kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আবার স্পিনে বাঁক বাংলাদেশের

মাসুদ পারভেজ   

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আবার স্পিনে বাঁক বাংলাদেশের

আফগানিস্তান সিরিজ শুরুর আগের দিন পর্যন্তও ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সফলতম বোলার আব্দুর রাজ্জাকই যেখানে জাতীয় দলের ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে পারছিলেন না আর, সেখানে সাড়ে আট বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বিচ্ছিন্ন কারো পক্ষে ফেরার আশা দুরাশাই। ঘুণাক্ষরেও সে আশা করেননি মোশাররফ হোসেন।

২০০৮ সালের মার্চে দেশের মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মাত্র ছয় দিনের মধ্যে তিনটি ওয়ানডে খেলেই থেমে গিয়েছিল যাঁর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারের চাকা। আচমকাই সেই চাকা আবার সচল হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা জাগিয়ে আফগানিস্তান সিরিজের শেষ ওয়ানডের দলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন এই বাঁহাতি স্পিনার।

এত দিন পর তাঁর জাতীয় দলে ফেরার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্পিনকেন্দ্রিক ভাবনার শ্লথ হয়ে যাওয়া চাকাটিও সম্ভবত গতিশীল হতে চলেছে। যে ভাবনাটি গতি হারাতে শুরু করেছিল ২০১৫-র বিশ্বকাপ থেকে। এর আগে তো দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের রণপরিকল্পনার কেন্দ্রেই থেকেছেন স্পিনাররা। বিশেষ করে দেশের মাটিতে খেলা হলে তো বাঁহাতি স্পিনাররাই সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়ে এসেছেন। সেটি অস্বাভাবিকও ছিল না। কারণ বাংলাদেশে এই প্রজাতির স্পিনারের অভাব হয়নি কখনোই। বরং তাঁরা গণ্ডায় গণ্ডায় বেরিয়ে দেশটিকে তাঁদের খনি বলেও কখনো কখনো মনে করিয়েছেন। তা একসময় একাদশে তিনজন বাঁহাতি স্পিনার খেলানোও ছিল নিয়মিত ঘটনা।

এই নীতি মেনে নিয়মিত বিরতিতে বড় সাফল্যের দেখাও পেয়েছে বাংলাদেশ। এর কোনো কোনোটি বিদেশের মাঠেও। ওয়েস্ট ইন্ডিজে ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে ভারতকে বিদায়ের পথ করে দেওয়া ম্যাচটির কথাই ধরুন। অভিজ্ঞ মোহাম্মদ রফিকের সঙ্গে রাজ্জাক আর সাকিব আল হাসানের বাঁহাতি স্পিনত্রয়ী দলের জয়েও রেখেছিলেন দারুণ অবদান। সুপার এইট পর্বে ওয়ানডে র্যাংকিংয়ে তখনকার এক নম্বর দল দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানোর দিনও তাঁরা তিনজনে মিলে তুলে নিয়েছিলেন ৬ উইকেট। এর আগে-পরেও অনেক দিন বাঁহাতি স্পিনারেই বাংলাদেশ শিবির এমন আস্থা রেখে এসেছে যে কখনো কখনো একাদশে মাত্র একজন পেসারকেও দেখা গেছে।

তবে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে হওয়া সবশেষ বিশ্বকাপ থেকে পরিস্থিতি পেসারদের অনুকূল হতে শুরু করে। এমনই যে মাশরাফি বিন মর্তুজা, রুবেল হোসেন এবং তাসকিন আহমেদের সমন্বয়ে গড়া পেস অ্যাটাক কার্যকর এক ‘ত্রিফলা’ হিসেবেও আবির্ভূত হয়ে যায়। স্মরণকালের মধ্যে বাংলাদেশের পেসারদের সেরা সুসময়ের সেই শুরু। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলে দেশে ফিরেই পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করা তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজেও পেসারদের উজ্জ্বল পারফরম্যান্স। এরপর ভারত সিরিজে মুস্তাফিজুর রহমানের আবির্ভাবে পেস আক্রমণ আরো ধারালো হয়ে ওঠে। দুটি ম্যাচে একমাত্র বিশেষজ্ঞ স্পিনার সাকিবের সঙ্গে চার-চারজন পেসার নিয়েও নেমেছিল বাংলাদেশ। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সাফল্যও তিন পেসার নিয়ে খেলেই। পেসারদের সাফল্যে বাঁহাতি স্পিনারদের প্রয়োজন না ফুরালেও তাঁরা গুরুত্ব হারিয়েছিলেন অনেকটাই।

