kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


এই মুশফিক উইকেটরক্ষক

নোমান মোহাম্মদ, চট্টগ্রাম থেকে   

২২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



এই মুশফিক উইকেটরক্ষক

ছবি : মীর ফরিদ, চট্টগ্রাম থেকে

তাঁর উইকেটকিপিং নিয়ে প্রশ্ন বরাবরের। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পথচলার ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও সে প্রশ্ন থেকে মুক্তি মেলেনি।

অথচ সেই মুশফিকুর রহিমই কাল হয়ে যান টেস্টে বাংলাদেশের সফলতম উইকেটরক্ষক। খালেদ মাসুদকে পেছনে ঠেলে দিয়ে।

সিংহাসনটা মাসুদের দখলে ২০০০ সাল থেকে। বাংলাদেশের একেবারে প্রথম টেস্টের সময় থেকেই। ২০০৭ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ম্যাচ হয়ে যায় তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট। নামের পাশে ৮৭ ডিসমিসাল। এর মধ্যে ৭৮টি ক্যাচ ও ৯ স্টাম্পিং। উইকেটের পেছনে গ্লাভসের উত্তরাধিকার মাসুদের কাছ থেকেই নেন মুশফিক। চট্টগ্রাম টেস্ট শুরু  করেন ৮৬ ডিসমিসাল নিয়ে। প্রথম দিন বিকেলে মেহেদী হাসানের বলে মঈন আলীর ক্যাচ ধরে পাশে বসের পূর্বসূরির। আর কাল সকালে একই বোলারের বোলিংয়েও স্টুয়ার্ট ব্রডকে মুঠোবন্দি করে যান ছাড়িয়ে। হয়ে যায় ৮৮ ডিসমিসাল, যার মধ্যে ৭৭ ক্যাচ ও ১১ স্টাম্পিং।

মাসুদ তাঁর ক্যারিয়ারের ৪৪টি টেস্টই খেলেন স্পেশালিস্ট উইকেটরক্ষক হিসেবে। মুশফিক আবার তা নয়। ২০০৫ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লর্ডসের অভিষেকে তিনি স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান। পরের বছর বগুড়ায় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচেও। ২০০৭ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট থেকে মাসুদকে সরিয়ে হয়ে ওঠেন টেস্ট উইকেটরক্ষক। যার ইঙ্গিত ছিল সে বছরের বিশ্বকাপ স্কোয়াডেই। এরপর মুশফিক কিপিং করে যান টানা। আঙুলের ইনজুরির কারণে গত বছর ভারতের বিপক্ষে একমাত্র ম্যাচ ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুই টেস্টে দাঁড়াননি উইকেটের পেছনে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চলমান চট্টগ্রাম টেস্ট দিয়ে উইকেটের পেছনে গ্লাভস হাতে প্রত্যাবর্তন। ক্যারিয়ারের ৪৯ টেস্টের মধ্যে ৪৪টিতে স্পেশালিস্ট উইকেটরক্ষক হিসেবে ছিলেন মুশফিক। পূর্বসূরি মাসুদের সমান টেস্টেই ভেঙে দেন তাঁর রেকর্ড। ইনিংসের হিসাবে অবশ্য বেশ এগিয়ে আগের জন। তাঁর ৬১ ইনিংসের চেয়ে ১৫ ইনিংস বেশি লাগে  মুশফিকের।

টেস্ট যুগে বাংলাদেশের উইকেটকিপিংয়ের পোস্টার এই দুজনই। চট্টগ্রামে ৯৪তম ম্যাচ খেলছে এখন দেশ। এর মধ্যে সমান ৪৪টি করে মোট ৮৮ টেস্টে গ্লাভস হাতে দাঁড়ান মাসুদ-মুশফিক। এর বাইরে মেহরাব হোসেন এক, মোহাম্মদ সেলিম দুই ও লিটন দাশ তিন টেস্টে পালন করেন সে দায়িত্ব। ২০০১ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে স্পেশালিস্ট উইকেটরক্ষক হিসেবে খেলেন ওপেনার মেহরাব। কারণ প্রথম টেস্টে ব্যথা পেয়ে সিরিজ থেকে ছিটকে যান মাসুদ। এ ছাড়া ২০০৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের দুই টেস্টে উইকেটকিপার হিসেবে দায়িত্ব পান সেলিম। আর মুশফিকের ব্যথার কারণে গত বছর ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তিন টেস্টে লিটন। এ ছাড়া শাহরিয়ার হোসেন, রাজিন সালেহ, ইমরুল কায়েস, মাহমুদ উল্লাহরা ম্যাচ চলাকালীন সময়ে স্পেশালিস্ট উইকেটরক্ষকের চোটের কারণে গ্লাভস হাতে চালিয়েছেন ঠেকার কাজ। যে কারণে মুশফিকের ৮৮, মাসুদের ৮৭-র পর বাংলাদেশের উইকেটরক্ষকদের ডিসমিসালের সংখ্যা বড্ড কম— সেলিমের চার, লিটনের তিন, মেহরাবের দুই এবং মাহমুদ-রাজিন সালেহ-শাহরিয়ার হোসেনের একটি করে।

