kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সেঞ্চুরিও নিশ্চয়তা নয় ইমরুলের

সাইদুজ্জামান   

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সেঞ্চুরিও নিশ্চয়তা নয় ইমরুলের

তাঁর ক্রিকেট জীবনটাই গানপয়েন্ট! আইসিএলে এক ঝাঁক ক্রিকেটার চলে যাওয়ায় ২০০৮ সালে আকস্মিক জাতীয় দলের দরজা খুলে যায় ইমরুল কায়েসের সামনে। ঢুকলেন বটে, তবে রাজ্যপাট জাঁকিয়ে বসা আর হয়নি এত দিনেও।

এই যে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করলেন, তবু প্রতিটি ম্যাচ একটি করে ‘লাইফ লাইন’ হয়ে আসবে ইমরুলের সামনে। আজকের ম্যাচে, ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেঞ্চুরিতে সিরিজের তৃতীয় ম্যাচটিও কনফার্ম করেছেন তিনি। তার পরও নিউজিল্যান্ডে নিয়মিত হওয়ার আগাম নিশ্চয়তা নেই।

বড় তারকাদের আত্মজীবনী বেস্টসেলার হয়। ইমরুল মোটেও সে ক্যাটাগরিতে পড়েন না। তবে নিশ্চিত যে, তিনি যদি কখনো নিজের ক্রিকেট জীবন নিয়ে লেখেন, তা প্রবল আকর্ষক হবে। বইয়ের পরতে পরতে যে থাকবে ইমরুলের অজানা সব বঞ্চনার কথা। বিদেশি কোচের চরম অপ্রিয়, নির্বাচকদের দৃষ্টিতে ‘ফুরিয়ে যাওয়া’র অপবাদ, মিডিয়ার অনাগ্রহ; সব মিলিয়ে বাইরে থেকে বাড়তি অনুপ্রেরণা তিনি কখনো পেয়েছেন বলে মনে হয় না। শুক্রবার রাতে ওইরকম ‘হাইভোল্টেজ’ একটি ম্যাচে সেঞ্চুরি করার পরও তাই উচ্ছ্বাস প্রকাশে সংযত ইমরুল। তবে ড্রেসিংরুমের দিকে ঘুরে বুক চাপড়ে হয়তো ইমরুল বোঝাতে চাচ্ছিলেন, ‘আমি ইমরুল। স্টাইলের চটক না থাকতে পারে কিন্তু রান করতে জানি!’

সে তো বহুদিন হলো অন্যদের (তামিম ইকবালের উদ্বোধনী সঙ্গী যাঁরাই হয়েছেন) মতো টুকটাক করছেনও ইমরুল। অন্তত সবশেষবার একাদশ থেকে ছিটকে পড়ার আগেও রান করেছেন তিনি। গত বছর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৭৬ ও ৭৩ এবং আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৩৭ রান করার পরও ছিটকে পড়েন একাদশ থেকে। কাছাকাছি সময়ে জাতীয় দলের প্রস্তুতি ম্যাচেও রান করেছেন তিনি। তবু ফিরেছেন সৌম্য সরকারের টানা রান না পাওয়ায়। বাজি ধরে বলা যায়, সৌম্য সরকার রানে ফিরলে কিংবা অন্য কোনো কারণে আবারও বাদ পড়ার চাপ পড়বে ইমরুলের ওপর। এমনটাই তো হয়ে এসেছে বরাবর।

অনেকটা কুড়িয়ে পাওয়া সুযোগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষিক্ত ইমরুলের প্রথম ফিফটি পঞ্চম ওয়ানডেতে। তবু পরের চারটি ইনিংস ৪২, ৯, ৩৩ ও ৯ হতেই প্রবল চাপে তিনি। তত্কালীন কোচ জেমি সিডন্সের একরকম দু’চোখের বিষই ছিলেন ইমরুল। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্রাইস্টচার্চে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেটা হতে পারত ইমরুলেরও শেষ ম্যাচ। কোচ নাকি জানিয়ে দিয়েছিলেন যে ওটাই শেষ সুযোগ। সুযোগে সেঞ্চুরি করেছিলেন বটে, তবে কোচের প্রকাশ্য নিন্দা-মন্দ বন্ধ হলেও মন গলাতে পারেননি। তাই আবার বাদ পড়েছেন, ফিরেছেনও। তামিম ইকবালের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উদ্বোধনী সঙ্গী হয়েও তাই আট বছরের ক্যারিয়ারে মাত্র ৬০টি ওয়ানডে খেলেছেন ইমরুল।

