kalerkantho


কারণ খুঁজছেন সাকিবও

সাইদুজ্জামান   

৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



কারণ খুঁজছেন সাকিবও

অনুশীলনের ঘণ্টা তখনো বাজেনি। জিম শেষ করে সবাই ড্রেসিংরুমে গা জুড়াচ্ছেন।

কিন্তু জাতীয় দলের একজন মিরপুরের পুরো মাঠ চক্কর দিচ্ছেন। তিনি আবার কিনা সাকিব আল হাসান! পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল নিজের ব্যাটিংয়ের ভিডিও-ও খুঁটিয়ে দেখেছেন তিনি। ভ্যাপসা গরমের দিনটায় এমন জোড়া চমক হজম করা একটু কঠিনই!

সন্ধ্যায় ভাইবারে এমন চমকের পেছনে কারণটা জানতে চাওয়ায় সাকিব আল হাসান প্রথমে হাসির স্মাইলি পাঠিয়ে জানালেন, ‘এমনিই রানিং করলাম। বিশেষ কোনো কারণ নেই। আর যা-ই হোক ফিটনেসটা তো ঠিক রাখতে হবে। ’ ফিটনেস ঠিক রাখার জন্য মাঠজুড়ে সাকিব চক্কর দিচ্ছেন, এমন দৃশ্য বিরল। তাঁর প্রারম্ভিক ক্রিকেট জীবনের দর্শন যতটুকু জানা তাতে লেখা, খেলতে খেলতেই ফিটনেসের কাজটা হয়ে যায়। আর এত টানা খেলেন যে, ফিটনেসের জন্য সময় মেলে খুব সামান্যই। অবশ্য ইদানীং ফিটনেস নিয়ে কাজ করতে দেখা যায় সাকিবকে।

কালের কণ্ঠকেই সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেওছিলেন তিনি, ‘এখন তো আর আগের বয়স নেই। তাই ফিটনেস ধরে রাখার জন্য বাড়তি খাটতে হয়। ’ কাল একাকী মিরপুরে তাঁর পাঁচ চক্কর দেওয়া যেন সাকিবের বদলে যাওয়া রুটিনের প্রামাণ্য দলিল।

তবে ফিটনেস না, বরং অন্য একটি বিষয় কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে সাকিবের মনে। সেটা আফগানিস্তানের বিপক্ষে তৃতীয় ইনিংসে নিজের ব্যাটিং। বাংলাদেশ দলে বহুদিন ধরেই একজন কম্পিউটার অ্যানালিস্ট অ্যাটাচড আছেন। ম্যাচের, কখনো কখনো নেটের ব্যাটিংও তিনি ভিডিওতে ধারণ করেন। টিম মিটিংয়ে কিংবা ব্যাটসম্যানকে ধরে ধরে ত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া হয়। চাইলে ব্যাটসম্যান নিজে থেকেও অ্যানালিস্টের কাছে গিয়ে ফুটেজ দেখে ভুলভ্রান্তি খুঁটিয়ে দেখেন। দলে এমনও কেউ কেউ আছেন, যাঁর কিংবা যাঁদের ফুটেজ দেখার তাগাদায় কম্পিউটার অ্যানালিস্ট নাকি ঠিকঠাক বিশ্রামও পান না! তবে সে দলে সাকিব নেই। ম্যাচের পর ক্রিকেটের বাতিই যে নিভিয়ে দেন তিনি। হতে পারে সুসময়ের নৌকায় চড়ে আছেন বলেই নিজের ভুলভ্রান্তি খুঁজতে কম্পিউটার অ্যানালিস্টের দরজায় টোকা দিতে হয় না সাকিবকে। কিন্তু এবার দিলেন। ‘নিজের ব্যাটিংয়ের ভিডিও বোধহয় জীবনে এই প্রথম দেখলাম’, কোনো ভণিতা না করে জানালেন সাকিব। এরপরই তিনি দার্শনিক, ‘জীবনে যে কত কিছু হয় আর কত কিছু দেখতে হয়!’

