kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


যেখানে যোজন দূরত্বে তামিমরা

২০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



যেখানে যোজন দূরত্বে তামিমরা

চট্টগ্রাম থেকে প্রতিনিধি : তামিম ইকবালের বৃহস্পতি তখন তুঙ্গে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাদের দেশে গিয়ে পর পর দুই টেস্টে সেঞ্চুরি বলে কথা! যার স্বীকৃতিতে ক্রিকেট-বাইবেল উইজডেনের ২০১০ সালের বর্ষসেরা ক্রিকেটারের স্বীকৃতি পান পর্যন্ত।

তবে ছয় বছর পর আবার যখন টেস্টে মুখোমুখি বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড, তামিমের টেস্ট পারফরম্যান্সের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাহাকার না ছড়িয়ে পারে না। মাঝের অর্ধযুগে যে ক্যারিয়ারে আর মোটে তিনটি টেস্ট সেঞ্চুরি যোগ করতে পারেন ডাকাবুকো এই ওপেনার!

 

অথচ জো রুটের দিকে তাকান। ২০১০ সালের যে মে মাসে লর্ডসে ইংলিশ বোলারদের তুলাধোনো করে সেঞ্চুরি তুলে নেন তামিম, ওই মাসেই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক রুটের। টেস্ট অভিষেক আরো আড়াই বছর পর, ২০১২-র ডিসেম্বরে। কিন্তু সেই রুটের নামের পাশে এখন ১০টি টেস্ট সেঞ্চুরি। আর বাংলাদেশ ওপেনারের সব মিলিয়েও এর চেয়ে তিনটি কম!

তামিম ও তাঁর সতীর্থ সবার টেস্ট ক্যারিয়ার অনুক্ষণ পোড়ে এই আক্ষেপে। তবে এই ব্যর্থতার দায় পুরোটাই ক্রিকেটারদের—তা বলার উপায় নেই। প্রায় ৯ বছরের ক্যারিয়ারে মোটে ৪২ টেস্ট খেলার সুযোগ পান তামিম। তাঁর মাস ছয়েক আগে গায়ে সাদা পোশাক চড়ানো সাকিব আল হাসানের ম্যাচসংখ্যাও তাই। তাঁদের চেয়ে একটু সিনিয়র মুশফিকুর রহিম। তবু ২০০৫ সালের মে মাসে লর্ডসে অভিষেকের পরের সাড়ে ১১ বছরে তো মোটে ৪৮ টেস্ট খেলার সুযোগ মেলে তাঁর। অথচ টেস্ট ক্যারিয়ারের চার বছর পূর্তি হওয়ার আগেই রুট খেলে ফেলেন ৪৬ টেস্ট। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের আফসোস তাই থাকবে না কেন!

পাশাপাশি নিজেদের পারফরম্যান্সকে আয়নায় দেখার সময়ও হয়েছে বোধকরি। ব্যাটিংয়েও ওই ত্রয়ীর টেস্ট ম্যাচ সংখ্যা তো কমবেশি সেই রুটেরই সমান। কিন্তু বিবেচ্য যদি হয় টেস্ট সেঞ্চুরি, সেখানে কত কত পিছিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা! তামিমের ৭, মুশফিক-সাকিবের ৩টি করে। শুধু তাই নয়। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট স্কোয়াডের সবার সম্মিলিত সেঞ্চুরির সংখ্যা এক অ্যালিস্টার কুকের চেয়েই ৮টি কম! মুশফিকের দলের যেখানে ২১; সেখানে এক ইংল্যান্ড অধিনায়কেরই টেস্ট সেঞ্চুরি ২৯টি!

আজ থেকে শুরু হওয়া ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট দিয়ে আবার পাঁচ দিনের ক্রিকেটে নিয়মিত হচ্ছে বাংলাদেশ। সেঞ্চুরির সংখ্যা বাড়িয়ে নেওয়ার দাবিটা তাই তাঁদের কাছে বাড়ছেই!