চন্দিকা হাতুরাসিংহের যুগেও পরিস্থিতির খুব উন্নতি হয়েছে, বলা যাবে না। সেই যাওয়া-আসাই চলছিল। সিডন্স চোখে চোখ রেখে জানিয়ে দিতেন, ‘তুমি, যা-তা!’ হাতুরাসিংহে সেটাই বুঝিয়ে দেন হাবে-ভাবে। কিন্তু সৌম্যর ব্যাট সরু হয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তা থেকেই ইমরুলের দিকে দৃষ্টি পড়ে কোচের। তখন আবার নানা ‘প্রান্তে’ রানও পাচ্ছেন ইমরুল। তাতেই কোচ-খেলোয়াড়ের ভালো লাগাটা ব্যাটে-বলে হয়েছে বলে জানা গেছে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রে। কার্যকর বলেই এখন কোচের প্রিয়পাত্রদের একজন ইমরুল। তবে অপ্রিয় হতেও যে সময় লাগবে না, নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায়।

কেন? দীর্ঘদিন দলের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা একজনও ভেবে ব্যাকুল, ‘সবার মতো ইমরুলও কষ্ট করে, ছেলেও ভালো। ব্যাটসম্যানের ক্যারিয়ারে সাফল্য-ব্যর্থতা আছে। আসলে কি যে হয়...। ’ মানে, তিনিও সঠিক কারণটা জানেন না। নাকি, টেকনিক্যাল কোনো কারণ এড়িয়ে গেলেন তিনি? ইমরুলের ‘ওয়াগন হুইল’ কি অপছন্দ কোচদের? ক্যারিয়ারের সিংহভাগ রানই তাঁর অন সাইডে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করা সেঞ্চুরি ইনিংসে উইকেটের সামনে রান নেই বললেই চলে। এ সীমাবদ্ধতাই কি নিয়মিত বিরতিতে ইমরুলের বাদ পড়ার কারণ? নাকি ব্যাটিংয়ে সেই রাজসিক দ্যুতির বদলে পুরোটা জুড়ে ইমরুলের খেটে খাওয়া শ্রমিকশ্রেণির ঘর্মাক্ত চেহারাটা দেখতে চান না কোচেরা?

এর বাইরে টিম ডিসিপ্লিন কিংবা অন্য কোনো অপবাদ শোনা যায়নি ইমরুলের বিপক্ষে। তবে রান তো রানই, সে যত অনাকর্ষণই হোক না কেন। স্কোরকার্ডে কিংবা ম্যাচ রেজাল্টে তো আর ‘আকর্ষক’, ‘বিকর্ষক’ লেখা থাকে না, প্রভাবও ফেলে না।

ইমরুল কায়েসকে নিয়ে এত কিছু বলার একমাত্র কারণ শুক্রবারের সেঞ্চুরি নয়। বিশেষ কারণ আছে। তামিম ইকবালের সঙ্গী হিসেবে গত প্রায় এক দশকে উল্টে-পাল্টে জনা পনেরোকে দেখা হয়েছে। রিপোর্ট কার্ড বলছে, সে পরীক্ষায় ইমরুল কায়েস বিপুল ব্যবধানে ফার্স্ট। সঙ্গে এ-ও সবার জানা যে উদ্বোধনী জুটি ব্যাটিং অর্ডারের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ। সেখানে এত পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে ইমরুলের ওপর দীর্ঘকালীন আস্থা রাখলে সুফলই মেলার কথা। তবু কি নিশ্চয়তা পাচ্ছেন ইমরুল?

অতএব ইমরুল জেনে রাখুন, হয়তো জানেনও যে একটা সেঞ্চুরিই তাঁর বেলায় পূর্ণ নিশ্চয়তা নয়, বড়জোর একটা ‘লাইফ লাইন’।


মন্তব্য