরোপা।

মিলখা সিং ভারতীয় সেনাবাহিনীর হয়ে যখন জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেন, তখনো দৌড় ব্যাপারটা কী, ভালো করে বুঝতেনই না। তিনি শুধু ছুটতেই জানতেন। ছেলের গলফের দীক্ষা মোটেও তেমন নয়। তিনি অ্যামেচার গলফ প্রথম খেলেন যুক্তরাষ্ট্রে, সেখানে পড়াশোনা করার সময়। কলেজ গলফের এক আসরে চ্যাম্পিয়নও হয়েছিলেন। পেশাদার হওয়ার অনুপ্রেরণা সেখান থেকেই। আর লড়াই করার রক্তটা তো বাবার কাছেই পাওয়া। বাবার স্বপ্নও অনেক বড়, জিভ মিলখা এত কিছু জিতেও সেই স্বপ্নটা পূরণ করতে না পেরে এখনো যেন বিব্রত, ‘উনি চেয়েছেন আমি যেন মেজর চ্যাম্পিয়ন হই, তা তো হতে পারিনি। ’ ২০০৮ সালে পিজিএ চ্যাম্পিয়নশিপে সেই লক্ষ্যেই ঝাঁপিয়েছিলেন, ভারতের প্রথম ও একমাত্র গলফার হিসেবে মেজর টুর্নামেন্টের সেরা দশে জায়গা করে নেওয়াটা সেবারই। বাংলাদেশের সিদ্দিকুর কিংবা ভারতের এখনকার রশিদ খান, গগনজিৎ ভুলার, অনির্বাণ লাহিড়ীদেরও স্বপ্ন ইউরোপিয়ান ট্যুর বা পিজিএ ট্যুরে এভাবে নিজেদের মেলে ধরার। তাঁদের জন্য পথটা বাতলে দিয়েছেন জিভ মিলখা, ‘সাহসটা রাখতে হবে বুকে। ১৯ বছর বয়সে যদি এমন একজন জিভ মিলখাকে আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম, তখনো আমার লক্ষ্য হতো তাঁকে ছাড়িয়ে যাওয়াই। ’ বসুন্ধরা ওপেনের এবারের আসরে একজন প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়েও তাই বেশি কিছু এই মিলখা সিং। বাবার মতো অলক্ষ্যে তিনিও হয়তো শোনেন ‘ভাগ মিলখা ভাগ’। নইলে বয়সকে তুড়ি মেরে এখনো কেন তাঁর এভাবে ছুটে চলা।


মন্তব্য