kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


যেন সে যুগের টেল এন্ড!

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



যেন সে যুগের টেল এন্ড!

ক্রীড়া প্রতিবেদক : বাংলাদেশের টেল এন্ডটা হলো মোমের তৈরি! প্রতিপক্ষ আক্রমণের ঝড় তুললে টুস করে ভেঙে যায়, ম্যাচ পরিস্থিতির চাপের গরমে গলে যায়। শক্ত থাকে শুধু ঠাণ্ডায়।

সমস্যা হলো মোমের গড়া টেল এন্ডের জন্য কাঙ্ক্ষিত তাপমাত্রাটা থাকে শুধু ড্রেসিংরুমে! তবে এ যুগে প্রায় প্রতি ম্যাচেই টেল এন্ডারদের ব্যাট হাতে মাঠে নামতে হয় মারমুখী প্রতিপক্ষের সামনে, উত্তপ্ত ম্যাচ পরিস্থিতিতে। শুক্রবার রাতে যেমন।

ভিক্টোরিয়ান যুগে যখন ক্রিকেটটা শতভাগ অভিজাতদের দখলে, তখন একাদশের ফর্মুলা ছিল পাঁচজন করে ব্যাটসম্যান আর বোলার এবং একজন উইকেটরক্ষক। পরিচয়ের সঙ্গেই যার যার কাজ বণ্টন করা ছিল, এক্সট্রা কারিকুলামের বালাই ছিল না। ভারতের এককালের ‘বিখ্যাত’ এগারো নম্বর ব্যাটসম্যান বিষেণ সিং বেদীর ৯ উইকেট পতনের পরও ব্যাটিংয়ে না নামার উদাহরণ রয়েছে। কোর্টনি ওয়ালশের টেস্ট এবং ওয়ানডে ব্যাটিং গড় কেন ৭ ও ৬, সে প্রশ্নও কেউ তোলেনি। কিন্তু এটা অলরাউন্ডারের যুগ, নিখাদ ব্যাটসম্যানকে নিদেনপক্ষে ভালো ফিল্ডার হতেই হবে। নেটে বোলারের ব্যাটিংও বাজপাখির দৃষ্টিতে নজরদারি করেন কোচ, অন্তত অপরপ্রান্তের স্বীকৃত ব্যাটসম্যানকে যেন প্রয়োজনীয় সমর্থনটা দিতে পান। মূলত বোলারদের নিয়ে গড়া টেল এন্ডারদের তাই আর মাদাম তুঁসোর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জাদুঘরের শোভা বাড়ানোর উপায় নেই!

ইদানীং লন্ডনের সেই মিউজিয়ামটাই যেন উঠে এসেছে বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে! এমনিতে আধুনিক ক্রিকেটে টেল এন্ডের ব্যাপ্তি সাত থেকে কমে নেমে এসেছে আট, দল বিশেষে নয় নম্বরে। ইংল্যান্ডের দশ নম্বর ব্যাটসম্যান আদিল রশিদের তো কাউন্টি সেঞ্চুরিও আছে দশটা। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডারের ভরসা সর্বোচ্চ সাত নম্বর পর্যন্ত। মাশরাফি বিন মর্তুজাকে দিয়ে শুরু টেল এন্ডের কাছ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ দলের উল্লেখযোগ্য কোনো প্রাপ্তির স্মৃতি নেই। বরং দলের ওলটপালটে ক্রমাগতই অবসন্ন মনে হচ্ছে টেল এন্ডকে।

শুক্রবারের ম্যাচের কথাই ধরুন। এটা বোধগম্য যে স্লিপ নেই দেখে আদিল রশিদকে থার্ডম্যানে গ্লাইড করতে চেয়েছিলেন মাশরাফি। কিন্তু ওটা করার জন্য চুলচেরা যে সময়জ্ঞান লাগে, সেটি কি তাঁর আছে? আট বছর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরা মোশাররফ হোসেনের ব্যাটিং দেখে মনে হতেই পারে বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে রান করে ফেলা খুব কঠিন নয়! ২০১১ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জেতা ম্যাচে মাহমুদ উল্লাহকে দারুণ সমর্থন জুগিয়ে যাওয়া শফিউল ইসলামের রান আউট হওয়ার ঘটনা মানসিক চাপে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়ারই পরিণতি। আর তাসকিন আহমেদের কাছে একমাত্র বোলিং বাদে ব্যাটিং ও ফিল্ডিংয়ের দাবি জানানো নিরর্থক!

