kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ইংল্যান্ড বলেই হতাশাটা বেশি রুবেলের

নোমান মোহাম্মদ   

৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ইংল্যান্ড বলেই হতাশাটা বেশি রুবেলের

আবার ইংল্যান্ড। আবার সেই দুই বল।

আবার রুবেল হোসেন।

অ্যাডিলেডের আকাশে সেদিন ইংল্যান্ডের জয়বার্তা লেখা হয়ে যায় একরকম। শেষ দুই ওভারে দুই উইকেট হাতে রেখে চাই মোটে ১৬ রান। ক্রিজে ৪২ রান করা ক্রিস ওকস এবং আগের ওভারেই ছক্কা মারা স্টুয়ার্ট ব্রড। বাংলাদেশের বিশ্বকাপযাত্রা যে কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্নমশাল জ্বালিয়ে, তা বুঝি নিবেই যাবে! কিন্তু রুবেল সেটি হতে দেন না। তিন বলের মধ্যে দুই অলৌকিক ডেভিলারিতে তুলে দেন ইংল্যান্ডের শেষ দুই উইকেট। নিবু নিবু উৎসবে লাগে দাবানলের স্ফুলিঙ্গ, বাংলাদেশ নিশ্চিত করে কোয়ার্টার ফাইনাল। আর বিশ্বকাপের সেই অমর কাব্যের শেষ বিকেলের মহানায়ক হয়ে যান রুবেল।

আবার যখন বাংলাদেশের সামনে সেই ইংল্যান্ড—সেই দুটো বল ও সেই রুবেল হোসেন স্মৃতিতে ঠোকর না দিয়ে পারে!

রুবেলের জন্যও এখন স্মৃতিই সম্বল। ওই নাটকীয় বোলিং কীর্তির পুনর্মঞ্চায়নের সুযোগটাই যে পাচ্ছেন না আপাতত! কারণ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঘোষিত প্রথম দুই ওয়ানডের স্কোয়াডে নেই তিনি। জাতীয় দলের সতীর্থরা অনুশীলন করছেন শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে, কেউ কেউ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফতুল্লার অনুশীলন ম্যাচে। রুবেল তখন জাতীয় লিগ খেলার জন্য বগুড়ায়। কিন্তু ওখানকার স্টেডিয়াম কিংবা পথঘাটের কিছু দর্শক ঠিকই উসকে দেয় এই পেসারের স্মৃতির উনুন। বগুড়ার হোটেল কক্ষ থেকে ফোনে কাল গোধূলিবেলায় তেমনটাই জানান রুবেল, ‘‘অনেকে জানেন না যে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে আমি নেই। দেখা হলে তাই বলে—‘রুবেল ভাই, আবার বিশ্বকাপের মতো বোলিং করতে হবে। অমনভাবে বোল্ড করতে হবে। ’ শুনে আমি হাসি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে কষ্ট হয় খুব। ’’

কষ্ট হবে না? আফগানিস্তানের বিপক্ষে সদ্য সমাপ্ত সিরিজেই তো ছিলেন। না হয় তৃতীয় ওয়ানডের একাদশ থেকে বাদ। তাই বলে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে যে স্কোয়াড থেকেই বাদ পড়বে, তা ভাবতেই পারেননি রুবেল, ‘মেনে নিচ্ছি, আমি আফগানিস্তানের বিপক্ষে ভালো বোলিং করিনি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কত দিন পর ওয়ানডে খেললাম। বাংলাদেশ খেলছে প্রায় ১০-১১ মাস পর। আমি তো আরো বেশি। গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের পর প্রথম। তাই আশা ছিল, আরেকটি সুযোগ হয়তো পাব। সিরিজটি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বলে আশা হয়তো ছিল একটু বেশিই। ’