আফগানিস্তানের ব্যাটসম্যানরাই সেই গুরুত্ব ফিরিয়ে আনলেন। দলে সাকিবের সঙ্গে তাইজুল ইসলামও আছেন, কিন্তু এঁদের সঙ্গে এবার জুড়ে দেওয়া হলো মোশাররফকেও। যিনি মাসখানেক আগেও মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। ৩০ জনের প্রাথমিক দলেও ছিলেন না। তবে হাইপারফরম্যান্স ইউনিটের (এইচপি) স্পিন উপদেষ্টা হিসেবে আসা ভারতের সাবেক বাঁহাতি স্পিনার ভেঙ্কটপতি রাজুর চোখে তাঁর বোলিং এমন মনে ধরে যায় যে যাওয়ার আগে জাতীয় দলের ম্যানেজমেন্টকে  মোশাররফের নাম সুপারিশও করে যান। তত্ক্ষণাৎ অনুশীলন শিবিরেও ডাকা হয় তাঁকে। ভারতে ব্যক্তিগত সফরে থাকা মোশাররফ তড়িঘড়ি দেশে ফিরে ২৮ আগস্ট যোগ দেন শিবিরে।

এক মাস পর আফগানিস্তানের কাছে হারের রাত পেরোতে না পেরোতেই মোশাররফ দলে। ১৪ জনের দলে তাঁকে জায়গা করে দিতে ছেঁটেও ফেলা হয়েছে পেসার রুবেলকে। তৃতীয় বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে তাঁর অন্তর্ভুক্তির ব্যাখ্যায় তো নির্বাচকরা বলেই দিয়েছেন যে এ ধরনের বোলারদের বিপক্ষে আফগান ব্যাটসম্যানদের তেমন সুবিধা করে উঠতে না পারার বিষয়টি। পেস শক্তিতে বুঁদ হয়ে থাকা বাংলাদেশের এ বোধোদয়েই ফিরে এলেন মোশাররফ এবং ফিরিয়ে নিয়ে এলেন বাঁহাতি স্পিনারদের লম্বা সময় ধরে পেয়ে আসা সর্বাধিক গুরুত্বও। নির্বাচক হাবিবুল বাশার যদিও বিষয়টিকে দেখতে চাইলেন একটু অন্যভাবেই, ‘এটা ঠিক যে আমরা বেশ কিছুদিন পরই দলে এতজন বাঁহাতি স্পিনার রাখার কথা ভেবেছি। তার মানে এই নয় যে এত দিন ব্যর্থতার কারণেই ওদের গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। পেসাররা ভালো করছিল বলে ওদের গুরুত্ব একটু কমেছিল। তবে গুরুত্ব বাড়ে-কমে মূলত কন্ডিশনের কারণেই। এখন যেমন আফগান ব্যাটসম্যানদের দুর্বলতার কথা ভেবেই বাঁহাতি স্পিনার একজন বাড়ানো হয়েছে। ’

আফগানিস্তান স্পিনে না পেসে দুর্বল, সেটা জানতেই দুই ম্যাচ শেষ হয়ে গেল! তাহলে এত এত ভিডিও পর্যালোচনা, প্রতিপক্ষকে আগাম চেনার চেষ্টা কেন? থিঙ্ক ট্যাঙ্কের স্পিনে বাঁক নেওয়ার দিনে এ প্রশ্নটাও কিন্তু উঠছে।


মন্তব্য