একজন মাশরাফিকে ছাড়া টেল এন্ডের বাকিদের ব্যাটসম্যানশিপ নিয়েও সময় ব্যয় করে লাভ নেই। ভাবতেও অবাক লাগে, কৈশোরে টপ অর্ডারে ব্যাটিংয়ের সুযোগ না দেওয়ায় কোচের ওপর রাগ করে স্টাম্প ছেড়ে বোল্ড হওয়ারও ঘটনা আছে তাঁর। এরপর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে লোয়ার অর্ডারে ঝড় তুলতেন প্রায়ই। পেস বোলিংয়ে নিজের ওপর কিছুটা অনাস্থা আছে, তবে স্পিনার পেলে বিধ্বংসী মাশরাফি ইদানীং সিএনজিতে কনভার্ট করা অটোমেটিক গাড়ি। রাস্তায় পানি জমলেই থেমে পড়ছেন, স্পিনেও আর সচল হন না তিনি। মামুলি লেগ স্পিনেও তাই উইকেট নিয়ে বাংলাদেশ অধিনায়ককে ড্রেসিংরুমের পথ দেখান আদিল রশিদ। অথচ ওই ওভারেই দুই ছক্কায় ইংলিশদের ম্যাচে ফেরার আশার আলো এক ফুত্কারে নিভিয়ে দিতে পারতেন তিনি, এমন মাশরাফিকেই তো দেখে অভ্যস্ত বাংলাদেশ! অবশ্য অধিনায়ক তিনি, অপরপ্রান্তের সেঞ্চুরিয়ান ইমরুল কায়েসকে সঙ্গ দিতেই হয়তো মারকুটে মেজাজটা লুকিয়ে রেখেছিলেন। আবার ইদানীং ব্যাটিংয়ে অতি মনোযোগী হওয়াও কি বিভ্রান্ত করে ফেলছে মাশরাফিকে? ঘাড়ের ওপরে উইকেটরক্ষককে দেখেও তাঁর গ্লাইড করার চেষ্টার পেছনে আর কি কারণ থাকতে পারে? টিম ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে কঠোর ‘স্পিকটি নট’ জারি হওয়ায় চেষ্টা করেও ফোনে ধরা যায়নি তাঁকে। তবে দীর্ঘদিনের অনুসরণ থেকে জানি ডিফেন্সটা মিডল ব্যাটেই করতে জানেন, ইমরুলের কথা ভেবে রশিদের ওই বলটাও সেভাবেই খেলতে পারতেন মাশরাফি।

যাক, জেতা ম্যাচ হারার দায়টা তো আর এক মাশরাফির না। ব্যাটসম্যানদের কোনো একজনেরই ম্যাচ শেষ করে আসার সুযোগ ছিল, সেটা ইমরুল, সাকিব আল হাসান কিংবা মোসাদ্দেক হোসেন হতে পারতেন। তবে দৃশ্যটা একবার ভাবুন; পর পর দুই বলে সাকিব ও মোসাদ্দেক আউট হওয়ার পর ড্রেসিংরুম থেকে নাসির হোসেনকে বেরিয়ে আসতে দেখছেন ইমরুল। নিশ্চিতভাবেই শরীরের মতো মনটাও তখন ক্র্যাম্প করত না তাঁর। নিখাদ টেল এন্ডার আর স্বীকৃত ব্যাটসম্যান; ক্রিজে থাকা মানুষটির মনে কে বেশি আস্থা জোগানি দিতেন সেটি জানার জন্য হাতুরাসিংহেকে জিজ্ঞাসা করার দরকার নেই।

স্বস্তির খবর হলো, আজ দ্বিতীয় ওয়ানডেতে সম্ভবত নাসিরসহ আট ব্যাটসম্যানে দল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ। তাতে বাড়বে নয় নম্বরের মাশরাফিতে পুরনো মাশরাফির ফেরার সম্ভাবনাও।


মন্তব্য