kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জ্বলেই নিভতে আসেননি মেহেদী

নোমান মোহাম্মদ, চট্টগ্রাম থেকে   

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



জ্বলেই নিভতে আসেননি মেহেদী

ছবি : মীর ফরিদ, চট্টগ্রাম থেকে

স্বপ্নের ঝড় তুলে তাঁর আগমন। ইন্দ্রজালের বিভা ছড়িয়ে তাঁর আবির্ভাব।

টেস্ট অভিষেকে পাঁচ উইকেট নিয়ে কাল বাংলাদেশের ক্রিকেটাকাশ রাঙিয়ে দেন ১৮ বছরের তরুণ মেহেদী হাসান। আর এ যেন ক্রিকেট-ঈশ্বরের নিজ হাতে লেখা চিত্রনাট্য! নইলে অভিষেকটা কেন ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই হবে!

ইংল্যান্ডের সঙ্গে তাঁর স্বপ্নের এক আশ্চর্য যোগসূত্র রয়েছে। ২০১০ সালে অনূর্ধ্ব-১৪ জাতীয় পর্যায়ে বিভাগীয় সেরা ব্যাটসম্যান হন। পুরস্কারের ২৫ হাজার টাকা মেহেদীর হাতে তুলে দেওয়া হয় ওই বছর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড ওয়ানডে ম্যাচের আগে। ওই প্রথম স্বপ্নের নায়ক সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিমদের চর্মচক্ষে দেখা। তখনই তাঁর প্রতিজ্ঞাটা শাণিত হয় আরো, ‘এক দিন জাতীয় দলে আমাকে খেলতেই হবে। ’ বাংলাদেশের সেই জার্সি মেহেদীর গায়ে ওঠে ওই ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই! কাল তাই দিনশেষে কণ্ঠে অবিশ্বাস মাখিয়ে বলে যান, ‘মানুষ স্বপ্নে যেমন দেখে, সবই কি মিলে যায়! আমার বেলায় তো এক্কেবারে মিলে গেল! বিশেষত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেক, সেখানে এমন পারফরম্যান্সের পর মনে হচ্ছে—সবই আল্লাহর ইচ্ছা। ’

মেহেদী তো এমন অবাক হবেনই! তবে আর অবাক হন না কাল চট্টগ্রাম থেকে ফোনে ভেজাকণ্ঠ বাবার সঙ্গে কথা বলার সময়। তিনি যে সেই ২০১০ সালেই সন্তানকে স্বপ্নের পথে দৌড়ানোর অনুমোদন দিয়ে দেন! তাঁর এই বাবা খুলনায় গাড়ি চালিয়ে সংসার চালাতেন। ছেলে ক্রিকেটের নেশায় মেতে থাকায় দিয়েছেন কত বকুনি! কত পিটুনি! কারণ তাঁর ধারণা, ক্রিকেট খেললে খারাপ সঙ্গে পড়ে সন্তান খারাপ হয়ে যাবে। অথচ সেই সন্তান এখন পুরো দেশের গর্ব! ২০১০ সালে সেই পুরস্কার নেওয়ার সময় বাবাকে সঙ্গে নিয়ে যান মেহেদী। স্টেডিয়ামে বসিয়ে দেখান বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড ওয়ানডে। সেখানে ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের কদর দেখে আর বাধা দেননি। কাল সেই সন্তান পাঁচ উইকেট পাওয়ার পর ফোনে কথা বলার সময় বাবার কণ্ঠ ভিজে উঠবে না কেন!

বাংলাদেশের জার্সি পরে মাঠে নামাই তো স্বপ্নপূরণ, সেখানে এমন পারফরম্যান্স! দিনশেষে প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় মেহেদীর খুশি যেন ধরে না, ‘অনেক ভালো লাগছে। এ দিনটার কথা আমার সারা জীবন মনে থাকবে। ’ আর তাঁর বোলিং যে নিজের স্বপ্নকেও ছাড়িয়ে গেছে, তাও অকপটে জানান তিনি, ‘এতটা ভাবিনি যে আমি পাঁচ উইকেট পাব। চিন্তা ছিল, প্রথম ম্যাচে নিজেকে আস্তে আস্তে মানিয়ে নেওয়ার। ভেবেছিলাম, পারফরম্যান্সটা যেন গড়পড়তা হয়। একটি-দুটি উইকেট পেলাম, ব্যাটিংয়ে ৩০ রানের মতো করলাম—এমন আর কি! আজকের পারফরম্যান্স আসলে আমার প্রত্যাশার বাইরে। ’ দল থেকেও যে তাঁর কাঁধে প্রত্যাশার জোয়াল চাপিয়ে দেওয়া হয়নি, তাও বলেছেন মেহেদী, ‘টিম ম্যানেজমেন্টও পাঁচ-ছয় উইকেটের আশা করেনি। আমার কাছে তাদের চাওয়া ছিল, আমি যেন মোটামুটি ভালো করি। যেন ভালো জায়গায় বল করি। উইকেট না পেলেও এ নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। ’