ভারতের বিপক্ষে অভিষেক টেস্টের অল্প কিছুটা সময় মাসুদের জায়গায় কিপিং করেন শাহরিয়ার হোসেন। নাঈমুর রহমানের বলে সাবা করিমের স্টাম্পিংও করেন। তাঁর ওপেনিং সঙ্গী মেহরাব সে দায়িত্ব পালন করেন পরের সিরিজে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্ট চলার সময় ব্যথা পান মাসুদ। যে কারণে জিম্বাবুয়ের ব্যাটিংয়ের মাঝপথে গ্লাভস তুলে নেন মেহরাব হোসেন। মনজুরুল ইসলামের বলে এমলুলেকি এনকালার ক্যাচও ধরেন উইকেটের পেছনে। তাতে অভিষেক ইনিংসে ছয় উইকেট হয়ে যায় ওই পেসারের। বাংলাদেশের পক্ষে অভিষেকে সেরা বোলিং হিসেবে ৮১ রানে ছয় শিকারের সেই রেকর্ড অক্ষত থাকে প্রায় এক যুগ। ২০১২ সালে সোহাগ গাজী ৭৪ রানে ছয় উইকেট নিয়ে মনজুকে ঠেলে দেন দ্বিতীয়তে। আর কাল মেহেদী হাসান ৮০ রানে ছয় উইকেট নিয়ে পাঠিয়ে দেন তৃতীয়তে। এরপর সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে মেহরাব খেলেন স্পেশালিস্ট উইকেটরক্ষক হিসেবে। সেখানে শরীফের বলে হিথ স্ট্রিকের ক্যাচও ধরেন।

রাজিন সালেহ উইকেটকিপিং করেন ২০০৭ সালের মে মাসে। ভারতের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে। মিরপুরের ওই ম্যাচে মাসুদের বদলি হিসেবে কিছুটা সময় কিপিং করেন তিনি। ওই ম্যাচে ভারতের ব্যাটিং অর্ডারের প্রথম চারজন দিনেশ কার্তিক, ওয়াসিম জাফর, রাহুল দ্রাবিড় ও শচীন টেন্ডুলকার করেন সেঞ্চুরি। পাঁচ নম্বরে নামা সৌরভ গাঙ্গুলির আউটে জড়িয়ে উইকেটরক্ষক রাজিনের নাম। রফিকের বোলিংয়ে গাঙ্গুলির ক্যাচ ধরেন তিনি। আর গত বছরের মে মাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে খুলনা টেস্টে কিপিং করেন ইমরুল ও মাহমুদ উল্লাহ। ম্যাচে ব্যথা পাওয়ায় গ্লাভস ছেড়ে দেন মুশফিক। বদলি হিসেবে অনেকটা সময়জুড়ে কিপিং করেন ইমরুল; কোনো সাফল্য পাননি অবশ্য। পেয়েছেন মাহমুদ। তাইজুল ইসলামের বলে জুলফিকার বাবরের স্টাম্পিং করেন তিনি। ব্যথা সত্ত্বেও পরের টেস্টেও গ্লাভসের অধিকার ছাড়েননি মুশফিক। ব্যথা আরো বেড়ে যাওয়ায় পরের দুই সিরিজের তিন টেস্টে পারেননি কিপিং করতে।

গ্লাভস হাতে তাঁর সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন যতই থাকুন, এটি মুশফিকের ভালোবাসার জায়গা। স্বেচ্ছায় কিপিং যে ছাড়বেন না, তা বলেছেন বহুবার। খালেদ মাসুদের ১৬ বছরের রাজত্ব তিনি কেড়ে নিয়েছেন কাল। ক্যারিয়ার শেষে রেকর্ডটিকে যে জায়গায় রেখে যাবেন মুশফিক, তা ছাড়িয়ে যেতে উত্তরসূরি কারো নিশ্চিতভাবেই লাগবে আরো অনেক দিন!

 


মন্তব্য