kalerkantho

বৃহস্পতিবার। ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ । ১১ ফাল্গুন ১৪২৩। ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নতুন করে পুরনো প্রতিশ্রুতি

১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



নতুন করে পুরনো প্রতিশ্রুতি

ক্রীড়া প্রতিবেদক : ব্রাজিল জার্মানির কাছে ৭ গোল খাওয়ার পরই ফুটবলপাড়ায় বলাবলি হচ্ছিল—এখন না আমাদের ফুটবলাররাও ম্যাচ হেরে হেরে ব্রাজিলের তুলনা দেওয়া শুরু করে, ব্রাজিলই ৭ গোল খায়, আর আমরা কোন ছার! ওইটুকুই। কোনো ফুটবলারের মুখ থেকে শেষ পর্যন্ত এমন উক্তি শোনা যায়নি। কিন্তু কাল ভুটানের কাছে হারের চরম লজ্জার পর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন সেই তুলনা দিয়ে বসলেন! ‘ব্রাজিলের মতো দল জার্মানির কাছে ৭ গোল হজম করেছে, ইংল্যান্ড ১৯৬৬-র পর আর বিশ্বকাপ পায় না, ফুটবলে এমন খারাপ সময় যায়ই। বাংলাদেশেও এটা প্রথম না। ’

ভবনের তিন তলার সংবাদ সম্মেলনে বসে যখন নিজেকে এভাবে ডিফেন্ড করছিলেন তিনি, তখনো বাইরে জনা পঞ্চাশেকের বিক্ষোভ মিছিল, ‘এক দফা, এক দাবি—সালাউদ্দিন তুই কবে যাবি?’ ভুটানের কাছে ইতিহাসের প্রথম হারের লজ্জার পর তৃতীয় দিনের মতো বাফুফে ভবনের সামনে জড়ো হয়ে সালাউদ্দিনের পদত্যাগ দাবি করছিলেন এই সমর্থকরা। যে ঘটনাকে ‘জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিন’ উল্লেখ করে টানা তৃতীয়বারের সভাপতি আবারও নতুন নতুন প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনার ফিরিস্তি দিয়ে গেছেন। যেমন যুব ফুটবলের উন্নয়ন, রিজিওনাল ডিস্ট্রিক্ট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার তৈরি, সোহরাওয়ার্দী ও শেরে বাংলা কাপ চালু করা, জেলা ফুটবল নিয়মিত করা, প্রতিবছর প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়নশিপ লিগের পাশাপাশি অনূর্ধ্ব-১৬ ও অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবল লিগ করা।

এ সবই পুরনো কাসুন্দি। তাই প্রশ্ন গেছে মেয়াদের আট বছর শেষে তাঁর এই পুরনো প্রতিশ্রুতি, পরিকল্পনার নতুন বয়ানে সাধারণ মানুষ কি আর আস্থা পাবে? সালাউদ্দিনের উত্তর, ‘অবশ্যই, আস্থা আছে বলেই তৃতীয়বারের মতো আমাকে সভাপতি নির্বাচন করা হয়েছে। ’ বাফুফের সামনে তাঁর পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ, মিডিয়ায় সাবেক ফুটবলারদের তাঁর মুণ্ডপাত—সব কিছুকেই তিনি ‘নাটক’ বলছেন, নির্বাচনে বিজিত পক্ষের স্রেফ আক্রোশ মেটানো বলে মনে করছেন। তবে ব্যর্থতা তিনি নিজেও মানছেন। যদিও সেখানেই দুনিয়া শেষ নয় বলে আবার নতুন উদ্যোমে ঝাঁপানোর প্রত্যয় জানিয়েছেন সালাউদ্দিন, ‘ব্যর্থতা থেকে আমি শিক্ষা নিতে চাই। পল স্মলিকে নিয়ে (টেকনিক্যাল ও স্ট্র্যাটেজিক ডিরেক্টর) আগামী চার বছরের জন্য আমরা একটা পরিকল্পনা সাজাচ্ছি। সেটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। যদি না পারি, চার বছর পর আমি নিজেই দায়িত্ব ছেড়ে দেব। এই নাটকের প্রয়োজন হবে না। ’

