kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


টেস্ট ভাবনারই প্রভাব নেই ছকে

সাইদুজ্জামান   

১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



টেস্ট ভাবনারই প্রভাব নেই ছকে

টি-টোয়েন্টি আমদানির পর ক্রিকেটে ‘আউট অব দ্য বক্স’ চিন্তাভাবনা ভীষণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। যে দল যতটা রীতিবিরুদ্ধ ক্রিকেট খেলার সাহস দেখাবে, তাদের সাফল্যের হার তত বেশি।

তবে পরিবর্তনের এ ডামাডোলে টেস্টের ভাবনাটা সেই সনাতনী আমলেই রয়ে গেছে, যে ফরম্যাটে বিশেষজ্ঞদের কদর কমেনি এতটুকু। কিন্তু বাংলাদেশ উল্টোস্রোতে। চট্টগ্রাম টেস্টের জন্য ঘোষিত স্কোয়াড দেখে যেমন মনে হচ্ছে, টি-টোয়েন্টির চেয়েও দুঃসাহসী এ দল গঠনের চিন্তাভাবনা। বিশেষজ্ঞের চেয়ে অলরাউন্ডার সংখ্যাধিক্য চমকে দেওয়ার মতোই।

চমকেছেন সবাই-ই। তবে এবারই সম্ভবত সে চমক সংক্রমিত চট্টগ্রামের র্যাডিসন ব্লুতে ঘাঁটি করা বাংলাদেশ দলেও। একসঙ্গে থাকা-খাওয়া হলে যা হয়, টিম ম্যানেজমেন্ট পুরোপুরি অবহিত ক্রিকেটারদের চমকে যাওয়া নিয়ে। তাই কাল দিনভর জাতীয় দলের অলিগলিতেও অন্ধকারময় ‘ব্ল্যাকআউট’! দল ঘোষণার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমতি ছাড়া ক্রিকেটারদের কথা বলার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে যায়। এবার ঘটা করে ‘ব্ল্যাকআউট’ ঘোষণা হয়েছে ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে। অনুমান করা যায় যে, এ দল নিয়ে মিডিয়ায় কাটাকুটির আশঙ্কা রয়েছে ম্যানেজমেন্ট পর্যায়ে।

আশঙ্কাটা অমূলকও নয়। চার পেসার নিয়ে ঘরের মাঠেও ওয়ানডেতে নেমে পড়া দেশ কিনা টেস্ট স্কোয়াডে রেখেছে মাত্র দুই পেসার, এঁদের একজন কামরুল ইসলাম আনকোরা, প্রথম শ্রেণিতে যাঁর উইকেট গড় ৪০.৮৯। অন্যজন শফিউল ইসলামের অভিজ্ঞতায় ৮ টেস্ট, উইকেট গড় ৫০.৫৩। এ দেখে বোঝা যায় চট্টগ্রাম টেস্টে পেস বোলারের কাছে টিম ম্যানেজমেন্টের চাওয়াটা অতি মামুলি, বলের ঔজ্জ্বল্য একটু কমিয়ে দেওয়া। উইকেট পেলে সেটা শতভাগ বোনাস! বোলিংয়ের সব দাবি স্পিনারদের কাছে। তবে ঘুরেফিরে মূল চাওয়াটা ব্যাটসম্যানদের কাছে। এক-দুই করে ১৪ জনের স্কোয়াডের ১১ জনই তাই ব্যাটসম্যান! শফিউল, তাইজুল ইসলাম আর কামরুল ছাড়া সবাই-ই আন্তর্জাতিক কিংবা ঘরোয়া ক্রিকেটের ‘ডাকসাইটে’ ব্যাটসম্যান।

চিন্তাটা পরিষ্কার এবং পুরোপুরি রক্ষণাত্মক। সঙ্গে অবশ্য আক্রমণের মিশেলও আছে। যেমন, চট্টগ্রামে দল এমন উইকেট চাচ্ছে যেখানে তিন দিনের মধ্যেই ‘সাঙ্গ হবে লীলাখেলা’! উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার। ভাঙাচোরা উইকেটে ফেলে দুই দলের সামর্থ্যের ব্যবধানটা কমিয়ে দিয়ে ফায়দা নেওয়া। ‘ধূর্তামি’ হিসেবে মন্দ নয়, সেটা বিশুদ্ধ ক্রিকেটীয় চিন্তার যতই বিরুদ্ধস্রোতে হাঁটা হোক না কেন। অবশ্য এ যুগের ক্রিকেটে বিশুদ্ধতা বিসর্জন গেছে বহু আগেই। ধূর্তামি আর নিন্দনীয় নয়, বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্টের ‘ত্রি-দিবসীয়’ টেস্ট ভাবনাও তাই সমালোচনার ঝুঁকিমুক্ত।