অথচ এই মেহেদী কাল দিনজুড়ে হয়ে থাকেন ইংল্যান্ডের দুশ্চিন্তা। এ ক্ষেত্রে অধিনায়কের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেন না, ‘‘আমার প্রথম বলটিই অনেক টার্ন করেছে। এরপর মুশফিক ভাই বারবার বলছিলেন, ‘বলগুলো স্টাম্পে রাখিস। তাহলে এলবিডাব্লিউ, বোল্ড হওয়ার সুযোগ থাকবে। ’ শুরুর কয়েক ওভার বাইরে বাইরে বোলিং করেছি। ওরা সেগুলো সহজে ছেড়ে দিচ্ছিল। তবে যখন বুঝতে পারলাম, স্টাম্প বরাবর বোলিং করলে ফল পাব, সে চেষ্টা করেছি। তাতেই পেয়েছি সফলতা। ’’ সফলতা বলতে পাঁচ-পাঁচটি উইকেট। এর মধ্যে শেষ শিকার বেশি প্রিয় মেহেদীর, ‘উইকেট সবগুলোই ভালো লেগেছে। তবে বোল্ড করে পঞ্চম যে উইকেট পেলাম, তা ভালো লেগেছে বেশি। ’ কেন? ‘বলটা উইকেটে পড়ে সোজা গেছে। কিভাবে কী হলো, ও বোঝেনি। আমিও বুঝিনি’—কৈশোরের সারল্যে মেহেদীর স্বীকারোক্তি।

অভিষেকে বাজিমাত করা খুলনার এই অলরাউন্ডার কাল বেশি করে স্মরণ করেন দুজনকে। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের কোচ সোহেল ইসলাম এবং খুলনার সতীর্থ বাঁহাতি স্পিনার আবদুর রাজ্জাককে। তাঁদের কথা বলতে গিয়ে যেন কৃতজ্ঞতায় বুজে আসে মেহেদীর কণ্ঠ, ‘‘অনূর্ধ্ব-১৫ দল থেকে আমাকে গাইড করে আসছেন সোহেল স্যার। কিভাবে উন্নতি করা যায়, ওনার সঙ্গে সব সময় কথা বলি। আর খুলনায় জাতীয় লিগে খেলার সময় রাজ ভাইও আমাকে খুব সাহায্য করেছেন। উনি সব সময় একটা কথা বলেন, ওখানে যেমন বোলিং করি, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও যেন তা-ই করি। বলেছেন, ‘তুই এক জায়গায় বোলিং করবি, কোনো বৈচিত্র্যের প্রয়োজন নেই। এক জায়গায় বোলিং করলে তোর বল কেউ খেলতে পারবে না। ’ এটা আমার মাথায় সব সময় কাজ করেছে। ’’

আর প্রতিজ্ঞার কথাও নিশ্চয়ই ভুলে যাননি মেহেদী। সর্বশেষ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ছিলেন বাংলাদেশের অধিনায়ক। গত বছর আগস্টেই শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের ইনডোরে নিজের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে তাঁর উচ্চারণ, ‘আগামী দুই বছরের মধ্যে জাতীয় দলে ঢুকতে চাই। আর একবার ঢুকলে অন্তত ১০ বছর টানা খেলতে চাই। ’ প্রথম স্বপ্নপূরণ হয়েছে। আর তাতে প্রথম দিনেই মেহেদীর এমন পারফরম্যান্স যে, তাঁর দ্বিতীয় স্বপ্নপূরণের বিপক্ষে এই মুহূর্তে অন্তত বাজি ধরার কাউকে পাওয়া যাবে না ৫৬ হাজার বর্গমাইলে!


মন্তব্য