kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


এবার অনভ্যস্ত টেস্টের জগতে

এক বছর পর মুশফিক...

নোমান মোহাম্মদ, চট্টগ্রাম থেকে   

২০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



এক বছর পর মুশফিক...

ছবি : মীর ফরিদ, চট্টগ্রাম থেকে

‘ক্যাপ্টেন, চট্টগ্রামে প্রচণ্ড গরমে...’—প্রথম প্রশ্নের প্রথম অংশই শেষ হতে দেন না। মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ক্লিষ্ট হাসিতে বলে ওঠেন বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক, ‘‘অনেক দিন পর শুনলাম যে, কেউ ‘ক্যাপ্টেন’ বলল।

আচ্ছা যা-ই হোক, ভালোই লাগল। ’’

এই ভালো লাগা কি আর সত্যিই ভালো লাগা? মুশফিকুর রহিমের মনের কষ্ট-কড়চা পড়ে নিতে তো সমস্যা হয় না এতটুকুন। দুটি বাক্যেই উথলে ওঠে তাঁর বুকের বিষাদসিন্ধু। আছড়ে পড়ে হাহাকারের ঢেউ। সংবাদ সম্মেলন কক্ষের জনারণ্যেও শোনা যায় তাঁর হৃদয়ের ভাঙনের শব্দ। সাম্রাজ্য হারানোর অনেক দিন পর আবার রাজ্যাভিষেকের মুহূর্তে যেমনটা হয় আর কি! মুশফিকের কণ্ঠে কাল তেমনই বিষণ্নতা! তেমনই অভিমান!

হালফিলের ক্রিকেটে কোচের গুরুত্ব বেড়েছে অনেক। বাংলাদেশে তা হয়তো আরো বেশি করে। তবে ক্রিকেট দল শেষ পর্যন্ত অধিনায়কেরই। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৪-র সেপ্টেম্বর—এই তিন বছর বাংলাদেশ দল ছিল সর্বাংশেই মুশফিকের। সব ফরম্যাটে, সব ধরনের ক্রিকেটে। এরপর ক্ষমতা খর্ব করে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টির দায়িত্ব থেকে দেওয়া হয় অব্যাহতি। সবেধন নীলমণি হয়ে থাকে কেবল টেস্ট অধিনায়কত্ব। কিন্তু ২০১৫-র আগস্টের পর তো ওই পাঁচ দিনের ক্রিকেটের আঙিনাই আর মাড়ায়নি বাংলাদেশ। গত ১৪ মাসে মুশফিক তাই অন্য ১০ জনের একজন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টে যখন আবার ‘একজন’ হয়ে অধিনায়কের সিংহাসনে বসার উপলক্ষ, সাম্রাজ্য হারানোর হাহাকার যেন আবারও কাল ফুটে বেরোয় তাঁর হৃদয় চিরে।

শুধু কি তাই? মাঝের এই সময়ে তো মুশফিক নিজেকে গুটিয়ে রাখেন শামুকের মতো। ঝিনুকের মতো অভিমানের বিষ-বালি ভেতরে নিয়ে দূরে সরে থাকেন সবার কাছ থেকে। ওদিকে ব্যাট থেকে রানের মুক্তোও ফোটে না আর। সব মিলিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে হয়ে যায় মেরু-দূরত্ব। পারতপক্ষে কথা বলেননি কোনো সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে। ২০১৫ সালের ৭ নভেম্বর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডেতে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে আসেন সর্বশেষবার। এর প্রায় এক বছর পর কাল আবার। টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে তো আর সেটি না করে উপায় নেই। এ নিয়ে তাই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। যার উত্তরটা কাল পেশাদার খোলসের মধ্যেই রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা মুশফিকের, ‘এটা আসলে আমার মনোযোগ একটা সুনির্দিষ্ট জায়গায় রাখার জন্য। ভাবছিলাম অন্য দিকে মনোযোগ না দিয়ে যদি নিজের কাজগুলো ভালোভাবে করতে পারি। আমার খেলা নিয়ে যেন বেশি সময় দিতে পারি। এই একটি কারণেই মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলিনি; এর বাইরে তেমন কোনো কারণ নেই। আর শেষ ১৫ মাসে হয়তো-বা কোনো খেলা হয়নি, তাই সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা হয় না। হয়তো খেলা হলে নিয়মিত দেখা হতো। ’

এখন? টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হতে হবে প্রতিনিয়ত। ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, ভারত, শ্রীলঙ্কা—একের পর এক টেস্ট সিরিজ সামনে। তাহলে? কণ্ঠে সেই অভিমানের সুর চড়িয়ে উত্তর দেন মুশফিক, ‘এটা মিডিয়ার ওপর নির্ভর করছে। আপনারা যদি ভালো ভালো প্রশ্ন করেন, আমিও ভালো ভালো উত্তর দেব। তাহলে হয়তো প্রভাব পড়বে না। আর যদি যদি উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করেন, তাহলে প্রভাব পড়তেও পারে। চেষ্টা করব মাঠে ভালো পারফরম্যান্স করার, দল হিসেবে ভালো করার। তাহলে হয়তো আপনারাও উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করার সুযোগ পাবেন না। ’ গণমাধ্যমকে পরোক্ষে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে যান কিন্তু কণ্ঠে যেন অভিযোগের চেয়ে অনুযোগই বেশি। বছরখানেক ধরে তো গণমাধ্যমকে ভালো কিংবা মন্দ কোনো প্রশ্ন করারই সুযোগ দেননি—মনে করিয়ে দিতেই আরো অসহায় শোনায় মুশফিকের স্বর, ‘আপনারা যদি এতটুকু সাহায্য না করেন, তাহলে খুব কঠিন হয়ে যায়। আমি ভেবেছি নিজের কাজের প্রতি মনোযোগটা যেন রাখতে পারি। হয়তো যেভাবে চেয়েছি, সেভাবে হয়নি। এখন আপনাদের অন্য রকম অনুভূতি থাকতে পারে। তবে আমি চেষ্টা করেছি যেটা দলের জন্য ভালো হয়, নিজের জন্য ভালো হয়—তা করার। ’

খারাপ সময়ে খোলসে ঢুকে যাওয়ার কথা শোনা যায় পরিচিতদের কাছ থেকে—শুনে পাল্টা জানতে চান, ‘পরিচিত কার কাছ থেকে শুনেছেন, আমিও শুনতে চাই। ’ পরে আবার ব্যথাতুর কণ্ঠে ব্যাখ্যা দেন মুশফিক, ‘খারাপ খেললে সবারই খারাপ লাগা স্বাভাবিক। আমি চেষ্টা করি আমার খারাপ লাগার কারণে যেন অন্য কারো খারাপ না লাগে। কারণ অনেকেই আমার কাছে অনেক কিছু আশা করে। আমার ভালো করার ওপর অনেকের ইচ্ছা থাকে, আকাঙ্ক্ষা থাকে। খারাপ করলে তাদেরও খারাপ লাগে। আমি চাই না যে আমার কারণে অন্য কেউ খারাপ অনুভব করুক। ’

এমনিভাবেই টেস্টপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে অনেকটা অংশজুড়ে থাকেন তিনি। যাঁর হৃদয়ে বেদনার রক্তক্ষরণ কিন্তু মুখ দিয়ে ছোটে না বাক্যের বর্শা। অভিমানের শব্দগুচ্ছ উড়ে বেড়ায় বরং। আর বিষাদের ওই জলরঙের ক্যানভাসেই ধরা থাকেন কালকের তিনি। ব্যক্তি মুশফিকুর রহিম! অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম!


মন্তব্য