এ চিন্তার উদ্যোক্তা কে, সেটি দলের দরজায় টোকা না মেরেও বলে দেওয়া যায়। তিনি চন্দিকা হাতুরাসিংহে। সাম্প্রতিককালে তাঁর অনুমোদন ছাড়া বাংলাদেশের ক্রিকেটে কিছু হয়নি, হওয়ার সাধ্যও নেই। অসীম ক্ষমতা এ শ্রীলঙ্কানের। অবশ্য গুরুর সিদ্ধান্তগুলো প্রায় সব সময় ‘ক্লিক’ করে যাওয়ায় শিষ্য থেকে শুরু করে বোর্ড সভাপতি হয়ে জনতা—সবাই মেনে নেন বিনা বাক্যব্যয়ে। চট্টগ্রাম টেস্টের স্কোয়াড নিয়ে তাই কিছুটা ধন্দে থাকেন তীব্র সমালোচকরা, এটাও যদি ‘লেগে’ যায়!

যেতেও পারে। কিন্তু তাতে করে কি টেস্ট দৈন্য ঘুচে যাবে বাংলাদেশের? কোনো সম্ভাবনা নেই। চট্টগ্রাম টেস্টের বাংলাদেশ স্কোয়াডকে বড়জোর ‘আপৎকালীন’ ব্যবস্থার মর্যাদা দেওয়া যায়। সেটাও হাতুরাসিংহের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে গ্রেস নম্বর দিয়ে।

এমন দল কেন গড়লেন হাতুরাসিংহে? অন্তত পেস আক্রমণ নিয়ে তাঁর ভাবনাটা বিস্ময়কর। পেসারকুলে বাংলাদেশের সেরা ‘টেস্ট মেটেরিয়াল’ মনে করা হয় রুবেল হোসেনকে। তিনি স্কোয়াডে নেই। আল-আমিন হোসেন কেন নয় তাহলে? মোহাম্মদ শহীদ চোটগ্রস্ত যখন, তখন অভিজ্ঞতার কারণে রুবেল কিংবা আল-আমিন বিবেচিত হতেই পারতেন।

কিন্তু হননি। জাতীয় দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একজনের মন্তব্য, ‘এর দায় সংশ্লিষ্ট ক্রিকেটারদেরও!’ বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যাননি তিনি। তবে বেশ কিছুদিন যাবত দলীয় আলোচনার সূত্র ধরে যে ছবিটা আঁকা যাচ্ছে, তা উদ্বেগজনক। এ দুজনের সঙ্গে জাতীয় দলে আসা-যাওয়া করা কয়েকজনের এমনই একটা ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে দলের ভেতরে যে, তাঁদের দলে ফেরা একটু কঠিনই।

চট্টগ্রাম টেস্টের জন্য গড়া জোড়াতালির পেস আক্রমণে রুবেলের জায়গা না হওয়াটাই মনে হচ্ছে জাতীয় দলের ‘জাতীয় শোক’! তবে এ শোকের মাঝেও ময়নাতদন্ত চলছে রুবেলের। সম্প্রতি বোলিংটা তেমন ভালো হচ্ছে না তাঁর। আর এই ভালো না হওয়ার পেছনে দায়টা রুবেলেরই। দলীয় পরিমণ্ডলে তাঁর সম্পর্কে ধারণা হলো, সুসময়ে উদ্দাম জীবনের হার্লে ডেভিডসনে ছোটাছুটি করেন এ পেসার। আর বাদ পড়লে ঢিমেতালের সাইকেলে প্যাডেল মেরে আবার ফিরে আসেন রুবেল, প্রচণ্ড খাটেন। যত দূর খবর, টেস্ট থেকে বাদ পড়া রুবেলের মনোজগতের বিশ্লেষণ চলছে দলে। আর ফিল্ডিং খারাপ বলে ওয়ানডে স্কোয়াডেই হুট করে অনিয়মিত আল-আমিন, টেস্টেও একই যুক্তিতে। যদিও ওয়ানডের চেয়ে টেস্টে বাজে ফিল্ডারকে ‘লুকিয়ে’ রাখার জন্য অনেক বেশি জায়গা পাওয়া যায়। তার চেয়ে বড় কথা, দলে হাই প্রোফাইল ফিল্ডিং কোচ এবং বিবিধ কোচিং স্টাফ থাকার পরও কেন শোধরাবেন না আল-আমিন? এ তো রোগ সারানোর চেষ্টা বাদ দিয়ে রোগীকে মেরে ফেলা!

চট্টগ্রাম টেস্টে সাফল্য-ব্যর্থতায় বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাস বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই, ইংল্যান্ডকে ‘হাতুড়ে’ দল দিয়ে হারালেও। দেয়াল লিখনে আপাতত হারটাই চোখে পড়ছে শুধু। আর বড় ক্যানভাসে সেই টেস্ট দৈন্য দীর্ঘায়িত হওয়ার বিপদ সংকেত। অবশ্য টেস্ট নিয়ে সংশ্লিষ্টরা খুব ভাবিত বলে মনেও হয় না।

এ ক্যাটাগরিতে নেই, এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি!


মন্তব্য