kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সেকেন্ডের ট্র্যাজেডিতে বাংলাদেশের স্বপ্নভঙ্গ

সনৎ বাবলা   

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সেকেন্ডের ট্র্যাজেডিতে বাংলাদেশের স্বপ্নভঙ্গ

তিন সেকেন্ডের ট্র্যাজেডিতে স্বপ্নভঙ্গ হলো স্বাগতিকদের। ‘এত ভালো’ যেন সইল না দেশের হকির।

দুর্দান্ত খেলেও ভাগ্যের হাতে মার খেল বাংলাদেশ, ৫-৪ গোলে হেরে শিরোপা তুলে দিয়েছে এশিয়ান হকির পরাশক্তি ভারতের হাতে।

পুরো ৭০ মিনিট দারুণ খেলেছে বাংলাদেশ। সঙ্গে হাজার তিনেক সমর্থকের সোল্লাস প্রেরণা দলটাকে সব সময় লড়াইয়ে রেখেছিল। শিরোপামুখী করে রেখেছিল। ৪-৪ গোলের সমতায় শেষ ভেবে মানুষও প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন পেনাল্টি শ্যুট-আউট দেখার। দুর্দান্ত ফাইনালের সমাপ্তি যেভাবে হওয়া উচিত, সেদিকেই যাচ্ছে ম্যাচের নিয়তি। কিন্তু শেষ বাঁশির তিন সেকেন্ড আগে সব ওলটপালট হয়ে গেল। আনন্দ শিবমের হিট স্বাগতিক দর্শক-সমর্থকদের হতাশায় ডুবিয়ে বাংলাদেশের গোলে পৌঁছে গেলে আফসোসের অনুরণন বয়ে গেল পুরো স্টেডিয়ামে। এত ভালো খেলেও কি এই প্রাপ্তি! মানা যায় না এমন বিদায়। কান্নার রোল পড়ে গেল লাল-সবুজে, রোমান-আশরাফুলদের যন্ত্রণা আর অন্তর্দহনে রচিত হলো অনূর্ধ্ব-১৮ এশিয়া কাপ হকিতে বাংলাদেশের স্বপ্নভঙ্গের ট্র্যাজেডি। প্রধান কোচ কাওসার আলীকেও মেনে নিতে হচ্ছে নিয়তির লিখন, ‘আমাদের কপালে নাই। আমার ছেলেরা শিরোপা জেতার মতোই খেলেছে। কিন্তু শিরোপা লেখা ছিল ওদের (ভারতের) কপালে। প্রথম দুইবার লিড নিয়েও ধরে রাখতে পারিনি। হয়তো আরো বড় লিড নিলেও হতো না। ভাগ্য আজ ভারতের সঙ্গেই ছিল। ’ তাই দুর্ভাগা বাংলাদেশকে রানার্স-আপেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।

এ টুর্নামেন্টে প্রথমবার ফাইনালে উঠে সত্যি সত্যি শিরোপার সৌরভ পেতে শুরু করেছিল স্বাগতিকরা। কারণ এই ভারতকে ৫-৪ গোলে হারিয়েই তারা টুর্নামেন্ট শুরু করেছিল। সুবাদে আত্মবিশ্বাসে এগিয়ে থাকা দলটি ২০ মিনিটে লিড নিয়েই স্বপ্ন দেখাতে শুরু করে। ঠিক প্রথম ম্যাচের মতোই নাইম স্ট্রাইকিং সার্কেলে ভারতীয় ধর্মেন্দ্রর পায়ে বল পুশ করে প্রথম পেনাল্টি কর্নার আদায় করে নেন। যথারীতি আশরাফুলের হিট, তবে গোললাইন থেকে এক ডিফেন্ডার ফিরিয়ে দিয়েও গোল রুখতে পারেননি। রোমান সরকারের ফিরতি হিটে এগিয়ে নেয় স্বাগতিকদের। প্রথমবারের মতো টুর্নামেন্টে গোলের মুখ দেখেছেন এই প্লে-মেকার, তবে আক্রমণ তৈরি এবং সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের সুবাদে এই বাংলাদেশ অধিনায়কই হয়েছেন টুর্নামেন্ট সেরা। মিনিট তিনেক বাদে অবশ্য বাংলাদেশ ডিফেন্স দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গোল খেয়ে ম্যাচে ফিরিয়েছে প্রতিপক্ষকে। বাইলাইন ধরে আনন্দ শিবম যখন গোলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তখন সবাই দাঁড়িয়ে, সহজেই তিনি স্বাগতিক গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে বল তুলে দিয়েছেন পোস্টে। এরপর আবার ৩৫ মিনিটে স্বাগতিকরা লিড নেয় দুর্দান্ত এক গোলে। সবুজের হিটে মহসিন স্টিক লাগিয়ে বলের দিক বদলে দেন। সেই লিডও ৪৩ মিনিটের বেশি টেকেনি, পেনাল্টি কর্নার থেকে হারদিক সিং গোল করে ম্যাচে ফেরান ভারতকে।

এরপর হয়েছে ঠিক উল্টো। শুরু হয়েছে ভারতের লিড আর স্বাগতিকদের ম্যাচে ফেরার গল্প। ৫০ মিনিটে দিলপ্রীত সিংয়ের হালকা পুশ বাংলাদেশ গোলরক্ষক আরাফাত সানির দু’পায়ের ফাঁক গলে জালে পৌঁছায়। বাংলাদেশকে ম্যাচে ফিরতে হবে। ৬০ মিনিটে পেনাল্টি কর্নার থেকে আশরাফুলের গোলে ফেরে। ১২ গোল নিয়ে তিনিই হয়েছেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ৬২ মিনিটে কনজেংবান সিংয়ের গোল আবার ভারতীয়দের এগিয়ে দিলেও মাহবুব হোসেন সেই গোল শোধ করে ৪-৪ গোলের সমতায় ফেরান ম্যাচ। তারপর ম্যাচ নিয়ে গেছে শেষ মিনিটে। খানিকটা ডিফেন্সিভ হয়ে যেন পেনাল্টি শ্যুট-আউটের মানসিক প্রস্তুতিও নিচ্ছিল স্বাগতিকরা। চোখ ছিল টাইমারের দিকে। কিন্তু তিন সেকেন্ড আগে সব প্রস্তুতি লণ্ডভণ্ড করে দিলেন ভারতের অভিষেক। বাঙালির হৃদয় ভেঙে দিয়ে শিরোপাটা ভারতের করে নিলেন। এমন জয়ে ভারতীয় অধিনায়ক নিলম সন্দ্বীপ দারুণ খুশি। তাঁর চোখে দুই দলের শক্তিতে কোনো পার্থক্য নেই, তবে ‘শেষের দিকে তারা (বাংলাদেশ) একটু অমনোযোগী হয়েছিল, সেটারই খেসারত দিয়েছে। নইলে আমাদের দলের সঙ্গে বাংলাদেশের শক্তিতে তেমন কোনো তফাৎ নেই। ’ আসলে তিন সেকেন্ড আগ পর্যন্ত মাঠের খেলায় দুই পক্ষকে আলাদা করার মতো কিছু ছিল না। শেষ পর্যন্ত আলাদা করে দিয়েছে তিন সেকেন্ডের ওই ট্র্যাজেডি। তাই বুকে অসহনীয় ব্যথা চেপে বাংলাদেশ কোচ কাওসার আলীর ঘোষণা, ‘আমরা হারিনি। আমার ছেলেরা হারেনি। তারা হারার মতো খেলেনি। ’ তাহলে! ভারত শুধুই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।


মন্তব্য