kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


অবিনশ্বর কীর্তির মহিমা ফিরবে মাহমুদের ব্যাটে!

নোমান মোহাম্মদ   

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



অবিনশ্বর কীর্তির মহিমা ফিরবে মাহমুদের ব্যাটে!

তার ওপর কেউ বাজি ধরেনি। কিন্তু বিস্ময়ের রং ছড়িয়ে বাজিমাত করেন ঠিকই।

ইতিহাসের ক্যানভাসে অবিনশ্বর এক কীর্তিতে। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান হিসেবে নিজের নাম লিখিয়ে। আর তাতে এ দেশের ক্রিকেট রূপকথায় অমর হয়ে যান মাহমুদ উল্লাহ।

সামনে যখন আবার ইংল্যান্ড, পেছনের সেই বীরত্বের ছবিটায় আবার ঝাড়পোছ না পড়ে পারে!

আগের চার বিশ্বকাপে কোনো সেঞ্চুরিয়ান ছিল না বাংলাদেশের। এবার সেই শূন্যতা উদ্ভাসিত হবে পূর্ণতার আলোয়—এমন প্রত্যাশা স্বাভাবিক। তবে তা যতটা তামিম ইকবাল কিংবা মুশফিকুর রহিম অথবা সাকিব আল হাসানকে ঘিরে—ততটা মাহমুদকে নিয়ে নয়। বরাবরের পার্শ্বনায়ক যে তিনি! কিন্তু সেই মাহমুদই বিশ্বকাপে আবির্ভূত মহানায়ক হিসেবে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যাডিলেডে খেলেন এক আশ্চর্য ইনিংস। ১৩৮ বলে সাত চার ও দুই ছক্কায় ১০৩ রানের। তাতে বিশ্বকাপে প্রথম সেঞ্চুরিয়ান শুধু পায় না বাংলাদেশ, তৈরি হয়ে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার মঞ্চও।

মাহমুদের কীর্তির শেষ নয় সেখানে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পরের ম্যাচেও তো স্পর্শ করেন জাদুকরী তিন অঙ্ক। মাহমুদের সামর্থ্যের স্পর্ধায় পর পর দুই ম্যাচে নতজানু দুই পরাশক্তি। রংধনুর সাতরঙের আঁকিবুঁকি তখন তাঁর ক্যারিয়ার। অথচ পরের বছর দেড়েকে রঙের খেলা কমে গেছে অনেক। অন্তত বিশ্বকাপে টানা দুই সেঞ্চুরি পরবর্তী প্রত্যাশার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় তা। কিউইদের বিপক্ষে ম্যাচের পর ১২টি ওয়ানডে ইনিংস খেলেন মাহমুদ। এর মধ্যে পঞ্চাশ পেরোনো ইনিংস মোটে তিনটি; নেই কোনো সেঞ্চুরি। দুই অঙ্কে পৌঁছার আগে আউট হন পাঁচবার।

আজ থেকে শুরু হওয়া সিরিজের প্রতিপক্ষ যখন ইংল্যান্ড, মাহমুদের আবার সাফল্যের রথে চড়ে বসার প্রত্যাশা তাই করতেই পারে বাংলাদেশ।

অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা অবশ্য বিষয়টি সেভাবে দেখতে রাজি নন। সতীর্থের সামর্থ্যে প্রবল আস্থা নিয়ে বরং উচ্চকণ্ঠ তিনি। কাল সংবাদ সম্মেলন শেষে ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ড্রেসিংরুমে ফেরার পথে তাই বলে যান, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলা বলে ওর সেঞ্চুরির সম্ভাবনা বেশি। বিশ্বকাপে কিন্তু নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঠিক পরের ম্যাচেও সেঞ্চুরি আছে। আসলে বিশ্বের যেকোনো দলের বিপক্ষে রিয়াদের (মাহমুদ) সেঞ্চুরি করার সামর্থ্য রয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। ’ কিন্তু সে বিশ্বাসের প্রতিফলন কেন নেই পারফরম্যান্সে? এখানে দলের স্বার্থের বিষয়টাকেই সামনে আনেন মাশরাফি, ‘দলের প্রয়োজনে আমরা ওকে একেক সময় একেক পজিশনে খেলাই। কিন্তু যদি শুধু রিয়াদের ক্যারিয়ারের কথা বলি, তাহলে চার নম্বর ওর জন্য সবচেয়ে ভালো। নিজেও ওখানে ব্যাটিং করতে পছন্দ করে। ছয় নম্বর ওর পজিশন না। যদিও দলের প্রয়োজনে সর্বশেষ ম্যাচে সেখানে পর্যন্ত নামতে হয়। তবু সেই ম্যাচে খুব কার্যকর ইনিংস খেলে। ’

