kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আত্মমগ্ন মুশফিককে নিয়ে প্রশ্ন

মাসুদ পারভেজ   

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আত্মমগ্ন মুশফিককে নিয়ে প্রশ্ন

এভাবে... ছবি : মীর ফরিদ

কথায় আছে গল্পের গরু গাছেও চড়ে! তা মুশফিকুর রহিমকে নিয়ে গত কয়েক দিনে চালু হয়ে যাওয়া তেমনই একটি গাছে চড়া গরুর গল্পটি এরকম—

আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে মাত্র ৬ রান করে আউট হওয়া মুশফিক সেদিন রাতে বাংলাদেশ দলের সঙ্গে হোটেলে না ফিরে রয়ে গিয়েছিলেন মিরপুর স্টেডিয়ামেই। সেখানকার ইনডোরে সারা রাত ধরে নকিংও করেছেন।

আর পরদিন সকালে সেখানে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে মুশফিকের ঘনিষ্ঠ সহকারী টিম বয় নাসিরকে! জ্ঞান হারালেও আগের রাতে মুশফিককে ক্রমাগত বল ছুড়ে যাওয়ার কারণে ওর একটি হাত নাকি তখনো নড়ছিল!

গল্প যেহেতু, তাই এর মধ্যে বানোয়াট অনেক কিছু থাকবে স্বাভাবিক। তবে ব্যর্থতায় আরো বেশি সিরিয়াস মুশফিকের একেবারে নিজের মধ্যে ডুবে যাওয়ার খণ্ড খণ্ড চিত্রে অবশ্য এক চুলও বানোয়াট কিছু নেই। দ্বিতীয় ওয়ানডের আগের দিন তেমনই একটি চিত্রের প্রত্যক্ষদর্শী অনেকেই। মিরপুরের ইনডোর সংলগ্ন মাঠের নেট থেকে বেরিয়ে আসার পথে হাত বাড়ানো দূরত্বে দাঁড়ানো সাকিব আল হাসান তাঁকে কিছু একটা জিজ্ঞেস করেছিলেন। কিন্তু কোনো ভাবান্তর না দেখে আরেক সতীর্থ তামিম ইকবালের সঙ্গে তা নিয়ে খুনসুটিতে মেতে ওঠার ভাষাটা ছিল এরকমই, ‘মুশফিক ভাইয়ের কি মাথা-টাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি? আমাকেও দেখি চিনছেন না!’

সতীর্থরা অবশ্য পারফর্ম না করার স্পর্শকাতর সময়ে মুশফিকের খুব আপনজনকেও তাঁর দুর্ব্যবহারের শিকার হতে দেখেছেন। বাজে সময়ে বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়কের কাছের মানুষ-দূরের মানুষ আলাদা করার উপায়ও থাকে না খুব। তখন দুঃসময় কাটিয়ে ওঠার জন্য বাড়তি অনুশীলনে এমন ধ্যানমগ্ন ঋষি হয়ে যান যে বিষয়টি প্রশংসারও দাবিদার। তবে সবার আগে অনুশীলনে নেমে পড়া মুশফিকের সবার শেষে যাওয়ার চেনা দৃশ্যের বাইরেও কিছু ব্যাপার থাকে। ব্যর্থতায় তিনি মনের দরজা-জানালা এমন বন্ধ করে বসে থাকেন যে তাঁর কাছে পৌঁছানোর সাধ্যি কার!  

তখন সতীর্থদেরও যে প্রবেশাধিকার পেতে সমস্যা হয়, সাকিবের ঘটনাটি এর একটি উদাহরণ মাত্র। আর মুশফিকের এরকম অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছে নিয়মিত বিরতিতেই। গত মার্চে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভারত ম্যাচ জেতাতে জেতাতে হেরে যাওয়ার অপরাধবোধ তাঁকে এরপর বেশ কিছুদিনই তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। তাঁদের প্রতি ওই ভারতের টিম ডিরেক্টর রবি শাস্ত্রীর অবজ্ঞাসূচক আচরণে পুরো বাংলাদেশ দলই ক্ষুব্ধ ছিল। তবে জিতে দেখিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে মুশফিকের বাড়তি উত্তেজনাও অন্তিম মুহূর্তে তাঁর গড়বড় করে ফেলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্বাস করেন সতীর্থরা। সেই বিশ্বাস শক্ত ভিতের ওপরও দাঁড়িয়েছে, যখন সেমিফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ভারতের হার ‘উপভোগ্য’ ছিল জানিয়ে টুইট করে বিতর্কিত হয়েছিলেন।

