kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পয়মন্ত মাঠে প্রকৃতির অভিশাপ!

নোমান মোহাম্মদ, চট্টগ্রাম থেকে   

১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



পয়মন্ত মাঠে প্রকৃতির অভিশাপ!

আিশ্বিনে আষাঢ়ের বৃষ্টি থাকেনি শেষ পর্যন্ত। কিন্তু শরতে শীতের শিশির কোত্থেকে চলে আসে অনাহূত আগন্তুকের মতো।

ম্যাচ হারলেও প্রথমটিতে আপত্তি নেই মাশরাফি বিন মর্তুজার। কিন্তু পরেরটি নিয়ে আক্ষেপ অন্তহীন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের শেষ ওয়ানডেতে শিশির খলনায়কের ভূমিকা না নিলে বিজয়ী দল যে হতো বাংলাদেশ—তা তো ঘোষণাই করে যান বাংলাদেশ অধিনায়ক!

‘এখন হেরে যাওয়ার পর মনে হতে পারে যে, ম্যাচটি বৃষ্টির কারণে না হলেই ভালো হতো। আমি তা বলব না। অবশ্যই খেলা হওয়ায় ভালো লেগেছে। বিশেষ করে সমর্থকদের কথা চিন্তা করে। তারা অপেক্ষায় ছিলেন ম্যাচটাকে নিয়ে’—সিরিজ শেষের সংবাদ সম্মেলনে বলে যান মাশরাফি। এ দফায় অধিনায়কত্ব পাওয়ার পর দ্বিপক্ষীয় সিরিজ শেষে সব সময় এসেছেন বিজয়ীর বেশে। ছয় সিরিজ এবং প্রায় দুই বছর পর এলেন পরাজিত সেনাপতি হিসেবে। কিন্তু ইংল্যান্ডের কাছে শেষ ওয়ানডেতে ৪ উইকেটে হেরে সিরিজ হারের জন্য শিশিরকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করান মাশরাফি। কথায় কথায়, নানা প্রশ্নের জবাবে তাই ওই ভেজা মাঠে পরে বোলিং করার প্রসঙ্গ নিয়ে আসেন বারবার।

‘শিশিরের কারণে উইকেট থেকে বোলাররা টার্ন পাচ্ছিল না। এখানে ২৭৭ অনেক বড় রান। শুধু যতটুকু শিশির পড়েছে, তার অর্ধেকও যদি পড়ত! আমি নিশ্চিত তাহলে অন্য রকম ম্যাচ হতো’—বাংলাদেশ অধিনায়কের কণ্ঠে আক্ষেপ। তাতে হাহাকার ঢেলে যোগ করেন, ‘শিশির না পড়লে আমাদের ২৭৭ রান এই উইকেটে ৩০০-র বেশি স্কোরের মতো। ওদের আদিল রশিদ, মঈন আলীরা অনেক টার্ন পাচ্ছিল। আমাদের ডানহাতি, বাঁহাতি স্পিনারদের সমন্বয় দারুণ ছিল। শুধু ?যদি শিশিরটা না পেতাম!’ তাহলে? তাহলে কী হতো, তা যেন মাশরাফির কথায় শোনায় আর্তনাদের মতো, ‘আগে বোলিং করলে সংবাদ সম্মেলনে আমি পরে আসতাম (জয়ী দল হিসেবে)। আমার কাছে তাই মনে হয়। ’ আরেক প্রশ্নের উত্তরেও সংবাদ সম্মেলন কক্ষে উড়িয়ে দেন আফসোসের রেণু, ‘ওদের স্পিনাররা উইকেট থেকে শতভাগ সুবিধা নিতে পেরেছে। আমরা দশ ভাগও নিতে পারিনি। এটাই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। ’

ম্যাচের আবহে শিশিরের অস্তিত্ব ছিল না সেভাবে। বরং বৃষ্টির দাপট প্রবলভাবে। আর দ্বিতীয় ওয়ানডের জেরে বিতর্কের প্রভাব। শেষ প্রসঙ্গে মাশরাফি অবশ্য আগের দিনের মতোই নির্বিকার, ‘আমার মনে হয় না, ওটা মাঠে কোনো সমস্যা করেছে। ’ দ্বিতীয় ওয়ানডে ছাপিয়ে বাংলাদেশ অধিনায়ক বরং ফিরে যেতে চান প্রথম ম্যাচে। ওই খেলায় জেতা অবস্থায় হেরে যাওয়ার আক্ষেপ পোড়ায় তাঁকে, ‘প্রথম ম্যাচটা আমরা যদি হিসেব করে খেলতে পারতাম! এমনই হয়। কোনো ভুল করলে তা পুরো সিরিজে টেনে নিতে হয়। যেটা আজ আমাদের হলো। প্রথম ম্যাচ ভালোভাবে শেষ করলে আজ আমাদের এমন হতো না। ’ সামগ্রিক অর্থে চট্টগ্রামের ওয়ানডেতে নিজেদের পারফরম্যান্সে খুব একটা অপূর্ণতা দেখছেন না বাংলাদেশ অধিনায়ক, ‘সত্যি কথা বলতে, এই ম্যাচ নিয়ে আমাদের কোনো আক্ষেপ নেই। তবু যদি বলি, ৩১তম ওভারে হঠাৎ করে ছন্দপতন হলো। পরের ৯টা ওভার আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। হারাই কয়েক উইকেট। এটা বাদ দিলে উইকেটে বল যেমন টার্ন করছিল, খেলা কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। এ ছাড়া আসলে এই ম্যাচে কোনো অপূর্ণতা নেই। ’

