kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সূর্যালোকের মুশফিক সূর্যগ্রহণের মুশফিক

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সূর্যালোকের মুশফিক সূর্যগ্রহণের মুশফিক

চট্টগ্রাম থেকে প্রতিনিধি : সুসময়ের সূর্য অস্ত যায় বড্ড দ্রুত। আবার দুঃসময়ের সূর্যগ্রহণ চলে যেন অনন্তকাল।

মুশফিকুর রহিমের চেয়ে তা ভালো করে বুঝছেন এখন কে?

গত বছর পর্যন্তও তাঁর ব্যাটে ছিল সূর্যের হাসি। ২০১৬ সালে তাতে মেঘের ঘনঘটা। ম্যাচের পর ম্যাচ যায়, সিরিজের পর সিরিজ। ফরম্যাট বদলায়। পরিবর্তন হয় প্রতিপক্ষ। এক ভেন্যু থেকে আরেক ভেন্যুতে ওড়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট-পতাকা। কিন্তু তাঁর ব্যাটে সেই রানের ফোয়ারা আর ছোটে না। হয় না রানের সূর্যোদয়। চেনা মুশফিক অচেনা হয়ে পড়েন ক্রমশ। দল থেকে সমর্থনের ছায়াটা সরে যায়নি এখনো। কিন্তু তাঁর ওপর চাপটা বাড়ছে ক্রমশ। আজ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডেতেও সেই অনন্ত চাপ সঙ্গী করে ক্রিজে যাবেন মুশফিক।

সময়টা কত দ্রুত পাল্টে গেল! কাল জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের ইনডোরে ব্যাটিং করতে করতে তা না ভেবে পারেন না মুশফিক। এই তো গত নভেম্বরেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে করেন সেঞ্চুরি (১০৭)। পরের দুই খেলায় ২১ ও ২৮ রান। সীমিত ওভারের অধিনায়কত্ব হারানোর পর সেটি তাঁর প্রথম সিরিজ। তাতে রানের ধারাবাহিকতায় ম্যান অব দ্য সিরিজ তিনি। এক নভেম্বর পেরিয়ে আরেক নভেম্বর আসেনি এখনো। কিন্তু মুশফিকের ব্যাটের জলপ্রপাত কিভাবেই না শীর্ণ জলধারায় রূপান্তরিত! তাঁকে নিয়ে চিন্তিত টিম ম্যানেজমেন্ট। উদ্বিগ্ন গোটা দেশ। আবার কবে রানে ফিরবেন মুশফিক—সেই অপেক্ষা ক্রমশ রূপ নিচ্ছে অস্থিরতায়।

অথচ এর আগে কী সুবর্ণ সময়ের ভেতর দিয়েই না যান মুশফিক! ২০১৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওই সেঞ্চুরি পর্যন্ত ধরলে তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ২৪ ইনিংস ব্যাটিং করেন তিনি। তাতে ৩৯.৬৫ গড়ে ৯১২ রান। দুটি সেঞ্চুরি ও পাঁচ ফিফটিতে। বিশ্বকাপে মাহমুদ উল্লাহ টানা দুই ম্যাচে সেঞ্চুরি করে সব আলো কেড়ে নেন নিজের দিকে। কিন্তু টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনের ইঞ্জিন মুশফিকই। আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ৭১, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৬০, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যাডিলেড-মহাকাব্যে ৮৯ রানের ঝলমলে ইনিংসে। পাকিস্তানের বিপক্ষে পরের সিরিজের তিন ম্যাচে ১০৬, ৬৫, অপরাজিত ৪৯ রানে তিনি নির্ভরতার প্রতিশব্দ। মুশফিক তখন খেলতে নামলেই রান করেন। সমকাল পেরিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যানের তকমাও তাঁর গায়ে সেঁটে দেন অনেকে।

