kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পাঁচতারা বাংলাদেশ

সাইদুজ্জামান   

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



পাঁচতারা বাংলাদেশ

বাঘের ডেরায় সিংহ। বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড সিরিজের প্রারম্ভিক তর্জন-গর্জন এমনটাই।

সাম্রাজ্যের শেষ চিহ্ন তিন সিংহের মূর্তির মাথায় মুকুট নিয়ে এখনো ঘোরে ইংল্যান্ড ক্রিকেট দল। বাংলাদেশের জার্সিতে বাঘ একটাই। তবে সিরিজ শুরুর এক দিন আগে সাব্বির রহমানের হুঙ্কার যেন বাংলাদেশ ড্রেসিংরুমেরই প্রতিধ্বনি। ‘ঘরের মাঠে বাংলাদেশ বাঘ’—বলেছিলেন এ ‘ব্যাঘ্রশাবক’। টানা ছয়টি হোম সিরিজ জেতা দলের মেজাজটা যেমন হয় আর কি।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের হানিমুন পিরিয়ড যদি টানা ছয়টি হোম সিরিজ ধরা হয়, তাহলে সাব্বির রহমান খুদে বাঘই। দলের জন্য শিকার ধরার কাজটা করছেন পরিণত বাঘেরাই, যাঁরা ‘ফাইভ স্টার’ বাংলাদেশের রূপকারও। মাশরাফি বিন মর্তুজা, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদ উল্লাহই বাংলাদেশের পাঁচ তারা, সৌরভ গাঙ্গুলীর যুগে ভারতের যেমন ছিল ‘ফ্যাবুলাস ফাইভ’। যাঁরা নিজেরা পারফর্ম করেন, দলের তরুণদেরও উজ্জীবিত করেন। আর সবার মতো মাশরাফি যেটাকে বলেন অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের যথার্থ মিশেল।

তাঁদের ব্যাকগ্রাউন্ড দেখুন। অভিজ্ঞতা এবং ব্যাটে-বলের নৈপুণ্যে বাংলাদেশের সর্বকালের সফলতম এই পঞ্চপাণ্ডবই। সবচেয়ে বেশি ১৬৩ ওয়ানডের অভিজ্ঞতা মাশরাফির। দেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি রান তামিমের, উইকেট সাকিবের। ঘরের মাঠে জেতা টানা ছয়টি সিরিজের দুটির সেরা মুশফিক। আর বিশ্বকাপে টানা দুই সেঞ্চুরিতে মাহমুদ উল্লাহ জানিয়েছেন তিনিও বাঘেদের সংসারে কর্তাস্থানীয়।

পরিসংখ্যান পর্বটা আরো দীর্ঘ করা যায়। যেমন, এ পর্যন্ত বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সিরিজ জিতেছে ২১টি। ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের সিরিজ জয়ে মাশরাফি ছাড়া বাকিরা ছিলেন দর্শক, আন্তর্জাতিক অভিষেকই হয়নি। তবে বাকি ২০ সিরিজ জয়ের সাক্ষী এঁদের একাধিকজন। সাকিব-তামিমদের নৈপুণ্যেও এর স্মারক রয়েছে। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার তো আর সাকিব এমনি এমনি হননি। ১৪টি ম্যাচ সেরার পুরস্কারের সঙ্গে সিরিজ সেরার খেতাবও তিনি জিতেছেন পাঁচবার। তামিমের এ অনুপাতটা ৮ঃ৩, মুশফিকের বেলায় ৩ঃ৪ এবং মাশরাফির কাপবোর্ডে ১০টি ম্যান অব দ্য ম্যাচের সঙ্গে রয়েছে দুটি সিরিজ সেরার পুরস্কার। ২০১৫ বিশ্বকাপ পর্যন্ত বাংলাদেশের ‘আনসাঙ হিরো’ মাহমুদ উল্লাহ সিরিজ সেরা হননি এখনো, তবে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছেন চারবার। সব মিলিয়ে এই পাঁচজনের জেতা ম্যাচ ও সিরিজের পুরস্কার সংখ্যা যথাক্রমে ৩৯ ও ১৪।

