kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


টেস্ট ক্রিকেট মর্যাদা নাকি যন্ত্রণা?

সাইদুজ্জামান   

১৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



টেস্ট ক্রিকেট মর্যাদা নাকি যন্ত্রণা?

চট্টগ্রাম টেস্টের দল ঘোষণার পরদিন ‘স্বপ্নপূরণে’র কথা শুনিয়েছেন সাব্বির রহমান। টি-টোয়েন্টি আর ওয়ানডেতে দাপিয়ে বেড়ালেও অভিজাত ক্রিকেটারদের মতো রাজশাহীর এ তরুণও টেস্টের পূজারি।

প্রকাশ্যে জাতীয় দল তো বটেই, যেকোনো উঠতি খেলোয়াড়ও নির্দ্বিধায় বলে দেবেন, টেস্টই আসল ক্রিকেট। কিন্তু এই ‘আসল ক্রিকেট’টা কি খেলতে সত্যি সত্যিই মরিয়া তাঁরা? কজনের হূদয়জুড়ে টেস্ট ক্রিকেট? শুধু খেলোয়াড় কেন, ক্রিকেট-সংশ্লিষ্টরা টেস্ট ক্রিকেটের ব্যাপারে সিরিয়াস কি না, সে প্রশ্ন বহুদিনের। নানা ‘উপসর্গ’ থেকেই কিন্তু এমন সব প্রশ্নের উদ্ভব।

টেস্ট ক্রিকেট ‘আসল ক্রিকেট’ নানা কারণে। ক্রিকেটের যাত্রা শুরুই এ ফরম্যাট দিয়ে, যে ফরম্যাট সাময়িক মাস্তানির চেয়ে ক্লাস এবং টেম্পারামেন্টের আভিজাত্য মেলে ধরার একমাত্র মঞ্চ। টি-টোয়েন্টি আর ওয়ানডে খেলে কোটিপতি হওয়া তামিম ইকবাল বিশ্বাস করেন, ‘একজন ক্রিকেটার বেঁচে থাকে তার টেস্ট পারফরম্যান্সে। ’ টেস্ট পারফরম্যান্সই গ্রেটনেসের প্রধান মানদণ্ড।

হালে বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতের গ্রেটদের দেখতে আর দর্শক মাঠে আসে না। দুবাইয়ে পাকিস্তান-ওয়েস্ট ইন্ডিজ রোমাঞ্চকর ম্যাচেও গ্যালারি মরুভূমির মতো ফাঁকা! টেস্ট ক্রিকেটকে বাঁচিয়ে রাখতে তাই মরিয়া আইসিসি এবং বিভিন্ন দেশের ক্রিকেট সংস্থা। গোলাপি বলে কৃত্রিম আলোয় টেস্ট হচ্ছে দর্শক টানতে। যদি কাজের শেষে মাঠমুখী হয় দর্শক। আর ক্রিকেটারদের টেস্টমুখী করতে আকাশচুম্বী ম্যাচ ফি ঘোষণা করেছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। যদি টেস্টপিছু নগদ ১৫ লাখ রুপি প্রাপ্তির টানেও দীর্ঘ পরিসরে আকৃষ্ট রাখা যায় ক্রিকেটারদের।

গোলাপি বল নিয়ে এখনো কিছুটা ‘অচ্ছুত’ মনোভাব রয়ে গেছে ক্রিকেট মহলে। কিন্তু ভারতীয় বোর্ডের টেস্ট ম্যাচ ফি বৃদ্ধির ঘোষণা ক্রিকেটারদের আড্ডার বক্স অফিস প্রবলভাবে হিট করেছে। মাঠে ভয়ংকর ফাস্ট বোলারের বাউন্সার খেলার সাহস রাখা ব্যাটসম্যানও অবশ্য এ নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে নারাজ। এতে যে দ্বিমুখী আক্রমণের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে! প্রথমত, ফি বাড়ানোর দাবি প্রকাশ্যে তুললে চটতে পারেন বোর্ড কর্মকর্তারা। দ্বিতীয়ত, অর্থের কাঙাল ভেবে ফেসবুক তোলপাড় করতে পারে সাধারণ মানুষ। অগত্যা অতি আপনজন ছাড়া কারো কাছে ভারতীয় বোর্ডকে উদ্ধৃত করেন না ক্রিকেটাররা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ক্রিকেটারদের আপনজন তাঁরা নিজেরা, তাই আলোচনাটাও থেমে তাঁদের গণ্ডিতেই।

