kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কিংবদন্তির শেষ স্মৃতিস্মারক

সামীউর রহমান, সিলেট থেকে   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



কিংবদন্তির শেষ স্মৃতিস্মারক

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পঙিক্ত ধার করেই বলতে হয়, ‘তেত্রিশ বছর কেটে গেল, কেউ কথা রাখেনি। ’ সেই ১৯৮২ সালে জুম্মন লুসাই যখন আবাহনী ক্লাবে যোগ দিয়েছিলেন, তখন টগবগে তরুণ।

৩৩ বছর ধরে, খেলোয়াড় ও পরবর্তী সময়ে কোচসহ নানা ভূমিকায় ছিলেন প্রিয় এই ক্লাবের সঙ্গেই। ঘরবাড়ি, পরিবার-পরিজন ছেড়ে ক্লাবের তাঁবুকেই করে নিয়েছিলেন আপন। জীবদ্দশায় ঠিকানাটা তিন দশক ধরে বদলায়নি।   প্রিয় আবাহনী ক্লাব ছাড়ার পর মাগুরছড়ার খাসিয়াপুঞ্জিই হয়েছে হকির এই কিংবদন্তির শেষ ঠিকানা। প্রতিদানে কতটা কী পেলেন জুম্মন? বড় বোন মারিয়ান চৌধুরীর সঙ্গে আলাপে জানা গেল, জীবনের সোনালি সময়টা যে খেলার পেছনে উজাড় করে দিয়েছেন, তার বিনিময়ে জুম্মন পেয়েছেন সামান্যই।

জুম্মন আর মারিয়ান ছিলেন পিঠাপিঠি ভাইবোন, দুজনের সম্পর্কটা ছিল বন্ধুর মতোই স্বচ্ছ। সিলেটের চৌহাট্টার বাসায় বসে মারিয়ানই জানালেন জুম্মন চলে যাওয়ার পর যত প্রতিশ্রুতি এসেছিল বিভিন্ন মহল থেকে, বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেই তাঁর কোনোটিরই। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন স্টেডিয়ামের একটি গ্যালারি নামকরণের, হয়নি। হকি ফেডারেশনের সে সময়কার সাধারণ সম্পাদক খাজা রহমতউল্লাহ জুম্মনের নামে টুর্নামেন্ট করার অঙ্গীকার করেছিলেন, হয়নি। আবাহনী ক্লাব থেকে পরিবারকে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, এখনো আশ্বাসই রয়ে গেছে। জুম্মনের বোন মারিয়ান সাবেক সংসদ সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত এনামুল হক চৌধুরীর স্ত্রী অভিমানভরে জানালেন, ‘এই প্রসঙ্গে তাদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তাদের উত্তর দেওয়ার ধরনটা পছন্দ হয়নি। ’

ঢাকায় চলছে যুব এশিয়া কাপ হকি, যেখানে বাংলাদেশের তরুণরা পাচ্ছে সাফল্য। এই সাফল্য দেখে যাওয়া হয়নি জুম্মনের। তরুণদের নিয়ে কাজ করার তীব্র ইচ্ছা ছিল তাঁর মনে, হকি ফেডারেশনের কাছ থেকে সিলেটে হকি একাডেমি গড়ে তোলার প্রস্তাবও পেয়েছিলেন। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর নানা প্রাতিষ্ঠানিক রেষারেষিতে সেই প্রকল্প আর আলোর মুখ দেখেনি। সেই অভিমান থেকেই বোধহয় সিলেট জেলার ক্রীড়াঙ্গন থেকে গুটিয়ে নেন নিজেকে। শান্তি খুঁজে পান শ্রীমঙ্গলের মাগুরছড়ার খাসিয়াপুঞ্জিতে। প্রকৃতির কাছে সহজ-সরল মানুষদের সান্নিধ্যে। এখনো যাদের হৃদয়টা গ্রাস করেনি শহুরে বাস্তবতা। পরিবার মিজোরামে, ভাইবোনেরা সিলেটে আর জুম্মন থাকেন আবাহনী ক্লাবে নইলে খাসিয়াপুঞ্জিতে। সিলেট শহর আর তাঁকে টানল না। নিজের শহরে এই কিংবদন্তির ফেরা প্রাণহীন শব হয়ে।