অপ্রত্যাশিত নাটকীয় সিরিজ জয়ের কারণেই কিনা বেশ কিছু ভুল আড়াল পড়ে গেছে। সঙ্গে প্রোফাইল মিলে-টিলে আরো বেশি আড়াল পড়ে গেছে আফগানদের বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডেতে সাকিব আল হাসানের ব্যাটিং। তিনি যখন ক্রিজে নামেন তখন বাংলাদেশের স্কোর ২ উইকেটে ১৬৩ রান। ৮৪ রানে অপরাজিত তামিম ইকবালের উপস্থিতিতে আরো নির্ভার করে দেওয়ার কথা সাকিবকে। কিন্তু কোথায় কী। ৩৫ বলে ১৭ রান করে দৌলত জাদরানকে উইকেট দিয়ে ফেরেন তিনি। ৩৫ বলের ২১টাই আবার ডট বল!

ওই রকম পরিস্থিতিতে এমন ব্যাটিং; এটা কি সাকিব নাকি অন্য কাউকে দেখেছি আমরা? কেন এমন হলো?

—জানি না। জানি না, কেন যা চেয়েছি তা হয়নি।

তবে ভিডিও দেখে নিজের সেদিনের ব্যাটিংয়ের ত্রুটি যা খুঁজে পেয়েছেন সাকিব, তাতে টেকনিকের চেয়ে বেশি প্রকট যেন তাঁর সে ইনিংসের মানসিকতা, ‘শুরুটা তো ঠিকই ছিল। কিন্তু মনে হয় রশিদ (খান) আর (মোহাম্মদ) নবির কথা বেশি চিন্তা করছিলাম। ’ সিরিজজুড়ে এই দুজনের সঙ্গে আফগানিস্তানের স্পিনাররা ভালো বোলিং করেছেন; বাস্তবতা মেনে নিয়েও মনে ঝড় সাকিবের, ‘মানছি যে ওরা ভালো বোলিং করেছে। তবে আমার আরো ভালো হতে পারত, বিশেষ করে ব্যাটিংটা। ’

এই ব্যাটিং নিয়েও ‘কথা’ আছে। ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে সাকিব এবং কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহের সম্পর্কটা মোটেও বন্ধুত্বপূর্ণ নয় বলেই চাউর আছে। সব ব্যাটসম্যানের মতো সাকিবও চান তিন থেকে পাঁচ নম্বরের মধ্যে, সবচেয়ে ভালো হয় চার নম্বরে ব্যাটিং। কিন্তু কোচ চান সাকিব ছয় নম্বরে খেলুন, দলের ইনিংসটাকে টেনে নিয়ে যান শেষ পর্যন্ত। বহুদিনের এ ‘সংকটে’র মধ্যেও আফগানিস্তান সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচ পাঁচে আর শেষ ওয়ানডেতে প্রোমোশন পেয়ে আরেকর ধাপ ওপরে খেলেছেন সাকিব। কিন্তু প্রত্যাশা মেটাতে পারলেন কই!

ওয়ানডেতে সাকিব আল হাসানের ব্যাটিং স্ট্রাইক রেট ৮০.৪০। আইসিসির অলরাউন্ডার র্যাংকিংয়ের চূড়ায় চড়ার পর সবশেষ ওয়ানডের চেয়ে কম স্ট্রাইক রেট ছিল তাঁর মাত্র তিনটি ওয়ানডেতে। এর মধ্যে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এমন শম্বুক গতির ব্যাটিংয়ে জয় দিয়েই শেষ করেছিলেন ম্যাচটি। নিজের ১৬০তম ম্যাচেও জিতেছেন। তবু ব্যাটিংটা সাকিবীয় হয়নি যে! জবাবে সাকিবের টেক্সট, ‘আসলে এমন তো প্রতিদিন হয় না। তাই এমন দিন হলে সবারই চোখে লাগে। অবশ্য আমার নিজেরও নিজের কাছে অনেক প্রত্যাশা। সে কারণেই ভিডিওটা দেখেছি কেন এমন ব্যাটিং করলাম, জানতে। ’

আলাদা রানিং করছেন, ভিডিও দেখে নিজের ভুল ধরছেন সাকিব আল হাসান; ইংল্যান্ড মহারণের আগে এ যেন সুখবরের আগাম বার্তাই!


মন্তব্য