দলে এঁদের প্রভাবের বিস্তারিত রয়েছে আরো। জেতা ম্যাচে সাকিবের ব্যাটিং গড় ৪৯.৬৮ আর বোলিং গড় ২২.০১, যেখানে তাঁর ক্যারিয়ার গড় যথাক্রমে ৩৫ ও ২৭.৬০। তামিমের ৩২.৪৪ ব্যাটিং গড় বদলে যায় জেতা ম্যাচে, ৪৪.০১। মুশফিক এবং মাহমুদ উল্লাহর বেলায় গড়ের এ পার্থক্যটা ৯-এরও বেশি এবং দলীয় সাফল্যের দিনে অবশ্যই ঊর্ধ্বমুখী। মাশরাফিও ব্যতিক্রম নন। মোট ২০৮ উইকেটের ১১৮টি তাঁর নেওয়া বাংলাদেশের জেতা ম্যাচে। উইকেট গড়েও রয়েছে দলীয় সাফল্যে মাশরাফির অবদানের স্বীকৃতি। এমনিতে তাঁর উইকেট গড় ৩০.৬০। তবে যেসব ম্যাচে জিতেছেন সেগুলোতে মাশরাফির উইকেটপিছু খরচ মোটে ২০.৭৪, যা পেছনে ফেলেছে সাকিবকেও। তো, জেতা ম্যাচে যাঁর বা যাঁদের নৈপুণ্য ঊর্ধ্বমুখী হয়, তিনি বা তাঁরাই দলের মেরুদণ্ড।

প্রসঙ্গটা সরকারিভাবে তুললে তরুণদের প্রসঙ্গও বেশি টানেন মাশরাফি, ‘সিনিয়রদের ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যত ম্যাচ জিতেছি, সিনিয়ররা ভালো খেলেছে। তবে জুনিয়ররাও হাত বাড়িয়েছে। আমাদের রোমাঞ্চকর কিছু তরুণ ক্রিকেটার আছে, যারা নিজেদের দিনে ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে। সব মিলিয়ে কম্বিনেশনটা দারুণ। ’ তবে এর অর্ধেকটা তো অধিনায়কের সরকারি ভাষ্য, যেন আবার জুনিয়ররা ভেবে না বসে যে সিনিয়ররা সাফল্যের সবটুকু ঝোল পাতে টেনে নিলেন! তবে কে না জানে, এই পাঁচজনের অভিমতেরও বিস্তর গুরুত্ব রয়েছে টিম গঠন থেকে শুরু করে রণপরিকল্পনায়। প্রভাব রয়েছে জুনিয়রদের চলার পথ তৈরি করাতেও। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের উত্তাপ কিংবা নিজের ফিউচার প্ল্যান নির্ধারণের জন্য বাইরের কোনো বিশেষজ্ঞের দরকার হয় না মুস্তাফিজের, ড্রেসিংরুমেই যে মাশরাফি-সাকিবরা আছেন। সৌম্য সরকার দুঃসময় থেকে বেরোনোর গল্প শোনেন এই সিনিয়রদের কাছ থেকেই। বিদেশি স্টাফ সংকটে ফিটনেস ক্যাম্প চালাতেও আর সমস্যা হয় না। ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ বিস্মিত তা দেখে, ‘সিনিয়ররা এমন উদাহরণ সৃষ্টি করেছে যে জুনিয়ররা জেনে গেছে নিজের কাজটা করতেই হবে। পরিবারের বড়রা ঠিকঠাক চললে যা হয় আর কি। ’

বাঘের থাবায় সিংহের আর্তনাদ শোনার সম্ভাবনা এখানেই। বড় মঞ্চেই নাকি বড় তারকা জ্বলেন বেশি। এ ‘অপবাদ’টা সাকিবেরই বেশি বলে মনে করেন এমন একজনের কণ্ঠে সেদিন চাপা উত্তেজনা, ‘দেখবেন, ইংল্যান্ড সিরিজ ও (সাকিব) কাঁপিয়ে দেবে!’ তামিমকে আবার তাতিয়ে রেখেছেন মাশরাফি। পরের ওয়ানডে সেঞ্চুরির জন্য নাকি ওপেনারকে অপেক্ষা করতে হবে ৫ মাচ ২৯ দিন! অবশ্য তাতানোর দরকার নেই, বড় লক্ষ্যে এখন নজরের সঙ্গে একাগ্রতাও রয়েছে তামিমের। চারপাশের সমালোচনায় বিদ্ধ মুশফিকের মনের ছাইচাপা আগুন জ্বলতেই পারে এ সিরিজে। বিশ্বকাপে এই দলটির বিপক্ষেই তো সেঞ্চুরি করেছিলেন মাহমুদ উল্লাহ। আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম জয়ের ম্যাচসেরাকে আফগানিস্তান সিরিজেও মনে হয়েছে দেশসেরা পেসার। তিনি মাশরাফি বিন মর্তুজা।

বিশ্বকাপের পর ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে দাঁড়ানো ইংল্যান্ড আর ঘরের মাঠে অদম্য দাপট বাংলাদেশ বলেই প্রবল ‘হাইপ’ সিরিজকে ঘিরে। ২০১৪ সালের নভেম্বর থেকে ঘরের মাঠের ‘পোস্ট’ আগলে রাখার দায়িত্বটা মূলত এই পাঁচ তারারই। পারবেন?


মন্তব্য