kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


অভিষেকে যত আলো

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



অভিষেকে যত আলো

চট্টগ্রাম থেকে প্রতিনিধি : আকাশের নতুন তারকা কি একটু বেশিই উজ্জ্বল হয়? কাননে প্রস্ফুটিত নতুন ফুলের সৌন্দর্যও কি চোখে পড়ে না আলাদা করে? বাংলাদেশ ক্রিকেটের ক্ষেত্রে অন্তত অমন কথা বলাই যায়। টেস্ট অভিষেকে আলো ছড়ানো, সৌরভ বিলানো ক্রিকেটারের সংখ্যা তো বড় কম নয়!

ইংল্যান্ডকে কাঁপিয়ে কাল নিজের প্রথম ম্যাচেই মেহেদী হাসান যে পাঁচ উইকেট নেন, সেটি তাই ব্যতিক্রম নয়।

আশ্চর্য এক ‘নিয়ম’-এর ধারাবাহিকতা মাত্র।

নিয়ম মানে এই নয় যে, সবাই অভিষেকের পারফরম্যান্সে কাঁপিয়ে দিয়েছেন। তা সম্ভবও না। তবে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ ক্রিকেটার তো শুরুর ম্যাচেই এঁকে দেন প্রতিভার আগুন-আলপনা। ব্যাটে কিংবা বলে। টেস্ট ক্রিকেটের ১৬ বছরে বাংলাদেশের খুঁড়িয়ে পথচলার পরিসংখ্যান বিবেচনায় তা অবাক করার মতো নিঃসন্দেহে। এই যে কাল মেহেদী অভিষেকে পাঁচ উইকেট নেন, কীর্তির সেই সৌধেও তিনি নিঃসঙ্গ নন। নাঈমুর রহমান, মনজুরুল ইসলাম, মাহমুদ উল্লাহ, ইলিয়াস সানী, সোহাগ গাজী ও তাইজুল ইসলাম—নামগুলো খোদাই করা রয়েছে সেই চূড়ায়।

২০০০ সালে বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টেই ইনিংসে ছয় উইকেট অফ স্পিনার নাঈমুরের। আর তা যখন ভারতের বিখ্যাত ব্যাটিং লাইনের বিপক্ষে, অর্জনের মাহাত্ম্য বেড়ে যায় আরো। তাঁর ছয় শিকারে খরচ ১৩২ রান। আর পরের বছর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বুলাওয়েতে ৮১ রান দিয়ে ছয় উইকেট মনজুরুলের। তাতে অভিষেকে সেরা বোলিংয়ে নাঈমুরকে পেছনে ঠেলে শীর্ষে উঠে যান বাঁহাতি পেসার। ২০০৯ সালে সেন্ট ভিনসেন্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট ক্যাপ ওঠে মাহমুদের মাথায়। অফ স্পিনে প্রথম ইনিংসে তিন শিকার, দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচটি। ইনিংসে কিংবা ম্যাচে—দুই জায়গাতেই এখনো নিজের সেরা বোলিং হয়ে আছে তা।

চট্টগ্রামের এই জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ২০১১ সালে সাদা পোশাকের পথচলা শুরু ইলিয়াস সানির। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসেই ৯৪ রানে ছয় শিকার এই বাঁহাতি স্পিনারের। একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে পরের বছর মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে অফ স্পিনার সোহাগ গাজীর অভিষেক। সেখানে কালকের মেহেদীর মতো নতুন বলে বোলিং শুরু করেন তিনি। আর প্রথম ইনিংসে তিনের পর দ্বিতীয়টিতে নেন ছয় উইকেট। প্রথম টেস্টে পাঁচ উইকেট নেওয়ায় বাংলাদেশের তালিকার শেষ নয় এখানে। ২০১৪-র সেপ্টেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেন্ট ভিনসেন্টে অভিষেকে তো বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম নিয়ে নেন পাঁচ উইকেট।

আরো আছে। মাশরাফি বিন মর্তুজার টেস্ট ইনিংসে পাঁচ শিকারের কৃতিত্ব নেই। আবার কখনো পাঁচ দিনের ক্রিকেট খেলতে পারেন কি না, এ নিয়েও ঘোর সংশয়। অথচ ২০০১ সালে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট ইনিংসে চার শিকার করে দারুণ প্রতিশ্রুতিই দিয়েছিলেন তিনি। ২০১৩-র এপ্রিলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারারেতে টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে চার শিকার অভিষিক্ত জিয়াউর রহমানেরও। আর গত বছরের মুস্তাফিজুর রহমানের কীর্তির ছবিতে এখনো নিশ্চয়ই ধুলো পড়েনি। দক্ষিণ আফ্রিকাকে অলআউট করায় তাঁর চার উইকেটের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।

