kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ফুটবলের দুর্দিনে নীরব সালাউদ্দিন

সনৎ বাবলা   

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ফুটবলের দুর্দিনে নীরব সালাউদ্দিন

সর্বনাশের আর কি কিছু বাকি রইল? ভুটান ম্যাচে পুরোপুরি বিবশ হয়ে গেল বাংলাদেশের ফুটবল। তাতে পুরো দেশ লজ্জিত, ক্ষুব্ধ ফুটবলামোদীরা।

কিন্তু যাঁরা ফুটবলের এমন অধঃপতনের মূল সূত্রধর, তাঁদের আসলে লজ্জা হচ্ছে কি না বলা মুশকিল। ভুটান ম্যাচের পর পাঁচ দিন হয়ে গেলেও বাফুফে সভাপতির মুখে ‘টুঁ’ শব্দটি নেই।

ভুটান ‘কলঙ্কে’র পর বাফুফে ভবনের সামনে হাজির হয়ে একদল ফুটবলামোদী কর্তাদের মুণ্ডপাত করছেন প্রায় প্রতিদিনই। তাঁদের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্লোগানে পদত্যাগের দাবিও উঠছে। টানা দুদিন এভাবে প্রতিবাদ সভা হয়েছে বাফুফে কর্তাদের বিরুদ্ধে। এখনো তুমুল নিন্দামন্দ চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কিন্তু তাতে ফেডারেশন কর্তাদের কোনো হেলদোল দেখা যাচ্ছে না। আসলে হারতে হারতে জাতীয় দলের যেমন গা-সওয়া ব্যাপার হয়ে গেছে, ফুটবল ফেডারেশনের কর্তাদেরও হয়েছে তা-ই। কোনো কিছুই যেন তাঁদের আর স্পর্শ করে না। রহমতগঞ্জের কোচ কামাল বাবুর প্রতিক্রিয়ায় তেমনই ইঙ্গিত, ‘আসলে তাঁরা পয়সা খরচ করে নির্বাচনে জিতে বাফুফের চেয়ারে বসেছেন। এ জন্যই বোধ হয় তাঁরা কারো কথা শুনতে রাজি নন। ’ হয়তো তাই, নইলে অমন হারের পর এখনো পর্যন্ত বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন কিংবা জাতীয় দল ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধান কাজী নাবিল আহমেদ কেন আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেবেন না! দেশের ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বড় লজ্জার ঘটনা ঘটেছে গত ১০ অক্টোবর, বাংলাদেশ ভুটানের কাছে হেরেছে প্রথমবারের মতো। তাতে আগামী তিন বছর আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে পারবে না বাংলাদেশ। রহমতগঞ্জের কোচের বিশ্লেষণে জাতীয় দলের এই হার যেন অবশ্যম্ভাবীই ছিল, ‘যে দলটা ভুটান গেছে, সেটি দেশে কোনো ক্লাব দলের সঙ্গে জিতবে বলে আমার মনে হয় না। তাহলে এই দল কিভাবে ভুটানকে হারাবে?’