আর কেবল টেস্ট নয়, পরিসর আরেকটু বাড়িয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আলো ফেলা হলেও সেখানে আঁধারের আধিক্যই বেশি। অন্তত এই সিরিজের প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ডের তুলনায়। একটু নজর বোলানো যাক মুশফিকের দলের ব্যাটসম্যানদের দীর্ঘ পরিসরের পারফরম্যান্সে। ৪২ টেস্টে তামিমের ৭ সেঞ্চুরি, ১৮ ফিফটি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৭২ ম্যাচে ১৩ সেঞ্চুরি, ৩১ ফিফটি। ওপেনিং সঙ্গী ইমরুল কায়েসের ২৪ টেস্টে ৩টি করে সেঞ্চুরি-ফিফটি আর প্রথম শ্রেণিতে ৮৩ ম্যাচে ১৪ সেঞ্চুরি, ১৮ ফিফটি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাংলাদেশ স্কোয়াডের এ দুজনের রানই কেবল পাঁচ হাজার পেরোনো।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিন নম্বরে খেলতে যাওয়া মমিনুল হক যেমন সেঞ্চুরি সংখ্যার গড়ে অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে। মাত্র ১৭ টেস্টে ৯টি ফিফটির পাশাপাশি ৪ সেঞ্চুরি এই বাঁহাতির। আর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৬৩ ম্যাচে ১০ সেঞ্চুরি, ২৫ ফিফটি। ২৭ টেস্ট খেলা মাহমুদ উল্লাহর সেঞ্চুরি মোটে ১টি। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যামিল্টনে আট নম্বরে নেমে করেন তা। স্টাইলিশ এই ব্যাটসম্যানের নামে তখন ছোটে প্রশংসার তুফান। কিন্তু ক্যারিয়ারে এরপর একটিও টেস্ট সেঞ্চুরি যোগ করতে পারেন না। আর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সাকুল্যে মাহমুদের সেঞ্চুরি ৮টি; সঙ্গে ২৬ ফিফটি।

এবার জানুন আরো দুই স্তম্ভের পরিসংখ্যান। ৪৮ টেস্ট খেলে মোটে তিন সেঞ্চুরি মুশফিকের সামর্থ্যের প্রতিফলক না নিশ্চিতভাবে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৮৭ ম্যাচে ছয় সেঞ্চুরিও নয়। ঠিক যেমনটা বলা যায় সাকিবের বেলাতেও। টেস্ট ও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তাঁর সেঞ্চুরি সংখ্যা অধিনায়কের ঠিক সমান। মুশফিকের চেয়ে ছয়টি টেস্ট ও ৯টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ কম খেলেন তিনি। সাদা পোশাকের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মুশফিক ১৫ বার এবং সাকিব ১৯ বার ফিফটিকে রূপান্তর করতে পারেননি সেঞ্চুরিতে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ধরলে সংখ্যাটি যথাক্রমে ২৭ ও ২৯। প্রতিভা বিবেচনায় এ দুজন নিশ্চয়ই এর চেয়ে ঢের ভালো!

প্রথম টেস্টের স্কোয়াডে থাকা অন্য ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সৌম্য সরকারের তিন টেস্টে নেই কোনো ফিফটি। শুভাগত হোমের সাত টেস্টে মোটে ১টি। পরেরজনের প্রথম শ্রেণিতে ৮ সেঞ্চুরি থাকলেও প্রথমজনের মাত্র ১টি। ঘরোয়া ক্রিকেটেই তো বড় রানের ইনিংসে অভ্যস্ত না, টেস্ট মঞ্চে তা করাটা তাই কঠিন হয়ে পড়ে বৈ কি! টেস্ট অভিষেকের অপেক্ষায় থাকা সাব্বির রহমান (প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৩ সেঞ্চুরি), নুরুল হাসানদের (৫ সেঞ্চুরি) ক্ষেত্রেও বলা যায় একই কথা।

বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের এই ফ্যাকাসের পরিসংখ্যানের বিপরীতে ইংল্যান্ডের ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে তা কী বর্ণিল! এক অ্যালিস্টার কুকের ১৩৩ টেস্টে ২৯ সেঞ্চুরি, ৫১ ফিফটি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ২৪৫ ম্যাচে ৫৫ সেঞ্চুরি, ৯৫ ফিফটি। আচ্ছা, এক পাশে সরিয়ে রাখুন ইংল্যান্ড অধিনায়ককে। রুটেরই ৪৬ টেস্টে হয়ে গেছে ১০ সেঞ্চুরি, ২২ ফিফটি। প্রথম শ্রেণিতে ১৯ সেঞ্চুরি, ৩৫ ফিফটি। তাঁকেও না হয় বাদ দিন। মূলত লেগ স্পিনার যে আদিল রশিদ, যিনি খেলেছেন মোটে তিন টেস্ট—তাঁরও তো প্রথম শ্রেণিতে রয়েছে ১০টি শতরানের ইনিংস!

কুকের টেস্ট সেঞ্চুরি সংখ্যা বাংলাদেশ স্কোয়াডের সবার সম্মিলিত শতরানের চেয়ে ৮টি বেশি—এই পরিসংখ্যানই যথেষ্ট বিব্রতকর। পাশে যখন আদিল রশিদের প্রথম শ্রেণির সেঞ্চুরি সংখ্যা রাখা হবে, তামিম-মুশফিক-সাকিবদের কাছে দাবিটা বেড়ে যায় আরো।

১৪ মাস বিরতির পর আজ থেকে শুরু যে টেস্ট মৌসুম, সেখানে সেঞ্চুরি সংখ্যা বাড়াতেই হবে তাঁদের!


মন্তব্য