kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


হঠাৎ নামা অন্ধকার দূর করার প্রতিজ্ঞা

নোমান মোহাম্মদ   

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



হঠাৎ নামা অন্ধকার দূর করার প্রতিজ্ঞা

সেবারও ওঠে এমন হায় হায় রব! দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে প্রথম ওয়ানডেতে মাত্র ১৬০ রানে অলআউট হয়ে ৮ উইকেটে হেরে যাওয়ার পর। বিশ্বকাপের দুরন্ত পারফরম্যান্স তখন মনে হয় কত দূরের! পাকিস্তানকে উড়িয়ে, ভারতকে গুঁড়িয়ে দেওয়া সিরিজ জয় হঠাৎ যেন দূর অতীতের।

প্রোটিয়াদের কাছে টি-টোয়েন্টিতে আত্মসমর্পণের পর ওয়ানডে সিরিজের শুরুতে হোঁচট খাওয়ায় আবার বরং প্রশ্নবিদ্ধ বাংলাদেশ।

সে প্রশ্নের জবাব কী অসাধারণভাবেই না দেয় মাশরাফি বিন মর্তুজার দল!

দ্বিতীয় ওয়ানডেতে প্রোটিয়াদের ১৬২ রানে অলআউট করে বাংলাদেশ ম্যাচ জিতে নেয় ৭ উইকেটে। যে জয়ে আলো ছড়ায় সৌম্য সরকারের ৭৯ বলে অপরাজিত ৮৮ রান। চট্টগ্রামে সিরিজ জয়ের ম্যাচের চিত্রনাট্যও প্রায় অভিন্ন। এবার দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১৬৮ রানে গুটিয়ে দিয়ে ৯ উইকেটের জয়। আবারও ৭৫ বলে ৯০ রানের ইনিংসে ঝলসে ওঠে সৌম্যর ব্যাট। রাজসিক পারফরম্যান্সে আবার বাংলাদেশ ক্রিকেটের ময়ূরপঙ্খী ভেড়ে সাফল্যের সুবর্ণবন্দরে।

আজ আফগানিস্তানের বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডেতেও তো অমন এক উপলক্ষের সামনে মাশরাফি বিন মর্তুজার দল! তাতে সফল হলে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ জয়ের মতো ধন্য ধন্য রব উঠবে না সত্যি। কিন্তু ব্যর্থতার গহ্বরে পিছলে গেলে রক্ষা নেই। হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসা অন্ধকার হঠাৎ জাপটে ধরবে বাংলাদেশকে। তা এড়াতে আজ শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের ক্রিকেটতীর্থে আফগানদের বিপক্ষে স্বাগতিকদের জয়ের বিকল্প নেই।

ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক যে জয়যাত্রা, তা শুরু মাশরাফি বিন মর্তুজার হাত ধরে। তিনি অধিনায়ক হওয়ার পর থেকেই সাফল্যের সঙ্গে মিতালি। ২০১৪-র আগস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে সিরিজ হারের পর অধিনায়কত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় মুশফিকুর রহিমকে। দায়িত্ব পান মাশরাফি। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ জয় দিয়ে পরাজয়ের গহ্বর থেকে বেরোনো শুরু বাংলাদেশের। এরপর বিশ্বকাপের বিস্ময়কর পারফরম্যান্সে কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তরণ। তারপর দেশের মাটিতে হিরণ্ময় তিন সিরিজে পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয়। বছরের শেষ দিকে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও। গত দুই বছরে সর্বশেষ পাঁচ ওয়ানডে সিরিজে তাই জয়ের হাসিতে শেষ করে বাংলাদেশ।

ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা-পাকিস্তানের মতো পরাশক্তিরা পদানত মাশরাফি-সাকিব-তামিমদের বিক্রমের সামনে। সেই তাঁরাই কি পচা শামুকে পা কাটবেন! দুই বছর ধরে যে অপরাজেয় অহংকার, তাতে আঁচড় পড়বে আফগানিস্তানের মতো দলের কাছে হেরে! উন্নতির রথে সওয়ার বাংলাদেশ যে তা ভাবতেই পারছে না!