কিন্তু চাপা এ অসন্তোষের প্রভাবটা ভয়াবহ। টি-টোয়েন্টি কিংবা ওয়ানডের চেয়ে টেস্ট দল ঘোষণার আগে বেশি শোনা যায় চোটের খবর। আরো বেশি শোনা যায়, ‘ওর টেস্ট ফিটনেস নেই। ’ প্রশ্ন হলো, কেন নেই? তাহলে বছরজুড়ে সেই ক্রিকেটারটি সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটে খেললেন কী করে? কেন চার পেসারে ওয়ানডে খেলা বাংলাদেশ দল টেস্টের পেস আক্রমণ সাজাতে হিমশিম খাবে? এমন প্রশ্নে ব্যতিব্যস্ত একজন অনন্যোপায় হয়ে অনুচ্চে বললেন, ‘ম্যাচ ফি দুম করে বাড়িয়ে দেন, দেখবেন আধমরা ঘোড়াও দাঁড়িয়ে গেছে টেস্ট খেলার জন্য! ভারতের মতো দেশও দেখছেন না কেমন ডাবল করে দিয়েছে ম্যাচ ফি। ’

ক্রিকেটাররা দেশের পতাকাকে সম্মান করেন না, জার্সির মূল্য দেন না—এসব বাজে কথা। আবার স্রেফ দেশ এবং জার্সির কথা ভেবে মাঠে প্রাণপণ লড়েন, সেসবও মেকি। ক্রিকেটটা সাকিব আল হাসান থেকে শুরু করে প্রথমবার টেস্টে ডাক পাওয়া চার তরুণের মতই পেশা। আর সব পেশার মতো ক্রিকেটেও তাই প্রভাব ফেলে পারিশ্রমিক। বিনা পারিশ্রমিকে অন্য কোনো পেশার কেউ কি ওভারটাইম করবেন? সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটের প্রভাবে টেস্ট ক্রিকেটকেও ‘ওভারটাইম’ ভাবতে শুরু করেছেন ক্রিকেটাররা। ওভারটাইমইতো! ওয়ানডের ম্যাচ ফি এক লাখ আর টেস্টের দুই লাখ। ওয়ানডে এক দিনের, টেস্ট পাঁচ দিনের। সে হিসেবে ব্যবধানটা পাঁচ গুণ হওয়ার কথা নয় কি? তার ওপর বাংলাদেশ বছরে কয়টা টেস্ট খেলে? ভাবা যায়, টেস্টে ব্যাটিং গড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকা মমিনুল হক গত এক বছরে কোনো ম্যাচ ফি পাননি, টেস্টই হয়নি যে! অগত্যা টেস্টের চিন্তা বাদ দিয়ে মমিনুলে আরো বেশি ‘ইম্প্রোভাইজড’ ক্রিকেটে মনোযোগী না হয়ে উপায় কী? এ অবস্থায় টেস্টের ম্যাচ ফি বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

অবশ্য টেস্ট নিয়ে ভাবনা বাংলাদেশের ক্রিকেট অভিভাবক মহলে বিশেষ ভাবনা আছে বলে মনে হওয়ার কোনো কারণ নেই। ভাবনা থাকলে তো টেস্ট দল গড়তে এমন হিমশিম খেতে হয় না নির্বাচকদের। বোর্ড কর্তারা কয়েক বছর ধরে লাগামাহীন বলে আসছেন যে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) কারণে নাকি বানের জলের মতো ক্রিকেটার উঠে আসছেন। তাহলে টেস্ট দল গড়তে ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা কেন?

টেস্টের গুরুত্ব বোঝাতে জাতীয় লিগ (এনসিএল) এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগকে (বিসিএল) সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলে বোর্ড। তা যদি দেওয়া হয়েই থাকে, তাহলে টেস্টের পাইপলাইন এত সরু কেন? কার্যকারণে মনে হয় এসব বলা দরকার, তাই বলা আর কি!

সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটে অর্থাগমের সঙ্গে দলেরও পারফরম্যান্স ঊর্ধ্বমুখী। সে কারণেই কিনা একদা মর্যাদার টেস্ট ক্রিকেটটা হয়ে গেছে বাংলাদেশের ‘অ্যাসিডিটি’, মাঝেমধ্যে এসে খুব জ্বালিয়ে যায়!


মন্তব্য