রুবেলের সে আশা পূরণ হয়নি। পেশাদারির ক্রিকেট জগতে দেড় বছর আগে তাঁর অ্যাডিলেড-বীরত্বের কথা ভুলে গেছে টিম ম্যানেজমেন্ট। কিন্তু ৫৩ রানে চার উইকেট এবং আরো বেশি করে ১৯৯২ বিশ্বকাপ ফাইনালের ওয়াসিম আকরামকে মনে করিয়ে দেওয়া ওই দুটো ডেলিভারি নিজে ভোলেননি। কাল সেই স্মৃতির তরণীতে তুলে দেওয়ায় রুবেলের কণ্ঠে তাই আনন্দের জলপ্রপাত, ‘ওই দুটো বল কী ভোলা যায়? আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে খুশির সময় তা। এখন আমি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে বাদ পড়েছি, সামনেই হয়তো ফিরব। কিন্তু আপনারা তো জানেন, বিশ্বকাপের ওপর আমার ক্যারিয়ার ঝুলে ছিল। সেখানে অমন দুটো বল করে বাংলাদেশকে কোয়ার্টার ফাইনালে নিয়ে যেতে পেরেছি—এর চেয়ে বড় আনন্দ হতে পারে না। ’

হ্যাঁ, বিশ্বকাপের ওপর তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ঝুলে ছিল সত্যি। ঠিক আগের সময়টা ব্যক্তিগত জীবনের ঝড়ে ওলটপালট। মামলা-মোকদ্দমার ঝামেলায় জড়িয়ে এমনকি জেলে পর্যন্ত যেতে হয় রুবেলকে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওই আশ্চর্য দুই ডেভিলারির গুরুত্ব তাই তাঁর কাছে অনেক, ‘তখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে আমি এমন কিছু করতে পারিনি। ক্যারিয়ারের সামনে বড় একটি প্রশ্ন তাই ছিলই। ইংল্যান্ডের শেষ দুই উইকেট তুলে নেওয়ার পরই বুঝতে পারি, আবার আমি ক্রিকেট খেলতে পারব। ’ আরো বুঝে যান, তাঁর ওই পারফরম্যান্সের গল্পগাথা চলতেই থাকবে। বাংলাদেশের ক্রিকেট-রূপকথায় চিরস্থায়ী অংশ হয়ে থাকবে তা, ‘এ নিয়ে আমার যে কত গর্ব, বলে বোঝাতে পরব না। খেলা ছাড়ার পরও বলতে পারব, বাংলাদেশকে ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠানোর পথে বড় ভূমিকা রাখতে পেরেছি। ’

পরের সময়টায় ক্যারিয়ারে উল্কার গতি আর ছিল না। বরং বাংলাদেশ ক্রিকেটে উল্কার মতো আবির্ভূত মোস্তাফিজুর রহমানের ছায়ায় আড়াল হয়ে যান রুবেল। আর ২০১৫-র জুলাইতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের পর তো জাতীয় দলে আর খেলাই হয়নি। ১৪ মাস পর ফেরেন আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে। সেখানে প্রথম দুই ম্যাচের পারফরম্যান্সে (৯-০-৬২-১ এবং ৩-০-২৪-০) সন্তুষ্ট নয় টিম ম্যানেজমেন্ট। যে কারণে বাদ পড়েন তৃতীয় ম্যাচের একাদশ থেকে। আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তো স্কোয়াড থেকেই।

খুব আশা ছিল, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আবার বিশ্বকাপের মতো বোলিং করবেন। আবার তাঁর নামে জয়ধ্বনি উঠবে মানচিত্রজুড়ে। কিন্তু তা আর হচ্ছে কই! ৭ অক্টোবর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে প্রথম ওয়ানডেতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলবে যখন বাংলাদেশ, রুবেল তখন জাতীয় লিগ খেলার জন্য থাকবেন কক্সবাজারে। তাই বলে নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করছেন না তিনি। বরং নিয়তি লিখতে চান নিজের হাতে, নিজের পারফরম্যান্সে। জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তনের সংকল্প তাঁর কণ্ঠে তাই শোনায় ঘোষণার মতো, ‘আমি হাল ছাড়ব না। চেষ্টা করব ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো পারফর্ম করে যত দ্রুত সম্ভব জাতীয় দলে ফিরতে। সামনে বাংলাদেশের অনেক খেলা। ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো করে সেখানে আমি অবশ্যই ফিরব। ’

তাঁর কাছে ২০১৫ বিশ্বকাপ ছিল ক্যারিয়ার বাঁচানোর লড়াই। রূপকথার মতো দুই ডেলিভারিতে সে লড়াইয়ের বিজয়ী যোদ্ধা রুবেল হোসেন। জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তনের লড়াইয়ে তাহলে তিনি হারবেন কেন!


মন্তব্য