পরিস্থিতি যা তাতে মনে হচ্ছে অন্যরা তাঁর ওপর আস্থা রাখুক কি না রাখুক, নিজের ওপর শতভাগ আস্থাশীল সালাউদ্দিন। যদিও তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হয়ে পুরনো প্রতিশ্রুতিই নতুন করে দিতে হচ্ছে তাঁকে! যা দেওয়ার আসলে কোনো প্রয়োজনই ছিল না। নির্বাচনী ইশতিহারেই রয়েছে এর সব। সেই ইশতিহারে লোকের আস্থা নেই বুঝেই কি নতুন করে সংবাদ সম্মেলন ডেকে আবার প্রতিশ্রুতির বয়ান শোনানো? ভুটান ম্যাচের পর সাবেক ফুটবলার গোলাম সারোয়ার টিপু বলছিলেন, ‘এমন একটা পরিণতির শঙ্কা কিন্তু ছিল। ফুটবল ফেডারেশন তবু যে কেন জেগে উঠল না!’ কাল সংবাদ সম্মেলনে সালাউদ্দিনই স্বীকার করেছেন এই পরিণতির আশঙ্কা তিনিও করেছিলেন, ‘জাতীয় দলের অবস্থা, খেলোয়াড়দের মান ও লিগের বর্তমান অবকাঠামোয় এই হারটা অপ্রত্যাশিত ছিল না আমার কাছেও। ’

কিন্তু কখন থেকে এই অবনমনটা শুরু হয়েছিল তা তিনি জানেন না। ২০০৮ সালে প্রথম সভাপতি হন তিনি, এই আট বছর তো তাঁর চোখের সামনেই জাতীয় দল এই অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, খেলোয়াড়দের মান ভুটানের কাছে হারের পর্যায়েও এসে ঠেকেছে, লিগ স্ট্রাকচার বলতে নানা অনিয়মের মধ্যে হওয়া এক প্রিমিয়ার লিগ, নিচের বিভাগের লিগগুলো তো পুরোপুরিই অনিয়মিত। তার পরও, পতনের আশঙ্কা সত্ত্বেও কি তিনি হাত গুটিয়ে বসেছিলেন? আর এখন গা ঝাড়া দিয়ে উঠতে চাইছেন নতুন করে। যখন আগামী তিন বছর জাতীয় দল আর কোনো ম্যাচই খেলার সুযোগ পাবে না ফিফা, এএফসির অধীনে। দায়িত্বে থেকেও এমন পতন তিনি রুখতে পারেননি সেই তিনিই নতুন করে আবার ফুটবলকে পথে ফেরাবেন—এর নিশ্চয়তা কী?

দুই মেয়াদে আট বছর ফুটবল শাসন করা মানুষটি তৃতীয় মেয়াদে এসে বলছেন জেলা আর বয়সভিত্তিক ফুটবল আসর শুরুর কথা! তা-ও এমন নয় যে এ জাতীয় টুর্নামেন্টের কথা অতীতে কেউ ভাবেননি, সালাউদ্দিনই প্রবক্তা! বাস্তবে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় শুরুর কথা বলা আসরগুলোর যাত্রা শুরু বহু আগে থেকেই, মধ্যিখানে ‘বাধাগ্রস্ত’ হয়ে বন্ধ ছিল শুধু। সালাউদ্দিন অ্যান্ড কোংদের আগের দুই মেয়াদে কেন চালু হলো না ফুটবলার তৈরির ‘কারখানা’গুলো? প্রতিশ্রুতির আগে এ প্রশ্নের উত্তরগুলো জানা সবচেয়ে জরুরি। অবশ্য প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে বাফুফের বর্তমান আধিকারিকদের অকার্যকারিতাই প্রমাণিত হয়। সে ভুল কী করে করেন কাজী সালাউদ্দিন!


মন্তব্য