সিরিজের প্রথম ম্যাচে হারতে হারতে জিতেছে মাশরাফির দল। দ্বিতীয় খেলায় আর শেষরক্ষা হয়নি। তাই বলে ওই এক হারে সব শেষ হয়েছে বলেও মানতে নারাজ অধিনায়ক। কাল সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে জোরালো কণ্ঠে তা জানিয়ে যান মাশরাফি, ‘আমরা এত দিন যে কাজগুলো করে এসেছি, যেভাবে সাফল্য পেয়েছি, তা এক ম্যাচ হারে শেষ হয়ে যাবে না। অবশ্যই গত ম্যাচ হারায় ক্রিকেটার-টিম ম্যানেজমেন্টসহ যে ২০-২২ জন রয়েছি, আমরা সবাই হতাশ। তার মানে এই না, এত দিন যে কাজগুলো করেছি তা ভুলে গেছি। ’ দ্বিতীয় ম্যাচের হারটি বরং মাথা থেকে তাড়িয়ে দিতে চাইছেন অধিনায়ক, ‘আমাদের জন্য সেদিন ছিল খারাপ দিন। ক্রিকেটে এমন হয়, যেকোনো খেলাতেই হয়। এগুলো মাথায় নিয়ে নামলে কাজ আরো কঠিন হবে। চেষ্টা করছি তাই মানসিকভাবে নির্ভার থাকতে। ’

প্রথম ম্যাচে আফগানরা কাঁপিয়ে দেয় বাংলাদেশকে। দ্বিতীয় ম্যাচে তো জিতেই যায়। এ জন্য প্রতিপক্ষকে কৃতিত্ব দিতে কার্পণ্য করেন না মাশরাফি। কিন্তু সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচের আগে নিজেদের দিকেই মনোযোগ দিতে চান বেশি করে, ‘প্রতিপক্ষ নিয়ে চিন্তা করার চেয়ে নিজেদের নিয়ে বেশি ভাবা উচিত। আমরা কী খেলছি, আমাদের পরিকল্পনা কী—এসব। আফগানিস্তানকে ছোট করছি না। কিন্তু ওটি ছিল আমাদের খারাপ এক দিন। তা নিয়ে ভাবলে মানসিকভাবে আরো বিপর্যস্ত হয়ে যেতে পারি। ’ সেটি এড়িয়ে জয়ের পথরেখা আঁকেন অধিনায়ক, ‘আমরা গত এক-দেড় বছর যা ভেবেছি, যেভাবে ইতিবাচক ক্রিকেট খেলেছি—সেভাবেই ক্রিকেট খেলার চেষ্টা করছি। আফগানিস্তান আমাদের চেয়ে ভালো খেললে অবশ্যই দিনটি ওদের হতে পারে। তবে আমাদের জন্য আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নেমে আত্মবিশ্বাসী হয়ে খেলাই ভালো। ’

অধিনায়ক হিসেবে প্রত্যাবর্তনের পর ওয়ানডে সিরিজ এখনো হারেননি মাশরাফি। তবে আইসিসি সহযোগী কোনো দেশের কাছে বাংলাদেশের সর্বশেষ ওয়ানডে সিরিজ হারের সময় তিনিই ছিলেন অধিনায়ক। তা ২০১০ সালের ইউরোপ সফরে। আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে দুই ম্যাচ সিরিজ ড্র হয় ১-১। বেলফাস্টে প্রথম ম্যাচ হারের পর দ্বিতীয়টিতে জিতে মানরক্ষা বাংলাদেশের। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ ভেসে যায় বৃষ্টিতে। আর নেদারল্যান্ডসের কাছে হেরে যায় সিরিজের একমাত্র  ম্যাচে।

এরপর পদ্মা-মেঘনায় গড়ায় অনেক জল। সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিমদের অধিনায়কত্বে অনেক ওয়ানডে খেলে বাংলাদেশ। কিন্তু আইসিসি সহযোগী কোনো দেশের বিপক্ষে আর মুখোমুখি হয়নি দ্বিপক্ষীয় সিরিজে। এবার আফগানদের সঙ্গে আবার সেই দ্বৈরথ। তাতে অনায়াস জয় প্রত্যাশিত ছিল। হয়নি। তাই বলে ১-১ ড্র থাকা অবস্থায় শেষ ম্যাচে জয় ভিন্ন অন্য কিছু তো ভাবারই সুযোগ নেই বাংলাদেশের।

দক্ষিণ আফ্রিকা-ভারত-পাকিস্তানের বিপক্ষে রূপকথার কাব্য লেখা মাশরাফির দল নিশ্চয় হোঁচট খাবে না আফগানিস্তানের বিপক্ষে!


মন্তব্য