তবু কিছু কিছু ভুল তো থাকেই। যে কারণে স্কোর ৩০০ না হওয়ার দুঃখ ঝরে পড়ে মাশরাফির কণ্ঠ থেকে। ইংল্যান্ডের ২১ বলে যখন প্রয়োজন ২১ রান, তখন স্লিপে ইমরুল কায়েসের মুঠো ফসকে ক্যাচ পড়া নিয়েও কষ্ট না থেকে পারে না। সত্যিকার অধিনায়কের মতো সতীর্থের কাঁধ থেকে সমর্থনের হাত সরিয়ে নেন না মাশরাফি। কিন্তু জবাব দিতে গিয়ে লাল-সবুজের অধিনায়ক বেদনার অদৃশ্য নীল রং ছড়িয়ে দেন ঠিকই, ‘ক্যাচ ধরলে ম্যাচটি জিততাম কিনা, তা কেউ বলতে পারে না। ক্রিকেটে অনেক কিছুই হতে পারে। ওটা ধরলে ওরা সপ্তম উইকেট হারাত। কিন্তু ক্যাচ পড়ে গেলে কিছু করার থাকে না। আবার ক্রিকেটে এও বলে যে, ওই সময় ক্যাচ হলে ভালো দুই বলে আরো দুটি উইকেট পড়ে যেতে পারত। হয়তো স্টোকসের ওপর চাপ আরো বাড়ত। ক্যাচটা ধরতে পারলে হয়তো আরো একটা সুযোগ পাওয়া যেত। ’ কিছু দিন আগে আফগানিস্তানের কাছে পরাজয়েও একই হাহাকার। শেষ দিকে মুশফিকুর রহিম যদি স্টাম্পিংটা করতে পারতেন! শেষ দিকের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এমন ক্যাচ পড়া কি দক্ষতার অভাব নাকি মানসিক চাপের প্রভাব—এমন প্রশ্নের উত্তরে পরেরটির কথাই বলেন মাশরাফি, ‘দক্ষতার অভাব বলব না, হয়তো মানসিক ব্যাপারটা ভালো রাখা উচিত। আমি যেটা বলতে চাচ্ছি খেলা শেষ হওয়ার আগেই ছেড়ে না দেওয়া। ওই মানসিকতা থাকতে হবে। সব ফিল্ডারকে প্রতিটি বলের আগে ভাবতে হবে বলটি আমার কাছেই আসবে। ’

এসব আলোচনাই হয়তো আসত না, সন্ধ্যার প্রকৃতি অমন ভোল না পাল্টালে। তবে এবার যেমন শিশিরের শিকার বাংলাদেশ, এই চট্টগ্রামেই গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকাকে তো একইভাবে এই ফাঁদে পড়ে হাঁসফাঁস করতে দেখেছে স্বাগতিকরা। মাশরাফি ওই সৌভাগ্যের দিন মনে করিয়ে দিয়ে এবার নিজেদের দুর্ভাগা হিসেবে ঘোষণা করেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে শেষ ম্যাচটা আমরা এখানে জিতেছিলাম। একদম একই ধরনের উইকেট, একই অবস্থা হয়েছিল। আজকের ম্যাচে আমরা অনেক দুর্ভাগা। ’

ম্যাচপূর্ব বিতর্কের বিন্দুমাত্র ঝাঁজ নেই কথায়, নেই কোনো অজুহাত। মাশরাফি যেন প্রকৃতির কাছে পরাজিত এক যোদ্ধা। নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করা এক অধিনায়ক। ইংল্যান্ডের কাছে না যতটা, তার চেয়ে বেশি করে যে শরতের শিশিরের কাছে হারল বাংলাদেশ! এখানে আর কী-ই বা করার ছিল মাশরাফি-ব্রিগেডের!


মন্তব্য