এ তো গেল বোলিং বীরত্বের গল্পগাথা। অভিষেকে ব্যাটিং কীর্তির নমুনাও তো অনেক। ভারতের বিপক্ষে ওই প্রথম টেস্টেই যেমন আমিনুল ইসলামের কল্পনা ছাড়ানো ১৪৫ রানের ইনিংস। হাবিবুল বাশারের স্ট্রোক ঝলমলে ৭১ রানও। যে ইনিংসের ওপর নিজের টেস্ট ক্যারিয়ার দাঁড়িয়ে বলে সব সময় স্বীকার করেন সাবেক এই অধিনায়ক। জাভেদ ওমর বেলিম সে টেস্টের স্কোয়াডে থাকলেও একাদশে সুযোগ পাননি। ‘টেস্ট ক্রিকেটার’-এর তকমা সেঁটে যাওয়া ব্যাটসম্যানই কিনা দেশের প্রথম টেস্টে ব্রাত্য। জবাবটা ওপেনার দেন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পরের সিরিজে সুযোগ পেয়ে। বুলাওয়েতে প্রথম ইনিংসে ৬২ করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে আদ্যোন্ত ব্যাটিংয়ে অপরাজিত থাকেন ৮৫ রান করে। মাত্রই টেস্ট আঙিনায় পা রাখা কোনো ক্রিকেটারের জন্য সেটি ছিল বিশাল এক কীর্তি।

এরপর মোহাম্মদ আশরাফুল। টেস্টে তাঁর ক্ল্যাপস্টিক শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অবিশ্বাস্য সেই সেঞ্চুরিতে। কৈশোরের গন্ধ গায়ে লেগে থাকা সেই ব্যাটসম্যান বিশ্বক্রিকেটে বাংলাদেশকে উপস্থাপন করেন ভিন্ন মর্যাদায়। টেস্ট অভিষেকে সানোয়ার হোসেন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে করেন ৪৫, হান্নান সরকার শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৫৫, একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তাপস বৈশ্য ৫২। শুরুটা ভালো হয় রাজিন সালেহ (৬০), নাফিস ইকবালেরও (৪৯)। শেষজনের ছোট ভাই তামিম ইকবালের টেস্টের শুরু আরো ঝলমলে। ২০০৮ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেকের দুই ইনিংসে এই বাঁহাতি ওপেনার করেন ৫৩ ও ৮৪ রান। একই টেস্টে টেস্ট ক্যাপ ওঠে আরেক ওপেনার জুনায়েদ সিদ্দিকীর মাথায়ও। তাতে দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি করেন ৭৪ রান। দুই নতুনে দ্বিতীয় ইনিংসে ১৬১ রানের ওপেনিং জুটিতে চোখে-মুখে শর্ষেফুল দেখে কিউই বোলাররা।

আরো আছে। এই চট্টগ্রামেই পাকিস্তানের বিপক্ষে অভিষেকে নাজিমুদ্দিন খেলেন ৭৮ রানের যথার্থ টেস্ট ইনিংস। ২০১২ সালে খুলনায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বড় এক কীর্তি আবুল হাসানের। মূলত পেস বোলার কিন্তু ১০ নম্বরে নেমে যে সেঞ্চুরি করে বসেন তিনি! পরের বছরের গল টেস্ট স্মরণীয় হয়ে আছে মুশফিকুর রহিমের ২০০, আশরাফুলের ১৯০, নাসির হোসেনের ১০০ রানের ইনিংসগুলোর সৌজন্যে। কিন্তু সেই টেস্টে অভিষেকে ৫৫ রান করেন মমিনুল হকও। যে ইনিংসে প্রতিশ্রুতি ছিল বড় কিছুর। পরবর্তী কালে টেস্ট ক্যারিয়ারে এখনো পর্যন্ত তাঁর পারফরম্যান্সে সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।

মমিনুল অবশ্য এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী দলের অংশ। যেখানে হাবিবুল-আশরাফুল-তামিম হয়তো তাঁর সঙ্গে ব্র্যাকেটবন্দি, যাঁদের টেস্ট ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান অন্তত হাহাকার ছড়ানোর মতো নয়। তাইজুল-মুস্তাফিজদের মতো দু-একজনের বেলায় এখনো অনুসিদ্ধান্তে আসার সময় হয়নি। এর বাইরে অভিষেকে পারফরম্যান্সকে পরবর্তীতে টেনে নিতে পারেননি তেমন কেউ।

মেহেদী হাসানের কাল পাঁচ উইকেট শিকারেও ফিসফিসিয়ে এই সতর্কবার্তাটা তাই থাকছেই!


মন্তব্য