আগের দুই বছরের পরিসংখ্যানও দেখুন। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেটের চরম দুঃসময়েও চওড়া ছিল মুশফিকের ব্যাট। টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে ৩৩ ম্যাচের ৩৫ ইনিংসে করেন ১২৫৫ রান। গড় ৩৯.২১। ৫০ পেরোনো ইনিংস ১০টি, যার মধ্যে সেঞ্চুরি দুটি। ২০১৩ সালেও একই অবস্থা। ১৯ ম্যাচের ২১ ইনিংসে ৩৯.১৯ গড়ে তাঁর ৮২৩ রান। পাঁচ ফিফটি, এক সেঞ্চুরিতে। সেঞ্চুরি মানে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গলের সেই ডাবল সেঞ্চুরি। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে যে কীর্তি প্রথম। মুশফিক তখন যেন এ দেশের ব্যাটসম্যানদের মানদণ্ডটাই নির্ধারণ করেন নতুন করে।

ডন ব্রাডম্যান নন মুশফিক। ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫—টানা তিন বছরের এই রানের জোয়ার তাই একসময় থামতই। তাই বলে এমন ভাটার টান! জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে গত নভেম্বরের সেঞ্চুরির পর আর কোনো টেস্ট খেলেনি বাংলাদেশ। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে এ সময়ে ২৩ ম্যাচের ২১ ইনিংসে ক্রিজে যান মুশফিক। তাতে রান ৩০৭। গড়টা তাঁর মানদণ্ডে অকল্পনীয়—১৩.৭৩! ২১ ইনিংসের মধ্যে আটবার আউট হন দুই অঙ্কে পৌঁছার আগে। একটি ফিফটিও নেই। সর্বোচ্চ আফগানিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডের ৩৮। বড় একটি ইনিংস তাই খুব করে পাওনা মুশফিকের কাছে।

শুধু যে মাঠের খেলায় রান নেই, তা নয়। মাঠের বাইরেও নানা কারণে সমালোচিত মুশফিক। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের কাছে সেই অবিশ্বাস্য হারে বড় দায় তাঁর। তিন বলে প্রয়োজন ২ রান—এমন সময় আউট হয়ে যান বলে শুধু নয়। ওই সময়ে দল জেতার আগেই মুষ্টিবদ্ধ উদ্যাপনের কারণেও। আবার ওই টুর্নামেন্টে ভারতের বিদায়ের পর নিজের আনন্দের প্রকাশ টুইটারে জানিয়ে দেওয়ার জন্যও। এমনিতেই আত্মকেন্দ্রিক মুশফিক এরপর আরো বেশি করে গুটিয়ে যান নিজের ভেতর। গণমাধ্যম দূরে থাক, সতীর্থদের কাছ থেকেও যেন নেন আড়াল। আরো বেশি করে ডুবে যান অনুশীলনে। এই যে কাল বৃষ্টির কারণে ইনডোরে সময় কাটাতে হয় বাংলাদেশকে, এতে সবচেয়ে বেশি মন খারাপ হয়তো মুশফিকেরই। ব্যাটিংটা ঠিকঠাক ঝালাই করা হলো না যে!

তবু ওই ক্রিকেটীয় আপ্তবাক্য আশা দেয় খুব করে—ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট। মুশফিকের ‘ক্লাস’ নিয়ে তো কারো মনে সন্দেহ নেই বিন্দুমাত্র। তাই তো মুশফিককে নিয়ে প্রশ্ন উঠলে প্রকাশ্যেই বিরক্তি জানিয়ে দেন অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। তাঁর যে দৃঢ় বিশ্বাস, দুঃসময়ের সূর্যগ্রহণ শেষে আবার সতীর্থের ব্যাটে হবে সুসময়ের সূর্যোদয়। আর মুশফিকুর রহিম সবাইকে ‘প্রতিপক্ষ’ বানিয়ে ফেললে কী হবে, তাঁর ওই রানে ফেরার অপেক্ষায় পুরো দেশ। প্রতীক্ষায় ১৬ কোটি ক্রিকেটপাগল।

আজই কী ফুরোবে সেই অপেক্ষার পালা, প্রতীক্ষার প্রহর।


মন্তব্য