কৌতূহলী হয়েই খুঁজতে যাওয়া জুম্মন লুসাইয়ের স্মৃতিস্মারকগুলো। এশিয়ান গেমস, এশিয়া কাপ, বিশ্ব একাদশের হয়ে খেলা—এমন অনেক বড় আন্তর্জাতিক আসরে অংশ নিয়েছেন জুম্মন। ঘরোয়া প্রতিযোগিতায়ও আছে অনেক অর্জন। সেই স্মারকগুলো কোথায়? বিশ্ব একাদশে প্রতিনিধিত্ব করার সময়কার ট্র্যাকস্যুট, প্রথম বাংলাদেশি হকি খেলোয়াড় হিসেবে আন্তর্জাতিক ম্যাচে হ্যাটট্রিক করার সেই হকিস্টিক—ক্রীড়াঙ্গনের অমূল্য এই স্মারকগুলো কার কাছে? এই প্রশ্নই রাখা হয়েছিল মারিয়ান চৌধুরীর কাছে। মারিয়ানের কাছে জানা গেল এর কোনোটাই বাংলাদেশে নেই, ‘জুম্মনের খেলার সব স্মারক তাঁর পরিবার নিয়ে গেছে মিজোরামে। বিশ্ব একাদশের ট্র্যাকস্যুটটা রাখা ছিল যত্ন করে। হ্যাটট্রিক করার সেই স্টিকটাও আমি বাঁধিয়ে রেখেছিলাম। জুম্মনের ছেলেকে দিয়ে বলেছি, যেন এটা যত্ন করে রাখে। এটা দিয়ে তোমার বাবা বাংলাদেশের হয়ে প্রথম হ্যাটট্রিক করেছিলেন। ’

স্মৃতি আছে, স্মৃতিচিহ্ন নেই। এভাবে একদিন হয়তো একসময় স্মৃতি থেকেও হারিয়ে যাবেন এই হকি কিংবদন্তি। বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ সম্মাননা জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন জুম্মন, কিন্তু সেটাও হাতে নিতে পারেননি জীবদ্দশায়। ১৯৭৮ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত মাঠের খেলোয়াড় জীবন, পরে কোচসহ নানা ভূমিকায় ছিলেন হকির সঙ্গেই। সেই জুম্মনকে জাতীয় পুরস্কার দেওয়া হলো ২০১১ সালে। মরণোত্তর পুরস্কার নেওয়াটা পরিবারের জন্য কতটা কষ্টের সেটাই ভারী গলায় বলছিলেন মারিয়ান। জুম্মনের পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন তাঁর অনুজ যৌবেল লুসাই, যিনি নিজেও হকি খেলেছেন আবাহনী ও অ্যাজাক্সের হয়ে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে স্বাধীনতা পুরস্কার নিচ্ছেন, এমন একটা স্বপ্ন ছিল জুম্মনের। ইচ্ছা ছিল, জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পর পাকাপাকিভাবে চলে যাবেন মিজোরামে। চলে গেলেন ঠিকই, তবে সীমান্তের ওপারে নয় বরং জীবনেরই সীমানা ছাড়িয়ে। জুম্মনের স্ত্রী ও তিন ছেলে মিজোরামেরই বাসিন্দা, বাবার পথ ধরে কেউ আসেনি হকিতে। দেশের ক্রীড়াঙ্গনেও তাঁর স্মরণে নেই কোনো স্থাপনা কিংবা প্রতিযোগিতা। জুম্মন লুসাইর নামটা শুধু খোদাই হয়ে আছে জাতীয় পুরস্কারের পদকে। এই পদকটা হাতে নিয়েই ভাইকে খোঁজেন মারিয়ান। কারণ এই ৫৬ হাজার বর্গমাইলে, ওই একটা জায়গাতেই তো খোদাই করে লেখা জুম্মনের নাম!


মন্তব্য