একসময় দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে ভারত বাদে কাউকে তেমন পাত্তাই দিত না বাংলাদেশ। বলে-কয়ে হারাত ভুটান-মালদ্বীপকে। নিজেদের অবহেলায় সেই গর্বের রঙিন দিন যে তলে তলে ফিকে হয়ে গিয়ে এখন কেবল ঐতিহ্য-সর্বস্ব একটা দলে পরিণত হয়েছে। তার ধার-ভার কিছুই নেই, আছে শুধু কথা। সমালোচকরা যেভাবে বলেন, ফুটবলারদের পায়ের খেলা উঠে গেছে মুখে। আর বাফুফে ভবনে কাজী সালাউদ্দিনের মুখেও ফুটবল উন্নয়নের খই ফোটে। সভাপতি গত পাঁচ দিন বাফুফে ভবনমুখী না হলেও গতকাল পাওয়া গেছে বাফুফে সহসভাপতি বাদল রায়কে। এই সহসভাপতি ব্যর্থতার দায় নিচ্ছেন, তবে মূল ‘টার্গেট’ ভিন্ন, ‘কমিটির সদস্য হিসেবে দায় আমারও আছে, তবে পুরো দায় আমি নেব না। আমি মনে করি, নেতৃত্বের কারণেই ফুটবলের আজকের এই দুরবস্থা। আমরা কি ফুটবল ডেভেলপমেন্টের জন্য কিছু করেছি? আট বছর ধরে আমরাই আছি ফেডারেশনে আর ফুটবল কেবল নিচের দিকে নেমেছে। ’ আট বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজী সালাউদ্দিন এবং তাঁর মতাদর্শীদের হাতে দেশের ফুটবলের দায়িত্ব। তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার আগে মালদ্বীপ-ভুটান-নেপালের সঙ্গে জেতে বাংলাদেশ। এখন এই সবগুলো দলের কাছে হারে। সুতরাং কাঠগড়ায় অবশ্যই সালাউদ্দিন এবং তাঁর অনুসারীরা। বাদল রায়ও স্বীকার করে নিচ্ছেন, ‘আমরা ফুটবলকে এক বিন্দুও এগিয়ে নিতে পারিনি। ফুটবল উন্নয়নের জন্য যেসব পরিকল্পনা করে এগোতে হয় সেগুলো কিছুই করিনি আমরা। ’ স্পষ্টতই তাঁর সব রাগ-ক্ষোভের লক্ষ্য বাফুফে প্রধান কাজী সালাউদ্দিন। ফিফা-এএফসির মতো বাফুফেও সভাপতিকেন্দ্রিক সংগঠন, সভাপতির নির্দেশনায় পরিচালিত হয় সব ফুটবল কর্মকাণ্ড।

এই ফুটবলীয় কর্মকাণ্ডে শুধু ঢাকার শীর্ষ লিগটিই হয়েছে নিয়মিত। আট বছর ধরে পেশাদার লিগ হচ্ছে, সঙ্গে জারি রয়েছে জাতীয় দলের ক্রম অধঃপতনও। তাই শুধু ঢাকার প্রিমিয়ার লিগ দিয়ে যে দেশের ফুটবলের চেহারা ফিরবে না সেটা প্রমাণিত। সারা দেশে ফুটবলের সেই রমরমা নেই। জেএফএ কাপ, বয়সভিত্তিক ফুটবল, সোহরাওয়ার্দী কাপ, শেরেবাংলা কাপসহ নানা টুর্নামেন্ট বন্ধ। গত এক যুগ ধরে জেলার ফুটবল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই চক্রও বিলীন। ফুটবলার বের করার মূল জায়গা জেলার ফুটবল সংস্কারে কোনো কাজ করেনি বাফুফে। বাফুফের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক হেলাল মনে করেন বাফুফে ভুল জায়গায় বেশি বিনিয়োগ করেছে, ‘জাতীয় দলের পেছনে অনেক টাকা খরচ করেছে বাফুফে। তার বিনিময়ে কিছুই পায়নি। বরং ফুটবলার তৈরির পেছনে অর্থাৎ সারা দেশে খেলা বাড়ানোর জন্য খরচ করলে অনেক নতুন ফুটবলার বেরিয়ে আসত। আসলে ফুটবল ডেভেলপমেন্টের জন্য কী করতে হয়, সেটা সবাই জানে। ’

বিষয়টি কি জানেন কাজী সালাউদ্দিন? জানলে অচল জাতীয় দলকে নিয়েই কেন এত আয়োজন? ভালো ফুটবলার না থাকলে বিদেশি কোচ, বিশাল কোচিং স্টাফেও পাল্টাবে না ফুটবলের চেহারা।


মন্তব্য