দলের স্বার্থে নিজেকে এমন ‘বলি’ প্রতিনিয়ত দিচ্ছেন মাহমুদ। তাতে আদতে বাংলাদেশের লাভ কতটা—সে প্রশ্ন বড় হচ্ছে ক্রমশ। ১২৮ ম্যাচের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে মোটে ১২ ইনিংসে চার নম্বরে খেলার সুযোগ পান এই মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান। তাতে দুই সেঞ্চুরি ও পাঁচ ফিফটিতে ৫৯৩ রান। গড়টা চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতো—৭৪.১২! এমন একজনেরও কিনা পজিশন থিতু হয় না! এই তো আফগানিস্তানের বিপক্ষে সর্বশেষ সিরিজেও তিন ম্যাচেও খেলেন আলাদা তিন পজিশনে। প্রথম ওয়ানডেতে চার নম্বরে নেমে ৭৪ বলে ৬২; পরেরটিতে তিন নম্বরে গিয়ে ৩৯ বলে ২৫ এবং শেষ ম্যাচে ছয় নম্বরে ক্রিজে গিয়ে ২২ বলে অপরাজিত ৩২। দলের প্রয়োজন প্রতি ম্যাচে মেটান বটে! তবে মাহমুুদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার কি করতে পারছে বাংলাদেশ?

২০১৫ বিশ্বকাপের পর পাকিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচ সিরিজে খেলেন তিন নম্বরে। করেন ৫, ১৭ ও ৪। ইনজুরির কারণে ভারতের বিপক্ষে সিরিজে ছিলেন না। ইনজুরি থেকে ফিরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ফেরেন চার নম্বরে। তাতে প্রথমটিতে রানের খাতা খোলার আগে আউট হলেও পরের ম্যাচে করেন ৫০। বছর শেষে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে মাহমুদের আবার সেই পজিশন সংকট। তিন ম্যাচে খেলেন আলাদা তিন পজিশনে; আফগানিস্তানের বিপক্ষে সর্বশেষ সিরিজেও তাই।

অধিনায়ক মাশরাফি ভালোভাবে বোঝেন মাহমুদের সংকট। সতীর্থকে সামর্থ্য প্রকাশের মঞ্চ তৈরি করে দিতে না পারায় কাল খানিকটা যেন দুঃখীও শোনায় তাঁর কণ্ঠ, ‘বড় খেলোয়াড় হয়ে উঠতে গেলে রিয়াদকে (মাহমুদ) নিয়মিত বড় রান করতে হবে। সে জন্য ওকে খেলতে হবে চার নম্বরে। কিন্তু ওকে তো এক জায়গায় স্থির করতে পারছি না। আফগানিস্তানের সঙ্গে প্রথম ম্যাচে সেঞ্চুরিটি হয়তো মিস করেছে। এর বাইরে নিজের মতো খেলার সুযোগ পাচ্ছে না। ’ তবে বিশ্বকাপের মহানায়কের ওপর অধিনায়কের আস্থা যে কতটা, মাশরাফির পরের কথায় তা স্পষ্ট, ‘রিয়াদের (মাহমুদ) ক্রিজে থাকা আমাকে সবচেয়ে বেশি স্বস্তি দেয়। ও উইকেটে থাকা মানেই সবার মধ্যে স্থিরতা নিয়ে আসা। যখন প্রয়োজন ধরে খেলে, যখন প্রয়োজন মেরে খেলে। দলের চাহিদা ও খুব ভালোভাবে মেটাতে পারে। ’

কিন্তু তা করতে গিয়ে মাহমুদের সামর্থ্যের সুবিচার কি হচ্ছে? বাংলাদেশ দলের লাভই-বা হচ্ছে কতটা? ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজটি এসব প্রশ্নের মীমাংসাও করে দেবে।


মন্তব্য