তুমুল বিতর্কে সেই পোস্ট প্রত্যাহার করে নেওয়া মুশফিকের কাছে এরপর সংবাদমাধ্যম সামান্যতম ‘একসেস’ও পায়নি। নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া মুশফিকের স্বাভাবিক হতে যে পারফরম্যান্স লাগে, সেটি করারও উপায় খুব ছিল না, কারণ বাংলাদেশ ওয়ানডেই তো খেলতে নামল প্রায় ১১ মাস পর। এত দিন পর সামনে আবার প্রাণশক্তি শুষে নিতে যথেষ্ট একের পর এক সিরিজ দেশে এবং দেশের বাইরে। আফগানিস্তান দিয়ে দীর্ঘ দৌড়ের সবে শুরু এবং শুরুতেই এক ম্যাচে রান করেননি তো আরেকটিতে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে স্টাম্পিং মিস করে কাঠগড়ায় মুশফিক। যা আবার তাঁর ‘নীরব’ হয়ে যাওয়ার পক্ষে আদর্শ পরিস্থিতিও।

এই পরিস্থিতিতে অবশ্য মাশরাফি বিন মর্তুজাকে পাশেই পাচ্ছেন তিনি। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে বাংলাদেশ অধিনায়ক গতকালও বলছিলেন, ‘একটি ম্যাচ কারো একার পক্ষে হারানো সম্ভব নয়। আমরা যদি আরো ২০টি রান করতাম, তাহলে এই পরিস্থিতি তৈরিই হতো না। ’ যদিও তাঁর উইকেটকিপিং নিয়ে প্রশ্ন আরো আগে থেকেই। গত বছর পাকিস্তানের বিপক্ষে খুলনা টেস্টে একাধিক ক্যাচ ও স্টাম্পিং মিস করার পর থেকে এ ক্ষেত্রে তাঁর ওপর থেকে আস্থার হাত তুলে নিয়েছেন হেড কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহেও। তাই ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্টে মুশফিক শুধুই খেলেছেন বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান হিসেবে।

সেই ব্যাটিং এবং এর পাশাপাশি কিপিংয়ে উন্নতির জন্য মুশফিক এখনো সর্বোচ্চ শ্রম নিংড়ে দেন। সে জন্য মাশরাফির সর্বোচ্চ প্রশংসাও বরাদ্দ থাকে তাঁর জন্য, ‘মুশফিকের পেশাদারির বিষয়টি যদি খেয়াল করেন, তাহলে দেখবেন ও আমাদের সবার থেকে সব সময় এক ধাপ এগিয়ে। এ ক্ষেত্রে ওকে একশতে একশই দিতে হবে। ’ আর পেশাদারি মুশফিকের নিজেকে ফিরে পাওয়ার চেষ্টায় যোগ হওয়া উপসর্গগুলোকে ব্যক্তিগতই মনে করেন মাশরাফি, ‘একেকজন মানুষের চিন্তাভাবনা, চলাফেরা একেক রকম। কিছু কিছু ব্যাপার আছে যেগুলো ওর একেবারেই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। ’ ব্যক্তিগত হওয়ায় মুখ ভার করে থাকা মুশফিককে তাই কেউ বোঝাতেও যান না। অবশ্য দলের মধ্যে অনেকেই মনে করেন স্বাভাবিকতায় ফিরলেও সুফল পেতে পারেন তিনি। এঁদেরই একজনের কথায় মিশে থাকল অসহায়ত্বও, ‘ক্রিকেটের খারাপ সময়ে সহজ-স্বাভাবিক থাকার পরামর্শই আমরা সব সময় পেয়ে এসেছি, কিন্তু মুশফিককে এটা বোঝাবে কে?’

মুশফিককে নিয়ে তাই গল্পের গরু গাছেই চড়ে বসে!


মন্তব্য